তীব্র অপুষ্টি দূর করতে আইসিডিডিআরবির নতুন পথ্য

প্রকাশ: June 9, 2015
icddrb

রেডি-টু-ইউজ থেরাপিউটিক ফুড নিয়ে ৯ জুন ২০১৫ তারিখে প্রথম আলোতে এই প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়েছে, যা আমরা ঢাকার পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হল-

মারাত্মক তীব্র অপুষ্টির শিকার শিশুদের চিকিৎসায় দেশি উপাদানে পথ্য তৈরি করেছে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশ (আইসিডিডিআরবি)। সংস্থাটির বিজ্ঞানীরা বলছেন, গবেষণায় দেখা গেছে, এই পথ্যে ৮০ শতাংশ শিশুর অপুষ্টি দূর হচ্ছে এবং তাদের ওজন বাড়ছে। ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের জন্য এই পথ্য তৈরি করা হয়েছে।

তবে এ পথ্য নিয়ে আপত্তি তুলেছেন দেশের শীর্ষস্থানীয় দুই পুষ্টিবিদ। অধ্যাপক এম কিউ-কে তালুকদার বলেছেন, এই পথ্যের বাণিজ্যিক ও ভুল ব্যবহারের সুযোগ আছে। আর বাংলাদেশ ব্রেস্টফিডিং ফাউন্ডেশনের চেয়ারপারসন এস কে রায় বলেছেন, এই পথ্য দীর্ঘ মেয়াদে শিশুপুষ্টি পরিস্থিতি খারাপ করবে।
গতকাল সোমবার আইসিডিডিআরবিতে পুষ্টিবিষয়ক আন্তর্জাতিক সিম্পোজিয়ামের উদ্বোধনী অধিবেশনে আনুষ্ঠানিকভাবে এ পথ্য সম্পর্কে জানানো হয়। গবেষণায় নেতৃত্বদানকারী বিজ্ঞানী ও আইসিডিডিআরবির পুষ্টি কেন্দ্রের প্রধান তাহমিদ আহমেদ বলেন, বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহৃত পথ্যের সঙ্গে নতুন এই পথ্যের পার্থক্য হচ্ছে—এগুলো দেশি খাদ্য উপাদানে তৈরি।

বিজ্ঞানী ও পুষ্টিবিদদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শিশুদের মারাত্মক তীব্র অপুষ্টি দূর করতে ব্যবহৃত এই পথ্যকে বলা হয় ‘রেডি-টু-ইউজ থেরাপিউটিক ফুড’ বা ‘আরইউটিএফ’। একটি ফরাসি প্রতিষ্ঠানের তৈরি এই পথ্য ‘প্লাম্পি নাট’ নামে আফ্রিকার কয়েকটি দেশে ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে ভারতে জনস্বাস্থ্যবিদ ও পুষ্টিবিদদের প্রতিরোধের মুখে প্লাম্পি নাট ব্যবহার বন্ধ করে দিয়েছে সে দেশের সরকার।

আইসিডিডিআরবির বিজ্ঞানীরা আরইউটিএফ তৈরি করেছেন চাল, ডাল বা ছোলা, গুঁড়া দুধ, চিনি, সয়াবিন তেল এবং অণুপুষ্টি-কণার (মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট) মিশ্রণে। পানিশূন্য এই মিশ্রণ একটি প্যাকেটে (পলিথিন-জাতীয়) থাকে। ঘরের তাপমাত্রায় এক বছর পথ্যটি ভালো থাকবে। ১০০ গ্রামের একটি প্যাকেট ৫০০ কিলোক্যালোরি শক্তি দেয়। শিশুর বয়স ও ওজনের ওপর নির্ভর করেই এ পথ্য খাওয়াতে হবে।

তাহমিদ আহমেদ উপস্থাপনায় বলেন, আইসিডিডিআরবির মহাখালীর কলেরা হাসপাতাল, কুড়িগ্রামে টেরে দেস হোমসের ক্লিনিক এবং ঢাকায় রাড্ডা বারনেনের ক্লিনিকে চিকিৎসা নিতে আসা মোট ৩২৭ জন শিশুর ওপর এই পথ্য নিয়ে গবেষণা করা হয়েছে। গবেষণাকাজ শেষ করতে সময় লেগেছে প্রায় তিন বছর। আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে গবেষণা করা হয়েছে। ফলাফলে দেখা গেছে, গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত একটি শিশুরও মৃত্যু হয়নি। ৮০ শতাংশ শিশুর অপুষ্টি দূর হয়েছে। আরইউটিএফ খেয়ে প্রতিটি শিশুরই ওজন বেড়েছে।

হঠাৎ করে অল্প সময়ের মধ্যে আমিষ, শক্তি এবং ভিটামিন ও খনিজের ঘাটতি দেখা দিলে শিশুর দেহে চর্বি ও পেশির টিস্যু কমে যায়—এরাই মারাত্মক তীব্র অপুষ্টির শিকার (সিভিয়ার অ্যাকুইট ম্যালনিউট্রিশন—স্যাম)। এসব শিশু রোগে আক্রান্ত হয় বেশি এবং এদের মৃত্যুঝুঁকিও বেশি। তাহমিদ আহমেদ বলেন, দেশে এ রকম শিশুর সংখ্যা ছয় লাখ।

উপস্থাপনার শেষ পর্যায়ে তাহমিদ আহমেদ বলেন, গবেষণায় এই ‘দেশি আরইউটিএফ’ ফলপ্রসূ প্রমাণিত হয়েছে। দেশে ব্যাপকভাবে পথ্যটি ব্যবহারের আগে মাঠপর্যায়ে একটি দিশারি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে।

তবে একাধিক পুষ্টিবিদ এই উদ্ভাবন বা এ ধরনের পথ্য বা খাবারের বিরোধিতা করে বলছেন, গুঁড়া দুধ শিশুপুষ্টির জন্য যেমন হুমকি হয়ে আছে, আরইউটিএফও একই হুমকি তৈরি করবে।

অধ্যাপক তালুকদার বলেন, আরইউটিএফ পরিচিতি পেলে চিকিৎসকেরা ব্যবস্থাপত্রে এই পথ্যের নাম লিখবেন, এই পথ্য বাণিজ্যিকভাবে তৈরি ও বিক্রি হবে। তিনি আরও বলেন, ‘মাতৃদুগ্ধ বিকল্প, শিশুখাদ্য, বাণিজ্যিকভাবে প্রস্তুতকৃত শিশুর বাড়তি খাদ্য ও উহা ব্যবহারের সরঞ্জামাদি (বিপণন নিয়ন্ত্রণ) আইন’ ও খসড়া পুষ্টিনীতি এ ধরনের খাদ্য বা পথ্যকে নিরুৎসাহিত করে।

আইসিডিডিআরবির সাবেক পুষ্টিবিজ্ঞানী এস কে রায় বলেন, অপুষ্টি ব্যবস্থাপনায় বাড়ির, হাঁড়ির বা পরিবারের খাবারকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে খাদ্যভিত্তিক ব্যবস্থাপনায় মারাত্মক তীব্র অপুষ্টি দূর করা সম্ভব বলে গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে। সে ক্ষেত্রে আরইউটিএফের পথে গেলে মায়েদের পুষ্টি সচেতনতা কমবে।
তবে আরইউটিএফ নিয়ে এসব আশঙ্কা ও অভিযোগ অস্বীকার করেছেন তাহমিদ আহমেদ। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, মারাত্মক তীব্র অপুষ্টি হচ্ছে রোগ। এর চিকিৎসা দরকার, ওষুধ দরকার। সেই ওষুধ হচ্ছে আরইউটিএফ। সব মা-বাবা বা অভিভাবক শিশুদের চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল বা শিশু হাসপাতালে আনতে পারেন না। তাই গ্রামে-গঞ্জে থাকা অপুষ্টির শিকার শিশুদের বাঁচাতে আরইউটিএফের ব্যবহার দরকার।

সূত্র: প্রথম আলো

You must be logged in to post a comment Login

মন্তব্য করুন