‘অন্যদের সময়ে’ বেঁচে থাকা হুমায়ুন আজাদ

প্রকাশ: August 11, 2015
হুমায়ুন_আজাদ_(১৯৪৭_–২০০৪)

হুমায়ুন আজাদ ছিলেন একাধারে কবি, ঔপন্যাসিক, গল্পকার, গবেষক, ভাষাবিজ্ঞানী। মুন্সিগঞ্জ জেলার অন্তর্গত বিক্রমপুরের রাড়িখালে ১৯৪৭ সালের ২৮ এপ্রিলে তার জন্ম। তার পূর্ব নাম হুমায়ুন কবির। ১৯৮৮ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর তিনি হুমায়ুন কবির নাম পরিবর্তন করে হুমায়ুন আজাদ নাম গ্রহণ করেন।

রাড়িখালের স্যার জগদীশচন্দ্র বসু ইনস্টিটিউশন থেকে মাধ্যমিক (১৯৬২), ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্যে অনার্সসহ স্নাতক (১৯৬৭) ও স্নাতকোত্তর (১৯৬৮) এবং এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভাষাবিজ্ঞান বিষয়ে গবেষণা করে ১৯৭৬ সালে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন হুমায়ুন আজাদ। তার পেশাগত জীবন শুরু হয় চট্টগ্রাম কলেজে যোগদানের (১৯৬৯) মধ্য দিয়ে। পরে তিনি ১৯৭০ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং ১৯৭২ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাষক পদে যোগদান করেন। ১৯৭৮ সালের ১ নভেম্বর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে নিয়োগ লাভ করেন এবং ১৯৮৬ সালে অধ্যাপক পদে উন্নীত হন।

১৯৬০-এর দশকে হুমায়ুন আজাদ যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগের ছাত্র তখন পশ্চিমের ভাষাবিজ্ঞানী চম্‌স্কি-উদ্ভাবিত ‘সৃষ্টিশীল রূপান্তরমূলক ব্যাকরণ’ (transformational-generative grammar (TGG)) তত্ত্বটি আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি ডিগ্রীর জন্য হুমায়ুন আজাদ এই তত্ত্বের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে বাংলা ভাষার বাক্যতত্ত্ব নিয়ে গবেষণা করেন। এর মাধ্যমে বাংলার ভাষাবিষয়ক গবেষণায় আধুনিক ভাষাবৈজ্ঞানিক পদ্ধতির সূত্রপাত করেন। তার পিএইচডি অভিসন্দর্ভের নাম ছিল Pronominalization in Bengali (অর্থাৎ বাংলা সর্বনামীয়করণ)। পরবর্তীতে এটি একই শিরোনামের ইংরেজি বই আকারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৮৩ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হয়। এর পর ১৯৮৪ খ্রিস্টাব্দে তিনি বাংলা ভাষার বাক্যতত্ত্বের ওপর বাক্যতত্ত্ব নামে একটি বাংলা বই প্রকাশ করেন। একই সালে তিনি বাঙলা ভাষা শিরোনামে দুই খণ্ডের একটি দালীলিক সঙ্কলন প্রকাশ করেন, যাতে বাংলা ভাষার বিভিন্ন ক্ষেত্রের ওপর বিগত শতাধিক বছরের বিভিন্ন ভাষাবিদ ও সাহিত্যিকের লেখা গুরুত্বপূর্ণ ভাষাতাত্ত্বিক রচনা সংকলিত হয়। এই তিনটি গ্রন্থ বাংলা ভাষাবিজ্ঞানে গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হিসাবে বিবেচিত হয়। তিনি পরবর্তী কালে তুলনামূলক-ঐতিহাসিক ভাষাবিজ্ঞান ও অর্থবিজ্ঞানের উপর দু’টি সংক্ষিপ্ত প্রাথমিক পাঠ্যপুস্তক লেখেন। ১৯৯০-এর দশকের শেষের দিকে তিনি বাংলা ভাষার একটি পূর্ণাঙ্গ ব্যাকরণ রচনার ব্যাপারে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। তবে দুর্ভাগ্যবশত অকাল মৃত্যুর কারণে তাঁর এই আগ্রহ বাস্তবায়িত হতে পারেনি।

হুমায়ুন আজাদের লেখালেখিতে বিজ্ঞানমনস্কতার ছাপ স্পষ্ট। তাকে দেশের প্রধান প্রথাবিরোধী ও বহুমাত্রিক লেখক হিসেবে বিবেচনা করা যায়। গতানুগতিক চিন্তাকে তিনি সচেতনভাবেই পরিহার করেছেন। তিনি যা ভাবতেন তাই সাহসের সঙ্গে লিখতেন ফলে তিনি বাংলা সাহিত্য ও দেশীয় রাজনীতির জগতে অনেকেরই বিরাগভাজন হন। সর্বপ্রথম গুস্তাভ ফ্লবেয়ারের আদলে ১৯৯১ প্রকাশিত প্রবচনগুচ্ছ এদেশের শিক্ষিত পাঠক সমাজকে আলোড়িত করতে সক্ষম হয়েছিল। তিনি নিজেই ছিলেন তার চিন্তা-চেতনা ও বিশ্বাসের প্রধান মুখপাত্র। একটি বৈষম্যহীন অর্থনৈতিক ব্যবস্থা তার স্বপ্ন ছিল। সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতিকেই তিনি মুক্ত মানবের মুক্ত সমাজ গড়ার পক্ষে অনুকূল বলে মনে করতেন। তার উল্লেখযোগ্য কিছু উক্তি-

“স্তবস্তুতি মানুষকে নষ্ট করে। একটি শিশুকে বেশি স্তুতি করুন, সে কয়েকদিনে পাক্কা শয়তান হয়ে উঠবে। একটি নেতাকে স্তুতি করুন, কয়েকদিনের মধ্যে দেশকে সে একটি একনায়ক উপহার দেবে”।

“সত্য একবার বলতে হয়; সত্য বারবার বললে মিথ্যার মতো শোনায়। মিথ্যা বারবার বলতে হয়; মিথ্যা বারবার বললে সত্য ব’লে মনে হয়”।
“নজরুল ও বেগম রোকেয়ার কথাই ধরা যাক, তারা সামাজিক ও ধর্মীয় ব্যাপারে এমন অনেক বক্তব্য প্রকাশ করেছেন, যা এখন ভাবতেও ভয় লাগে। এখন সে-সব প্রকাশ শুধু অসম্ভবই নয়, অত্যন্ত ভয়াবহও। পাকিস্তান ও বাঙলাদেশপর্বে কোনো নজরুল বা রোকেয়ার জন্ম সম্ভব ছিলো না, ও অসম্ভব। এখন কোনো নজরুল বা রোকেয়া ওই সব বক্তব্য প্রকাশ করলে তাঁদের রাস্তায় ছিঁড়ে ফেলা হবে। আমরা ভণ্ড বলে মৃত নজরুল-রোকেয়ার কবরে সৌধ তুলি, কিন্তু জীবিত নজরুল, রোকেয়ার গলা কাটার জন্য সবচেয়ে ধারালো ছরিকাগুলো প্রতিদিন শানিয়ে রাখি”।

“একটি মানুষ হয়ত লাশে পরিণত হয়, তখন তার কোন পরিচয় থাকে না, তার অস্তিত্ব পাওয়া যায় না, তাকে চাইলেই জড়িয়ে ধরা সম্ভব নয়, চুম্বন করতেও সাহসিকতার অভাব দেখা দেয় কিন্তু তাঁর মননশীলতা বেঁচে থাকে শতাব্দীর পর শতাব্দী। হত্যা কোন সমাধান নয়। একজন মানুষকে হত্যা করে কিছু সময় কিছু বছরের জন্যে হয়ত ভাল থাকা যায়, উন্নতি লাভ করা যায়, শান্তি পাওয়া যায়, লাভবান হওয়া সম্ভব কিন্তু জীবনে চলার পথে সেই হত্যাকারী দিনে দিনে হিংস্র ধ্বংসাত্মক রূপে নিজেকে আবিস্কার করতে সক্ষম হয় এবং একসময় মৃত্যুবরণ করে কিন্তু একজন জ্ঞানী মানুষ মৃত্যুর পরও বেঁচে থাকে”।

২০০৪ সালের ২৫ জানুয়ারি তৎকালীন সংসদ সদস্য দেলোয়ার হোসেন সাঈদী জাতীয় সংসদে হুমায়ুন আজাদের ‘পাক সার জমিন সাদ বাদ’ (২০০৩) বইটিকে ইসলাম বিরোধী আখ্যায়িত করে বক্তব্য দেন এবং এ ধরনের লেখকদের লেখা বন্ধ করতে ব্লাসফেমি আইন প্রণয়নের জন্য তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। এই বইটিতে হুমায়ুন আজাদ তীব্র ব্যঙ্গাত্মক ভাষায় বাংলাদেশের মৌলবাদীগোষ্ঠী স্বরূপ চিত্রিত করেন।

২০০৪ খ্রিস্টাব্দের ২৭ ফেব্রুয়ারি বাংলা একাডেমীতে অনুষ্ঠিত বইমেলা থেকে বেরিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে নিজের বাসায় যাওয়ার পথে ঘাতকদের আক্রমণের শিকার হন তিনি। বিদেশে নিবিড় চিকিৎসার মাধ্যমে তিনি কিছুটা সুস্থ হন। জামায়াতুল মুজাহেদিন বাংলাদেশ নামক ইসলামী জঙ্গি সংগঠনের একজন শীর্ষনেতা শায়খ আব্দুর রহমান পরবর্তিতে হুমায়ুন আজাদ এবং একইসাথে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এম ইউনুসকে হত্যার নির্দেশ দেবার কথা স্বীকার করে। মূলত তার নারী (১৯৯২), দ্বিতীয় লিঙ্গ (অনুবাদ, ২০০১), পাক সার জমীন সাদ বাদ (২০০৩) গ্রন্থ তিনটি তাকে মৌলবাদীদের বিরাগভাজন করে তোলে।

নারী_(১৯৯২)

পাক_সার_জমিন_সাদ_বাদ_(২০০৪)

সাময়িকভাবে সুস্থ হওয়ার পর ২০০৪ সালের ৭ আগস্ট জার্মান কবি হাইনরিখ হাইনের ওপর গবেষণা বৃত্তি নিয়ে জার্মানি যান হুমায়ুন আজাদ। সেবছরেরই ১১ আগস্ট আবাসস্থলে আকস্মিকভাবে মৃত্যুবরণ করেন হুমায়ুন আজাদ।

১৯৮০-র দশকের শেষভাগ থেকে হুমায়ুন আজাদ সমসাময়িক রাজনীতি নিয়ে গণমাধ্যমে বক্তব্য রাখতে শুরু করেন। এ সময় তিনি ‘খবরের কাগজ’ সাপ্তাহিক পত্রিকায় সম্পাদকীয় নিবন্ধ লিখতে শুরু করেন। সামরিক শাসনের বিরোধিতা দিয়ে তার রাজনৈতিক লেখালিখির সূত্রপাত। ২০০৩ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত ‘আমরা কি এই বাঙলাদেশ চেয়েছিলাম’ গ্রন্থটি প্রধানত রাষ্ট্রযন্ত্রের ধারাবাহিক সমালোচনা।

‘কবি হাইনরিশ হাইনের জীবনী ও তাঁর কবিতার বাংলা অনুবাদ’ বিষয়ে গবেষণার জন্য জার্মানির পি ই এন কর্তৃপক্ষ হুমায়ুন আজাদকে এক বছরের (১ আগস্ট ২০০৪-৩১ জুলাই ২০০৫) ফেলোশিপ প্রদান করলে তিনি জার্মানিতে গমন করেন। সেখানকার মিউনিখ শহরে ২০০৪ সালের ১২ আগস্ট তাঁর মৃত্যু হয়।
সাহিত্যে ভাবের ও ভঙ্গির প্রকাশে হুমায়ুন আজাদ ছিলেন স্বতন্ত্র। ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইল (১৯৯৪), সব কিছু ভেঙে পড়ে (১৯৯৫), মানুষ হিশেবে আমার অপরাধসমূহ (১৯৯৬), যাদুকরের মৃত্যু (১৯৯৬), শুভব্রত, তার সম্পর্কিত সুসমাচার (১৯৯৭), রাজনীতিবিদগণ (১৯৯৮), কবি অথবা দন্ডিত অপুরুষ (১৯৯৯), নিজের সঙ্গে নিজের জীবনের মধু (২০০০), ফালি ফালি করে কাটা চাঁদ (২০০১) ও শ্রাবণের বৃষ্টিতে রক্তজবা (২০০২) উপন্যাসগুলিতে তাঁর নিজস্ব ভাবনা প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে এ অঞ্চলের সমাজ ও সংস্কৃতির নানা সংঘাতের কথা উঠে এসেছে।

১৯৭৩ সালে প্রকাশিত হয় হুমায়ুন আজাদের প্রথম কাব্য ‘অলৌকিক ইস্টিমার’ এবং প্রবন্ধগ্রন্থ ‘রবীন্দ্রপ্রবন্ধ: রাষ্ট্র ও সমাজচিন্তা’। এ সময় তিনি ভাষাবিজ্ঞানচর্চার পাশাপাশি কবিতা লেখাতেও মনোযোগ দেন। ১৯৮৩ সালে প্রকাশিত হয় তার দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘জ্বলো চিতাবাঘ’। তার ভাষাতত্ত্ব বিষয়ক তিনটি গ্রন্থ যথা, বাংলা ভাষার শত্রুমিত্র (১৯৮৩), Pronominalization In Bengali (১৯৮৩), বাক্যতত্ত্ব (১৯৮৪)। তার সম্পাদিত গ্রন্থ: বাঙলা ভাষা (দু-খন্ড, ১৯৮৪ ও ১৯৮৫), আধুনিক বাংলা কবিতা (১৯৯৪), মুহম্মদ আবদুল হাই রচনাবলী (তিন খন্ড, ১৯৯৪), রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রধান কবিতা (১৯৯৭); তাঁর ভাষাবিজ্ঞানবিষয়ক দুটি গ্রন্থ, তুলনামূলক ও ঐতিহাসিক ভাষাবিজ্ঞান (১৯৮৮), অর্থবিজ্ঞান (১৯৯৯)। তার সাহিত্য-সমালোচনা ও মননশীলতার প্রকাশ লক্ষ করা যায় শামসুর রাহমান/নিঃসঙ্গ শেরপা (১৯৮৩) বিমানবিকীকরণ ও অন্যান্য প্রবন্ধ (১৯৮৮), ভাষা-আন্দোলন : সাহিত্যিক পটভূমি (১৯৯০), নারী (১৯৯২), নরকে অনন্ত ঋতু (১৯৯২), প্রবচনগুচ্ছ (১৯৯২), সীমাবদ্ধতার সূত্র (১৯৯৩), আধার ও আধেয় (১৯৯৩), আমার অবিশ্বাস (১৯৯৭), নির্বাচিত প্রবন্ধ (১৯৯৯), আমরা কি এই বাংলাদেশ চেয়েছিলাম (২০০৩) প্রভৃতি গ্রন্থে।

লাল নীল দীপাবলি (১৯৭৬), ফুলের গন্ধে ঘুম আসে না (১৯৮৫), কতো নদী সরোবর (১৯৮৭), আববুকে মনে পড়ে (১৯৮৯), বুকপকেটে জোনাকিপোকা (১৯৯৩), আমাদের শহরে একদল দেবদূত (১৯৯৬), অন্ধকারে গন্ধরাজ (২০০৩) প্রভৃতি বইয়ে হুমায়ুন আজাদের বৈশিষ্ট্যপূর্ণ ব্যঞ্জনাধর্মী ভাষা, প্রতিভা ও মননের প্রমাণ পাওয়া যায়। তার কবিস্বভাবের প্রমাণ পাওয়া যায় নিম্নলিখিত কাব্যগুলিতে, যতোই গভীরে যাই মধু যতোই ওপরে যাই নীল (১৯৮৭), আমি বেঁচেছিলাম অন্যদের সময়ে (১৯৯০), কাব্যসংগ্রহ (১৯৯৮), কাফনে মোড়া অশ্রুবিন্দু (১৯৯৮)।

সাহিত্যে অবদানের জন্য ১৯৮৬ সালে হুমায়ুন আজাদ বাংলা একাডেমী পুরস্কার লাভ করেন। শিশু সাহিত্যের জন্য অগ্রণী পুরস্কার (১৯৮৬), মার্কেন্টাইল ব্যাংক পুরস্কার (২০০৪) এবং একুশে পদক (মরণোত্তর, ২০১২) লাভ করেন তিনি।

You must be logged in to post a comment Login