অমর আলতাফ মাহমুদ

প্রকাশ: June 8, 2015
altaf mahmud

আলতাফ মাহমুদ (জন্ম: ২৩ ডিসেম্বর, ১৯৩৩ – অন্তর্ধান: ১৯৭১) একজন বাংলাদেশী সুরকার, সাংস্কৃতিক কর্মী ও স্বাধীনতা যুদ্ধের শহীদ মুক্তিযোদ্ধা। ১৯৩৩ সালের ২৩শে ডিসেম্বর বরিশাল জেলার মুলাদি উপজেলার পাতারচর গ্রামে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৪৮ সালে বরিশাল জিলা স্কুল থেকে তিনি মেট্রিকুলেশন পরীক্ষা পাশ করে বিএম কলেজে ভর্তি হন। পরে তিনি চিত্রকলা শিখতে ক্যালকাটা আর্টস স্কুলে যান।

আলতাফ মাহমুদের সৃজনশীলতার বহিঃপ্রকাশ ঘটে তার ছেলেবেলাতেই। বাড়ির সামনের বেঞ্চে বসে ঘন্টার পর ঘন্টা গান গাইতেন তিনি। তার গান শুনে মুগ্ধ হতেন পরিবারের সদস্যরা, বন্ধু-বান্ধব, সহপাঠী আর স্কুলের শিড়্গকরা। খুব সুন্দর ছবি আঁকতেন তিনি। ১৯৫২ থেকে ৭১ পর্যন্ত বিভিন্ন সময় বিভিন্ন আন্দোলন এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে তাঁকে দেখা গেছে পোস্টার, প্ল্যাকার্ড লিখতে ও আঁকতে। ছবি আঁকা ছিল তার নেশা। কিন্তু সবচেয়ে বড় নেশা ছিল তার গান গাওয়া। দিন-রাত প্রায় সারাক্ষণ তার মুখে লেগে থাকতো গানের কলি। আলতাফ মাহমুদ গান লিখতেন, সুর করতেন এবং গেয়ে শোনাতেন। হারমোনিয়াম, তবলা, পারকাসন, বাঁশি, পিয়ানো, বেহালাসহ প্রায় সব ধরনের যন্ত্রই বাজানোতেই পারদর্শী ছিলেন তিনি। ষাট দশকের শেষের দিকে তিনি অর্কেস্টেশন সম্পর্কে বিরল জ্ঞান অর্জন করেন। তিনি প্রসিদ্ধ ভায়োলিন বাদক সুরেন রায়ের কাছে প্রথম সঙ্গীতে তালিম নেন। তিনি গণসঙ্গীত গাইতে শেখেন যা ঐ সময় তাঁকে অসম্ভব জনপ্রিয়তা ও বিপুল খ্যাতি এনে দেয়।

১৯৫০ সালে আলতাফ মাহমুদ ঢাকা এসে ‘ধূমকেতু শিল্পী সংঘ’-এ যোগদান করেন। পরে তিনি ভাষা আন্দোলনে যোগ দেন এবং গণজাগরণের লক্ষ্যে বহু গণসঙ্গীত পরিবেশন করেন। ১৯৫০ সালের দিকে তিনি ভাষা আন্দোলনের পক্ষে সমর্থন আদায়ের জন্য বিভিন্ন জায়গায় গণসঙ্গীত গাইতেন। গান গাওয়ার মাধ্যমে মাহমুদ এই আন্দোলনকে সর্বদাই সমর্থন যুগিয়েছেন। ২৩ ফেব্রুয়ারি, ১৯৫২ সালে আবদুল গাফফার চৌধুরী রচিত আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো শিরোনামের আলোড়ন সৃষ্টিকারী গানটিতে সুর সংযোজন করে খ্যাতির শীর্ষে আরোহণ করেন। ১৯৬৯ সালে তিনি আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো গানটিতে পুণরায় সুরারোপ করেন, যেটি প্রথমত সুর করেছিলেন আব্দুল লতিফ। এই সুরটি জহির রায়হানের চলচ্চিত্র ‘জীবন থেকে নেয়া’য় ব্যবহৃত হয়।

১৯৫৬ সালে ভিয়েনায় আয়োজিত শান্তি সম্মেলনে যাওয়ার আমন্ত্রণ পেয়ে তিনি করাচি পর্যন্ত গিয়েছিলেন, কিন্তু তৎকালীন পাকিস্তান সরকার তার পাসপোর্ট বাজেয়াপ্ত করায় তিনি আর যেতে পারেননি। ওই সময় তিনি দেশে না ফিরে ১৯৬৩ পর্যন্ত করাচিতেই অবস্থান করেন। সেখানে তিনি ওস্তাদ আবদুল কাদের খাঁর নিকট উচ্চাঙ্গসঙ্গীতে তালিম নেন। কিছুকাল নৃত্যশিল্পী ঘনশ্যাম ও গীতিকার, সঙ্গীত পরিচালক দেবু ভট্টাচার্যের সঙ্গেও তিনি কাজ করেন। করাচি থেকে ঢাকায় ফিরে ১৯৬৫ সালের দিকে তিনি চলচ্চিত্রে সঙ্গীত পরিচালনার কাজ শুরু করেন। এর পাশাপাশি তাঁর সাংগঠনিক তৎপরতাও অব্যাহত থাকে। এ সময় তিনি ‘ক্রান্তি শিল্পীগোষ্ঠী’সহ অনেক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হন এবং বিভিন্ন সভা-সমিতিতে গণসঙ্গীত পরিবেশন করেন।

বাংলা সংস্কৃতির বিকাশের জন্য যাঁরা সংগ্রাম করেছেন, আলতাফ মাহমুদ ছিলেন তাঁদের অন্যতম। অঙ্কন শিল্পেও তাঁর ব্যুৎপত্তি ছিল। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় তিনি দেশাত্মবোধক গান রচনা ও পরিবেশনার মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধা ও স্বাধীনতাকামী জনগণকে গভীরভাবে উদ্বুদ্ধ করেন। তাঁর সেসব গান তখন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত হতো। মুক্তিযোদ্ধাদের অর্থ ও খাদ্য দিয়েও তিনি প্রত্যক্ষ্যভাবে স্বাধীনতা সংগ্রামে সাহায্য করেন। তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে তাঁর বাসায় গোপন ক্যাম্প স্থাপন করেন। কিন্তু ক্যাম্পের কথা ফাঁস হয়ে গেলে ১৯৭১ সালের ৩০ আগস্ট পাকিস্তানী সেনাবাহিনী তাঁকে আটক করে। তাঁর ওপর অমানুষিক নির্যাতন চালানো হয়। তাঁর বাসা থেকে আরো অনেক গেরিলা যোদ্ধা আটক হয়। এদের অনেকের সাথে তিনিও চিরতরে হারিয়ে গেছেন। পরবর্তীকালে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে তাঁর দেশাত্মবোধক গান প্রচারিত হতে থাকে যা অগণিত মুক্তিযোদ্ধাকে অনুপ্রারিত করেছিল।

আলতাফ মাহমুদ যেসকল গীতিনাট্য, ছায়ানাট্য ও নৃত্যনাট্যের সঙ্গীত পরিচালনা করেছেন: নূর আহমেদ রচিত ‘আগামী দিন’, তারাশংকরের ‘দুই পুরষ’, পূর্ব-পাকিস্তান শিল্পী সংসদ প্রযোজিত ‘কিষাণের কাহিনী’, পূর্ব-পাকিস্তান শিল্পী সংসদ প্রযোজিত ‘মজদুর’, নিজামুল হক পরিচালিত ‘শিল্পী’, আবদুল মালেক খান পরিচালিত ‘মায়ামৃগ’, সোভিয়েত ইউনিয়নের ৫০ বছর পূর্তি উপলড়্গে ‘আমরা স্ফুলিঙ্গ’, ড. এনামুল হক রচিত ‘হাজার তারের বীণা’, আমানুল হক রচিত ‘জ্বলছে আগুন ক্ষেত-খামারে’, ড. এনামুল হক রচিত ‘রাজপথ জনপথ’।

Altaf record

আলতাফ মাহমুদ যে সকল গণসঙ্গীত এবং একুশের গান সুর করেছেন এবং গেয়েছেন: মোশারফ উদ্দিন রচিত, ‘মৃত্যুকে যারা তুচ্ছ করিল ভাষা বাঁচাবার তরে…’, আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী রচিত ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারী’, মোরা কি দুঃখে বাঁচিয়া রবো, মন্ত্রী হওয়া কি মুখের কথা, শামসুদ্দিন রচিত ‘রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন করলিরে বাঙালী/ তোরা ঢাকা শহর রক্তে ভাসাইলি’, নিজের রচিত ‘মেঘনার কূলে ছিল আমার ঘর/ হঠাৎ একটা তুফান আইসা ভাইসা নিল তারে রে’, করাচি বেতারে পরিবেশিত ‘জীবনের মধু মাস মোর দুয়ারে আজ কি কথা বলে যায়’, শহীদুল্লাহ্‌ কায়সার রচিত ‘আমি মানুষের ভাই স্পার্টাকাস’, স্বরোচিত ‘এ ঝঞ্জা মোরা রুখবো’, বদরুল হাসান রচিত ‘ঘুমের দেশের ঘুম ভাঙাতে’, সংগ্রহীত রচনা ‘এই পথ কালো পথ’, স্বরোচিত ‘হে মহাক্ষুধা’, ভাষা সৈনিক গাজীউল হক রচিত ‘ভুলবো না ভুলবো না, একুশে ফেব্রুয়ারী’, কাজী নজরুল ইসলামের ‘বিদ্রোহী’ কবিতা, ম্যায় ভূখা হু, জাগো কমরেড, ঈষাণ কোণে মেঘ জমেছে, হুনছোনি ভাই দেখছোনি দেখছোনি ভাই হুনছোনি, স্বর্গে যাবো গো, সুখেন্দু চক্রবর্তী রচিত ‘বিচারপতি তোমার বিচার করবে যারা, আজ জেগেছে সেই জনতা’।

১৯৭৭ সালে আলতাফ মাহমুদকে একুশে পদক প্রদান করা হয়। বাংলা সংস্কৃতি ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে অবদান রাখার কারণে তাঁকে এ পুরস্কার প্রদান করা হয়। সংস্কৃতিক্ষেত্রে অসামান্য আবদান রাখায় তাকে ২০০৪ সালে স্বাধীনতা পুরস্কার (মরণোত্তর) প্রদান করা হয়। তাকে স্মরণ রাখতে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে শহীদ আলতাফ মাহমুদ ফাউন্ডেশন।

You must be logged in to post a comment Login

মন্তব্য করুন