কাইয়ুম চৌধুরী

প্রকাশ: May 21, 2015
Qaium Chaudhury

কাইয়ুম চৌধুরী জন্মেছিলেন ফেনীতে, ১৯৩৪ সালের ৯ মার্চ। ক্ষয়িঞ্চু যে জমিদার-পরিবারে তাঁর জন্ম সেখানে বিত্তের পূর্বতন জৌলুস বিশেষ অবশিষ্ট ছিল না, কিন্তু এই পরিবারে শিক্ষা ও উদার মানসের ছিল জোরদার অবস্থান। পিতা আবদুল কুদ্দুস চৌধুরী ছিলেন সমবায় পরিদর্শক এবং পরে হয়েছিলেন সমবায় ব্যাংকের কর্মকর্তা। বাবার বদলির চাকরির সুবাদে কাইয়ুম চৌধুরী বাংলার অনেক এলাকায় ঘুরে ফিরেছেন।

একেবারে বাল্যে মক্তবে কাইয়ুম চৌধুরীর শিক্ষার হাতেখড়ি, তারপর ভর্তি হলেন চট্টগ্রামের নর্মাল স্কুলে। এরপর কিছুকাল কুমিল্লায় কাটিয়ে চলে যান নড়াইলে। সেখান থেকে সন্দ্বীপ এসে ভর্তি হন প্রথমে সন্দ্বীপ হাই স্কুলে ও পরে কারগিল হাই স্কুলে। এরপর নোয়াখালি সদরে কিছুকাল কাটিয়ে পিতার সঙ্গে তার ঠাঁই বদল হয় ফেনীতে। ভর্তি হলেন ফেনী হাই স্কুলে, সেখানে থেকে যান ফরিদপুরে। ফরিদপুর থেকে অবশেষে ময়মনসিংহ এসে সিটি কলেজিয়েট স্কুল থেকে যখন ম্যাট্রিক পাশ করেন তখন ১৯৪৯ সাল, বৃটিশ বিদায় হয়ে পাকিস্তানের জন্মের পর কেটেছে প্রায় দু’বছর। ১৯৪৯ সালে আর্ট ইনস্টিটিউটে ভর্তি হয়ে কাইয়ুম চৌধুরী কৃতিত্বের সঙ্গে শিক্ষা সমাপন করেন ১৯৫৪ সালে।

পিতার প্রভাব কাইয়ম চৌধুরীকে বিশেষ আগ্রহী করেছে সঙ্গীতে ও গ্রন্থপাঠে। বাল্যকালে অর্জিত এই দুই নেশা তাঁর পরবর্তী শিল্পীজীবনে বিশেষ ছায়াপাত ঘটিয়েছে। স্কুল জীবন থেকে আঁকাআঁকির প্রতি ঝোঁক দেখা গিয়েছিল কাইয়ুম চৌধুরীর। তখনকার দিনে আঁকাআঁকি শেখার জন্য যেতে হত কলকাতায়, কিন্তু ঢাকায় শিল্পশিক্ষালয় খোলা হয়েছে এবং এই কাজের উদ্যোক্তা ময়মনসিংহের কৃতী সন্তান জয়নুল আবেদিন। একদিন জয়নুল আবেদিনকে দেখে আইয়ুম চৌধুরীর আগ্রহে তার বাবা জয়নুল আবেদিনের সঙ্গে আলোচনা করলেন ঢাকার আর্টস ইনস্টিটিউটে ভর্তির বিষয়ে এবং পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের পূর্বেই ১৯৪৯ সালের শেষাশেষি কাইয়ুম চৌধুরী ঢাকায় এসে অপরিসর দুই কক্ষের সেই প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হলেন।

ঢাকায় এসে বোনের বাসায় উঠেছিলেন কাইয়ুম চৌধুরী, বাবার দেয়া মাসোহারা ছিল চার টাকা। সতীর্থ অন্যরাও মধ্যবিত্ত বলয়ের মানুষ। জেলা শহর ঢাকা হঠাত্‍ করে প্রাদেশিক রাজধানী হয়েছে বটে কিন্তু নাগরিক আচার বা বৈদগ্ধ তখনও কিছু আয়ত্ত হয়নি। দ্রুত বাড়ছিল শহর, তবে শহরের মানুষের সঙ্গে গ্রামবাংলার যোগ ছিল বেশ নিবিড়। বস্তুত গোটা পূর্ববঙ্গেই শহুরে এলিট শ্রেণী বিশেষ বলবান ছিল না।

QCP1

বড় আকারের স্বপ্ন বুকে নিয়ে ছোট আকারে যে যাত্রা শুরু হয়েছিল আর্টস ইনস্টিটিউটের তা ক্রমশ কাঠামোগতভাবে বিকশিত হতে থাকে। ১৯৫২ সালের শেষাশেষি সেগুনবাগিচায় বাগান ও মাঠসমেত বনেদি দোতলা ভবনে ইনস্টিটিউটটি স্থানান্তরিত হয়। এরপর শুরু হয় নিজস্ব ভবন নির্মাণের প্রয়াস এবং ১৯৫৬ সালে প্রতিভাবান তরুণ স্থপতি মাজহারুল ইসলামের নকশায় তৎকালীন ঢাকার আধুনিক স্থাপত্যের শ্রেষ্ঠ নিদর্শনস্বরূপ বর্তমান ভবন নির্মিত হয়ে এর স্থায়ী রূপদান সম্পন্ন হয়।

১৯৫৩ সালে একুশে ফেব্রুয়ারির প্রথম বার্ষিকী স্মরণে রেখে হাসান হাফিজুর রহমান ও মোহাম্মদ সুলতানের যৌথ উদ্যোগে যে সঙ্কলন প্রকাশের প্রয়াস নেয়া হয় সেখানে নবীন শিল্পশিক্ষার্থীদের ঘনিষ্ঠ ভূমিকা ছিল। সঙ্কলনের জন্য লিনোকাট ও ড্রইং করেছিলেন মুর্তজা বশীর ও বিজন চৌধুরী। প্রচ্ছদ এঁকেছিলেন আমিনুল ইসলাম। আর সদরঘাট থেকে যে মিছিল বের হয়েছিল তাতে আর্ট ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থীরা যোগ দিয়েছিলেন চিত্রিত ফেস্টুন নিয়ে এবং মিছিলের পুরোভাগে রশীদ চৌধুরী, মুর্তজা বশীরের সঙ্গে ছিলেন কাইয়ুম চৌধুরী।

QCP3

ঢাকার আর্টস ইনস্টিটিউটে শিল্পের করণ-কৌশল শেখানোর মান সন্তোষজনক হলেও চিত্রকলার ইতিহাস ও তত্ত্ব নিয়ে পড়াবার কোনও ক্লাস ছিল না সে-সময়। শিল্পতত্ত্ব বিষয় হিসেবে যেমন সংহতি অর্জন করেনি, তেমনি এ- বিষয়ে শিক্ষাদানর যোগ্য ব্যক্তিরও অভাব ছিল। ছাত্রদের সামনে সুযোগও ছিল সীমিত। দুই কক্ষের শিক্ষালয়ে বইয়েরও কোনও ভাণ্ডার ছিল না সঙ্গতকারণেই। তবে সম্পদ ও অবকাঠামোর এই ঘাটতি পূরণের তাগিদ শিক্ষার্থীদের মধ্যেই ছিল। কাইয়ুম চৌধুরী প্রথম স্কলারশিপ পান ৩৫ টাকা,এর মধ্যে ২০ টাকার বই আর ১৫ টাকার পেইন্টিং ম্যাটেরিয়াল কিনেছিলেন।

QCP2

১৯৫৪ সালে কাইয়ুম চৌধুরী যখন ফাইন আর্টস বিভাগের পাঠ সমাপন করলেন তখন তাঁর বয়স মাত্র কুড়ি। নবগঠিত আর্ট কলেজে যেসব ছাত্র ভর্তি হয়েছিলেন তাঁদের কারো সামনে পেশার ছবি পরিষ্কার কিছু ছিল না, সে ভাবনাতে তাঁরা তেমন আলোড়িতও হননি। তাঁদের একমাত্র অভিলাষ ছিল শিল্পী হয়ে ওঠা। বলার অপেক্ষা রাখেনা, আর্ট কলেজের শিক্ষা কাউকে শিল্পী করে তোলে না, শিল্পী হওয়ার যাত্রাপথে দাঁড় করিয়ে দেয় মাত্র। পাশ করার পর কাইয়ুম চৌধুরী তক্ষনি কোনও পেশায় যোগ দেননি। ১৯৫৫-৫৬ সালে তিনি নানা ধরনের ব্যবহারিক কাজ করেছেন, বিজ্ঞাপনী সংস্থার সঙ্গে যুক্ত থেকেছেন, আর করেছেন বইয়ের প্রচ্ছদ ও সচিত্রকরণের কাজ। ছাত্রজীবনে ডিজাইনের যে পারিপার্ট ছিল তাঁর বৈশিষ্ট্য সেটি তিনি বাস্তবে প্রয়োগ করতে শুরু করলেন এবং শিক্ষাসমাপন পরবর্তী হলেও এই পর্বকে শিক্ষানবিশীর কালই বলা যায়। তবে প্রচ্ছদ অঙ্কনে তাঁর সুবিধা ছিল তাঁর পঠনপাঠন ও সাহিত্যবোধের ব্যাপ্তি, বইয়ের অন্তর্নিহিত ভাব অবলম্বন করে তিনি পৌঁছতে পারেন বহিরঙ্গে। বইয়ের প্রচ্ছদকে শিল্পের পর্যায়ে উন্নীত করার ক্ষেত্রে সত্যজিত্‍ রায়ের শৈল্পিক স্পর্শ তখন পল্লবিত হতে শুরু করেছে সিগনেট প্রেসের প্রকাশনাকে ঘিরে। পঞ্চাশের দশকের গোড়া থেকে সত্যজিৎ রায় সিগনেটের প্রকাশনার শিল্পনির্দেশনার কাজ শুরু করেন এবং কেবল প্রচ্ছদ অঙ্কনই নয়, পেছনের মলাটের লিপি বিন্যাস, নামপত্র, পৃষ্টাসজ্জা, বাঁধাই ইত্যাদি মিলিয়ে প্রকাশনাকে একটি সামগ্রিক শিল্পরুচির বাহক করে তোলেন। ঢাকায় সিগনেটের বই মোটামুটিভাবে ছিল লভ্য। কাইয়ুম চৌধুরীর জন্য এ ছিল এক অনুপম নির্দশন। তবে পূর্ববঙ্গে প্রকাশনার তখন সবে সূচনাকাল, পাঠ্যবইয়ের বাইরের সৃজনশীল বইয়ের প্রকাশনা যেমন কম তেমনি মুদ্রণ পদ্ধতি ও রঙ্গিন প্রচ্ছদ ছাপার রীতিও একান্ত সেকেলে। ধীরে ধীরে সামাজিক রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটছিল এবং চুয়ান্নর প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে মুসলিম লীগের ভরাডুবি ঘটিয়ে যুক্তফ্রন্টের বিজয় এ উত্সালহব্যঞ্জক অবস্থার জন্ম দিয়েছিল। বাঙালি জাতীয়তাবাদের জাগরণ বাংলা সাহিত্য ও প্রকাশনায় প্রেরণা যোগাচ্ছিল। সাময়িক পত্রিকা বিষয়ে আগ্রহী কাইয়ুম চৌধুরী, ‘ছায়াছবি’ নামে একটি চলচ্চিত্র সাময়িকী যুগ্মভাবে সম্পাদনা করেছিলেন কিছুকাল। সুযোগমতো টুকটাক প্রচ্ছদ আঁকছিলেন এবং এই কাজের সূত্রেই পরিচয় সৈয়দ শামসুল হকের সঙ্গে। ১৯৫৫ সালে তাঁর দুই বইয়ের প্রচ্ছদ এঁকেছিলেন, কিন্তু প্রকাশক অপারগ হওয়ায় সে বই আর আলোর মুখ দেখেনি। প্রচ্ছদে একটি পালাবদল তিনি ঘটালেন ১৯৫৭ সালে প্রকাশিত জহুরুল হকের ‘সাত-সাঁতার’ গ্রন্থে। এতোকাল প্রচ্ছদকে নিছক দৃষ্টিশোভন করার যে চেষ্টা দেখা যেতো সেখানে তিনি যোগ করলেন বুদ্ধিবৃত্তিক বিবেচনা। অর্থাৎ গ্রন্থের বক্তব্যের বা সারসত্যের প্রতিফলন ঘটালেন প্রচ্ছদে, একই সঙ্গে গ্রাফিক ডিজাইনে কুশলতা ও নতুন ভাবনার ছাপ মেলে ধরলেন। এমনি দক্ষতার যুগল মিলনে আঁকলেন ফজলে লোহানী রচিত ‘কথাসরিত্সাগর’-এর প্রচ্ছদ যা কখনও আলোর মুখ দেখেনি প্রকাশকের নিরুৎসাহে। প্রকাশনার ব্যাপ্তি যতো প্রসারিত হতে লাগলো আপন দক্ষতাকে ততো নিপুণ ও ব্যতিক্রমী করে তুলতে লাগলেন তিনি।

১৯৫৪ সালে কাইয়ুম চৌধুরী অংশ নেন বর্ধমান ভবনে আয়োজিত নিখিল পাকিস্তান চিত্রপ্রদর্শনীতে। ১৯৫৬ সালে সহশিল্পী মুর্তজা বশীর ও সৈয়দ জাহাঙ্গীরকে নিয়ে গড়ে তোলেন ‘পেইন্টার্স ইউনিট’। ঢাকা প্রেস ক্লাবে আয়োজিত হয় পেইন্টার্স ইউনিট -এর প্রথম চিত্র প্রদর্শনী। তিন শিল্পীর সম্মিলিত এই গ্রুপের এটিই ছিল প্রথম ও শেষ প্রদর্শনী এবং অচিরে নবগঠিত দল ভেঙে যায়। কাইয়ুম চৌধুরী ছয়টি জলরঙ নিয়ে প্রদর্শনীতে যোগ দিয়েছিলেন এবং বন্ধু সৈয়দ শামসুল হক ১৯৬২ সালের জানুয়ারিতে ‘কাইয়ুম: এ পোট্রেট’ শিরোনামে অবজারভার পত্রিকায় প্রকাশিত নিবন্ধে এই প্রদর্শনীর বিশেষ উল্লেখ করেছেন। লেখাটি নানা কারণে আলাদাভাবে উল্লেখের দাবি রাখে। কাইয়ুম চৌধুরী-বিষয়ক এটিই যে প্রথম পূর্ণাঙ্গ রচনা কেবল তা নয়, শিল্প-সমালোচক হিসেবে সৈয়দ শামসুল হক যে কী অসাধারণ দক্ষতা ও অন্তর্দৃষ্টি ধারণ করতেন তার পরিচয় মেলে এই লেখায়। সৈয়দ শামসুল হক লিখেছেন, “কাইয়ুম আধ ডজন জলরং ছবি নিয়ে প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করে। এর তিনটির বিষয় আমার মনে স্থায়ী ছাপ ফেলেছে, রাতের জিন্নাহ এভিনিউ, দুপুরে একই রাস্তা এবং ঘাটে-বাঁধা নৌকা। সবগুলোই ছিল ঘনিষ্ঠ অবলোকন। তিনি ছবিতে পুরে দিয়েছিলেন জলরঙের প্রয়োজনীয় গীতলতা। কাজটি প্রশংসনীয়, কেননা প্রকৃতিগতভাবে এই মাধ্যমটি ঘনিষ্ঠ পর্যবেক্ষণ এড়িয়ে যেতে চায়।”
এই সময়ের আঁকা আরও যে দু-একটি চিত্রকর্ম আমরা দেখতে পাই তার মধ্যে রয়েছে তেলরঙে ‘আমার বোন’, যা ইমপ্রেশনিস্ট শিল্পরীতি যাচাই করে দেখার প্রয়াস হিসেবে গণ্য হতে পারে। আরও রয়েছে ১৯৫৬ সালে তেলরঙে আঁকা ‘মহাজন’ এবং একই বছর করা জলরঙের ছবি ‘নিশ্চল নৌকা’। উল্লেখ্য, ১৯৭৭ সালে শিল্পকলা একাডেমী আয়োজিত কাইয়ুম চৌধুরীর প্রথম চিত্র প্রদর্শনীতে ছবিগুলো স্থান পেয়েছিল। ‘মহাজন’ এবং ‘নিশ্চল নৌকা’ ইঙ্গিত দেয় শিল্পীর সামনের দুই পথের। প্রথমটিতে রয়েছে ফিগারেটিভ কাজকে আধুনিক ফর্মে উপস্থাপনের সফল নিরীক্ষাময়তা এবং দ্বিতীয়টিতে লোকায়ত ফর্মের গভীরে প্রবেশের আকুতি। ১৯৫৭ সালে কাইয়ুম চৌধুরী আর্ট কলেজে শিক্ষকতার কাজে যোগ দেন। শিক্ষকতার পাশাপাশি চলছিল তাঁর ডিজাইন ও প্রচ্ছদ অঙ্কনের কাজ। তত্কা্লীন প্রকাশনা পরিস্থিতিতে খুব বেশি কাজ হওয়ার সুযোগ অবশ্য ছিল না, কিন্তু নানা দিকে নিজেকে ছড়িয়ে দিচ্ছিলেন। জহির রায়হান, সৈয়দ শামসুল হক, গাজী শাহাবুদ্দিন প্রমুখ বন্ধুদের টানে চলচ্চিত্র, সাহিত্য সাময়িকী প্রকাশনা নিয়ে গভীরভাবে মজেছিলেন। সঙ্গীতের রসগ্রহণ তো বরাবরের মতো চলছিল। সব মিলিয়ে বলা যায়, শিল্পের সমগ্রতার রস আহরণ করছিলেন যৌবনের দীপ্ত দিনগুলোতে এবং সেই সমগ্র দৃষ্টি নিয়ে খুঁজছিলেন নিজের জন্য শিল্পভূমি।

পেইন্টার্স ইউনিটের প্রদর্শনী-পরবর্তী সময়কে কাইয়ুম চৌধুরীর শৈল্পিক মানসের এক সঙ্কটকাল হিসেবে উল্লেখ করেছেন সৈয়দ শামসুল হক। এ মূলত শিল্পীর মানস-সঙ্কট, শৈল্পিক আকুতির প্রকাশপথ নিয়ে দ্বিধা-দ্বন্দ্বে দীর্ণ হওয়ার সঙ্কট। কাইয়ুম চৌধুরী যে ধরনের কাজ করছিলেন তাতে তৃপ্ত হতে পারছিলেন না, হাতড়ে ফিরছিলেন বিভিন্ন দিক; কিন্তু নিজের পথ কোনটি হবে তার সায় মন থেকে পাচ্ছিলেন না। এসব ক্ষেত্রে যেমনটা হয়ে থাকে, দীর্ঘ সময় তিনি হয়ে রইলেন প্রায় নিষ্ফলা। তবে নিষ্ফলা হলেও অকর্ষিত থাকেনি মনোভূমি। তাঁর নিজস্ব উপায়ে শিল্পানুসন্ধান ও শিল্পজিজ্ঞাসা অব্যাহত ছিল।

১৯৫৭ সালে সতীর্থ আমিনুল ইসলাম ও সৈয়দ জাহাঙ্গীরকে নিয়ে কাইয়ুম চৌধুরী গিয়েছিলেন কলকাতায়। ঢাকাস্থ বৃটিশ কাউন্সিলের তরুণ কর্মকর্তা জিওফ্রে হেডলির সঙ্গে তাঁদের বিশেষ সখ্য গড়ে উঠেছিল। ঐ কর্মকর্তা পরে কলকাতা বদলি হলে তাঁরই আহ্বানে এই সফর। কলকাতায় দেখা করেছিলেন তাঁর মানস-নৈকট্যবান সত্যজিত্‍ রায় ও খালেদ চৌধুরীর সঙ্গে। প্রচ্ছদ ও মুদ্রণ-সৌকর্য বিকাশে তিনি নিজে যে-ধরনের আকুতি অনুভব করছিলেন তার সমর্থন যেন মিললো এই সাক্ষাত্‍ থেকে। আরও ছিল চলচ্চিত্র-দর্শন ও বিভিন্ন শিল্পীর সঙ্গে সাক্ষাতের অভিজ্ঞতা। মোটের ওপর বলা যায়, এই সফর থেকে তিনি চিত্তের খোরাক সংগ্রহ করেছিলেন।
ব্যবহারিক শিল্প সংক্রান্ত কাজে কাইয়ুম চৌধুরী আনন্দ খুঁজে পাচ্ছিলেন। ডিজাইনের যে আঁটসাঁট চারিত্র, অবয়ব থেকে রূপে পৌঁছাবার যে চ্যালেঞ্জ সেটি তো শিল্পের করণকৌশলের অন্তর্গত। শিল্প-সমাধান অর্জনের ক্ষেত্রে ব্যবহারিক ও সৃজনশীল উভয়ের মধ্যে এক্ষেত্রে সাযুজ্য রয়েছে এবং এইসব কাজে তিনি যেন নিজের শিল্পক্ষমতা যাচাই ও ঝালাই করে নেয়ার সুযোগ পাচ্ছিলেন। বিশেষভাবে তাঁর স্ফূর্তি ছিল বইরের প্রচ্ছদ অঙ্কনে এবং এই কাজে তিনি অচিরেই এক অতুলনীয় মাত্রা অর্জন করলেন। তরুণ এই শিল্পীর অনুপম দক্ষতার সাক্ষ্য ফুটে উঠতে লাগলো একের পর এক অভিনব দৃষ্টিনন্দন ভাবুক প্রচ্ছদ শোভিত বইয়ে। ১৯৫৯ সালে বন্ধুবর গাজী শাহাবুদ্দিন আহমদের সন্ধানী প্রকাশনী যাত্রা শুরু করলো জহির রায়হানের ‘শেষ বিকেলের মেয়ে’ গ্রন্থ প্রকাশের মাধ্যমে। ১৯৬১ সালে মাওলা ব্রাদার্স সৃজনশীল প্রকাশনার অধ্যায় উন্মোচন শুরু করে আবদুশ শাকুরের ‘ক্ষীয়মাণ’ এবং সৈয়দ শামসুল হকের কাব্যগ্রন্থ ‘একদা এক রাজ্যে’ প্রকাশ দ্বারা। এই দুই প্রকাশনা সংস্থার রুচিশীল কাজের পেছনে বরাবরই তিনি সক্রিয় থেকেছেন। ইতোমধ্যে ১৯৫৯ সাল বার্ডস অ্যান্ড বুকস প্রকাশ করেছিল শামসুর রাহমানের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘প্রথম গান, দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে’ এবং রুচি ও ভাবনার সাযুজ্যে সেই বইয়ের অনুপম প্রচ্ছদ এঁকেছেন কাইয়ুম চৌধুরী।

তৎকালীন পূর্ববঙ্গে রেলওয়ে দপ্তর ছিল বৃহত্তম সরকারি সংস্থা এবং রেলের টাইমটেবিল ব্যাপকভাবে ব্যবহার্য বিশিষ্ট প্রকাশনা। ষান্মাসিক টাইমটেবিলের প্রচ্ছদ নকশা নিয়ে প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হতো এবং প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় অধিকারীকে অর্থমূল্য পুরস্কার প্রদান করা হতো। তৎকালীন বিচারে এই পুরস্কারের আর্থিক ও সামাজিক মান ছিল উঁচুদরের। ১৯৫৯ এবং ১৯৬১ সালে রেলওয়ে টাইমটেবিলের প্রচ্ছদ এঁকে সেরা পুরস্কারটি লাভ করেন কাইয়ুম চৌধুরী।

১৯৫৭ সালে যখন আর্ট কলেজে শিক্ষকতায় যোগ দেন তখন জয়নুলের এই প্রতিষ্ঠানে ছাত্রীদের পদচারণা শুরু হয়েছে। ১৯৫৪ সালে প্রথম যে চারজন ছাত্রী ভর্তি হয়েছিরেন তাঁদের মধ্যে ছিলেন তাহেরা খানম। ১৯৬০ সালে তাহেরা খানমের সঙ্গে পরিণয় বন্ধনে আবদ্ধ হলেন কাইয়ুম চৌধুরী। মনের সাযুজ্য তাঁর শৈল্পিক প্রয়াসের জন্য বিশেষ অনুকূল হয়েছে এবং স্ত্রীর প্রেরণাদায়ক ভূমিকা সৃষ্টিশীল কর্মে উদ্বুদ্ধ করেছে। ঐ বছরই আর্ট কলেজ ছেড়ে যোগ দিলেন কামরুল হাসানের নেতৃত্বে নবগঠিত ডিজাইন সেন্টারে।

১৯৬১ সালে ডিজাইন সেন্টার ছেড়ে অবজার্ভার হাউজে চিফ আর্টিস্ট হিসেবে যোগদান করেন। ‘অবজারভার’ তখন মতিঝিলে নিজস্ব ভবনে আধুনিক সংবাদপত্রের রূপায়ণ সূচিত করেছে। ইংরেজি দৈনিক ছাড়াও সিনে-সাপ্তাহিক ‘চিত্রালী’ জনপ্রিয়তার উচ্চ শিখরে এবং উভয় পত্রিকায় কাজ করছেন তরুণ প্রতিভাবান একদল লেখক ও সাংবাদিক। কাইয়ুম চৌধুরী প্রস্তুতির সময় নিয়েছিলেন অনেক বেশি, কেননা নিজের সঙ্গে বোঝাপড়ায় তিনি কোনও সরল সমাধান কামনা করেননি। এই বোঝাপড়ায় ক্রমে শক্তি সঞ্চয় করছিলেন সংস্কৃতির নানা শাখায় নিজেকে ছড়িয়ে দিয়ে এবং ব্যবহারিক শিল্পের গভীর অনুশীলন থেকে। আর ছিল পঠন-পাঠনে নিমজ্জিত থেকে রস আহরণের চেষ্টা, গান ও সিনেমায় মজে থাকা।

২০১৪ সালের ৩০ নভেম্বর কাইউম চৌধুরী বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের ক্ল্যাসিকাল মিউজিক ফেস্টিভালের চতুর্থ দিনে তার বক্তব্য দেয়ার সময় হঠাৎ করে অসুস্থ হয়ে পড়েন। সেখান থেকে তাকে সি এম এইচ- এ নিয়ে গেলে কর্তব্যরত ডাক্তার তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী ২০১০ সালে সুফিয়া কামাল পদক লাভ করেন । প্রতিক্রিয়ায় শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, ‘এমন একজন মহীয়সী নারীর নামাঙ্কিত পদক আমাকে প্রদান করা হয়েছে, জানি না আমি এর যোগ্য কি না। আমি এর জন্য আনন্দিত এবং গর্বিত। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের কাছে আমি অশেষ কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।’ কাইয়ুম চৌধুরীর ৭৮তম জন্মবার্ষিকীতে সৈয়দ শামসুল হক বলেন, সত্যিকার অর্থে বিশ্বমানের শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী। মুস্তাফা মনোয়ার বলেন, সত্যজিত রায়ের পর গ্রাফিক্স কিংবা প্রচ্ছদ শিল্পকে তিনি অন্যরকম অবস্থানে নিয়ে গেছেন। কামাল লোহানী বলেন, কাইয়ুম চৌধুরী আমাদের চলার পথে সংগ্রামী সাথী। অধ্যাপক বোরহানউদ্দীন খান জাহাঙ্গীরবলেন, তাঁর মতো বন্ধু পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। তিনি ২০১৪ সালে শহীদ আলতাফ মাহমুদ পদকে ভূষিত হয়েছেন।

You must be logged in to post a comment Login

মন্তব্য করুন