গণমানুষের সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

প্রকাশ: June 23, 2015
CREATOR: gd-jpeg v1.0 (using IJG JPEG v62), quality = 50

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী একাধারে শিক্ষাবিদ, লেখক, প্রাবন্ধিক, পরিবেশ সুরক্ষা এবং সামাজিক ন্যায়বিচার বিষয়ক আন্দোলনের পুরোধা ব্যক্তিত্ব। দীর্ঘকাল তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যে অধ্যাপনা করেছেন। কিন্তু শুধু ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যের মধ্যেই তার জ্ঞানের পরিধি সীমাবদ্ধ নয়।

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর শৈশব কেটেছে রাজশাহীতে ও কলকাতায় বাবার চাকরি সূত্রে। তিনি ২৩ জুন, ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দে ঢাকার বিক্রমপুর উপজেলায় বাড়ৈখালীতে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম হাফিজ উদ্দিন চৌধুরী ও মা আসিয়া খাতুন। তিনি পড়াশোনা করেছেন ঢাকার সেন্ট গ্রেগরি স্কুল, নটরডেম কলেজ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। তিনি ইংরেজি সাহিত্যে উচ্চতর গবেষণা করেছেন যুক্তরাজ্যের লিডস্‌ এবং লেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ে। পড়াশোনা শেষে দেশে ফিরে এসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন ১৯৫৭ খ্রিস্টাব্দে।

এক সময়ে তিনি তমদ্দুন মজলিসের কর্মী ছিলেন। উচ্চ শিক্ষা নিয়ে যুক্তরাজ্য থেকে ফেরার পর তিনি হন মুক্তবুদ্ধিসম্পন্ন উদার মানবতার অনুরাগী। এরপর সত্তরের দশক থেকে তিনি হন সমাজতন্ত্রের সমর্থক এবং সমাজ পরিবর্তনের ও গণমানুষের কল্যাণে নিবেদিত। তিনি লেখনীর মাধ্যমে সমাজ ও রাষ্ট্রের অন্যায়, অনিয়ম অসঙ্গতি যেভাবে তুলে ধরেন প্রতিবাদী ভাষায় সে তুলনায় সমাধানের পথে কম গিয়েছেন।

দেশের কোনো আন্দোলন-গণসংগ্রাম থেকে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী নিজেকে কখনো দূরে রাখেননি। সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে তিনি কখনোই সামান্য দূরেও সরে যাননি বা জেগে থেকে ঘুমাননি। এভাবেই তিনি নিজের মধ্যে একটি বিপ্লব করে একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট কর্তৃক দুবার উপাচার্য হওয়ার জন্য মনোনীত হয়েছিলেন। কিন্তু তিনি প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি পত্রিকা সম্পাদনার সঙ্গেও দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত। সম্পাদনা করেছেন ‘পরিক্রমা’, ‘সাহিত্যপত্র’, ‘সচিত্র সময়’, ‘সাপ্তাহিক সময়’, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পত্রিকা’, ‘ঢাকা ইউনিভার্সিটি স্টাডিস’ প্রভৃতি। তার সম্পাদনায় নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে ত্রৈমাসিক সাহিত্য সংস্কৃতির পত্রিকা ‘নতুন দিগন্ত’। ‘নতুন দিগন্ত’ প্রগতিশীল, মুক্তচিন্তার মানুষের জন্য খোলা জানালা।

মানুষের পক্ষে, সমাজ পরিবর্তনের পক্ষে সিরাজুল ইসলাম সবসময়ই সোচ্চার। সম্পূর্ণ নির্মোহ দৃষ্টিকোণ থেকে তিনি রাষ্ট্র ও সমাজকে দেখেছেন এবং বিশ্লেষণ করেছেন। সমাজের অন্যায় অসঙ্গতি ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে তিনি আজীবন লড়াই করেছেন। তিনি সর্বদাই প্রত্যাশা করেছেন সমাজতান্ত্রিক সমাজ। যে সমাজে ধনী-গরিবের কোনো বৈষম্য থাকবে না। বৈষম্যহীন শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠায় তিনি নিরন্তর কাজ করে যাচ্ছেন একেবারেই নীরবে।

সিরাজুল ইসলাম রচিত প্রবন্ধ-গবেষণা: আম্বেষণ (১৯৬৪); দ্বিতীয় ভুবন (১৯৭৩); নিরাশ্রয় গৃহী (১৯৭৩); আরণ্যক দৃশ্যাবলী (১৯৭৪); অনতিক্রান্ত বৃত্ত (১৯৭৪); প্রতিক্রিয়াশীলতা, আধুনিক ইংরেজি সাহিত্যে (১৯৭৫); শরৎপন্দ্র ও সামন্তবাদ (১৯৭৫); আমার পিতার মুখ (১৯৭৬); বঙ্কিমচন্দ্রের জমিদার ও কৃষক (১৯৭৬); কুমুর বন্ধন (১৯৭৭); উপরকাঠামোর ভেতরই (১৯৭৭); বেকনের মৌমাছিরা (১৯৭৮); স্বাধীনতা ও সংস্কৃতি (১৯৭৯); একই সমতলে (১৯৮০); ঊনবিংশ শতাব্দীর বাংলা গদ্যের সামাজিক ব্যাকরণ (১৯৮০); স্বাধীনতার স্পৃহা, সাম্যের ভয় (১৯৮১); বাঙলালী কাকে বলি (১৯৮২); বাঙালীকে কে বাঁচাবে (১৯৮৩); বৃত্তের ভাঙা-গড়া (১৯৮৪); টলস্টয় অনেক প্রসঙ্গের কযেকটি (১৯৮৫); নেতা, জনতা ও রাজনীতি (১৯৮৬); গণতন্ত্রের পক্ষ-বিপক্ষ (১৯৮৭); শেষ মীমাংসার আগে (১৯৮৮); উদ্যানে এবং উদ্যানের বাইরে (১৯৮৯); শ্রেণী, সময় ও সাহিত্য (১৯৯০); স্বপ্নের আলো ছায়া (১৯৯১); কেউ বলে বৃক্ষ, কেউ বলে নদী (১৯৯০); দ্বিজাতিতত্ত্বের সত্য-মিথ্যা (১৯৯২); লেনিন কেন জরুরী (১৯৯২); আপনজন (১৯৯৪); অপরিচিত নেতা, পরিচিত দুর্বৃত্ত (১৯৯৪); বাঙালীর জয়-পরাজয় (১৯৯৪); লিঙ্কনের বিষণ্ণ মুখ (১৯৯৪); এর পথ ওর প্রাচীর (১৯৯৫); ভয় পেয়ো না, বেঁচে আছি (১৯৯৫); মাঝখানের মানুষেরা (১৯৯৫); দুই বাঙালীর লাহোর যাত্রা (১৯৯৬); পতঙ্গ, ভৃত্য ও দৈত্য (১৯৯৬); রাষ্ট্রের মালিকানা (১৯৯৭); উপনিবেশের সংস্কৃতি (১৯৯৮); শেক্সপীয়রের মেয়েরা (১৯৯৯); বাঙারীর জাতীয়তাবাদ (২০০০); বাঙালীর সময়-অসময় (২০০০); ধ্রুপদী নায়িকাদের কয়েকজন (২০০০); পুঁজিবাদের দুঃশাসন (২০০১); আত্মপ্রতিকৃতি নয় (২০০২); Middle Class and the Social Revolution in Bengal (২০০০); An Unfimished Agenda; ইংরেজি সাহিত্যে ন্যায়-অন্যায় (২০০২); ভূতের নয়, ভবিষ্যতের (২০০২); বন্ধ করো না পাখা (২০০৪); প্রভুর যত ইচ্ছা (২০০৫); ভরসার জায়গাজমি (২০০৫); বিচ্ছিন্নতার সত্য-মিথ্যা (২০০৬); গণতন্ত্রের অমসৃণ পথ (২০০৬); দ্বন্দ্বের মেরুকরণ (২০০৬); গণতন্ত্রের সন্ধানে (২০০৬)।

সিরাজুল ইসলাম রচিত ছোটগল্প: ভালো মানুষের জগৎ (১৯৯০)। তার উপন্যাস: শেষ নেই (২০০৪) ও কণার অনিশ্চিত যাত্রা (২০০৫)। ছোটদের জন্য তার রচিত উপন্যাস : বাবুলের বেড়ে-ওঠা (১৯৯১)। তার লেখা ছোটদের গল্প : দরজাটা খোলো (১৯৮৯)। এ্যারিস্টটলের কাব্যতত্ত্ব (১৯৭২), ইবসেনের বুনো হাঁস (১৯৬৫), হাউসম্যানের কাব্যের স্বভাব (১৯৬৫) এবং হোমারের ওডেসি (১৯৯০) তিনি অনুবাদ করেছেন। তার ইংরেজি গ্রন্থ : Introducing Nazrul Islam (১৯৬৫), The Moral Imagination of Joseph Conrad (১৯৭৪) এবং The Enemy Territory (১৯৭৬)। তার সম্পাদিত গ্রন্থ আনোয়ার পাশা রচনাবলী (তিন খন্ড) ও Dhaka University Convocation Speeches (দুই খন্ড)। তার সম্পাদিত লিটল ম্যাগাজিন ত্রৈমাসিক নতুন দিগন্ত (২০০৩)।

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী লেখক সংঘ পুরস্কার (১৯৭৫), বাংলা একাডেমী পুরস্কার (১৯৭৬), আবদুর রহমান চৌধুরী পদক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (১৯৭৮), লেখিকা সংঘ পদক (১০৮০), মাহবুবউল্লাহ ফাউন্ডেশন পদক (১৯৮৩), অলক্ত সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮৮), একুশে পদক (১৯৯৬), আবদুল রউফ চৌধুরী পুরস্কার (২০০১), ঋষিজ পদক (২০০২)।

You must be logged in to post a comment Login

মন্তব্য করুন