ছোট-বড় সবার মন রাঙিয়েছেন হাশেম খান

প্রকাশ: May 21, 2015
Hashem Khan

হাশেম খান (জন্ম: জুলাই ১, ১৯৪১) বাংলাদেশের একজন খ্যাতিমান চিত্রশিল্পী। তিনি ১৯৯২ সালে একুশে পদক লাভ করেন। ২০১১ সালে হাশেম খানকে তার অবদানের জন্য বাংলাদেশ সরকার স্বাধীনতা দিবস পুরস্কার প্রদান করে।

হাশেম খানের শিক্ষা জীবনের শুরু গ্রামের মুন্সিবাড়ি প্রাথমিক স্কুলে। সেখানে কিছুদিন পড়ার পর ১৯৪৯ সালে চলে যান চন্দ্রা ইমাম আলী হাই স্কুলে। প্রাথমিক স্কুল পাশ করার পর বড়ভাই সুলেমান খান আর তিনি চলে আসেন চাঁদপুর শহরে। ভর্তি হন বিখ্যাত হাসান আলী হাই স্কুলে। স্কুলের ছিল এক বিশাল লাইব্রেরি, তাতেই মজে যান হাশেম খান। ১৯৫২ সালে সেই স্কুলে পড়ার সময়ই ক্লাস ছেড়ে বেরিয়ে এসে যোগ দেন রাজপথে ভাষা আন্দোলনের মিছিলে। সেই যে রাজপথে নেমেছিলেন আর কোনোদিন ঘরে ফেরা হয়নি তাঁর। ১৯৫৬ সালে সেই স্কুল থেকেই মেট্রিক পাশ করেন। পরে নিজের আগ্রহে ভর্তি হন তৎকালীন গভর্নমেন্ট আর্ট কলেজে (বর্তমান চারুকলা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়)।

ঢাকায় এসে হাশেম খান শিশু-কিশোর সংগঠন কচিকাঁচার আসর গড়ার কাজে যুক্ত হন। সংগঠনটির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে তাকে রোকনুজ্জামান দাদাভাইয়ের দক্ষিণ হস্ত বলে তার বন্ধুরা ঠাট্টা করতেন। তার জীবনের প্রথম উপার্জন আসে এখানে কাজ করেই, দাদাভাইয়ের হাত ধরে। ছবি ও লেখার জন্য তিনি প্রথম বিল তুলেছিলেন বারো টাকা।

১৯৬১ সালে চিত্রকলায় প্রথম শ্রেণীতে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৬১-৬৩ পর্যন্ত এশিয়া ফাউন্ডেশনের বৃত্তিতে মৃৎশিল্পে রিসার্চ স্কলার হিসেব কাজ করেন। এই সময় বাঙালির স্বাধীকার আন্দোলনের সাথে জড়িয়ে পড়েন বেশ ভালোভাবেই। আওয়ামী লীগের পোষ্টার, মঞ্চ, ব্যানার সব কিছুর নকশা করতেন তিনি। ঐতিহাসিক ছয় দফার পোস্টার ও লোগো, ১৯৬৯ পরবর্তী সমস্ত গণ-আন্দোলন, মিছিল-সবখানেই হাশেম খানের অবদান রয়েছে।

১৯৭১ সালে ঢাকায় গণহত্যা শুরু হলে হাশেম খান তার বড় ভাই ড. সুলেমান খানসহ চাঁদপুরে গ্রামের বাড়িতে চলে যান। সেখান থেকেই মুক্তিযুদ্ধকে সংগঠিত করার উদ্যোগ নেন। সেখানেই ২৬ এপ্রিল রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর দোসর মুসলিম লীগ তাদের দলবলসহ অস্ত্র নিয়ে তাঁদের বাড়িতে খুবই সুপরিকল্পিতভাবে হামলা চালায়। রাজনৈতিক কারণেই স্থানীয় মুসলিম লীগের সঙ্গে পূর্ব শত্রুতা ছিল সুলেমান খানের। খুনীরা জানত হাশেম খানও বাঙালির গণতান্ত্রিক অধিকার ও স্বাধীকার আন্দোলনের একজন সক্রিয় সংগঠক। আওয়ামী লীগের ৬ দফাসহ অন্যান্য আন্দোলনের পোস্টার তার হাতে করা। খুনীরা দরজা ভেঙ্গে প্রথমেই গুলি চালায় ডা. সুলেমান খানের বুকে। তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। তার পর একে একে গুলি চালায় হাশেম খান, তাঁর মা এবং ভাগ্নি মঞ্জুর উপর। হাশেম খান পায়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে মরার মতো মাটিতে পড়ে থাকলে একজন হাশেম খানকে আবার গুলি করতে চাচ্ছিলেন। কিন্তু তাঁর রক্তাক্ত অবস্থা দেখে ফিরে গেলে হাশেম খান তখন বেঁচে যান।

হাশেম খান ১৯৬৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের প্রাচ্যকলা বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। ১৯৭৯ সালে জাপানের টোকিওতে শিশু পুস্তক চিত্রণে স্বল্পকালীন প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছেন। গত চার দশকে বর্তমান ঢাকার গড়ে ওঠাটাকে প্রত্যক্ষ করেছেন তিনি খুব কাছ থেকে। সঙ্গত কারণেই তাঁর ক্যানভাসে ফুটে উঠেছে বিভিন্ন সময়ের ঢাকা নগরী। তিনি ১৯৬৩ সালে চারুকলা ইনস্টিটিউটের প্রাচ্যকলা বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন।

এছাড়া ১৯৭২ সালে প্রণীত গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সংবিধান গ্রন্থ অলংকরণের প্রধান শিল্পী হিসেবে কাজ করেছেন হাশেম খান। বাংলাদেশের শিল্পকলার প্রতিনিধিত্বশীল ব্যক্তি হিসেবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছুটে গেছেন তিনি। ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশের সমকালীন শিল্পকলার দায়িত্ব নিয়ে কোলকাতা, দিল্লী ও বোম্বাইয়ে প্রদর্শনী করেছেন। আন্তর্জাতিক শিশুবর্ষ ১৯৭৯ উপলক্ষে জাপানে শিশু পুস্তক শিল্পীদের সম্মেলনে, ১৯৮৫, ১৯৮৬, ১৯৮৭ ও ১৯৮৯ সালে টোকিও, চেকেস্লোভাকিয়ায় বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। নেতৃত্ব দিয়েছেন দেশ-বিদেশের অসংখ্য প্রশিক্ষণ কর্মশালায়। তাঁর বর্ণাঢ্য কর্মজীবনে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে নির্মিতব্য ‘স্বাধীনতা স্তম্ভ’-এর জুরি বোর্ড ও বাস্তবায়নে বিশেষজ্ঞ কমিটির সদস্য (১৯৯৭-২০০০) হিসেবে কাজ করেছেন। তিনি ছিলেন জাতীয় চিত্রশালা, জাতীয় নাট্যশালা এবং জাতীয় সংগীত ও নৃত্যকলা কেন্দ্রের বাস্তবায়নের স্টিয়ারিং কমিটির (৩ সদস্যের) বিশেষজ্ঞ সদস্য। ঢাকা নগর জাদুঘর, বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর প্রতিষ্ঠায় তাঁর রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। প্রাথমিক থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের পাঠ্যবইয়ের অলংকরণ ছাড়াও তিনি মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে চারুকলা ও ললিতকলা বিষয়ক পাঠ্যসূচি প্রণয়ন করেছেন। ষষ্ঠ শ্রেণী থেকে একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত বিষয় ভিত্তিক ৫টি গ্রন্থ রচনা করেছেন তিনি।

hashem khan 1

১৯৬২-১৯৯৫ মোট ১৫ বার বাংলাদেশ জাতীয় গ্রন্থ কেন্দ্র কর্তৃক বইয়ের ছবি আঁকার (প্রচ্ছদ ও ইলাস্ট্রেশন) শ্রেষ্ঠ শিল্পী হিসেবে পুরস্কার লাভ করেন। ১৯৯৭ সালে লাইপজিগ আন্তর্জাতিক বই মেলায় তাঁর আঁকা বই পুরস্কৃত হয়। ১৯৮৮ ও ১৯৯৩ সালে শিশু সাহিত্যে অগ্রণী ব্যাংক পুরস্কার, ১৯৮৮ সালে চাঁদপুর ফাউন্ডেশন স্বর্ণপদক, ১৯৯১ সালে বঙ্গবন্ধু পুরস্কার এবং ১৯৯২ সালে জাতীয় সম্মান একুশে পদক লাভ করেন।

hashem khan2

শিল্প ও মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে হাশেম খান বেশ কিছু বইও লিখেছেন। এর মধ্যে – ‘চারুকলা পাঠ’, ‘গুলিবিদ্ধ একাত্তর’, ‘দু’জন শিক্ষক আমি ছাত্র’, মাধ্যমিক পর্যায়ে চারুকলা শিক্ষার ৪টি বই, উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে চারুকলা শিক্ষার ২টি বই, ‘শিল্পী জয়নুল আবেদিন- মানুষ জয়নুল আবেদিন’, ‘ড্রইং কথা’, ‘স্কেচ কথা’, ‘নিরাবরন কন্যার গল্প-অল্প’, ‘স্বাধীনতা ও জরিনারা উল্লেখযোগ্য।

hashem khan3

১৯৬৩-২০০৬ সাল পর্যন্ত তিনি তৎকালীন পাকিস্তান ও বাংলাদেশের জাতীয় চারুকলা প্রদর্শনী ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ২৫টি যৌথ প্রদর্শনীতে অংশ নিয়েছেন। ১৯৮১ সাল থেকে এ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত সবগুলো দ্বিবার্ষিক এশীয় চারুকলা প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ ছাড়াও এ সময়ে বিদেশে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন প্রদর্শনীতে বাংলাদেশের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করেছেন। এছাড়াও যৌথ জলরঙ প্রদর্শনী- ১৯৬৮, বিদেশে-৩য় আন্তর্জাতিক দ্বিবাষিক প্রদর্শনী, তেহরান-১৯৬৭, টোকিও-৭০, বাংলাদেশের সমকালীন চারুকলা প্রদর্শনী- কলকাতা, দিল্লী ও বোম্বাই-১৯৭৩, জি.ডি.আর-১৯৭৮, ১ম এশীয় দ্বিবার্ষিক গ্রাফিক ডিজাইন প্রদর্শনী, তেহরান-১৯৭৯, ত্রিবার্ষিক সমকালীন চারুকলা প্রদর্শনী, ভারত-১৯৭৫ ও ৭৮, এশিয়ান আর্ট শিল্পমেলা, ফুকুওকা-জাপান-১৯৮০, হংকং-১৯৮১ ইত্যাদি প্রদর্শনীতেও অংশ নিয়েছেন। এছাড়াও ১ম আন্তর্জাতিক শিশু-বই চিত্র প্রদর্শনী, জাপান-১৯৮৬, আন্তর্জাতিক দ্বিবার্ষিক ইলাস্ট্রেশন প্রদর্শনী, ব্রাতিসলাভা, চেকোস্লোভাকিয়া- ১৯৮৩, ১৯৮৫, ১৯৮৭, ১৯৮৯, বাংলাদেশের শিল্পকলা প্রদর্শনী, ভারত-১৯৯৫, রাশিয়া-১৯৯৫, জার্মানি-১৯৯৯-তেও তিনি অংশ নিয়েছেন। ১৯৯২, ২০০০, ২০০২ ও ২০০৫ সালে ঢাকায় তাঁর একক চিত্র প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়।

You must be logged in to post a comment Login

মন্তব্য করুন