ঐতিহ্য পুরুষ জহির রায়হান

প্রকাশ: May 17, 2015
Jahir Raihan

প্রতিবাদী সাহিত্য চর্চা করতে করতেই একসময় চলচ্চিত্রকে মাধ্যম হিসেবে বেছে নেন প্রয়াত চলচ্চিত্রকার জহির রায়হান। পরবর্তীতে চলচ্চিত্রই তার ধ্যান-জ্ঞান হয়ে ওঠে। ১৯৩৫ সালের ৫ আগস্ট (বিভিন্ন জায়গায় তার জন্ম তারিখ উল্লেখ করা হয়েছে ১৯ আগস্ট, কিন্তু তার বোন দাবি করেছেন জহির রায়হানের জন্ম তারিখ ৫ আগস্ট) তৎকালীন নোয়াখালি জেলার ফেনী মহকুমার অর্ন্তগত মজুপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি।

তিনি ১৯৫৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হতে বাংলা সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৫০ সালে তিনি ‘যুগের আলো’ পত্রিকায় সাংবাদিক হিসেবে কাজ করা শুরু করেন। পরবর্তীতে তিনি ‘খাপছাড়া’, ‘যান্ত্রিক’, ‘সিনেমা’ ইত্যাদি পত্রিকাতেও কাজ করেন। ১৯৫৬ সালে তিনি সম্পাদক হিসেবে ‘প্রবাহ’ পত্রিকায় যোগ দেন। ১৯৫৫ সালে তার প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘সূর্যগ্রহণ’ প্রকাশিত হয়। চলচ্চিত্র জগতে তার পদার্পণ ঘটে ১৯৫৭ সালে, ‘জাগো হুয়া সাবেরা’ ছবিতে সহকারী হিসেবে কাজ করার মাধ্যমে। তিনি সালাউদ্দীনের ছবি ‘যে নদী মরুপথে’তেও সহকারী হিসেবে কাজ করেন। প্রখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক এহতেশাম তাকে ‘এ দেশ তোমার আমার’এ কাজ করার আমন্ত্রণ জানান; জহির এ ছবির নামসঙ্গীত রচনা করেছিলেন। ১৯৬১ সালে তিনি রূপালী জগতে পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন ‘কখনো আসেনি’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে। ১৯৬৪ সালে তিনি পাকিস্তানের প্রথম রঙিন চলচ্চিত্র ‘সঙ্গম’ নির্মাণ করেন (উর্দু ভাষার ছবি) এবং পরের বছর তার প্রথম সিনেমাস্কোপ চলচ্চিত্র ‘বাহানা’ মুক্তি দেন। জহির রায়হান ভাষা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন এবং ২১শে ফেব্রুয়ারির ঐতিহাসিক আমতলা সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন। ভাষা আন্দোলন তার ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছিল, যার ছাপ দেখতে পাওয়া যায় তার বিখ্যাত চলচ্চিত্র ‘জীবন থেকে নেওয়া’তে। তিনি ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে অংশ নেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি কলকাতায় চলে যান এবং সেখানে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে প্রচারাভিযান ও তথ্যচিত্র নির্মাণ শুরু করেন। কলকাতায় তার নির্মিত চলচ্চিত্র ‘জীবন থেকে নেওয়ার’ বেশ কয়েকটি প্রদর্শনী হয় এবং চলচ্চিত্রটি দেখে সত্যজিত রায়, মৃণাল সেন, তপন সিনহা এবং ঋত্বিক ঘটক প্রমুখ ভূয়সী প্রশংসা করেন। সে সময়ে তিনি চরম অর্থনৈতিক দৈন্যের মধ্যে থাকা সত্ত্বেও তার চলচ্চিত্র প্রদর্শনী হতে প্রাপ্ত সমুদয় অর্থ তিনি মুক্তিযোদ্ধা তহবিলে দান করে দেন।

অন্তর্ধান ও মৃত্যু
জহির রায়হান দেশ স্বাধীন হবার পর তার নিখোঁজ ভাই শহীদুল্লাহ কায়সারকে খুঁজতে শুরু করেন, যিনি স্বাধীনতার ঠিক আগমুহূর্তে পাকিস্তানী আর্মির এদেশীয় দোসর আল বদর বাহিনী কর্তৃক অপহৃত হয়েছিলেন। জহির রায়হান ভাইয়ের সন্ধানে মিরপুরে যান এবং সেখান থেকে আর ফিরে আসেননি। মীরপুর ছিল ঢাকা থেকে কিছুটা দূরে অবস্থিত বিহারী অধ্যুষিত এলাকা এবং এমন প্রমাণ পাওয়া গেছে যে সেদিন বিহারীরা ও ছদ্মবেশী পাকিস্তানী সৈন্যরা বাংলাদেশীদের ওপর গুলি চালালে তিনি নিহত হন।

জীবনপঞ্জি
১৯৩৫: জন্ম ১৯ আগস্ট, মজুপুর গ্রাম, ফেনী।
প্রাথমিক লেখাপড়াঃ মিত্র ইন্সটিটিউট, কলকাতা।
আলিয়া মাদ্রাসা, কলকাতা।
১৯৪৯: নতুন সাহিত্য পত্রিকা (কলকাতা)য় ‘ওদের জানিয়ে দাও’ শীর্ষক কবিতা প্রকাশিত।
১৯৫০: আমিরাবাদ হাইস্কুল (ফেনী) থেকে মেট্রিক পরীক্ষা।
১৯৫১-১৯৫৭: কমিউনিস্ট পার্টির সাথে সরাসরি জড়িত।
১৯৫২: : ছাত্র অবস্থাতেই মহান ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহন।
মোহাম্মদ জহিরুল্লাহ থেকে জহির রায়হানে পরিণত।
প্রমথেশ বড়ুয়া মেমোরিয়াল ফটোগ্রাফি স্কুলে (কলকাতা) ভর্তি।
১৯৫৩: জগন্নাথ কলেজ (ঢাকা) থেকে আই.এস.সি পরীক্ষা।
১৯৫৬-১৯৫৮: কোর্স শেষ না করেই চিকিৎসাশাস্ত্র (মেডিক্যাল কলেজ) ত্যাগ।
১৯৫৬: পাকিস্তানের প্রখ্যাত চিত্র পরিচালক জারদরি-এর সহকারী মনোনীত হয়ে চলচ্চিত্র জগতে প্রবেশ।
১৯৫৮: বি.এ.অনার্স (বাংলা ভাষা ও সাহিত্য), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
পঞ্চাশের দশকে ছাত্র অবস্থায় প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘সূর্য গ্রহণ’ প্রকাশিত।
১৯৬১: : প্রথম চলচ্চিত্র ‘কখনো আসেনি’র মুক্তি লাভ।
পাকিস্তানের প্রথম রঙ্গিন ছবি ‘সঙ্গম’ (উর্দু ভাষায়) তৈরি।
১৯৬৪: ‘হাজার বছর ধরে’ উপন্যাসের জন্য আদমজী পুরস্কার লাভ।
১৯৭০: পাকিস্তানের প্রথম রাজনৈতিক-চেতনামন্ডিত চলচ্চিত্র ‘জীবন থেকে নেয়া’ মুক্তিলাভ।
১৯৭১: : মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ।
মুক্তিযুদ্ধের উপর প্রথম চলচ্চিত্র ‘স্টপ জেনোসাইড’ নির্মাণ।
মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে দ্বিতীয় চলচ্চিত্র ‘এ স্টেট ইজ বর্ন’ নির্মাণ।
মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে চলচ্চিত্র ‘ইনোসেন্ট মিলিয়ন’ (পরিচালকঃ বাবুল চৌধুরী) এবং ‘লিবারেশন ফাইটার্স’ (পরিচালকঃ আলমগীর কবীর)-এর তত্ত্বাবধান।
বুদ্ধিজীবীদের বাংলাদেশ মুক্তি পরিষদ (Bangladesh Liberation council of Intelligentsia)-এর সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত।
১৯৭১: সাহিত্যে অবদানের জন্য বাংলা একাডেমী পুরস্কার লাভ (১৯৭২ সালে ঘোষিত)
১৯৭২: বুদ্ধিজীবী হত্যা তদন্ত কমিটি গঠন।
১৯৭২: নিখোঁজ (৩০ জানুয়ারি থেকে আজ পর্যন্ত)।
১৯৭৭: চলচ্চিত্র শিল্পে অবদানের জন্য রাষ্ট্রীয় একুশে পদক লাভ।
১৯৯২: সাহিত্যে কৃতিত্বের জন্য স্বাধীনতা দিবস পুরস্কার লাভ।

পুরস্কার
আদমজী সাহিত্য পুরস্কার ১৯৬৪। (হাজার বছর ধরে)
নিগার পুরস্কার (‘কাঁচের দেয়াল’) চলচ্চিত্রের জন্য শ্রেষ্ঠ বাংলা ছবি হিসেবে।
বাংলা একাডেমী পুরস্কার ১৯৭১। (উপন্যাসঃ মরণোত্তর)
একুশে পদক ১৯৭৭। (চলচ্চিত্রঃ মরণোত্তর)
স্বাধীনতা দিবস পুরস্কার ১৯৯২। (সাহিত্যঃ মরণোত্তর)

উল্লেখযোগ্য কাজ
উপন্যাস

শেষ বিকেলের মেয়ে (১৯৬০) প্রথম উপন্যাস। প্রকাশকঃ সন্ধানী প্রকাশনী। রোমান্টিক প্রেমের উপাখ্যান।
হাজার বছর ধরে (১৯৬৪) আবহমান বাংলার গ্রামীণ জীবনের পটভূমিতে রচিত আখ্যান। (চলচ্চিত্ররূপ, ২০০৫)
আরেক ফাল্গুন (১৯৬৯) বায়ান্নর রক্তস্নাত ভাষা-আন্দোলনের পটভূমিতে রচিত কথামালা।
বরফ গলা নদী (১৯৬৯) প্রথম প্রকাশঃ ‘উত্তরণ’ সাময়িকী। অর্থনৈতিক কারণে বিপর্যস্ত ক্ষয়িষ্ণু মধ্যবিত্ত পরিবারের অসহায়ত্ব গাঁথা।
আর কত দিন (১৯৭০) অবরুদ্ধ ও পদদলিত মানবাত্নার আন্তর্জাতিক রূপ এবং সংগ্রাম ও স্বপ্নের আত্নকথা।
কয়েকটি মৃত্যু
একুশে ফেব্রুয়ারি (১৯৭০)
তৃষ্ণা (১৯৬২)
গল্পসমগ্র
সূর্যগ্রহণ প্রথম গল্পগ্রন্থ। ১৩৬২ বাংলা।
সোনার হরিণ
সময়ের প্রয়োজনে
একটি জিজ্ঞাসা
হারানো বলয়
বাঁধ
নয়াপত্তন
মহামৃত্যু
ভাঙাচোরা
অপরাধ
স্বীকৃতি
অতি পরিচিত
ইচ্ছা অনিচ্ছা
জন্মান্তর
পোস্টার
ইচ্ছার আগুনে জ্বলছি
কতকগুলো কুকুরের আর্তনাদ
কয়েকটি সংলাপ (১৯৭১)
দেমাক
ম্যাসাকার
একুশের গল্প

অন্যান্য রচনা
পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ (প্রবন্ধ), কলকাতার ঐতিহ্যবাহী ‘পরিচয়’ সহিত্যপত্রের বাংলাদেশ সংখ্যায় (জুলাই ১৯৭১) এ প্রকাশিত হয়।
অক্টোবর বিপ্লব ও সোভিয়েত চলচ্চিত্র (প্রবন্ধ) , সোভিয়েত বিপ্লবের ৫০ তম বার্ষিকী উপলক্ষে অক্টোবর সমাজতান্ত্রিক মহাবিপ্লব উদযাপন কমিটির (ঢাকা) স্মরণিকা ‘তরঙ্গ’-এ (নভেম্বর ১৯৬৭) প্রকাশিত হয়।
ওদের জানিয়ে দাও (কবিতা)
জহির রায়হান রচনাবলী- ১ম খণ্ড
জহির রায়হান রচনাবলী-২য় খণ্ড

পত্রিকা সম্পাদনা
এক্সপ্রেস (ইংরেজি সাপ্তাহিক)
প্রবাহ (বাংলা মাসিক)

চলচ্চিত্র (সহকারী পরিচালক হিসেবে)
জাগো হুয়া সাবেরা (১৯৫৯)
এদেশ তোমার আমার (১৯৫৯)
যে নদী মরুপথে (১৯৬১)

(পরিচালক, প্রযোজক, লেখক ও চিত্রনাট্যকার হিসেবে)

বছর

চলচ্চিত্র

ভূমিকা

ভাষা

নোট

পরিচালক

প্রযোজক

চিত্রনাট্য

লেখক

১৯৬১

কখনো আসেনি

হ্যাঁ

হ্যাঁ

হ্যাঁ

বাংলা

পরিচালক হিসেবে প্রথম চলচ্চিত্র

১৯৬২

সোনার কাজল

হ্যাঁ

বাংলা

কলিম শরাফী এর সাথে যৌথভাবে পরিচালনায় নির্মিত।

১৯৬৩

কাঁচের দেয়াল

হ্যাঁ

হ্যাঁ

হ্যাঁ

হ্যাঁ

বাংলা

১৯৬৪

সংগম

হ্যাঁ

হ্যাঁ

হ্যাঁ

হ্যাঁ

উর্দু

সমগ্র পাকিস্তান তথা বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে নির্মিত প্রথম রঙ্গীন চলচ্চিত্র।

১৯৬৫

বাহানা

হ্যাঁ

হ্যাঁ

হ্যাঁ

হ্যাঁ

উর্দু

সমগ্র পাকিস্তান তথা বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে নির্মিত প্রথম সিনেমাস্কোপ চলচ্চিত্র।

১৯৬৫

একুশে ফেব্রুয়ারী

হ্যাঁ

বাংলা

অপ্রকাশিত

১৯৬৬

বেহুলা

হ্যাঁ

হ্যাঁ

বাংলা

১৯৬৭

আনোয়ারা

হ্যাঁ

হ্যাঁ

বাংলা

১৯৬৮

দুই ভাই

হ্যাঁ

হ্যাঁ

বাংলা

১৯৬৮

কুচবরণ কন্যা

হ্যাঁ

বাংলা

১৯৬৮

জুলেখা

হ্যাঁ

বাংলা

১৯৬৮

সুয়োরাণী-দুয়োরাণী

হ্যাঁ

বাংলা

১৯৬৮

সংসার

হ্যাঁ

হ্যাঁ

বাংলা

১৯৬৯

মনের মত বউ

হ্যাঁ

বাংলা

১৯৬৯

শেষ পর্যন্ত

হ্যাঁ

বাংলা

১৯৭০

জীবন থেকে নেয়া

হ্যাঁ

হ্যাঁ

হ্যাঁ

হ্যাঁ

বাংলা

১৯৭০

টাকা আনা পাই

হ্যাঁ

বাংলা

১৯৭০

লেট দেয়ার বি লাইট

হ্যাঁ

হ্যাঁ

হ্যাঁ

হ্যাঁ

ইংরেজী, বাংলা, উর্দু, রুশ

অসমাপ্ত। চলচ্চিত্রটি সমাপ্ত হবার আগেই বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হয়।

১৯৭১

জলতে সুরজ কে নীচে

হ্যাঁ

উর্দু

১৯৭১

স্টপ জেনোসাইড

হ্যাঁ

হ্যাঁ

ইংরেজী

তথ্যচিত্র

১৯৭১

বার্থ অব আ নেশন / এ স্টেট ইজ বর্ন

হ্যাঁ

হ্যাঁ

হ্যাঁ

ইংরেজী

তথ্যচিত্র

১৯৭১

চিলড্রেন অব বাংলাদেশ

হ্যাঁ

হ্যাঁ

হ্যাঁ

ইংরেজী

তথ্যচিত্র

১৯৭১

সারেন্ডার

হ্যাঁ

হ্যাঁ

হ্যাঁ

ইংরেজী

তথ্যচিত্র

১৯৭২

প্রতিশোধ

হ্যাঁ

বাংলা

১৯৭৩

ধীরে বহে মেঘনা

বাংলা

মূল পরিকল্পনা

২০০৫

হাজার বছর ধরে

হ্যাঁ

বাংলা

২০১৪

পোস্টার

হ্যাঁ

বাংলা

স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র

জহির রায়হান একটি অবিস্মরণীয় নাম। অন্যায়, অমানবিকতা, দুঃশাসন, সামাজিক আধিপত্য ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে সংগ্রামী চেতনার স্বাক্ষর রেখে গেছেন তাঁর কর্মক্ষেত্রের পরতে পরতে। শিল্প-সাহিত্যের প্রতি ছাত্র অবস্থা থেকেই ছিলেন অনুরাগী। কারো অজানা নয় যে চলচ্চিত্রে জহির রায়হানের সৃষ্টি ‘কখনো আসেনি’, ‘কাঁচের দেয়াল’, ‘বাহানা’, ‘বেহুলা’ যোগ করেছিল নতুন মাত্রা। জগন্নাথ কলেজ থেকে ১৯৫৩ সালে আইএসসি পাস করেন তিনি। শিল্প-সাহিত্যে অসাধারণ অনুরাগ আর সৃষ্টিশীলতার অন্তর্গত অনুপ্রেরণার ফলে বিজ্ঞান ছেড়ে দিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা অনার্সে ভর্তি হন। নিপীড়িত মানুষের প্রতি তাঁর ভালোবাসা ছিল প্রগাঢ়। ১৯৫১ থেকে ১৯৫৭ সাল পর্যন্ত কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। ১৯৫২ সালে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন এবং গ্রেপ্তার হন। তারপর শুরু করতে চান অন্য আরেক শিল্পমাধ্যমে সংগ্রাম। সে জন্য দরকার প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি। ভর্তি হলেন ফটোগ্রাফি শেখার জন্য কলকাতায় প্রমথেশ বড়ুয়া মেমোরিয়াল ফটোগ্রাফি স্কুলে।

১৯৫৬ সালের শেষের দিকে চিত্রজগতে তাঁর সদর্প প্রবেশ। বদলে দিলেন পুরো চিত্রজগতের চেহারাটাই। তাঁর প্রথম ছবির নাম ‘কখনো আসেনি’। তার পর থেকে একে একে তাঁর হাত দিয়ে যুগান্তকারী ছবিগুলো নির্মিত হয়, যা তখনকার রাজনৈতিক-সামাজিক প্রেক্ষাপটে ছিল বৈপ্লবিক উত্থান। সে সময় ১৯৬১ সালে চিত্রনায়িকা সুমিতা দেবীকে এবং পরে চিত্রনায়িকা সুচন্দাকে বিয়ে করেন। কর্মপ্রাণ মানুষটির জীবন ও কর্মে ছিল বৈচিত্র্য ও বিশালতার এক বিস্ময়কর সমন্বয়। ১৯৭০ সালে নির্মিত ‘জীবন থেকে নেয়া’ ছবিটিতে স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের যে শৈল্পিক অভিপ্রকাশ ঘটেছিল, তা অনবদ্য। একটি পারিবারিক আবহে স্বৈরশাসিত রাষ্ট্রের দুর্দশা তুলে ধরেছিলেন অসাধারণ শিল্প-দক্ষতায়। এরপর শুরু করেছিলেন নতুন ধারার একটি ছবির কাজ ‘লেট দেয়ার বি লাইট’। কিন্তু দুর্ভাগ্য যে তখনই ১৯৭১ সালে শুরু হয়ে যায় আমাদের স্বাধীনতাযুদ্ধ। জহির রায়হান স্বভাবতই ছিলেন শিল্পী ও যোদ্ধা যুগপৎ। তথাকথিত বিলাসী বুদ্ধিজীবীদের মতো শিল্প অথবা শিল্পতত্ত্ব নিয়ে ঘরে বসে থাকার লোক ছিলেন না। কারণ, তিনি ভালোবাসতেন মানুষকে। মানুষের জীবনের ক্লেশ-ক্লেদ দেখার এবং তা বিভিন্ন শিল্পমাধ্যমে মুক্তির হাতিয়াররূপে রূপান্তরিত করার মতো প্রতিভাবান ছিলেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে চলে গেলেন কলকাতা এবং তৈরি করলেন বাংলাদেশে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর গণহত্যার প্রামাণ্য চলচ্চিত্র ‘স্টপ জেনোসাইড’। অতঃপর তিনি হলেন বাংলাদেশ লিবারেশন কাউন্সিল অব ইন্টেলিজেন্সিয়ার সাধারণ সম্পাদক। শুধু ক্যামেরা নয়, কলমও ছিল তাঁর যুদ্ধাস্ত্র। একজন খ্যাতনামা কথাসাহিত্যিক হিসেবেও প্রতিষ্ঠা পেয়েছিলেন। ‘আরেক ফাগুন’, ‘বরফ গলা নদী’, ‘হাজার বছর ধরে’ প্রভৃতি তাঁর অনন্য সৃষ্টি। এসব উপন্যাসে আবহমান বাংলার দুর্ভোগ আর সামাজিক শোষণ-বঞ্চনার চিত্র পরিস্ফুট হয়ে উঠেছে তাঁর ব্যতিক্রমী শৈলীতে। তিনি ছাত্রজীবনে সাহিত্য মাসিক ‘প্রবাহ’ এবং ইংরেজি সাপ্তাহিক ‘এক্সপ্রেস’ পত্রিকার সম্পাদনা ও প্রকাশনার সঙ্গেও ছিলেন যুক্ত।এ প্রতিভাবান মানুষটিকে আমরা বেশি দিন ধরে রাখতে পারিনি। স্বাধীনতার পরপরই কলকাতা থেকে ঢাকায় চলে আসেন। এসে শুনলেন বুদ্ধিজীবীদের নির্মম হত্যাকাণ্ডের ঘটনা এবং অগ্রজ শহীদুল্লা কায়সারের নিখোঁজ সংবাদ। অগ্রজকে খুঁজতে বের হয়েছিলেন তিনি, আর ফিরে আসেননি। ভাইকে নিয়ে যাওয়ার জন্য বিহারি ও রাজাকার অধ্যুষিত মিরপুর এলাকায় ডেকে নিয়ে তাঁকে সম্ভবত হত্যা করা হয়। এর পর থেকে তাঁর আর কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।

সূত্রঃ উইকিপিডিয়া।

You must be logged in to post a comment Login

মন্তব্য করুন