ঢাকার কাওয়াল ও কাওয়ালি সংগীত

প্রকাশ: May 10, 2015
Untitled-1

কাওয়ালি এক প্রকার আধ্যাত্মিক প্রেমবিষয়ক ভক্তিমূলক গান। ‘কওল’ থেকে কাওয়ালি শব্দটির উৎপত্তি। আমীর খসরু এই ধারা সঙ্গীতের প্রবর্তক। এ গান মূলত সুফি সাধকরা গেয়ে থাকেন। ফারসি ও উর্দু ভাষায় রচিত কাওয়ালি গান মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যে প্রচলিত। এ গানের স্থায়ী ও অন্তরার মধ্যে তাল বন্ধ রেখে প্রতিবার বিভিন্ন প্রকার স্বরবিন্যাস বা রাগের সমাবেশ করা হয়। সাধারণত দলগতভাবে এ গান গাওয়া হয়। এতে একজন মূল গায়ক থাকেন, অন্যরা ধুয়া ধরে। তালযন্ত্র হিসেবে এতে ঢোলক ব্যবহূত হয় এবং সমবেতভাবে হাততালি দিয়ে তাল রক্ষা করা হয়। এটি কাওয়ালি গানের একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য। যে সকল রাগ আধ্যাত্মিক প্রেমপ্রকাশক সে সকল রাগে কাওয়ালি গান গাওয়া হয়। এতে দাদরা, ধূমালি, রূপক, পশ্তু ইত্যাদি তাল ব্যবহূত হয়। কাওয়ালি গানের শিল্পীরা ‘কাওয়াল’ নামে পরিচিত। পুরান ঢাকার আদিবাসীদের মধ্যে এ গানের প্রচলন আছে। তারা বিভিন্ন জলসা, বিবাহ ইত্যাদি অনুষ্ঠান উপলক্ষে এ গানের আয়োজন করে থাকে। [মোবারক হোসেন খান]

একসময় পুরনো ঢাকা থেকে রাতের বেলা মাইকে ভেসে আসত মনকাড়া উর্দু গানের সুর। ‘অ্যায় মেরে মুর্শিদ/মেরা কামলিওয়ালা/মেরা মেহেবুব খাজা বাবা…অথবা অ্যায় বেনেওয়াজ মালিক/খোদা হায় তেরা নাম/আউর ম্যায় হুঁ তেরা গোলাম…’ ইত্যাদি অসংখ্য খাজাপ্রেম বা খোদাপ্রেমের ভুক্তিমূলক গান ভেসে আসত ইথারে। সঙ্গে উচ্চ শব্দে বাজনার আওয়াজ। সংগীতপ্রেমী একশ্রেণীর মানুষ এ দরগায়-সে দরগায় ঘুরে ঘুরে সারা রাত জেগে এসব গান শুনতেন। দরগায় গাওয়া এ ধরনের সংগীতকেই বলা হয় কাওয়ালি।
11221237_10153319729033872_326994723_o
ঢাকায় রয়েছে অসংখ্য পীর-ফকিরের দরগা। এসব দরগা এ দেশে ইসলাম ধর্ম প্রচারে বিশেষ ভূমিকাও পালন করেছে বিভিন্ন সময়। আরেকটি কারণে এসব দরগা বিশেষভাবে পরিচিত। ঢাকায় কাওয়ালি সংগীতের প্রসার ঘটে মূলত এসব দরগার কল্যাণেই। বিশেষ করে চিশতিয়া ও নেজামিয়া দরগা ঢাকায় কাওয়ালি গান প্রসারে বিশেষ ভূমিকা পালন করে। পরবর্তীকালে কাওয়ালি গান ধর্মীয় গণ্ডি ছেড়ে সামাজিক অনুষ্ঠানেও স্থান করে নেয়।
আরবি কওল শব্দ থেকে কাওয়ালি শব্দের উৎপত্তি। সুলতান আলাউদ্দিন খিলজির সময় (১২৯৬-১৩১৬) কাওয়াল শব্দটির প্রচলন ঘটে। যে ব্যক্তি কাওয়ালি সংগীত করেন তাকে কাওয়াল বলা হয়। কাওয়ালি সংগীত হচ্ছে খোদা, রাসুল বা অলি-আল্লাহর উদ্দেশ্যে রচিত সুফিসাধকদের এক ধরনের প্রেমধর্মী, ভক্তিমূলক আধ্যা@ি@@@ক গান। এ গানকে সুফিসাধকদের আত্মার খোরাক বলা হয়। কাওয়ালি গান শ্রবণের মাধ্যমে সুফিসাধকরা সৃষ্টিকর্তার প্রতি প্রেম-ভক্তি নিবেদন করেন এবং তাঁর নৈকট্য কামনা করেন।

দ্বাদশ শতকে ইমাম আল গাজ্জালি (র.) সর্বপ্রথম কাওয়ালি সংগীত রচনা করেন। পরবর্তীকালে আমির খসরু (র.) কাওয়ালি গানের উন্নতি করেন। তাঁর দুই শিষ্য আসাদ ও নিজাম এ সংগীত ধারার ব্যাপক প্রসার ঘটান। কাওয়ালি সংগীত প্রথম দিকে চিশতিয়া-নিজামিয়া তরিকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও পরে তা কাদেরিয়া, মোজাদ্দেদিয়া, নকশাবন্দিয়া ইত্যাদি তরিকায়ও প্রচলন ঘটে। ফার্সি, উর্দু, হিন্দি, পাঞ্জাবি, সিন্ধি ইত্যাদি ভাষায় কাওয়ালি গান পরিবেশিত হলেও ভারতে উর্দু ভাষায়ই কাওয়ালি গান জনপ্রিয়তা লাভ করে। ভারতের হিন্দু ও মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের সংগীতপ্রেমী মানুষের কাছে কাওয়ালি সমাদর পায়। এভাবে কাওয়ালি গান ভারতীয় বৈচিত্র্যময় সংগীত ভাণ্ডারকে আরো সমৃদ্ধ করে।

ঢাকায় মূলত বিভিন্ন দরগার মাধ্যমে কাওয়ালি গানের সূচনা ঘটে। আগে শুধু হিজরি বর্ষপঞ্জির রজব মাসজুড়ে শোনা যেত কাওয়ালি গান। পরে ঢাকার নবাবদের পৃষ্ঠপোষকতায় এ গানের প্রসার ঘটে। নবাবদের কারণে কাওয়ালি সংগীত ধর্মীয় গণ্ডি ছেড়ে সামাজিক অনুষ্ঠানে স্থান করে নেয়। প্রথম দিকে ভারতবর্ষের বিভিন্ন রাজ্য থেকে কাওয়াল এনে সংগীত পরিবেশন করা হতো। পরবর্তীকালে ঢাকার কাওয়ালরা সে স্থান দখল করে। গোড়ার দিকে ঢাকার উর্দুভাষী মানুষ কাওয়ালি গানের সমঝদার ছিলেন। পরে ঢাকার আদি অধিবাসীরাও এ গানে মজে যায়। এভাবে কাওয়ালি গান ঢাকার আদি অধিবাসীদের সংস্কৃতির অংশে পরিণত হয়।

কাওয়ালি সংগীত ছিল চিশতিয়া-নিজামিয়া দরগার ঐতিহ্য। ঢাকার প্রায় সব দরগা বা খানকা শরিফে কাওয়ালি গান নিয়মিত পরিবেশিত হতো। কাওয়ালিপ্রেমী মানুষ দরগায় ঘুরে ঘুরে কাওয়ালি শুনত। গত শতকেও কাওয়ালি গান জনপ্রিয় ছিল।

কাওয়ালি সংগীত আদিতে ঈশ্বরীয় প্রেম-ভক্তি প্রকাশের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। পরে সুর ও তাল ঠিক রেখে নর-নারীর প্রেম-ভালোবাসা নিয়ে কাওয়ালি সংগীত পরিবেশন শুরু হয়। গায়ে হলুদ ও বিয়েতেই এ ধারার কাওয়ালি গান পরিবেশন করা হয়। তা জনপ্রিয়তা পাওয়ায় চলচ্চিত্রেও এর প্রভাব পড়ে। কাওয়ালি গান একক বা সমবেতভাবে গাওয়া হয়। শুরুতে দোহার প্রথা না থাকলেও এখন দেখা যায়। তবে মূল গায়ককে কেন্দ্র করেই এক একটি দল গড়ে ওঠে। তার নামেই এই দলটি পরিচিতি লাভ করে। ঢাকায় যেসব কাওয়াল একসময় নাম করেছিলেন তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন মো. চাঁদ রশিদ, মো. আইয়ুব, ছোট আইয়ুব, মো. বেলাল, মো. পিয়ারু, মো. জব্বার, মো. হোসেন প্রমুখ।

১৯৪৭-এ পাকিস্তান সৃষ্টির পরে ষাটের দশক পর্যন্ত ঢাকায় কাওয়ালি গানের জমজমাট উপস্থিতি ছিল। কিন্তু বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর কাওয়ালি গানে ভাটা পড়ে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনকে এ দেশে বসবাসকারী উর্দুভাষী অবাঙালিরা বিরোধিতা করে। ফলে সাধারণের মধ্যে তাদের সম্পর্কে বিরূপ ধারণার সৃষ্টি হয়। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে কাওয়ালি গানেও। এ দেশে কাওয়ালি গানের ধারা দুর্বল হয়ে গেলে তার স্থান দখল করে বয়াতিদের পরিবেশিত সহজ-সরল বাংলায় মারফতি ও মুর্শিদি গান। এ জাতীয় গান তরিকাপন্থীদের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। বয়াতিরা দরগা ও খানকায় জাঁকিয়ে বসেন। এ ধারার গান গেয়ে খ্যাতি অর্জন করেন হালিম বয়াতি, রাজ্জাক দেওয়ান, লালমিয়া বয়াতি প্রমুখ।
একসময় এ নগরীতে বিভিন্ন দরগা ও খানকা শরিফে কাওয়ালি সংগীতের যে প্রচলন ঘটেছিল, আজ তা প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছে। তবে আজও গুটিকয়েক দরবারে এ গানের প্রচলন আছে। হজরত শাহ আলী (র.) মাজার বা শাহ মোবারক (র.), শাহ ইসলাম উল্লাহ চিশতি (র.), শাহ মো. ইসরাইল চিশতি (র.)-এর দরগায় আজও কাওয়াল গানের চর্চা দেখা যায়। বর্তমানে যেসব কাওয়াল কাওয়ালি গান গেয়ে বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেছেন তাদের মধ্যে আছেন মো. শমীর হোসেন, মো. নূরে আলম, মো. ইকবাল কাওয়াল প্রমুখ। এখন অবশ্য শুধু উর্দুতেই কাওয়ালি গান পরিবেশন হয় না। কথা ভাষান্তর করে একই সুরে বাংলায়ও কাওয়ালি সংগীত পরিবেশন করা হয়। বর্তমানে কাওয়ালরা বিভিন্ন দরগায় ভক্তিমূলক কাওয়ালি গান পরিবেশন করেন। তবে এখন নানা সামাজিক উৎসব-পার্বণেও কাওয়ালি সংগীত পরিবেশনের রেওয়াজ হয়েছে। আর এভাবেই সংগীতের এ প্রাচীন ধারা ঢাকায় আজও অস্তিত্ব বজায় রেখেছে। [সৌরভ দাস]

You must be logged in to post a comment Login

মন্তব্য করুন