ঢাকার বাঈজী কাহিনী

প্রকাশ: May 13, 2015
ফরাসী চিত্রকর বেলেনস এর আঁকা এক বাঈজী

অতীতে ভারতের উত্তর প্রদেশ রাজস্থান, মহারাষ্ট্র ও গুজরাট রাজ্যে ‘বাঈ’ শব্দ দ্বারা ধ্রুপদী নৃত্য-গীতে পারদর্শী সম্ভ্রান্ত মহিলাদের বোঝানো হত৷ খুব ছোট থাকতেই তারা ওস্তাদদের কাছে তালিম নিয়ে নৃত্যগীত শিখতেন৷ শিক্ষা শেষে শাস্ত্রীয় নৃত্যগীতকে পেশা হিসেবে নিলে লোকে তাদের ‘বাঈ’ শব্দটির সম্মানসূচক ‘জি’ শব্দটি জুড়ে দিত, তখন তাদের নামে শেষে ‘বাঈজি’ শব্দটি শোভা পেত৷ বাঈজিরা সম্রাট, সুলতান, বাদশা, রাজা-নবাব ও জমিদারদের রঙমহলে শাস্ত্রীয় নৃত্যগীত পরিবেশন করে বিপুল অর্থ ও খ্যাতিলাভ করতেন৷ অর্থ আয়ের জন্য তারা যেমন বাইরে গিয়ে ‘মুজরো’ নাচতেন, তেমনি নিজেদের ঘরেও মাহফিল বসাতেন৷

খ্রিস্টীয় অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষার্ধে বাংলায়, বিশেষ করে কলকাতায় বাইজিদের আগমন ঘটতে থাকে। অযোধ্যায় বিতাড়িত নবাব ওয়াজেদ আলী শাহর কলকাতার মেটিয়া বুরুজ এলাকায় নির্বাসিত জীবনযাপনকালে সেখানে যে সংগীত সভার পত্তন ঘটে, তাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন স্থান থেকে অনেক বাঈজির আগমন ঘটে। বেশির ভাগ বাঈজিই রাগসংগীত ও শাস্ত্রীয় নৃত্য বিশেষত কত্থকে উচ্চশিক্ষা নিতেন। বাইজিদের নাচ-গানের আসরকে মুজরো বলা হয়, আবার তাকে মেহফিল বা মাহফেলও বলা হয়ে থাকে। মেহফিলে পারিশ্রমিকের বিনিময়ে অংশগ্রহণ ছাড়াও কোনো কোনো বাইজি রাজা-মহারাজা-নবাবদের দরবার থেকে নিয়মিত মাসিক বেতন পেতেন। বাইজিদের নাচ-গানে মোহগ্রস্ত হওয়ার কারণে কোনো কোনো নবাব-রাজা-মহারাজা বা ধনাঢ্য ব্যক্তির পারিবারিক ও আর্থিক জীবনে বিপর্যয়েরও সৃষ্টি হয়েছে।

shovan13_1362978546_4-1111

ঢাকায় বাইজিদের নাচ-গান শুরু হয় মুঘল আমলে। সুবাহদার ইসলাম খাঁর দরবারে (সপ্তদশ শতাব্দীর প্রথম পর্ব) যারা নাচ-গান করতেন তাদের ‘কাঞ্চনী’ বলা হতো। উনিশ শতকে ঢাকার নবাব নুসরাত জং, নবাব শামসুদ্দৌলা, নবাব কমরুদ্দৌলা এবং নবাব আবদুল গণি ও নবাব আহসানুল্লাহর সময় বাইজিদের নাচ-গান তথা মেহফিল প্রবলতা পায়। তারা আহসান মঞ্জিলের রংমহল, শাহবাগের ইশরাত মঞ্জিল, দিলকুশার বাগানবাড়িতে নৃত্য-গীত পরিবেশন করতেন। ঢাকার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনে যেসব বাইজি খ্যাতি অর্জন করেছিলেন, তাদের মধ্যে লক্ষ্নৌর প্রখ্যাত গায়ক ও তবলাবাদক মিঠন খানের নাতি সাপান খানের স্ত্রী সুপনজান উনিশ শতকের শেষ দিকে ঢাকায় ছিলেন।
shovan13_1362978509_2-11111
১৮৭০-এর দশকে ঢাকার শাহবাগে নবাব গণির এক অনুষ্ঠানে মুশতারী বাই সংগীত পরিবেশন করে প্রখ্যাত সাহিত্যিক আবদুল গফুর খানের নজরে পড়েছিলেন। ১৮৮০-এর দশকে শাহবাগে এলাহীজান নামে আরেক বাইজির নৃত্য ও করুণ পরিণতির দৃশ্য দেখেছিলেন হাকিম হাবিবুর রহমান। নবাব গণির দরবারে নাচ-গান করতেন পিয়ারী বাই, হীরা বাই, ওয়ামু বাই, আবেদী বাই, আন্নু নান্নু ও নওয়াবীন বাই। শেষোক্ত তিন বোন ১৮৮০-এর দশকে ঢাকার নাটক মঞ্চায়নের সঙ্গেও জড়িত ছিলেন। ঢাকার অন্য খ্যাতিমান বাইজিদের মধ্যে ছিলেন বাতানী, জামুরাদ, পান্না, হিমানী, আমিরজান, রাজলক্ষ্মী, কানী, আবছন প্রমুখ। এছাড়া কলকাতা থেকে মাঝেমধ্যে ঢাকায় মুজরো নিয়ে আসতেন মালকাজান বুলবুলি, মালকাজান আগরওয়ালী, জানকী বাই, গহরজান, জদ্দন বাই, হরিমতী প্রমুখ।

নাচ গান ও রূপের নেশায় ঊচ্চমান অর্জন হলেও কোন পুরুষ শিল্পী কিন্তু এই সব বাইজির সাথে এক আসরে বসতে চাইতেন না। কলকাতার একটি আসরে মোস্তারী বাই পূরবী রাগে খেয়াল গেয়ে সুরের মদিরায় শ্রোতাদের এমন আচ্ছন্ন করেছিলেন যে ওই আসরে পরবর্তী শিল্পী বিখ্যাত ফৈঁয়াজ খা, এনায়েত খা ও হাফেয খা মঞ্চে উঠতেই অস্বীকৃতি জানলেন।
shovan13_1362989422_1-1113
ইন্দোররাজ শিবাজী হোলকারের সভায় বিখ্যাত বীনাকার স্বয়ং বন্দে আলী খা। বীনা বাজিয়ে সুরের ইন্দ্রজালে মুগ্ধ করেন সব শ্রোতাদের, শিবাজীর খাস নর্তকী চুন্নাবাঈ কিন্তু ছিলেন সেদিন মুগ্ধ শ্রোতাদের আসরে। খুশী হয়ে রাজা ইনাম দিতে চেয়েছিলেন বীনাকারকে। সুরমুগ্ধ রাজাকে চমকে দিয়ে বন্দে আলী খা ইনাম হিসাবে চেয়ে বসলেন বাঈজী চুন্নাবাইকে।

উনিশ শতকের প্রথমার্ধে কলকাতায় নিকি বাঈ, আশরুন জিনাত, বেগমজান, হিঙ্গল বাঈ, নান্নিজান বাঈ ও সুপনজান বাঈয়ের নাম শোনা যায়। হেকিম হাবিবুর রহমান তার লেখায় অনেক বাঈজীর নাম বলেছেন যেমন- আবেদি বাঈ, আন্নু, গান্নু, নোয়াবীন, পিয়ারী বেগম, আচ্ছি বাঈ, ওয়াসু, বাতানী, হীরা, লক্ষ্মী, জামুরাদ, রাজলক্ষ্মী, এ ছাড়া সত্যেন সেনের লেখা থেকে জানকী বাঈ ও মালেকাজানের নাম জানতে পারি।
shovan13_1362979544_8-morgiana-dancing
বিখ্যাত গহরজান, জদ্দন বাঈ ও মুশতারী বাঈ ঢাকায় মেহফিল অংশ নিয়েছিলেন। এ ছাড়া বিখ্যাত জিন্দাবাহার লেনের দেবী বাঈজী ও হরিমতি বাঈজীর নাম ও উল্লেখ্য করতে হয়। ঢাকার জিন্দাবাহার লেনের বাসিন্দা বিখ্যাত শিল্পী পরিতোষ সেনের লেখায় হরিমতি বাঈজীর কথা আছে। তিনি লিখেছেন- হরিমতি বাঈজীর ঘর টি আমাদের বারান্দা থেকে পরিস্কার দেখা যায়, প্রতিদিনের অভ্যাস মত সকালে ভৈরবী রাগে গান ধরেছেন ‘রসিয়া তোরি আখিয়ারে, জিয়া লাল চায়’ ঠুংরী ঠাটের গানের এ কলিতে আমাদের জিন্দা বাহার গলি কানায় কানায় ভরে উঠেছে।

নওয়াবীন বাঈজী

নওয়াবীন বাঈজী


সেকালে ঢাকার গানের আসরে ছিল সব সমাজদার শ্রোতার আগমন, ইন্দুবালার একটি মন্তব্য থেকে এ ব্যাপারে ধারনা পাওয়া যায়, কলকাতা থেকে ঢাকা আসার আগে সে কালী ঘাটে যেয়ে মন্দিরে প্রার্থনা করেছিল, মা ঢাকা যাচ্ছি, ঢাকা তালের দেশ, মান রাখিস মা’। ইঞ্জিনিয়ার কর্নেল ডেভিডসন ১৮৪০ সালে ঢাকার অধিবাসীদের ‘মিউজিক্যাল পিপল’ বলে আখ্যায়িত করেছিলেন।

বাঈজী নাচ ও খেমটা নাচ সেকালে ঢাকার মানূষদের জীবনের অঙ্গ হয়ে দাড়িয়েছিল। কবি নবীন চন্দ্র সেন তার ছেলের বিয়েতে ঢাকা থেকে বাঈজী আনতে পেরে গর্ব অনুভব করেছিলেন। গান আর নাচে খুব দক্ষ না হলে সে কালে ভাল বাঈজী হওয়া যেত না আর তার সাথে অবশ্যই থাকতে হত রূপের মোহ।

একবার খেতরীর রাজার সভায় উপস্থিত হন স্বয়ং বিবেকানন্দ। সভায় একজন বাঈজী গান গাইবেন, একেতো স্ত্রীলোক তায় আবার বাঈজী বিবেকানন্দ গান শুনতে অস্বীকৃতি জানাল, কিন্তু রাজার অনুরোধে গান শুনতে বসলেন। বাঈজী গাই লেন

প্রভু মোর অবগুন চিতনা ধর
সমদরশি হ্যায় নাম তোমার
এক লহো পুজামে রহত হ্যায়
এক রহো ঘর ব্যাধক পরো
পরলোক মন দ্বিধা নাহি হ্যায়
দুই কাঞ্চন করো।

গান শুনে বিবেকানন্দের চোখে পানি চলে আসে। এরপর সেই বাঈকে বিবেকানন্দ মা বলে সম্ভোধন করেন। যারা মানূষের আনন্দের জন্য নিজেদের বিলিয়ে দিতেন সমাজ তাদের দিত নিত্য বঞ্চনা।
মোস্তারী বাঈ শুধু সুরের জাদুতে বশ করতেন শ্রোতাদের। ১৮৭০ সালে ঢাকার নবাব আব্দুল গনির আমন্ত্রনে শাহবাগের বাগান বাড়িতে এসে গান গেয়ে মুগ্ধ করেছিলেন সে কালের বিখ্যাত উর্দু সাহিত্যিক আবদুল গাফফার নাসকান কে। কলকাতায় তার গান শুনে আত্মহারা হয়েছিলেন রাঁইচাদ বড়াল, কৃষ্ণচন্দ্র আর কবি নজরুল ইসলাম। রেডিওতে মোস্তারী বাঈয়ের গান শুনে তখন ফোন করছিলেন রেডিও অফিসে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আর জিজ্ঞাস করেছিলেন, ‘এই দেবীকে কোন গন্ধর্বলোক থেকে নিয়ে এলে’?

লাল চাদ বড়ালের গুরু বিশ্বনাথ রাওয়ের ছাত্রী মানদা। ল্যান্স ডাউন রোডে নাটোর হাউসে বিখ্যাত ফৈয়াজ খাঁ র সাথে এক সাথে সংগীত পরিবেষন করেছিলেন যা ১৯২৭ সালে যা এর আগে কল্পনাই করা যেত না। এভাবেই সমাজের কাছে নিস্প্রভ করে দিয়েছিলেন গনিকার আত্মজা হওয়ার কষ্ট। মানদার ৫০ টির মত বেকর্ড আছে তার মধ্যে ৩ টি রবীন্দ্র স্ংগীত। উপমহাদেশে পুরুষদের সাথে পাল্লা দিয়ে নারী শিল্পীদের চলা এই সময় থেকেই মূলত শুরু।
shovan13_1363160371_4-stock-photo-old-illustration-of-indian-dancers-on-stage-created-by-godefroy-durand-published-on-l-illustration-79512121
ঢাকার বিভিন্ন অঞ্চলে বাঈজী বা বারাঙ্গনা পাড়া ছিল।সে সময় বাঈজী পাড়া হিসাবে গঙ্গাজলি ও সাচিবন্দর ছিল। ঢাকার ইসলাম পুর ও পাটুয়াটুলীর মোড় থেকে যে পথটি ওয়াইজঘাট নামে বুড়ি গঙ্গার দিকে চলে গেছে তার নাম ছিল গঙ্গাজলি। সন্ধ্যা নেমে আসার সাথে সাথে তবলার বোল, সেতারের ঝঙ্কার আর নুপুরের নিক্কর গঙ্গাজলির পরিবিশ মুখরিত হয়ে উঠত। বাবু আর সাহেবদের আলবোলার গুড়্গড় শব্দ পরিবেশের সাথে ছিল সঙ্গতি পূর্ন।

নাট্যকার সাঈদ আহমেদ তার একটি লেখায় বলেছেন, কাছেই ছিল মহেশ ভট্টাচার্যির বিশাল হোমিওপ্যাথিক ওষুধের দোকান, গঙ্গাজলির উল্টা দিকে ছিল কালীমন্দির। গঙ্গাজলি ছিল দোতালা প্রসস্ত বাড়ী। নীচতলায় বাঈজীদের কাজের লোকেরা থাকত। বাঈজীরা থাকতেন দোতালায়। বাকওয়ালা সিড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে হত। বারান্দায় পাতা থাকত ইজি চেয়ার। বাঈজীদের খাস কামরা সাজানো থাকত শান শওকতে। ফরাশ বিছানো ঘর।

গঙ্গাজলির অধিকাংশ বাঈজী বিষ্ণু উপাসনা করত। প্রতিদিন সকালে গঙ্গাজলি থেকে স্নানের জন্য দল বেধে বুড়ি গঙ্গায় যেতেন। গোসল সেরে বুকে গামছা জড়িয়ে কোমড়ে পিতলের কলসি নিয়ে সিক্ত ভূষনে বাঈজীরা লাইন দিয়ে ফিরে আসতেন। এ দৃশ্য উপভোগ করতে কৈশরে বন্ধুদের নিয়ে ওয়াইজ ঘাট এলাকায় যেতেন নাট্যকার সাঈদ আহমেদ।

শিল্পী পরিতোষ সেন ও কিন্তু ভূলে যাননি সিক্ত বসনে বাঈজীদের ঘরে ফেরার দৃশ্যর বর্ননা দিতেঃ

‘আমাদের পাড়ায় বারবনিতারা প্রতিদিন সকালে স্নান করতে বুড়ীগঙ্গা যায়। তাদের স্নানে যাবার পথটি আমাদের বাসার সামনে দিয়ে। ফেরার পথে ভেজা কাপড়ে কালী মন্দিরে প্রনাম করে আমাদের গলির মূখে আবার দেখা হয়। সকাল বেলার এই মনোরম দৃশযটি আমাদের পাড়ার পুরুষদের চোখকে বেশ তৃপ্তি দিত। তাদের মন মেঝাজ খোশ রাখে। দিনটি ভাল কাটে।

সদ্য স্নাত তরুনীদের প্রথম সারির মাঝখানে ১৬-১৭ বছরের একটি মেয়ের আকর্ষনীয় বর্ননা দিয়েছিলেন পরিতোষ সেন। সেই সরস বর্ননা আমি শামীম আমিনুর রহমানের একটি লেখায় কিছুটা পেয়েছিলাম তার কিছুটা তুলে দিলামঃ

মুখটি অবিকল লিচুর মত গোল। থুতুনিটি ঈষৎ তীক্ষন, ঠোট দুটি যেন রসালো দুটি কমলার কোয়া। তার নাকের ছোট্ট পাটা দুটি প্রতিটি নিঃশ্বাসের সাথে সাথে ফুলে ফুলে উঠছিলো। গোটা শরীরটি যেন মুর্শিদাবাদী রেশম দিয়ে মোড়ান। এমনই মসৃন আর চকচকে তার ত্বক। পাকা পাতি লেবুর গায়ে হাল্কা গোলাপী রঙের পোচে যে রঙের মিশ্রন হয় ঠিক তেমনই তার গায়ের রঙটি। তার নীল কালো চোখ দুটি যেন স্তম্ভিত মেঘ মুখের অর্ধেকটাই জুড়ে আছে।

শাস্ত্রে বলা আছে বিহঙ্গের সৌন্দর্যের প্রতি আনুরাগ আছে বলিয়াই তো বিহঙ্গটি সুন্দর হয়েছে। ময়ুর ও সেই সৌন্দর্য্যের প্রতি অনুরাগী বলিয়াই তো ময়ুর সুন্দর হয়েছে। চম্পক আঙ্গুলী ও খঞ্জন নয়নের প্রতি পুরুষের আকর্ষন আছে বলিয়াই তো নারী জাতি চম্পক আঙ্গুলী ও খঞ্জন নয়নের অধিকারিনী হয়েছে’।

পরিতোষ সেন আরো বর্ননা দিয়েছেনঃ

‘ভেজা কাপড়টি মেয়েটির গায়ে লেপ্টে থাকার কারনে তার শরীরের প্রতিটি অঙ্গ যেন একটি ফুলের বিভিন্ন পাপড়ির মত আলাদা সত্ত্বা নিয়ে সরল বৃন্তটির ওপর দাড়িয়ে আছে। এক একটি পাপড়ি যেন একেকটি ফুল। বাকী মেয়েকটির মত তার কাধেও পেতলের কলসি ভরা বুড়িগঙ্গার জল। এই কলসি আর নিতম্ব দুইই মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। দুইই টলোমলো। এমনই সুন্দর সাবলীল আর বেপরোয়া।

তার চলার ভঙ্গি মনে হয় কোন নিঃশব্দ সংগীতের সঙ্গে তাল রেখে পা ফেলছে বা এই পা ফেলের ঢং যে কোন ওস্তাদ নর্তক বা নর্তকীর ঈর্ষার বস্তু হতে পারে, তাতে আর সন্দেহ কি? এই চালে তার সোনার বাটির মত বক্ষ যুগল নেচে ঊঠছে, আর একটু নাচলেই হয়ত করতালের মত বেজে ঊঠবে।
shovan13_1362978487_1-11
যে মেয়ের উদ্ভাসিত রূপ পৃথিবীর তাবৎ পুরুষদের সমস্ত সূর্যকিরনকে সজীব করে তোলে তার কোথা থেকেই বা শেষ করি কোথা থেকেই বা শুরু করি? একই দেহে একই সঙ্গে এত রূপ দেখার পক্ষে বিধাতা পুরুষদের দুটি মাত্র চোখ দিয়ে যেন বিশেষ অবিচার করেছেন, কারন একদিক দিয়ে দেখতে গিয়ে আর একদিক যেন বাদ পরে যায়।

তাই এক কথায় বলি এ যুগের রাধা। তার মা নাকি তাকে সত্যি সত্যি হরিদাসী বলে ডাকত। জমিদার পুত্র, বিশ্ববিখ্যাত সাতারু, আধুনিক বাংলা সাহিত্য বিশেষ অবদান রয়েছে এমন লেখক আর কবিদের হরিদাসীর দাস হতে দেখেছি’।

সত্যেন সেন তার রচনায় ঢাকার জানকী বাঈয়ের কথা বলেছেন। এলাহাবাদের মেয়ে ছিলেন। থাকতেন ঢাকায়। সে সময় তিনিই ঢাকায় সবচেয়ে বেশী পারিশ্রমিক প্রাপ্ত ছিলেন একদিনের মুজরোতে তাকে দেড় হাজার টাকা দিতে হত ততকালীন সময়ে। জানকী ছিলেন এক নবাবের রক্ষিতা। নবাব তাতে এতই মুগ্ধ ছিলেন কেউ যেন তার কাছ থেকে জানকীকে ছিনিয়ে নিতে না পারে সেই জন্য কিছুটা কুৎসিত করার নিমিত্তে জানকীকে ৫৬ টি ছুরির আঘাত করেছিলেন। সে কারনে জানকী ছাপান্ন ছুড়ি নামে পরিচিত ছিল।
ঢাকার বাঈজীদের নিয়ে কিছু তথ্য পাওয়া যায় হেকিম হাবিবুর রহমানের লেখায়। এলাহীজান উত্তর ভারত থেকে ঢাকায় এসেছিলেন। নওয়াব আবদুল গনির কাছ থেকে তিনি নিয়মিত মাসোহারা পেতেন। নবাব সাহেবের কাছ থেকে আরো অনেকে মাসোহারা পেতেন যাদের কথাও হেকিম সাহেব তার লেখায় উল্লেখ্য করেছেন। আন্নু, গান্নু আর নওয়াবীন ছিলেন তিন বোন। এদের মধ্যে সবচেয়ে ডাকসাইটে ছিলেন নওয়াবীন।

এই তিন বোন ১৮৮০ সালে নভেম্বরে ‘পূর্ববঙ্গ রঙ্গভূমি’ ভাড়া করে টিকিট বিক্রির মাধ্যমে ‘ইন্দ্রসভা’ নাটকটি মঞ্চস্থ করেছেন। ঢাকা প্রাকাশ এর সংবাদ অনুযায়ী মঞ্চস্থ নাটকটিতে শুধু বাঈজীদের অংশ গ্রহনের কারনে অনেকেই এর বিরোধিতা করেন। ঘটনাটি আমাদের মঞ্চ নাটকের জন্য ও খুব গুরুত্বপূর্ন কারন কারন ঢাকায় শুধু মহিলাদের উদ্দ্যেগে মঞ্চনাটক এই প্রথম। ইন্দ্রসভা ছাড়া তারা ‘যাদুনগর’ নামে আর একটি নাটক মঞ্চস্থ করে।

হেকিম হাবিবুর রহমান তার লেখায় আচ্ছি বাঈকে নবাব সাহেবের সব থেকে পেয়ারী বাঈজী বলে উল্লেখ্য করেন। লক্ষৌর এই বাঈজী ছিলেন নৃত্যে সুনিপুনা। হেকিম সাহেবের মতে ঢাকায় এরপরে এত বড় মাপের আর কোন নর্তকী আসেনি। হীরা বাঈজী নাকি নাচে খুব দক্ষ ছিলেন, হীরা বাঈজী যখন নাচতেন তখন তার গায়ের কালো রঙ থেকে নাকি আলো ঠিকরে পড়ত। হীরা বাঈজীর মেয়ে পান্না কিন্তু গজল গেয়ে সুখ্যাতি অর্জন করেছিল।
shovan13_1363330909_6-qw
আমীরজান বাঈজী আর রাজলক্ষী বাঈজীর কথা লিখতে গেলে ঢাকার পানীয় জল সরবরাহের কথা লিখতে হয়। ১৮৭০ এর দশকে ঢাকায় পানিয় জলসরবরাহের নিমিত্তে নবাব আবদুল গনি গন্যমান্যদের নিয়ে একটি সভা ডাকেন। আমন্ত্রন জানানো হয় রাজলক্ষী আর আমীরজান কে। সে সভায় সব বড় বড় জমিদারদের আহ্বান জানান সবাই যেন কিছু কিছু দিয়ে সাহায্য করে।

ওই বৈঠকে আমীরজান আর রাজলক্ষী টাকা দিয়ে সাহায্য করতে চেয়েছিল আর কোন নবাব বা জমিদার কিন্তু কোন সাহায্য প্রস্তাব দেয়নি। নবাব গনি সে সাহায্য না নিয়ে পুরো প্রকল্পের ব্যায়ভার নিজের কাধে তুলে নেন। রাজলক্ষী ভূমিকম্পে বিধ্বস্ত জিন্দাবাহার গলির মুখে কালী মন্দির সংস্কার করেছিলেন।

সত্যেন সেনের লেখায় মালকাজান সন্মন্ধ্যে জানা যায়। মালকাজান মুজরো করতে ঢাকা আসতেন। সে সময় তিনজন মালকাজান ছিলেন। আগ্রাওয়ালী মালকাজান, বেনারসের চুলবুলিয়া মালকাজান ও ভাগলপুরী মালকাজান, উপমহাদেশের বিখ্যাত বাঈজী গওহরজান ছিলেন বেনারসের চুলবুলিয়া বা বড় মালকাজানের কন্যা। অসামান্য রূপসী মালকাজানের পূর্ব নাম ছিল লেডী এডেলাইন। আর্মেনিয়ান ঈহুদী। স্বামী রবার্ট ইঊয়ার্ডের সাথে বিচ্ছেদ হলে পরে এডেলাইন বাঈজী বৃত্তি গ্রহন করে।

এরপর ইসলাম ধর্ম গ্রহন করে নিজের নাম রাখেন মালকাজান আর মেয়ে এঞ্জেলিনার নাম রাখেন গওহরজান। আধুনিক নায়িকাদের মত সেকালে মালকাজানের ছবি অধিকাংশ ঘরেই টানান থাকত, এত ছিল তার রূপ। মালকাজানের কিছু রেকর্ড বের হয়ে ছিল। ভারতের বাঈজী মহলে গওহরজান কিন্তু সম্রাজ্ঞীর আসন করেছিলেন। একে ছিলেন অসামান্য সুন্দরী তায় গুনী শিল্পী। ১৯০২ সালে তার গাওয়া গানের রেকর্ড বের হয়। এ ব্যাপারে পরে বিস্তারিত পোষ্ট দেব। সৈয়দ মুহান্মদ তৈফুর ১৮৯০ এর দশকে ঢাকার কালীবাড়ীর এক বিয়েতে তাকে নাচতে আর গাইতে দেখেছেন।

গওহরজান ছিলেন ভীষন শৌখিন আর ফ্যাশন সচেতন। নিজেকে সব সময়ই সাজিয়ে গুছিয়ে উপস্থাপন করতেন। বস্তুত গওহরজানের হাত ধরেই কিন্তু শিল্পীদের ফ্যাশন সচেতনতা এ দেশে শুরু হয়। তার গানের রেকর্ড ছিল বেশ উল্লেখ্যযোগ্য। তিনি কিছু গানও রচনা করেছিলেন। কবি কাজী নজরুল ইসলামের গানের গুরু ওস্তাদ জমির উদ্দিন কিন্তু গওহর জানের শিষ্য ছিল।
shovan13_1363330735_5-sw
গওহরজানের মা মালকাজানের সৎবোন ছিল জদ্দন বাঈ। জদ্দনের মা ইসলাম গ্রহন করে আর জীবিকার কারনে মেয়েকে বাঈ হিসাবে তৈরী করে। জদ্দন বাঈ বেশ কয়েক বার বিয়ে করেন। জদ্দন বাঈ ঢাকার বিভিন্ন মেহফিল মাতিয়ে রাখতেন। তিনি ঢাকার নবাব এর ঘনিষ্ট সান্নিধ্য পেয়েছিলেন বলেও জানা যায়। জদ্দনের শেষ স্বামী উত্তম চাদ মোহন জদ্দনের প্রেমে মাতোয়ারা হয়ে মুসলমান হন আর তাকে বিয়ে করেন। মোহন নিজের নাম রাখেন আবদূর রশীদ।
shovan13_1363330924_7-Nargis_in_Humayun__1945_
মাওলানা আবুল কালাম আজাদ এ বিয়েতে সাক্ষী হন। জদ্দন বাঈজী পেশা ছেড়ে চলচিত্রের সাথে যুক্ত হন। রশীদ আর জদ্দানের ঘরে জন্ম নেন নার্গিস। এই সেই নার্গিস ভারতের চিত্র জগতে তিনি কিংবদন্তী তুল্য মর্যাদা পেয়েছেন। সে যুগের সেই সব বাঈজীরা কিন্তু শিক্ষিত নারীদের চলচিত্রে আসার পথ খুলে দিয়েছিলেন। বলা যায় বাঈজীদের ঘর থেকেই মেয়েরা প্রথম অভিনয়ের পথে আসেন।
shovan13_1363330695_4-sd
১৮৭৩ সালে কলকাতার মেয়েরা যখন যখন রঙ্গমঞ্চে আসার অনুমতি পেলেন, তখন নিষিদ্ধ পল্লীর সংগীতে পারদর্শীরাই কিন্তু মঞ্চে এসেছিল। তখন থেকে বিংশ শতাব্দীর ত্রিশের দশক পর্যন্ত কিন্তু সমস্ত অভিনেত্রীরাই সুগায়িকা ছিলেন। এ প্রসঙ্গে বিনোদিনী, তিনকড়ি, তারাসুন্দরী থেকে বিংশ শতাব্দীর আঙ্গুরবালা, ইন্দুবালা পর্যন্ত অনেকেরই নাম করা যায়। কানন দেবী এখনো অনেকের ই প্রিয়। আমারো কিন্তু কানন দেবীর গান ভাল লাগে। তিনি কিন্তু সুঅভিনেত্রী ও ছিলেন।
last_kiss_1931
ঢাকার প্রথম পূর্নাঙ্গ নির্বাক চলচিত্র ছিল ‘দ্য লাষ্ট কিস’ এর নায়িকা ছিল লোলিতা তাকে বাদামতলীর নিষিদ্ধ পল্লী থেকে নিয়ে আসা হয়। তার আসল নাম ছিল বুড়ী। তখন তার বয়স ছিল মাত্র ১৪ বছর। ছবির কাজ শেষে বুড়ী আবার পুরানো পেশায় ফিরে যায় এর বেশি কিন্তু লোলিতার সন্মন্ধ্যে জানা যায় না। মঞ্চে তাদের অভিনয় করানোর জন্য অনেক পত্র পত্রিকায় জোর প্রতিবাদ জানানো হয়। তাদের সঙ্গে যে এক মঞ্চে উপবেশন করাই অসন্মানের। দ্যা লাষ্ট কিসের সহ নায়িকা চারুবালাকে আনা হয় কুমারটুলী পতিতালয় থেকে জিন্দাবাহার লেন থেকে আনা হয় দেববালাকে।

কৃতজ্ঞতাঃ হেকিম হাবিবুর রহমান, ডঃ মুনতাসির মামুন, শামীম আমিনুর রহমান, ইন্টারনেট।

You must be logged in to post a comment Login

মন্তব্য করুন