বিষাদ ঝরানো আবুল হাসান

প্রকাশ: August 4, 2015
abul hasan

১৯৪৭ সালের ৪ আগস্ট তৎকালীন ফরিদপুর জেলার গোপালগঞ্জ মহকুমার অন্তর্গত টুঙ্গীপাড়া থানার বর্নি গ্রামে কবি আবুল হাসান জন্মগ্রহণ করেন। তার প্রকৃত নাম আবুল হোসেন মিয়া, আবুল হাসান তার সাহিত্যিক নাম। ১৯৫৬ সাল থেকে ১৯৬৬ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত তিনি কবিতা লিখতেন আবুল হোসেন নামে। কিন্তু আবুল হোসেন নামে অগ্রজ একজন কবি থাকার কারণে নাম-বিভ্রাট এড়ানোর জন্যে কবি রফিক আজাদের উপদেশে তিনি নামটা কিঞ্চিত পরিবর্তন করে হয়ে ওঠেন আবুল হাসান।

১৯৪৮ সালে আবুল হাসানের পরিবার তৎকালীন বরিশাল জেলার অন্তর্গত পিরোজপুর মহকুমার নাজিরপুর থানাধীন ঝনঝনিয়া গ্রামে স্থায়ী হন। তার শৈশব কেটেছে নানার বাড়ি বর্নি গ্রামে। নানার বাড়িতেই তিনি পড়েছেন কালিদাস ও রবীন্দ্র রচনাবলী। নানার বাড়ির পরিবেশটি ছিল সাহিত্য চর্চার অনুকূল। বর্নি সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তিনি চতুর্থ শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশুনা করেন। এই বিদ্যালয়ে চতুর্থ শ্রেণীর ছাত্র থাকাকালীন তিনি প্রথম কবিতা লেখা শুরু করেন।

অষ্টম শ্রেণী থেকে উত্তীর্ণ হবার পর আবুল হাসান পড়ালেখার উদ্দেশ্যে চলে আসেন পিতার কর্মস্থল ঢাকায়। এখানে এসে তিনি আরমানিটোলা সরকারী উচ্চবিদ্যালয়ে নবম শ্রেণীতে ভর্তি হন। আরমানিটোলা স্কুলে পড়ালেখার সময় থেকেই আবুল হাসান নিয়মিত কবিতা লিখতে শুরু করেন এবং ক্লাসের বইয়ের চেয়ে ক্লাসের বাইরের বই পড়ায় আগ্রহী হয়ে ওঠেন বেশি। আরমানিটোলা সরকারী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৬৩ সালে আবুল হাসান ম্যাট্রিক পাস করেন। এর পর তিনি ১৯৬৩ সালে বরিশালের ব্রজমোহন সরকারী মহাবিদ্যালয়ে বিজ্ঞান বিভাগে উচ্চ মাধ্যমিক ভর্তি হন। বরিশালে এসে কবি হিসেবে তিনি খ্যাতি লাভ করেন। ১৯৬৫ সালে তিনি ব্রজমোহন মহাবিদ্যালয় থেকে যশোর শিক্ষা বোর্ডের অধীনে দ্বিতীয় বিভাগে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন।

এইচ.এস.সি. পাশ করার পর ১৯৬৫ সালে আবুল হাসান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগে প্রথম বর্ষ সম্মান শ্রেণীতে ভর্তি হন। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েই হাসান সাহিত্যচর্চায় গভীরভাবে মনোনিবেশ করেন। এ সময় তিনি ঢাকার তরুণ কবিদের প্রত্যক্ষ সান্নিধ্যে আসেন।

১৯৬৭ সালের মাঝামাঝি সময়ে আবুল হাসান সাবসিডিয়ারী পরীক্ষার ফর্ম পুরণ করার সময় পারিবারিক প্রয়োজনে হঠাৎ করে নিজ গ্রাম ঝনঝনিয়ায় যান। বিশ্ববিদ্যালয়ে তখন ছুটি থাকায় সহপাঠী এক বন্ধুর কাছে পরীক্ষার ফি রেখে এবং তাকে তা জমা দিতে বলে তিনি বাড়ি যান। কিন্তু কোন কারণে তার বন্ধুটি ফিসের টাকা জমা না দেওয়ায় বাড়ি থেকে ফিরে এসে তিনি বিভাগীয় চেয়ারম্যানের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। কিন্তু দেরী হওয়ায় তিনি আর পরীক্ষার ফি জমা দিতে পারেননি, এবং বিভাগীয় চেয়ারম্যানের বিরূপ মন্তব্যে অভিমান করে তিনি পরীক্ষা দেয়ার আর চেষ্টা করেননি। তারপর তার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা আর অগ্রসর হয়নি।

প্রাতিষ্ঠানিক পড়ালেখা বন্ধ হয়ে গেলে আবুল হাসান অর্থের প্রয়োজনে পত্রিকায় চাকুরী নেয়ার কথা ভাবেন। ১৯৬৯ সালের প্রথম দিকে তিনি দৈনিক ‘ইত্তেফাক’ পত্রিকায় বার্তা বিভাগে চাকুরী নেন। কিন্তু মাত্র তিন মাস পরে তিনি চাকুরী ছেড়ে দেন।

১৯৭০ সালে ‘শিকারী লোকটা’ শিরোনামে একটি কবিতার জন্য তিনি সমগ্র এশিয়াভিত্তিক এক প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান অর্জন করে বিশেষ পুরস্কার লাভ করেন। পরে ওই কবিতাটি কলকাতা থেকে প্রকাশিত সমগ্র পৃথিবীর প্রতিনিধিত্বশীল কবিদের কবিতা-সঙ্কলনে অন্তর্ভুক্ত হয়। বাংলা ভাষায় প্রকাশিত ‘পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ কবিতা’ (১৯৭০) শীর্ষক ওই গ্রন্থে তদানীন্তন পাকিস্তানের একমাত্র প্রতিনিধি আবুল হাসানের কবিতা স্থান পায়।

আবুল হাসানের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘রাজা যায় রাজা আসে’ প্রকাশিত হয় ১৯৭২ সালের ডিসেম্বর মাসে। ‘রাজা যায় রাজা আসে’ কাব্যগ্রন্থটি প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই আবুল হাসানের কবিখ্যাতি বিস্তার লাভ করে। এরপর দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘যে তুমি হরণ করো’ প্রকাশিত হয় ১৯৭৪ সালের এপ্রিল মাসে।

১৯৭২ সালের প্রথম দিকে আবুল হাসান ‘গণবাংলা’ পত্রিকায় চাকুরীতে যোগ দেন। ‘গণবাংলা’-য় তখন সাহিত্য বিভাগের সম্পাদক ছিলেন কবি শহীদ কাদরী। সাহিত্য বিভাগে শহীদ কাদরীর সহযোগী হিসেবে কাজ করেন তিনি। ‘গণবাংলা’ পত্রিকায় হাসান প্রায় এক বছর চাকুরী করেন। ১৯৭৩ সালের জানুয়ারি মাস পর্যন্ত ‘গণবাংলা’-য় তিনি কর্মরত ছিলেন। তারপর তিনি যোগ দেন আবদুল গাফফার চৌধুরী সম্পাদিত দৈনিক ‘জনপদ’ পত্রিকায়। ‘জনপদ’ পত্রিকা প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৭৩ সালের ২৪ জানুয়ারি। এ পত্রিকায় প্রথম দিন থেকেই আবুল হাসান সহকারী সম্পাদক হিসেবে চাকুরী গ্রহণ করেন। ‘জনপদ’ পত্রিকায় তিনি ১৯৭৪ সালের জুন মাস পর্যন্ত চাকুরী করেন। এই দেড় বছরে ‘জনপদ’ পত্রিকায় আবুল হাসানের অনেক রচনা প্রকাশিত হয়েছে-এর মধ্যে আছে কবিতা, প্রবন্ধ এবং উপ-সম্পাদকীয় নিবন্ধ। এই পত্রিকায় তিনি ‘আপন ছায়া’ এবং ‘খোলাশব্দে কেনাকাটা’ শীর্ষক দুটি উপ-সম্পাদকীয় কলাম লিখতেন। ‘খোলাশব্দে কেনাকাটা’ শীর্ষক কলামটির প্রথম চার সংখ্যা তিনি ‘ভ্রামণিক’ ছদ্মনামে লিখেছেন।

১৯৭৪ সালের জুন মাসের শেষের দিকে আবুল হাসান ‘জনপদ’ পত্রিকার চাকুরী ছেড়ে দিয়ে সহ-সম্পাদক হিসেবে দৈনিক ‘গণকণ্ঠ’ পত্রিকায় যোগ দেন। এই পত্রিকায় তিনি ১৯৭৪ সালের নভেম্বর মাস পর্যন্ত কর্মরত ছিলেন। ‘গণকণ্ঠ’ পত্রিকায় তিনি ‘আড়ালে অন্তরালে’ এবং ‘বৈরী বর্তমান’ শীর্ষক দুটি উপ-সম্পাদকীয় কলাম লিখতেন। এছাড়া ‘ফসলবিলাসী হাওয়ার জন্য কিছু ধান চাই’ শীর্ষক একটি উপ-সম্পাদকীয় নিবন্ধ রচনা করে সেইসময় তিনি অনেকের দৃষ্টি আকর্ষণে সক্ষম হয়েছিলেন।

আবুল হাসানের ‘পৃথক পালঙ্ক’ প্রকাশিত হয় ১৯৭৫ সালের অক্টোবর মাসে। তার মৃত্যুর দশ বছর পর ১৯৮৫ সালে নওরোজ সাহিত্য সংসদ প্রকাশ করে ‘আবুল হাসানের অগ্রন্থিত কবিতা’।

আবুল হাসান স্বভাব-কবির মতো অবিশ্বাস্য দ্রুততায় কবিতা লিখে দেয়ার মতো বিরল প্রতিভার অধিকারী ছিলেন। কবিতার পাশাপাশি তিনি বেশ কিছু সার্থক ছোটগল্প রচনা করেছেন। ১৯৬৯ সাল থেকে ঢাকায় বিভিন্ন দৈনিক ও সাময়িকপত্রে তাঁর গল্প প্রকাশিত হতে থাকে। তবে জীবিত অবস্থায় তাঁর কোন গল্প-সঙ্কলন প্রকাশিত হয়নি। মৃত্যুর পনের বছর পর ১৯৯০ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর নয়টি গল্প সঙ্কলন ‘আবুল হাসান গল্পসংগ্রহ’। কবিতা-গল্প ছাড়া আবুল হাসান প্রবন্ধ এবং নাটকও রচনা করেছেন। ‘ওরা কয়েকজন’ শীর্ষক একটি কাব্যনাটক তাঁর মৃত্যুর পর সাপ্তাহিক ‘বিচিত্রা’-য় (১২.১২.১৯৭৫) প্রকাশিত হয়, যা স্বতন্ত্র গ্রন্থাকারে মুদ্রিত হয় ১৯৮৮ সালে।

শৈশব থেকেই নানা রোগে আক্রান্ত হয়েছেন কবি আবুল হাসান। ১৯৭০ সালে হৃদপিন্ড সম্প্রসারণজনিত রোগ ধরা পড়ে তার। এর পর থেকে অসুস্থতা আর তার পিছু ছাড়েনি। ১৯৭৫ সালের শুরুতেই আবুল হাসান পুনরায় গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। কিন্তু তার হৃদযন্ত্রের সুচিকিৎসা করার ক্ষমতা ইউরোপের উন্নত দেশগুলোর ছিল না, তিনি শারীরিকভাবেও বড় অপারেশনের ধকল সহ্য করার মত অবস্থায় ছিলেন না। তাই চিকিতসাসূত্রে সেসময় জার্মানিতে থাকলেও তখন তাকে দেশে ফেরত পাঠানো হয়।

১৯৭৫ সালে ঢাকা পৌঁছে আবুল হাসান চাকুরীর চেষ্টা করতে থাকেন। কিন্তু অসুস্থতার কথা বিবেচনা করেই কেউ তাকে চাকুরী দেননি, কেননা তাহলে পরিশ্রমজনিত ক্লান্তিতে তার অসুস্থতা আরো বৃদ্ধি পাবে- এরকম ধারণা করতেন অনেকে। একদিকে অসুস্থতা, অন্যদিকে বেকার-জীবন মাথার ওপর ভাই-বোনদের পড়ালেখার খরচ যোগানোর দায়িত্ব-এসব নিয়ে দুশ্চিন্তায় আবুল হাসান পুনরায় গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাঁকে পি.জি. হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। হাসপতালের বেডে শুয়ে বুকের অসহ্য যন্ত্রণা নিয়েই তিনি বেশ কিছু কবিতা লিখেছিলেন। অবশেষে ১৯৭৫ সালের ২৬ নভেম্বর মাত্র আটাশ বছর বয়সে আবুল হাসান মৃত্যুবরণ করেন। তার মরদেহ ঢাকার বনানী গোরস্থানে সমাহিত করা হয়। মৃত্যুর পর তিনি ১৯৭৫ সালে বাংলা একাডেমী পুরস্কার এবং ১৯৮২ সালে একুশে পদক লাভ করেন।

You must be logged in to post a comment Login