রিকশাচিত্র: ঢাকার অলংকরণ

প্রকাশ: May 17, 2015
rikshaw7

রিকশাচিত্র, চিত্রকলার আলাদা একটি মাত্রা। মূলত রিকশাচিত্র বলতে উজ্জ্বল রঙে আঁকা কিছু চিত্রকে বোঝায়, যা খুব সাবলীল ভঙ্গিতে বিষয়বস্তুকে উপস্থাপন করতে সক্ষম। সাধারনত রিকশার পিছনে, হুডে এবং ছোট ছোট অনুষঙ্গে এই বিশেষ চিত্রকলা লক্ষ্য করা যায়। বিশেষজ্ঞগণ এধরণের চিত্রকলাকে ফোক আর্ট, পপ আর্ট কিংবা ক্র্যাফট সব দিক দিয়েই আলোচনা করতে পছন্দ করেন। তাঁদের মতে, যেকোনো বস্তুরই ‘ফর্ম’ আর ‘ডেকোরেশন’ নামে দুটি দিক থাকলেও রিকশাচিত্র কেবলই একপ্রকার ‘ডেকোরেশন’। চিত্রকরদের মতে, রিকশাচিত্রের টান বা আঁচড়গুলো খুবই সাবলীল, প্রাণবন্ত এবং স্পষ্ট, এবং টানগুলো হয় ছোট ছোট ও নিখুঁত। অথচ এই বিশেষ চিত্রকলার জন্য নেই কোনো আলাদা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা, একেবারে দেশজ কুটিরশিল্পের মতই শিল্পীরা স্বপ্রণোদিত হয়ে শিখে থাকেন এই চিত্রশিল্প এবং নিজের কল্পনা থেকেই এঁকে থাকেন এসব চিত্র।

rikshaw2

১৯৪৭-এর দেশভাগের পর প্রতিষ্ঠানভিত্তিক চারুকলার ধারার পাশাপাশি একটি অপ্রাতিষ্ঠানিক ধারাও গড়ে ওঠে। এর নেতৃত্ব দেন পীতলরাম সুর, আর কে দাস, আলাউদ্দিন, আলী নুর, দাউদ উস্তাদ প্রমুখ শিল্পী।

rickshaw art

গতানুগতিক ধারার বাইরের এই শিল্পীদের মাধ্যমেই বিকশিত হয় এ দেশের সিনেমা ব্যানার পেইন্টিং, রিকশা আর্ট, ট্রাক আর্ট ইত্যাদি। এগুলোর মধ্যে রিকশা চিত্র নিজস্ব শিল্পশৈলী, উপস্থাপন রীতি ও বিষয়বস্তুর স্বকীয়তায় ইতিমধ্যে দেশে-বিদেশে সুধীজনের বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।

rickshaw painting

রিকশা চিত্রের মূল লক্ষ্য রিকশাকে সুসজ্জিত ও আকর্ষণীয় করা। সাধারণত শিল্পীরা মহাজন এবং ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী ছবি এঁকে থাকেন। সাধারণত এনামেল পেইন্ট দিয়েই তারা আঁকেন। রাজধানীর বকশীবাজার, বেড়িবাঁধ, মোহাম্মদপুর, ঝিগাতলা, মিরপুর, যাত্রাবাড়ী, গুলিস্তানসহ বেশ কয়েক জায়গায় রয়েছেন এমন শিল্পী। তাঁরা নতুন রিকশা যেমন পেইন্ট করেন, তেমনি পুরনো রিকশাও ঘষেমেজে পেইন্ট করে দেন। তবে গত ৫০ বছরে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ধরনের বিষয় নিয়ে রিকশা পেইন্টিং করা হয়েছে। যেমন, ষাটের দশকে রিকশা পেইন্টিং করা হতো মূলত শীর্ষস্থানীয় চলচ্চিত্র তারকাদের প্রতিকৃতি অবলম্বনে। সত্তরের দশকের মাঝামাঝি রিকশায় মানুষের ছবি আঁকার ওপর সরকারি নিষেধাজ্ঞা আরোপিত হলে রিকশা পেইন্টাররা মানুষের পরিবর্তে পশুপাখির ছবি আঁকতে শুরু করেন। যেমন, ট্রাফিক কন্ট্রোল করছে একটা শিয়াল, রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে একটা বাঘ, পাশে স্কুল বালকের মতো ব্যাগ কাঁধে খরগোশ ছানা চলেছে স্কুলে।

rikshaw3

এ ছাড়া বিভিন্ন মিথ বা ধর্মীয় কিংবদন্তিকে বিষয় করে রিকশায় ছবি আঁকা হয়। যেমন, মুসলিম উপাখ্যানের দুলদুল, মিরাজ গমনের বাহন বোরাক কিংবা আরব্য রজনীর আলাদিনের আশ্চর্য প্রদীপ ও দৈত্য, রাজকন্যা, রাজপ্রাসাদ ইত্যাদি।

rikshaw9

‘সংগ্রাম’ নামে পরিচিত শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের কাদায় আটকে যাওয়া গরুর গাড়ির ছবিটি রিকশাচিত্রীরা বিভিন্নভাবে এঁকেছেন। ভিনদেশি দৃশ্য যেমন, মরুভূমির ভেতর উট নিয়ে চলেছে দুই বেদুইন কিংবা অচেনা কোনো সমুদ্রসৈকতে খেলা করছে কোনো বালক, জাপানের কোনো বাড়ি, লন্ডন ব্রিজ, আইফেল টাওয়ার, টাইটানিক জাহাজ ইত্যাদিও রিকশাচিত্রে উঠে এসেছে। স্মৃতিসৌধ, সংসদ ভবন, শহীদ মিনার ইত্যাদি স্থাপত্য রিকশাচিত্রের বিষয় হয়েছে বহুবার। মোগল স্থাপত্যের নিদর্শন তাজমহল রিকশা পেইন্টিংয়ের আরেকটি জনপ্রিয় বিষয়। ইদানীং রিকশাচিত্রীদের আরেকটি প্রিয় বিষয় বঙ্গবন্ধু সেতু। এ ছাড়া ডাইনোসরের সঙ্গে যুদ্ধরত লুঙ্গিপরা খালি গায়ের বাঙালি—রিকশাচিত্রীদের অপূর্ব কল্পনাশক্তির নিদর্শন। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে মুক্তিযুদ্ধকে বিষয়বস্তু করে রিকশা চিত্রে উঠে এসেছে পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে মুক্তিবাহিনীর সম্মুখ যুদ্ধ, বাংলাদেশি নারী-পুরুষদের উপর পাকিস্তানী সেনাদের অত্যাচার ও হত্যাযজ্ঞ, বিজয় উদযাপন ইত্যাদি।

rikshaw5.1

rikshaw6

আবার সত্তরের দশকে নতুন দেশের নতুন রাজধানী হিসেবে ঢাকা যখন বাড়তে শুরু করে, তখন কাল্পনিক শহরের দৃশ্য আঁকা হতো রিকশায়।

rikshaw8

পাশাপাশি সব সময়ই গ্রামের জনজীবন, প্রাকৃতিক দৃশ্যের ছবিও আঁকা হতো, এখনো হয়। এ ছাড়া বিভিন্ন স্টাইলের ফুল, পাখি ইত্যাদি তো আছেই।

rickshaw1

রিকশা পেইন্টিংয়ে লোকায়ত ধারার প্রভাব, বিশেষ করে রেখার ব্যবহারে অধিক চোখে পড়ে। আবার বিভিন্ন ক্যালেন্ডার বা ছাপা ছবিকে মূল হিসেবে ব্যবহার করে রিকশা পেইন্টাররা ছবি এঁকে থাকেন। তবে রিকশা পেইন্টিংয়ে, বিশেষ করে রং নির্বাচনে, সিনেমার ব্যানার চিত্রীদের কাজের প্রভাব পড়েছে উল্লেখযোগ্য মাত্রায়। ইদানীং রিকশা পেইন্টারদের সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক ধারার শিল্পীদের যৌথ আর্ট ওয়ার্কশপের সংবাদও জানা যায়। আবার কোনো কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ধারার শিল্পীর কাজে রিকশা পেইন্টিংয়ের প্রভাবও লক্ষ করা যায়।

10170776_10152369944323872_1529433280919104226_n

rikshaw4

বাংলাদেশে রিকশাচিত্র ১৯৫০-এর দশক থেকে প্রচলিত, এবং রিকশার প্রায় সম্ভাব্য সবগুলো অংশই চিত্রিত করার একটা প্রয়াস লক্ষ করা যেত। জ্যামিতিক নকশার পাশাপাশি ফুল, পাখি এমনকি জনপ্রিয় নায়ক-নায়িকাদের ছবি আঁকারও প্রচলন ছিল। কখনও রিকশাচিত্রে রিকশাওয়ালার ধর্মীয় বিশ্বাস প্রতিফলিত হতো, আবার কখনও হয়তো নিছক কোনো বক্তব্য কিংবা সামাজিক কোনো বিষয় দেখা যেত।

১৯৮৮ সালে লন্ডনে মিউজিয়াম অব ম্যানকাইন্ডে (বর্তমানে ব্রিটিশ মিউজিয়ামের অন্তর্ভুক্ত) শিরিন আকবরের কিউরেটিংয়ে ঢাকার রিকশা পেইন্টিং নিয়ে বিশেষ প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়, যার শিরোনাম ছিল ‘ট্রাফিক আর্ট: রিকশা পেইন্টিং ফ্রম বাংলাদেশ’। ব্রিটিশ মিউজিয়ামেও বাংলাদেশের সুসজ্জিত ও চিত্রিত রিকশা সংগৃহীত আছে। জাপানের ফুকুয়োকা এশিয়ান আর্ট মিউজিয়ামেও বাংলাদেশের রিকশা পেইন্টিং নিয়ে বিশেষ প্রদর্শনী হয়েছে এবং এই মিউজিয়ামে রিকশা পেইন্টিংয়ের একটা বড় সংগ্রহ আছে। সম্প্রতি (২০১৩) জাপানের তাকামাতসু শহরে একটি আর্ট ফেস্টিভ্যালে বাংলাদেশের রিকশাচিত্র বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে প্রদর্শিত হয়েছে। নেপালেও হয়েছে বাংলাদেশের রিকশাচিত্রের প্রদর্শনী। তবে বাংলাদেশে রিকশা পেইন্টিংয়ের সবচেয়ে বড় প্রদর্শনীটি হয়েছে ১৯৯৯ সালে ঢাকায় আলিয়ঁস ফ্রঁসেজে। এ প্রদর্শনীতে ৫০০ জন রিকশা পেইন্টার এবং ৮৩ জন বেবিট্যাক্সি (দুই স্ট্রোকবিশিষ্ট অটোরিকশা) পেইন্টারের শিল্পকর্ম প্রদর্শিত হয়েছিল।

তবে অনুসন্ধান করে দেখা গেছে, ইদানীং ঢাকার রিকশাচিত্রশিল্পীগণ, যারা এখনো সক্রিয়, তারা মূলত বিদেশি ক্রেতাদের ওপর নির্ভরশীল। বিদেশিদের শখ মেটানো গেলেও তাতে রিকশাচিত্রীদের জীবনে, দু-একটি বিরল ব্যতিক্রম বাদে বিশেষ কোনো হেরফের হয়েছে—এমনটা মনে হয় না। বরং হাতে আঁকা প্লেটের বিকল্প হিসেবে ডিজিটাল প্রিন্টের ব্যাপক ব্যবহার বৃদ্ধি পাওয়ায় এই বিশেষ রীতির চিত্রকলা আজ হুমকির সম্মুখীন। পেশাগত দিক দিয়ে হুমকির সম্মুখীন রিকশা পেইন্টাররা। ইতিমধ্যে বেশির ভাগ রিকশাচিত্রশিল্পী পেশা পরিবর্তন করেছেন বা বিকল্প কাজ খুঁজে নিয়েছেন। ঢাকায় বর্তমানে আনুমানিক ১০-১২ জন সক্রিয় রিকশাচিত্রশিল্পী আছেন। ঢাকা ছাড়াও রাজশাহী, কুমিল্লা, যশোর, খুলনা, পাবনা, ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম ইত্যাদি শহরে আরও কিছু রিকশাচিত্রশিল্পী কমবেশি কাজ করেন।

বাংলাদেশের চিত্রকলার ইতিহাসে তো বটেই, পৃথিবীর চারুশিল্পের ইতিহাসেও বিশেষ ধরন বা শৈলী হিসেবে রিকশা পেইন্টিং বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। এই ধারার বিলুপ্তি ঘটলে পৃথিবীর শিল্পকলার ইতিহাসের একটা উল্লেখযোগ্য শৈলীর অবসান ঘটবে। তবে আশার কথা, সম্প্রতি বাংলাদেশে রিকশাচিত্র নিয়ে কিছু কিছু উদ্যোগের খবর জানা যাচ্ছে। ‘রিকশা পেইন্ট’ এরকমই একটি উদ্যোগ। এর লক্ষ্য রিকশাচিত্রের সঙ্গে জড়িত শিল্পীদের সঙ্গে একসঙ্গে কাজ করে তাদেরকে তাদের যথাযথ স্থানে নিয়ে যাওয়া এবং এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে রিকশা চিত্রের শিল্পী ও ক্রেতাদের এক করে দেওয়া। উচ্চমানের রিকশা চিত্র তৈরি, ক্রেতার চাহিদা ও পছন্দ অনুযায়ী চিত্রকর্ম তৈরি ও সরবরাহ এবং দেশের শিল্পকলার এই খাতটিকে পরিচিতিদানই এই প্ল্যাটফর্মটির উদ্দেশ্য।

rikshawpaint.net

রিকশা শিল্পীদের কল্যাণে আরেকটি উদ্যোগ ‘রিকশা আর্ট’ । সংশ্লিষ্ট শিল্পীগণ যেন তাদের শিল্পকর্মের প্রকৃত মূল্য পান এবং শিল্পীদের কল্যাণের জন্য যেন একটি গড়ে তোলা যায় সেই উদ্দেশ্যে কাজ করে যাচ্ছে এই প্ল্যাটফর্মটি।

rikshawart.org

You must be logged in to post a comment Login

মন্তব্য করুন