সংশপ্তক ফেরদৌসী মজুমদার

প্রকাশ: June 18, 2015
ferdousi mojumdar

ফেরদৌসী মজুমদার প্রতাপশালী বাংলাদেশী অভিনেত্রী। স্বাধীনতা উত্তরকালে টিভি ও মঞ্চে সমান সফলতার সাথে অভিনয় করে আসছেন। ধারাবাহিক নাটক সংশপ্তকে ‘হুরমতি’ চরিত্রে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে দেশব্যাপী দর্শক-ভক্তদের ব্যাপক প্রশংসা লাভ করেন তিনি।

ফেরদৌসী মহুমদারের জন্ম ১৯৪৩ সালের ১৮ জুন। জন্মস্থান বরিশালে হলেও ফেরদৌসী মজুমদারের পৈতৃক নিবাস নোয়াখালীতে। কিন্তু তিনি বেড়ে উঠেছেন ঢাকায়। তার বাবা খান বাহাদুর আব্দুল হালিম চৌধুরী ছিলেন ডিস্ট্রিক ম্যাজিস্ট্রেট। তার ভাইবোন ছিল মোট ১৪ জন যাদের মধ্যে ৮ জন ভাই এবং ৬ জন বোন। সবচেয়ে বড় ভাই কবীর চৌধুরী এবং মেজ ভাই শহীদ মুনীর চৌধুরী। ফেরদৌসী মজুমদারের পরিবার ছিল খুব রক্ষণশীল। বাড়িতে সাংস্কৃতিক চর্চা ছিল নিষিদ্ধ। কুসংস্কার এবং ধর্মের দোহাই দিয়ে তখন নারীদের কোণঠাসা করে রাখা হতো। তার লেখাপড়া শুরু হয় নারী শিক্ষা মন্দির স্কুল থেকে। এই স্কুলে ক্লাস সেভেন পর্যন্ত পড়ার পর তিনি ভর্তি হন মুসলিম গার্লস স্কুলে যেখান থেকে তিনি ম্যাট্রিক পাশ করেন। তারপর ইডেন কলেজে ভর্তি হন।

ইডেন কলেজে ইন্টারমিডিয়েট পড়ার সময় তিনি তাঁর বড় ভাই মুনীর চৌধুরীর কাছ থেকে প্রস্তাব পান একটা নাটকে রোবটের চরিত্রে অভিনয় করার যার নাম ছিল ‘ডাক্তার আবদুল্লাহর কারখানা’।এটি লিখেছিলেন শওকত ওসমান এবং মঞ্চস্থ হয়েছিল বর্তমান জহুরুল হক হলে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর তিনি পাবলিক লাইব্রেরিতে ‘দন্ড ও দন্ডধর’ নাটকে অভিনয় করেন তাঁর শিক্ষক রফিকুল ইসলামের বিপরীতে।তারপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে ভর্তি হয়ে একটা নাটকের ফোরামে তিনি জড়িয়ে পড়েন। অভিনয়ও চলছিলো ছাত্র-শিক্ষকদের যে নাট্য সংগঠন ছিলো সেটা থেকে। তারপর ১৯৬৪-তে টেলিভিশন এলে প্রথম অভিনয় করলেন ‘একতলা-দোতলা’ নাটকে। এরপর তাকে পেছন ফিরে তাকাতে হয় নি আর। বাংলায় অনার্স-মাস্টার্স এবং তারপর আরবিতে মাস্টার্স করলেন। পাশাপাশি অভিনয় করেছেন পুরো দমে। তিনি নীলিমা ইব্রাহিমের লেখা ‘তামসি’ নামক নাটকে অভিনয় করেন। তিনি ১৯৭০ সালের ১৩ই জুন রামেন্দু মজুমদারকে বিয়ে করেন। ১৯৭১ সালের শুরুতে তিনি পাকিস্তানের করাচীতে চলে যান একটা অ্যাডভার্টাইজিং ফার্মে কাজ করতে।পরে ১১ই মার্চ ঢাকায় ফিরে আসেন।

স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে ‘থিয়েটার’ গঠন করা হয়, যেখানে ছিল আবদুল্লাহ আল মামুন, রামেন্দু মজুমদার প্রমুখ। ফেরদৌসী মজুমদার সেই দলে যোগ দেন। তার জীবনের একটা বড় অংশ দখল করে আছে নাট্যদল থিয়েটার। বাংলাদেশ টেলিভিশনে তিনি প্রায় তিনশ’র মতো নাটকে অভিনয় করেন। তার অভিনয় জীবন প্রায় তিন দশকের মতো দীর্ঘ। আবদুল্লাহ আল মামুন ফেরদৌসী মজুমদারকে নিয়ে একটি ৮৬ মিনিটের একটি তথ্যচিত্র নির্মাণ করেছেন যার নাম ‘জীবন ও অভিনয়’। তিনি ঢাকার উইল্‌স্‌ লিট্‌ল্‌ ফ্লাওয়ার স্কুলের শিক্ষক ছিলেন।

ব্যস্ততা কিংবা সময়ের প্রয়োজনে এখন আর আগের মতো টেলিভিশনে অভিনয় করা হয়ে ওঠে না ফেরদৌসী মজুমদারের। তবে নাটকের চিত্রনাট্য ও নির্মাতা পছন্দ হলে এখনো মাঝেমধ্যে অভিনয় করেন। নবনাট্য আন্দোলন থেকে শুরু করে দেশের সব সাংস্কৃতিক আন্দোলনে তার অংশীদারিত্ব দেশের সংস্কৃতি নির্মানে রেখেছে বিরাট প্রভাব।

ফেরদৌসী মজুমদার মনে করেন, তার আজকের প্রতিষ্ঠা থিয়েটারের অবদান। বাংলাদেশের মঞ্চে প্রথম একক নাটক ‘কোকিলারা’র চৌকস এই অভিনেত্রী টিভি নাটকেও হয়েছেন সমান জনপ্রিয়। প্রয়াত নাট্যজন আবদুল্লাহ আল মামুনের ‘কোকিলারা’ নাটকে তার বৈচিত্র্যময় অভিনয় কৃতিত্বের মধ্য দিয়ে এ দেশের মঞ্চপ্রেমী দর্শক তাকে চিনতে পেরেছেন ভিন্ন আঙ্গিকে। তার অভিনীত টেলিভিশন ও মঞ্চনাটকের মধ্যে ‘বরফ গলা নদী’, ‘খাঁচা’, ‘জীবিত ও মৃত’, ‘অকূল দরিয়া’, ‘চোখের বালি’, ‘সংশপ্তক’, ‘নিভৃত যতনে’, ‘কোকিলারা’, ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’, ‘এখনও দুঃসময়’, ‘দুই বোন’, ‘এখনও ক্রীতদাস’, ‘বারামখানা’ এবং ‘মুক্তধারা’ উল্লেখযোগ্য। টিভি, মঞ্চ ছাড়াও তিনটি চলচ্চিত্রে অভিনয় করে ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছেন এই অভিনেত্রী। নব্বইয়ের দশকে তিনি মঞ্চ নির্দেশনায় রেখেছেন অগ্রণী ভূমিকা। তার নির্দেশিত মঞ্চনাটকের মধ্যে ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’, ‘চিঠি’, ‘তাহারা তখন’, ‘মেহেরজান আরেকবার’ এবং সম্প্রতি রবিঠাকুরের ‘মুকুট’। বর্তমানে তিনি রাজধানীর ‘সান বিমস’ বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত।

You must be logged in to post a comment Login

মন্তব্য করুন