সংস্কারমুক্ত সংস্কৃতিচর্চায় বুলবুল চৌধুরী এবং বুলবুল ললিতকলা একাডেমী

প্রকাশ: May 13, 2015
Bulbul Chowdhury

বুলবুল একাডেমি অব ফাইন আর্টস সংক্ষেপে বাফা (BAFA: Bulbul Academy for Fine Arts) নামে সর্বসাধারণের কাছে বেশি পরিচিত। বাফা প্রতিষ্ঠায় অংশ নিয়েছিলেন তৎকালীন শিল্পী, সাহিত্যিক, সংস্কৃতিকর্মী ও রাজনীতিবিদরা। বাংলাদেশে আর কোনো সাংস্কৃতিক সংগঠন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে এত কর্মী সমাগম হয়নি। তবে এর প্রধান উদ্যোক্তা ছিলেন রাজনীতিবিদ ও সংস্কৃতিকর্মী মাহমুদ নুরুল হুদা। বুলবুল চৌধুরী ছিলেন ত্রিশ-চল্লিশের দশকে উপমহাদেশের একজন প্রখ্যাত নৃত্যশিল্পী। মাত্র ৩৫ বছর বয়সেই মারা যান। মাহমুদ নুরুল হুদা ছিলেন তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু। ১৯৫৪ সালের ১৭ মে বুলবুল মারা যান কলকাতায়। তার মৃত্যুতে ৮ মে কার্জন হলে জাতীয় শোকসভায় একাডেমি প্রতিষ্ঠায় প্রচার ও তহবিল সংগ্রহে ১০০ জনের একটি কমিটি গঠন করা হয়। ১৯৫৫ সালের ১ জানুয়ারি বুলবুলের জন্মদিনে স্মৃতি দিবস পালনের সিদ্ধান্ত হয়। ৭ নম্বর ওয়াইজঘাট, নীলকর ওয়াইজের বাড়িটি ছিল পরিত্যক্ত সম্পত্তি। জেলা কর্তৃপক্ষের সচিবের পরামর্শে ১৯৫৪ সালের অক্টোবর-নভেম্বরে হুদা এ বাড়িতে ‘বুলবুল ললিতকলা একাডেমি’র সাইনবোর্ড লাগান। পরে প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী একাডেমির নামে বাড়িটি বরাদ্দের নির্দেশ দেন। তারপর থেকে প্রতিষ্ঠানটি কণ্ঠসঙ্গীত, যন্ত্রসঙ্গীত, নৃত্যকলা, নাট্যকলা, চারু ও কারুশিল্পে শিক্ষাদান এবং শিল্প-সাহিত্য-সঙ্গীতে গবেষণা পরিচালনা করে চলেছে।

বুলবুল ললিতকলা একাডেমী প্রথমে একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ শুরু করে। বিভিন্ন সময়ে সাংস্কৃতিক প্রতিনিধি দল নিয়ে এটি ইরাক, ইরান, পাকিস্তান, সোভিয়েত রাশিয়া, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, চীন, নেপাল, বলিভিয়া, ওমান প্রভৃতি দেশে অনুষ্ঠান করে সুনাম অর্জন করে। এছাড়া একাডেমীর নিয়মিত অনুষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন জাতীয় দিবস পালন, বর্ষবরণ, বসন্ত উৎসব ইত্যাদি উদ্যাপন এবং রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, বুলবুল চৌধুরী, আববাসউদ্দীন আহমদ, জয়নুল আবেদিন প্রমুখ মনীষীর জন্ম-মৃত্যুবার্ষিকী পালন। এসব অনুষ্ঠানের মাধ্যমে দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে একাডেমী এক উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে।

একাডেমী ললিতকলার বিভিন্ন মাধ্যম, যেমন কণ্ঠসঙ্গীত, যন্ত্রসঙ্গীত, নৃত্যকলা, নাটক, চিত্রকলা ও ভাস্কর্যশিল্পে ছাত্র-ছাত্রীদের প্রশিক্ষণ দেয়। শিল্পের বিভিন্ন মাধ্যমে পদ্ধতিগত শিক্ষাদান ছাড়াও এখানে রয়েছে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রযোজনা বিভাগ। একাডেমীর প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ছাত্র-ছাত্রীরাই এর সদস্য। এ বিভাগ উচ্চমানের অনুষ্ঠানাদি পরিচালনা করে থাকে। বিভিন্ন সাংস্কৃতিক আন্দোলনেও এর অংশগ্রহণ থাকে। একাডেমী পরিবেশিত কয়েকটি উল্লেখযোগ্য নৃত্যনাট্য হলো: চন্ডালিকা (১৯৫৮), প্রকৃতির লীলা (১৯৫৮), নকসী কাঁথার মাঠ (১৯৫৯), সিন্ধু (১৯৬১), মায়ার খেলা (১৯৬৪), চিত্রাঙ্গদা (১৯৬৬), হাজার তারের বীণা (১৯৬৭), বাদল বরিষণে (১৯৬৭), রাজপথ জনপথ (১৯৬৯) ও শ্যামা (১৯৭০)। এছাড়াও একাডেমী বিভিন্ন বিষয় ও গানের ওপর প্রায় অর্ধশত খন্ড নৃত্যনাট্য পরিবেশন করেছে।

বুলবুল ললিতকলা একাডেমীর সবচেয়ে বড় অবদান সংস্কারমুক্ত সংস্কৃতিচর্চাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া। এক সময় নৃত্যকলা সম্পর্কে মুসলিম সমাজের বিরূপ ধারণা ছিল। এই একাডেমী সে ধারণা ভেঙে দিয়ে নৃত্যকলাকে সবার নিকট গ্রহণযোগ্য করে তুলেছে। সঙ্গীত, নৃত্য ও যন্ত্রশিল্পী তৈরি করে এই প্রতিষ্ঠান দেশের মৌলিক সাংস্কৃতিক দায়িত্ব পালন করছে।

বুলবুল চৌধুরীর পরিচিতি:
নৃত্যশিল্পী ও লেখক বুলবুল চৌধুরীর প্রকৃত নাম রশীদ আহমদ চৌধুরী, ‘বুলবুল চৌধুরী’ তার ছদ্মনাম। ১৯১৯ সালের ১ জানুয়ারি চট্টগ্রাম জেলার সাতকানিয়া থানার চুনতি গ্রামে তার জন্ম। পিতা মোহাম্মদ আজমউল্লাহ ছিলেন বেঙ্গল পুলিশ সার্ভিসের ইন্সপেক্টর। ১৯২৪ সালে তিনি হাওড়া প্রাইমারি স্কুলে ভর্তি হন। তারপর বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নের পর ১৯৪৩ সালে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম.এ ডিগ্রি লাভ করেন।

শৈশব থেকেই নাচ, গান, ছবি আঁকা এবং গল্প-কবিতা লেখার প্রতি বুলবুল চৌধুরির প্রবল আগ্রহ ছিল। ১৯৩৪ সালে মানিকগঞ্জ হাইস্কুলে অনুষ্ঠিত এক চিত্র প্রদর্শনীতে তার আঁকা ছবি প্রথম পুরস্কার লাভ করে। তবে নৃত্যশিল্পী হিসেবেই মুখ্যত তিনি খ্যাতি অর্জন করেন। মানিকগঞ্জ হাইস্কুলের এক বিচিত্রানুষ্ঠানে স্বরচিত ‘চাতক-নৃত্য’ পরিবেশনের মাধ্যমে তাঁর নৃত্যশিল্পী জীবনের সূত্রপাত ঘটে। ছাত্র থাকাকালে প্রেসিডেন্সি কলেজের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করে নৃত্যশিল্পী হিসেবে তিনি প্রতিষ্ঠা লাভ করেন। এ সময় কয়েকজন খ্যাতনামা শিল্পী, যেমন: সরোদবাদক সন্তোষচন্দ্র, সুরশিল্পী তিমিরবরণ ভট্টাচার্য, নৃত্যশিল্পী উদয়শঙ্কর, সাধনা বসু প্রমুখের সঙ্গে বুলবুলের যোগাযোগ ঘটে,যাঁরা ছিলেন তাঁর প্রতিভা বিকাশের অন্যতম প্রেরণা। ১৯৩৬ সালে তিনি সাধনা বসুর সঙ্গে যৌথভাবে পরিবেশন করেন, রবীন্দ্রনাথের বিখ্যাত নৃত্যনাট্য কচ ও দেবযানী। এটি ছিল তাঁর শিল্পীজীবনের মাইলফলক।

১৯৩৭ সালে ওরিয়েন্টাল ফাইন আর্টস অ্যাসোসিয়েশন (OFA) প্রতিষ্ঠায় বুলবুল চৌধুরী অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। নাচের সঙ্গে অভিনয় যোগ করে সুনির্দিষ্ট বক্তব্য পরিস্ফুট করে তোলাই ছিল তাঁর নৃত্যনাট্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। তাঁর নৃত্যনাট্যের বিষয়বস্ত্ত ছিল বিচিত্র ধরনের এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনাসম্পন্ন। যেমন হিন্দু-মুসলিম পুরাণ কাহিনী ও রূপকথা, লোককাহিনী, ঐতিহাসিক চরিত্র, সামাজিক সমস্যা, সমকালীন ঘটনা, যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ প্রভৃতি। তাঁর নৃত্যের স্টাইল ছিল অনন্য, ব্যতিক্রমী এবং অভিব্যক্তি-নির্ভর। বিষয়বস্ত্তর নতুনত্ব ও কল্পনাশক্তির গভীরতায় সমৃদ্ধ তাঁর নৃত্যনাট্যগুলি দেশেবিদেশে সর্বত্র দর্শকদের প্রশংসা অর্জন করেছে। ব্যালে নৃত্যের আঙ্গিকে তিনি জাতির আশা-আকাঙ্ক্ষাকে মূর্ত করে তুলেছেন। তাঁর স্ত্রী আফরোজা বুলবুলও একজন প্রতিভাময়ী নৃত্যশিল্পী এবং তাঁর যথার্থ নৃত্যসঙ্গী ছিলেন।

নৃত্যশিল্পকে জীবনের প্রতিচ্ছবি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা, বিশেষ করে সে যুগের রক্ষণশীল সমাজে নৃত্যকে জনপ্রিয় করে তোলার ক্ষেত্রে বুলবুল ছিলেন পথিকৃৎ। ১৯৪০ সালের জানুয়ারি মাসে তিনি নাচের দল নিয়ে ঢাকায় এসে কয়েকটি নৃত্যনাট্য পরিবেশন করে দর্শকদের মুগ্ধ করেন। ১৯৪১ সালের ৩১ মার্চ তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘কলকাতা কৃষ্টি কেন্দ্র’। ১৯৪২ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনি চট্টগ্রামে আসেন এবং কয়েকটি জায়গায় চাকরি করেন। দেশ বিভাগের পর বুলবুল তাঁর শিল্পীজীবনে ফিরে যান। ১৯৫০ থেকে ১৯৫২ সাল পর্যন্ত তিনি পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের বিভিন্ন শহরে নৃত্যানুষ্ঠান করে প্রশংসা অর্জন করেন। ১৯৫৩ সালে তিনি নাচের দল নিয়ে ইউরোপ যান এবং ব্রিটেন, আয়ারল্যান্ড, হল্যান্ড, বেলজিয়াম ও ফ্রান্সের বিভিন্ন শহরে নৃত্যনাট্য পরিবেশন করেন। ১৯৩৪ থেকে ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত তিনি প্রায় ৭০টি নৃত্যনাট্য রচনা এবং সফলভাবে পরিবেশন করেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য কয়েকটি নৃত্যনাট্য হচ্ছে: অভিমন্যু, ইন্দ্রসভা, সাপুড়ে, সুধন্বা, কবি ও বসন্ত, মরুসঙ্গীত, ফসল উৎসব, তিন ভবঘুরে, জীবন ও মৃত্যু, শিব ও দেবদাসী, অজন্তা জাগরণ, অর্জুন, কালবৈশাখী, দি রেইনবো ফেয়ারিজ, হাফিজের স্বপ্ন, ইরানের পান্থশালায়, সোহরাব ও রুস্তম, ক্ষুধিত পাষাণ, মহাবুভুক্ষা, নিষ্প্রদীপ, যেন ভুলে না যাই, প্রেরণা, বিদায় অভিশাপ, ক্রাইসিস, শৃঙ্খলের নিপীড়নে, দেশপ্রেমিক, ভারত ছাড়, আনারকলি, ননীচোর, চাঁদ সুলতানা, বীতংস, রাসলীলা প্রভৃতি।

বিভিন্ন দেশের পত্রপত্রিকায় বুলবুল চৌধুরীর নৃত্য প্রদর্শনী সম্পর্কে প্রশংসাসূচক মন্তব্য প্রকাশিত হয়, যেমন ভারতের অমৃতবাজার, স্টেটসম্যান, স্টার অফ ইন্ডিয়া, করাচির ডন, লন্ডনের ডেইলি টেলিগ্রাফ, ইংল্যান্ডের কেমব্রিজ ডেইলি নিউজ, ডাবলিনের আইরিশ ইন্ডিপেন্ডেন্ট, ফ্রান্সের ল্য ফিগারো প্রভৃতি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পটভূমিতে তিনি প্রাচী (১৯৪২) শিরোনামে একটি উপন্যাস রচনা করেন। এছাড়া তাঁর লেখা কয়েকটি ছোটগল্পও রয়েছে। ১৯৫৪ সালের ১৭ মে কলকাতায় তাঁর মৃত্যু হয়। নৃত্যশিল্পে অসাধারণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁর নামে ১৯৫৫ সালের ১৭ মে ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত হয় বুলবুল ললিতকলা একাডেমী।

You must be logged in to post a comment Login

মন্তব্য করুন