সংস্কৃতি অভিমুখে আপদ-বিপদ

প্রকাশ: May 11, 2015
578104_440304255983624_259196288_n

আমাদের সৃজনশীল চলচ্চিত্র শিল্পের বিকাশও রুদ্ধ হয়ে পড়েছে। আমাদের দেশের সুস্থধারার চলচ্চিত্র বিনাশের অনুরূপ ঘটনা ঘটেছে পশ্চিমবঙ্গেও। অভিন্ন ভাগ্যবরণ করতে হয়েছে কলকাতার বাংলা চলচ্চিত্রকে। এক সময় কলকাতার বাংলা ছবি ভারতবর্ষের আইডল ছিল। কলকাতার প্রচুর বাংলা ছবি ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে নানা ভাষায় রিমেক হতো। এখন উল্টো বাংলা ছবি- হয় বম্বের- না হয় দক্ষিণ ভারতের মারদাঙ্গা ছবির রিমেক। আমাদের বাংলা চলচ্চিত্র নিয়ে লিখছেন মযহারুল ইসলাম বাবলা।

সংস্কৃতি অভিমুখে আপদ-বিপদ

বায়ান্নর ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষার সফল আন্দোলন-পরবর্তী বাংলা সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সংযোজন বাংলা চলচ্চিত্রের নির্মাণ পর্ব। মুখ ও মুখোশ সবাক চলচ্চিত্র নির্মাণের হাত ধরে বাংলা চলচ্চিত্র শিল্পের যাত্রা শুরু হয়েছিল। ১৯৪৭ সালের মর্মান্তিক দেশ ভাগের পরও বোম্বের হিন্দি এবং কলকাতার বাংলা ছবি আমাদের এখানে অবাধে প্রদর্শিত হতো। সেই ধারাবাহিকতায় এখানে চলচ্চিত্র দর্শক গড়ে উঠেছিল। কিন্তু ১৯৬৫ সালের সেপ্টেম্বরে পাক-ভারত যুদ্ধের কারণে ভারতীয় চলচ্চিত্রের প্রদর্শনী সম্পূর্ণরূপে বন্ধ হয়ে যায়। লাহোর ও ঢাকায় নির্মিত উর্দু ছবি ভারতীয় চলচ্চিত্রের বিকল্পরূপে জায়গা করে নিতে চাইলেও সম্ভব হয়নি দর্শকনন্দিত বাংলা ছবির অগ্রযাত্রায়। বাংলা ছবির সঙ্গে প্রতিযোগিতায় লাহোর ও ঢাকার উর্দু ছবি দাঁড়াতে পারেনি একমাত্র ভাষার কারণে। সুস্থ বিনোদনের উপাদানে নির্মিত বাংলা ছবি সংখ্যাগরিষ্ঠ দর্শকদের সহজেই আকৃষ্ট করতে পেরেছিল। তুলনামূলক বিচারে বাংলা চলচ্চিত্রের দৃঢ় অবস্থানে উর্দু ছবি মোটেও প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি। সে সময়ের বাংলা চলচ্চিত্র নিয়ে আমরা গর্ব করতে পারি। আর তখন ছিল বাংলা ছবির সোনালি যুগ। বিরুদ্ধ স্রোত এবং তীব্র প্রতিযোগিতায় বাংলা চলচ্চিত্র শিল্প আপন কৃতিত্বে সুদৃঢ় অবস্থান নিশ্চিত করেছিল। যা আমাদের জাতীয়তাবাদী লড়াই সংগ্রামেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার দাবি করতে পারে। বাংলা সাংস্কৃতিক চর্চায় বাংলা চলচ্চিত্রের অবদানকে অস্বীকারের উপায় নেই।

পাকিস্তান আমলে আমাদের এখানের সাংস্কৃতিক বিনোদনের অপরিহার্য অংশ ছিল প্রেক্ষাগৃহে গিয়ে ছবি দেখা। এ ছাড়া রেডিও শোনার ঐতিহ্য ছিল ব্যাপক আকারে। রেডিওর চারপাশে বসে নাটক-গান শোনার প্রচলন ছিল সর্বাধিক। সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের বিনোদনের মাধ্যম ছিল রেডিও। ঢাকা বেতার এবং আকাশবাণী, বিবিধ ভারতি সম্প্রচারিত বাংলা নাটক ও বাংলা গান শোনার প্রচলিত ঐতিহ্যপূর্ণ সংস্কৃতি ছিল। যার প্রধান শক্তিরূপে আমরা ভাষাকেই দেখে থাকি। একমাত্র ভাষার কারণেই ভারতীয় বাংলা চলচ্চিত্র, নাটক, গান সহজেই আমাদের আকৃষ্ট করতে পেরেছিল। বাংলা গানের কিংবদন্তি শিল্পীদের গাওয়া গান লোকমুখে হরহামেশা পথে-ঘাটে শোনা যেত।

আমাদের চলচ্চিত্র শিল্পের অগ্রযাত্রায় সূর্যস্নান, মাটির পাহাড়, কখনো আসিনি, কাচের দেয়াল। সুতরাং আনোয়ারা, জুলেখা, কাগজের নৌকা, হারানো দিন, রাজধানীর বুকে, বিন্দু থেকে বৃত্ত, জোয়ার এলো, ময়নামতি, নীল আকাশের নীচে, জোয়ার ভাটা, বেহুলা, দ্বীপ নিভে নাই, কখগঘঙ, নয়নমণি, পরশ পাথর, এতটুকু আশা, আদর্শ ছাপাখানা, তের নম্বর ফেকু ওস্তাগার লেন, জীবন থেকে নেওয়া ইত্যাদি ছবির পাশাপাশি রূপকথাভিত্তিক সাত ভাই চম্পা, রূপবান, সুয়োরানী-দুয়োরানী, কাঞ্চনমালা, আবার বনবাসে রূপবান, ভানুমতি, অরুণ বরুণ কিরণ মালা প্রভৃতি রূপক ছবিও সুস্থ বিনোদনে দর্শক আকৃষ্ট করতে পেরেছিল। দেশের চলচ্চিত্র শিল্পে তখন সুস্থ সাংস্কৃতিক ধারা অব্যাহত ছিল। দর্শকদের প্রেক্ষাগৃহমুখো করতে কাহিনীনির্ভর ও সুস্থ রুচিসম্পন্ন ছবিবেহুলা_(চলচ্চিত্র)_কভারগুলোর অবদান অস্বীকার করা যাবে না। চলচ্চিত্র শিল্পে পুঁজির লগ্নিকারকরা তখন হঠাৎ ফুলে-ফেঁপে কলাগাছ হয়নি সত্য, তবে দেউলিয়াও কাউকে হতে হয়নি। নগণ্যসংখ্যক ছবিই ব্যবসায় সুবিধা বঞ্চিত হতো। চলচ্চিত্র ব্যবসার একমাত্র লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ছিল না রাতারাতি বিত্তবৈভব অর্জনও। রুচির বিকৃতিতে অধিক মুনাফার লালসাও তখন তেমন দেখা যায়নি।

আমাদের সংস্কৃতির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ ছিল সেসব চলচ্চিত্র। তাই পরিবারসমেত সবাই একত্রে প্রেক্ষাগৃহে গিয়ে ছবি দেখত। সর্বত্র সুস্থ ও স্বাভাবিকতা বিরাজমান ছিল বিনোদনের এই মাধ্যমটিতে। অথচ আমাদের দুর্ভাগ্য, স্বাধীন দেশে সে ঐতিহ্য ও ধারা মোটেও বজায় থাকেনি। ক্রমেই চলচ্চিত্র শিল্পে ঢুকে পড়ে অশ্লীল স্থূলতা-দাঙ্গাবাজি। রংবাজ ছবির হাত ধরে আমাদের চলচ্চিত্র শিল্পে সর্বনাশের যে ধারাটি শুরু হয়েছিল- পর্যায়ক্রমে সেই ধারাটির বিকাশ সুদীর্ঘকাল। বিশালাকারে বিরাজে আমরা হারিয়েছি সুস্থধারার চলচ্চিত্র বিনোদন এবং প্রেক্ষাগৃহগুলো হারিয়েছে অগণিত দর্শক। দর্শকরা সেই যে প্রেক্ষাগৃহ থেকে বিমুখ হয়েছিল- তা আর পুনরুদ্ধার হয়নি। হালের দশা আরো করুণ। খোদ ঢাকা শহরে প্রেক্ষাগৃহ কমে গিয়ে এখন হাতে গোনার দশা। গুলিস্তান, নাজ, তাজমহল, শাবিস্তান, শ্যামলী, বিউটি, রূপমহল প্রভৃতি প্রেক্ষাগৃহ এখন মার্কেটে পরিণত।
গুলিস্তান-সিনেমা-হল-১৯৫৪
স্বাধীনতার পর মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক অরুণোদয়ের অগ্নিসাক্ষী ছবিটি ঈদে মুক্তি পেয়েছিল। দর্শক অভাবে তিন দিনের মাথায় প্রদর্শক সে ছবির প্রদর্শনী স্থগিত করে অন্য ছবির প্রদর্শনীতে বাধ্য হয়েছিল আমাদের রুচিবোধের অবক্ষয় ও বিকৃতির অপতৎপরতায়।

চলচ্চিত্রের মাধ্যমে দর্শক সৃষ্টির পথ পরিহার করে চলচ্চিত্র ব্যবসায়ীরা সংস্কৃতি-বিবর্জিত স্থূল ও বিকৃতির নেশা ধরিয়ে রাতারাতি অর্থবিত্তের মোহে চলচ্চিত্র শিল্প ধ্বংসে বিনা বাধায় অগ্রসর হয়েছিল। যার করুণ পরিণতি এখন আমরা প্রত্যক্ষ করছি। আমাদের চলচ্চিত্র সেই যে সংকটের পথ ধরেছিল- তা আর সুস্থধারায় ফিরে আসেনি। অনিবার্যরূপে আমাদের সম্ভাবনাময় চলচ্চিত্র শিল্প ক্রমেই কালেরগর্ভে বিলীন হওয়ার পথে।
বিশ্বের সব দেশের চলচ্চিত্র শিল্পের দুটি ধারা লক্ষ করা যায়। একটি বাণিজ্যিক অন্যটি সৃজনশীল। স্বাধীনতার পর সৃজনশীল চলচ্চিত্র নির্মিত হয়নি- এটা সত্য নয়। তবে বাণিজ্যিক ধারার দাপটে সৃজনশীল চলচ্চিত্র মাথা তুলতে পারেনি।

পুঁজির দৌরাত্ম্যে আমাদের সৃজনশীল চলচ্চিত্র শিল্পের বিকাশও রুদ্ধ হয়ে পড়েছে। আমাদের দেশের সুস্থধারার চলচ্চিত্র বিনাশের অনুরূপ ঘটনা ঘটেছে পশ্চিমবঙ্গেও। অভিন্ন ভাগ্যবরণ করতে হয়েছে কলকাতার বাংলা চলচ্চিত্রকে। এক সময় কলকাতার বাংলা ছবি ভারতবর্ষের আইডল ছিল। কলকাতার প্রচুর বাংলা ছবি ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে নানা ভাষায় রিমেক হতো। এখন উল্টো বাংলা ছবি- হয় বম্বের- না হয় দক্ষিণ ভারতের মারদাঙ্গা ছবির রিমেক।

স্যাটেলাইট টিভির বদৌলতে আমাদের ঘরে ঘরে ঢুকে পড়েছে হিন্দি সংস্কৃতির আগ্রাসন। হিন্দি ছবির সিরিয়ালে আকৃষ্ট আশি শতাংশ টিভিদর্শক। দেশীয় বেসরকারি টিভির একমাত্র সংবাদই আমাদের দেশে সর্বাধিক জনপ্রিয়। এ ছাড়া বিজ্ঞাপনের আধিক্যে বেসরকারি টিভির অনুষ্ঠান দেখা ধৈর্যের অগ্নিপরীক্ষার শামিল। নিয়মিত বিজ্ঞাপন বিরতিতে অনুষ্ঠান দেখার ধৈর্য ধারণের উপায় থাকে না।

ভারতীয় বাংলা চ্যানেলগুলো পর্যন্ত হিন্দিমুক্ত নয়। নানা উছিলায় হিন্দির প্রয়োগ লক্ষ করা যায়। গানের প্রতিযোগিতা, গানের কুইজ, গান নিয়ে প্রশ্নোত্তরে বাংলা গানের পরিবর্তে হিন্দি গান গাওয়া হয়ে থাকে। তাদের মিউজিক নামের চ্যানেলে বাংলা গান শোনার সুযোগ রয়েছে। তবে সেখানেও হরহামেশা হিন্দি চলচ্চিত্রের গান গেয়ে থাকেন বাঙালি শিল্পীরা। তাদের আগ্রহের মূলে হিন্দি। কেননা হিন্দির বদৌলতে সহজে সর্বভারতীয় মর্যাদা প্রতিষ্ঠা পাওয়া সম্ভব। যা বাংলা ভাষায় সম্ভব নয়। সে অভিলাষে হিন্দির প্রতি তাদের অধিক আকর্ষণ লক্ষ করা যায়। শুরুতে মান্না দে বাংলা গান পরিত্যাগ করে হিন্দি গানের সর্বভারতীয় গায়ক হতে বোম্বে স্থায়ী হয়েছিলেন। শেষ বয়সে এসে তাঁকেও বলতে হয়েছে, একমাত্র বাঙালি হওয়ার কারণেই তাঁর হিন্দি উচ্চারণ মোহাম্মদ রফি-মুকেশদের ন্যায় হতে পারেনি। স্বীকার করেছেন এবং বলেছেনও, ‘হিন্দি গানের ভুবনে আই ওয়াজ অ্যান আউট সাইডার।’

আমাদের বেসরকারি চ্যানেলগুলোর সব অনুষ্ঠান মাতৃভাষায়। তবে হিন্দি অনুষ্ঠানগুলোর আঙ্গিক-উপকরণ এবং অনুসরণ অধিক মাত্রায় লক্ষ করা যায়। কিছু বাংলা নাটক ও সিরিয়ালে বিকৃত বাংলা ভাষার আধিক্যে আমরা শঙ্কিত। এফএম রেডিওসহ বিভিন্ন বেসরকারি রেডিওতে যে ভাষা সম্প্রচারিত হচ্ছে সেটা মোটেও প্রমিত ভাষা নয়। বিকৃত বাংলা ও ইংরেজির মিশ্রণে অদ্ভুত এক ভাষা। সে ভাষাকে বড়জোর বাংরাজি ভাষা বলা যায়। বাংলা ভাষা বলার উপায় নেই। ভাষার সংকটে এসব বিকৃতি আমাদের মাতৃভাষাকে আরো সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। ভাষা-সংস্কৃতির এই বহুমাত্রিক বিপদের মাঝেও আমাদের সচেতনতার লক্ষণ দেখছি না। বিষয়টি উদ্বেগের নিশ্চয়। কিন্তু এ নিয়ে এখনই সরব না হলে আগত বিপদের ভয়াবহতার শিকার হতে হবে আমাদের এবং বিশেষ করে আগামী প্রজন্মকে।

এটা মানতেই হবে, অধিক ত্যাগে অর্জিত আমাদের একটি অর্জনও সার্বজনীন হতে পারেনি। এমনকি আমাদের স্বাধীনতা পর্যন্ত। স্বাধীনতার স্বাদ সবাই পায়নি। পেয়েছে কিছু এবং তারাই স্বাধীনতার সুফলভোগী। সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ স্বাধীনতা বঞ্চিত বলেই তাদের ভাষা-সংস্কৃতি রাষ্ট্রীয় আনুকল্যবঞ্চিত। বাংলা ভাষা-সংস্কৃতি অতি সাধারণের ভাষা-সংস্কৃতিরূপে পরিণত। জনসমষ্টির সংখ্যালঘু অংশ বাংলা জানলেও, বাংলা বলে না, চর্চাও করে না। এমন কি বাংলা সংস্কৃতি পর্যন্ত নিজেদের বলে গণ্য করে না। হাওলাতি ভাষা-সংস্কৃতির দুর্বার আকর্ষণে তারা বৈষম্যের সীমারেখা নিশ্চিত করেছে। অথচ এই সংখ্যালঘু শ্রেণীর নিয়ন্ত্রণে বাহুবন্দিতে দেশ-রাষ্ট্রের সব ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত। ক্ষমতার নিয়ন্ত্রক এবং নির্ণায়করূপে তারা আমাদের সব অর্জন হাতিয়ে নিয়েছে। এই অসম ব্যবস্থার পরিবর্তন ব্যতীত সব মানুষের স্বাধীনতা, অধিকার ও সুযোগ নিশ্চিত হবে না। তাই সর্বাগ্রে প্রয়োজন ব্যবস্থাটির আমূল পরিবর্তন। সেটা সম্ভব হলেই কেবল আমাদের স্বাধীনতা, ভাষা, সংস্কৃতির সুরক্ষা এবং বিকাশ সম্ভব হবে। এ ছাড়া অন্য পথ আমাদের সামনে খোলা নেই।

You must be logged in to post a comment Login

মন্তব্য করুন