সদাজাগ্রত নিতুন কুন্ডু

প্রকাশ: June 10, 2015
nitun kundu

নিতুন কুন্ডু চিত্রশিল্পী, নকশাবিদ, ভাস্কর, শিল্পপতি। ১৯৩৫ সালের ৩ ডিসেম্বর দিনাজপুর শহরের প্রাণকেন্দ্র ‘বড়বন্দর’ এলাকায় ১৯৩৫ সালের ৩ ডিসেম্বর জন্ম নেন চিত্র শিল্পী নিতুন কুন্ডু। বাবা-মা প্রথম নাম রেখেছিলেন শ্রী নিত্য গোপাল কুন্ডু। তাঁর মা বীণাপানি কুন্ডু সবসময় ছেলেকে ‘নিতুন’ নামে ডাকতেন। তাই ডাক নামটি এক সময়ে সকলের কাছে প্রতিষ্ঠা পায়।

নিতুন কু্ন্ডুর প্রথম লেখাপড়ায় হাতে খড়ি হয় ১৯৪২ সালে স্থানীয় বড় বন্দর পাঠশালায়। যেটি এখন বড়বন্দর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নামে পরিচিত। পাঠশালার পাঠ শেষে ১৯৪৭ সালে তিনি ভর্তি হন দিনাজপুর শহরের মহারাজা গিরিজা নাথ হাইস্কুলে। লেখাপড়া এবং ক্রীড়া ক্ষেত্রে তখন স্কুলটির যথেষ্ট সুনাম ও খ্যাতি ছিল। শিল্পী নিতুন কুন্ডু এই স্কুল থেকেই ১৯৫২ সালে মাধ্যমিক পাশ করেন।

ছোটবেলা থেকে আঁকা-আঁকির নেশার কারণে মাধ্যমিক পরীক্ষার পর নিতুন কুন্ডু ঢাকায় এসে আর্ট কলেজে ভর্তি হতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তাকে ঢাকায় রেখে পড়াশুনা করানোর সামর্থ ছিল না মা-বাবার। তাই তারা তাকে স্থানীয় কলেজেই পড়তে বললেন।

বিখ্যাত অভিনেতা-পরিচালক সুভাষ দত্ত ১৯৫৩ সালের গোড়ার দিকে চলচ্চিত্রে কাজ করার জন্য বম্বে থেকে ফিরে দিনাজপুরে আসেন এবং সেখানে তিনি ব্যানার, সাইনবোর্ড ইত্যাদি সাজ সজ্জার কাজ শুরু করেন। তখন নিতুন কুন্ডু তার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। এক পর্যায়ে সুভাষ দত্ত নিতুন কুন্ডুর সুন্দর হাতের লেখার জন্য সিনেমা হলের ডেকোরেশন, ব্যানার ও সাইন বোর্ড লেখার সহকারী হিসেবে সঙ্গে নেন। নিতুন কুন্ডু অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গেই সে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। সুভাষ দত্তের কাজ দেখে ঢাকার এক ফিল্ম রিপ্রেজেনটেটিভ তাঁকে মাসে ১০০ টাকা বেতনে ঢাকায় আসার সুযোগ করে দেন। এরপর তিনি ঢাকায় চলে আসেন। ছবি আঁকা শেখার জন্য নিতুন কুন্ডুও মাত্র দশ টাকা সম্বল করে অজানা অচেনা শহর ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দেন। ১৯৫৪ সালে তিনি ঢাকার চারুকলা ইনস্টিটিউটে ভর্তি হন এবং ১৯৫৯ সালে এ প্রতিষ্ঠান থেকে চিত্রশিল্পে স্নাতক সমমানের পাঁচ বছরের কোর্স সমাপ্ত করেন।

১৯৫৪ সালে নিতুন কুন্ডু আর্ট কলেজে ভর্তি হন। তখন উচ্চ মাধ্যমিক ও স্নাতক একই সাথে আর্ট কলেজে পড়ানো হতো। আর্ট কলেজে ভর্তি হওয়ার পর তিনি নিজের যোগ্যতার প্রমাণ দিতে আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যান। খরচ চালানোর জন্য তিনি তখন সিনেমার পোষ্টার আঁকতেন। সারারাত ধরে ব্যানার এঁকে সকালে আর্ট কলেজে ক্লাস করতে যেতেন। এভাবে কঠোর সাধনার মধ্যে দিয়ে এগুতে থাকেন তিনি।

শিল্পী নিতুন কুন্ডু ছিলেন আর্ট কলেজের শ্রেষ্ঠ ছাত্র। শিক্ষক এবং ছাত্র-ছাত্রী সকলের কাছে অসম্ভব প্রিয় ছিলেন তিনি। ড্রইংয়ে তুখোড়, জলরঙে সাবলীল, আর তেলরঙে ছিল মুন্সিআনা। কম্পোজিশন নামাতে পারতেন- যে কোনো মাধ্যমে। জীবন ঘনিষ্ঠ যেকোন চিন্তাভাবনাকে তিনি তুলির আঁচড়ে ফুটিয়ে তুলতে পারতেন অনায়াসে। এছাড়া গ্রাম-বাংলার মাঠ-ঘাট, নদী-নালা প্রকৃতি ও নিঃসর্গ প্রতিটি ক্ষেত্রে ছিল তাঁর অসামান্য দক্ষতার ছাপ। ১৯৫৯ সালে ঢাকার চারুকলা ইনস্টিটিউট থেকে পেইন্টিংয়ে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হয়ে স্নাতক ডিগ্রী লাভ করেন শিল্পী নিতুন কুন্ডু। তাঁর প্রচণ্ড ইচ্ছে ছিল আর্ট কলেজে শিক্ষকতায় যোগ দেবেন, কিন্তু সেই ইচ্ছে তাঁর পূরণ হয়নি। কেননা তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তান সরকার এবং কলেজ কর্তৃপক্ষ তা চাননি, একজন সংখ্যালঘুর উচ্চাশা বাস্তবে রূপ নিক।

ষাট, সত্তরের দশকে ঢাকার মার্কিন তথ্যকেন্দ্র ‘ইউসিস’ নামে পরিচিত ছিল। যা এখন আমেরিকান কালচারাল সেন্টার নামে পরিচিত। এই ইউসিসে তিনি ১১ বছর অর্থাৎ ১৯৫৯-১৯৭১ সাল পর্যন্ত কাজ করেন। তিনি যখন ১৯৭১ সালে ইউসিসের চাকরি ইস্তফা দিয়ে স্বাধীনতা যুদ্ধের কর্মকাণ্ডে অংশ নেয়ার লক্ষ্যে প্রবাসী সরকারের তথ্য ও প্রচার বিভাগে যোগদান করেন, তখন ইউসিসে তাঁর সর্বশেষ পদমর্যাদা ছিল চীফ ডিজাইনার।

নিতুন কুন্ডু ঢাকাস্থ মার্কিন তথ্যকেন্দ্রে যোগ দিয়ে ১৯৭১ সালের মার্চ পর্যন্ত কর্মরত ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধকালে তিনি বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকারের অধীনে তথ্য ও প্রচার বিভাগে ডিজাইনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ওই সময়ে তার আঁকা একটি পোস্টারের স্লোগান ছিল: ‘সদাজাগ্রত বাংলার মুক্তিবাহিনী’।

sodajagroto banglar muktibahini

তার আঁকা আরেকটি পোষ্টারের বক্তব্য ছিল- ‘বাংলার হিন্দু, বাংলার মুসলমান, বাংলার বৌদ্ধ, বাংলার খ্রিস্টান- আমরা সবাই বাঙালি’। এছাড়া ষাটের দশকের স্বাধিকার আন্দোলনে বামপন্থি রাজনীতিতে তার ভূমিকাও উল্লেখযোগ্য।

amra sobai bangali

স্বাধীনতার পরে চাকরি না করে নিতুন কুন্ডু স্বাধীনভাবে সৃজনশীল কর্মে নিজেকে নিয়োজিত করেন। সে লক্ষ্যে ১৯৭৫ সালে গড়ে তোলেন ‘অটবি’ নামে এমন একটি প্রতিষ্ঠান যা বর্তমানে বাংলাদেশের একটি বৃহৎ শিল্পপ্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃত।

একজন সৃজনশীল চিত্রশিল্পী হিসেবে ঢাকা (১৯৬৫, ১৯৬৬), চট্টগ্রাম (১৯৬৬) ও রাজশাহীতে (১৯৬৮) তাঁর মোট চারটি একক চিত্র প্রদর্শনী হয়। এছাড়া ১৯৫৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত দেশে-বিদেশে বহু উল্লেখযোগ্য যৌথ প্রদর্শনীতে তিনি অংশ নিয়েছেন। বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী এ শিল্পী তেলরঙ, জলরঙ, অ্যাক্রিলিক, এচিং, সেরিগ্রাফ, পেনসিল বা কালিকলম মাধ্যমে চিত্র রচনা করেন। প্রথম দিকে অবয়বধর্মী কাজ করলেও পরবর্তীকালে তিনি ঝুঁকেছেন বিমূর্ত ছবির দিকে। এছাড়া তিনি নির্মাণ করেছেন ভাস্কর্য (‘মা ও শিশু’, ১৯৭৫; স্বাধীনতা যুদ্ধের স্মারক ‘সাবাস বাংলাদেশ’, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, ১৯৯২ এবং ঐতিহ্যবাহী নৌকার প্রতীক ‘সাম্পান’, চট্টগ্রাম বিমান বন্দর, ২০০১), ফোয়ারা (‘কদমফুল’, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সামনের সড়কদ্বীপ, ঢাকা, আশির দশক; ‘সার্ক ফোয়ারা’, সোনারগাঁ সড়কদ্বীপ, ঢাকা, ১৯৯৩) ও ম্যুরাল (ঢাকার মধুমিতা সিনেমা হল, ১৯৬৬-৬৭; হোটেল শেরাটন ও গুলশান জনতা ব্যাংক)। জাতীয় পর্যায়ের বিভিন্ন পুরস্কার ও পদকের ট্রফি, ক্রেস্ট, মেডেল প্রভৃতির নকশাকার তিনি। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য: একুশে পদক, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, প্রেসিডেন্ট গোল্ডকাপ, এশিয়া কাপ ক্রিকেট পুরস্কার, বাংলাদেশ টেলিভিশনের নতুন কুঁড়ি পুরস্কার, আন্তর্জাতিক শিল্পমেলা ট্রফি, প্রেসিডেন্ট শিশুকিশোর ফুটবল কাপ প্রভৃতি। প্যাভিলিয়ন ও তোরণ নির্মাণ, মঞ্চসজ্জা, আলোকসজ্জা, নানা স্মরণিকার প্রচ্ছদ ও পোস্টার অঙ্কন, লোগো তৈরি প্রভৃতিতেও তাঁর পারদর্শিতা উল্লেখযোগ্য। তাঁর বহুমাত্রিক প্রতিভার স্বাক্ষর পাওয়া যায় প্রকৌশলভাবনায়, মেশিনের যন্ত্রাংশ কিংবা নাট-বল্টু তৈরিতে, নতুন মেশিনের পরিকল্পনায় কিংবা লিফট নির্মাণে।

saarc fountain

চিত্রশিল্পী ও শিল্পপতি হিসেবে বিশেষ অবদানের জন্য তিনি লাভ করেন জাতীয় চিত্রকলা পুরস্কার (১৯৬৫), চিত্রকলায় স্বর্ণপদক (মোবাইল প্রদর্শনী: ১৯৬৮), ঢাকা বাণিজ্য মেলায় প্যাভিলিয়ন নকশার জন্য প্রথম পুরস্কার (নয় বার: ১৯৭৪, ১৯৭৯, ১৯৮১, ১৯৮২, ১৯৮৩, ১৯৮৫, ১৯৯০, ১৯৯৬, ১৯৯৮) ও রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার ‘একুশে পদক’ (১৯৯৭)।

sabas bangladesh

নিতুন কুন্ডু নারীর ক্ষমতায়নের জন্যে নারীর শিক্ষা, সচেতনতা এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধির ওপর সর্বদা জোর দিতেন। এজন্যে তিনি বেশ কিছু নারী সংগঠনকে বড় বড় অংকের অনুদানও দিয়েছেন। নানাভাবে পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন। তার মধ্যে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ একটি। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের উন্নয়নে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি আর্থিক, মানবিক ও পরামর্শগত সহযোগিতা করেছেন। বিভিন্ন নারী সংগঠনকে তিনি অটবি প্রতিষ্ঠার পর নিয়মিতভাবে আর্থিক সাহায্য করেছেন। ঢাকার বারডেম হাসপাতাল, কিডনি ফাউন্ডেশন, শিশু হাসপাতাল-এর মতো অনেক বড় বড় প্রতিষ্ঠানেও শিল্পী নিতুন কুন্ডু অনেক বড় ধরনের সহযোগিতা করেছেন। ঢাকা, দিনাজপুরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে অনেক ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, ক্লাব, সংগঠন সংস্কার ও নির্মাণে, উৎসব পার্বণে আর্থিক সহায়তা প্রদান করেছেন। অনেক এতিম ও দুস্থ ছেলেমেয়েকে তিনি সহযোগিতা করেছেন।

২০০৬ সালের সেপ্টেম্বরের ১২ তারিখে নিতুন কুন্ডু গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। এরপর তাঁকে দ্রুত শ্যামপুর ফ্যাক্টরী থেকে ঢাকার বারডেম হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। চিকিত্সুকদের অবিরাম চেষ্টার ফলে অবস্থার কিছুটা উন্নতি ঘটে। ১৩ তারিখে আবারও স্বাস্থ্যের অবনতি হয় এবং ১৫ তারিখে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

You must be logged in to post a comment Login

মন্তব্য করুন