সূচনালগ্নের শিল্পী ফেরদৌসী রহমান

প্রকাশ: May 24, 2015
ferdousi rahman

ফেরদৌসী রহমান একজন বাংলাদেশী গায়িকা। তিনি পল্লী গীতি সম্রাট আব্বাস উদ্দিনের মেয়ে। প্রায় পাঁচ দশক ধরে তাঁর সংগীত জগতে সদর্প পদচারণা চলছে। পল্লীগীতি, রবীন্দ্রসঙ্গীত, নজরুল সঙ্গীত, আধুনিক এবং প্লে ব্যাক সব ধরনের গানই তিনি করেছেন।

শিল্পী ফেরদৌসী রহমানের জন্ম পশ্চিমবঙ্গের কুচবিহারে। জন্ম থেকেই গানের সাথে সখ্য তাঁর। গানে হাতে খড়ি হয় তাঁর পিতার কাছে। পরবর্তীতে ওস্তাদ মোহাম্মদ হোসেন খসরু, ইউসুফ খান কোরেইশী,কাদের জামেরী, গুল মোহাম্মদ খান ইত্যাদি সঙ্গীতজ্ঞের কাছে তালিম নিয়েছেন। খুব অল্প বয়স থেকে তাঁর স্টেজ পারফরম্যান্স শুরু হয়। মাত্র ৮ বছর বয়সে রেডিওতে খেলাঘর নামের অনুষ্ঠানে অংশ নেন।১৯৬০ সালে ‘আসিয়া’ নামের চলচ্চিত্রে তিনি প্রথম প্লে ব্যাক করেন।৬০ ও ৭০-এর দশকের বহু চলচ্চিত্রে তিনি নেপথ্য কন্ঠশিল্পী হিসেবে যুক্ত ছিলেন।তার প্লে ব্যাক করা চলচ্চিত্রের সংখ্যা ২৫০-এর কাছাকাছি। ১৯৪৮ সালে তিনি প্রথম রেডিওতে গান করেন।তখন তিনি রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইতেন।১৯৫৬ সালে তিনি প্রথম বড়দের অনুষ্ঠানে গান করেন। ১৯৬৪ সালের ২৫শে ডিসেম্বর তিনি বাংলাদেশ টেলিভিশনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে গান করেন। ১৯৫৭ সালে তিনি প্রথম গান রেকর্ড করেন হিজ মাস্টারস ভয়েস থেকে।

প্রায় ছয় দশকের গানের ক্যারিয়ারে ফোক, আধুনিক, উচ্চাঙ্গসংগীত, নজরুলগীতি, রবীন্দ্রসংগীত, প্লেব্যাক সব ধরনের গানই তিনি গেয়েছেন। বাংলাদেশ টেলিভিশনের সূচনালগ্ন থেকে সেখানে গাইছেন তিনি। ১৯৬০ সালে ফেরদৌসী রহমান ইউনেস্কো ফেলোশীপ পেয়ে লন্ডনের ট্রিনিটি কলেজ অব মিউজিক থেকে ৬ মাসের সঙ্গীতের ওপর স্টাফ নোটেশন কোর্স সম্পন্ন করেন।৩টি লং প্লে সহ প্রায় ৫০০টি ডিস্ক রেকর্ড এবং দেড় ডজনের বেশী গানের ক্যাসেট বের হয়েছে তাঁর।তাঁর মাত্র ১টি সিডি বের হয়েছে ‘এসো আমার দরদী’। এ পর্যন্ত প্রায় ৫ হাজার গানের রেকর্ড হয়েছে তাঁর। এছাড়াও তিনি বাংলাদেশ টেলিভিশনে এসো গান শিখি অনুষ্ঠান পরিচালনা করতেন। এই অনুষ্ঠান দিয়ে সবার কাছে ‘খালামনি’ হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেন ফেরদৌসী রহমান।

ফেরদৌসী রহমানের গান বাংলা ছবিতে জনপ্রিয়তা ও সাফল্য এনে দিয়েছিল। ‘মনে যে লাগে এতো রঙ ও রঙিলা’, ‘নিশি জাগা চাঁদ হাসে কাঁদে আমার মন’, ‘আমি রূপনগরের রাজকন্যা রূপের যাদু এনেছি’, ‘এই সুন্দর পৃথিবীতে আমি এসেছিনু নিতে’, ‘এই রাত বলে ওগো তুমি আমার’, ‘বিধি বইসা বুঝি নিরালে’, ‘এই যে নিঝুম রাত ঐ যে মায়াবী চাঁদ’, ‘মনে হলো যেন এই নিশি লগনে’, ‘ঝরা বকুলের সাথী আমি সাথী হারা’, ‘আমার প্রাণের ব্যথা কে বুঝবে সই’, ‘যে জন প্রেমের ভাব জানে না’, ওকি গাড়িয়াল ভাই’, ‘পদ্মার ঢেউরে’, এমনি শত শত গান সিনেমায় আর রেকর্ডে গাওয়ার কারণে এক সময়ে তার জনপ্রিয়তা হয়ে উঠেছিল গগনচুম্বী। ঢাকার সিনেমা হিট হওয়ার অনিবার্য হাতিয়ার হয়ে উঠেছিল ফেরদৌসীর গান। ১৯৫৯ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত ফেরদৌসী ছাড়া সিনেমার গান ছিল প্রায় অচল। ফিল্মে গান করা ছেড়ে দিয়েছেন বহু বছর হয়। অথচ তার গাওয়া অতীতের সেই সব গান আজ অবধি জনপ্রিয় হয়ে থাকল। আর এ জন্য সঙ্গীত ভুবনে ফেরদৌসী রহমান কিংবদন্তি। জন্ম তার ১৯৪১ সালের ২৮ জুন। সে হিসেবে ফেরদৌসী রহমানের বয়স প্রায় সত্তর। এ বয়সে তিনি মাঝে মধ্যে সঙ্গীতবিষয়ক আলোচনা সভা, অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি কিংবা বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন। দেশে ও দেশের বাইরে বিভিন্ন স্থানে অনুষ্ঠিত সঙ্গীত সম্মেলনের উদ্বোধক হিসেবেও তিনি উপস্থিত হচ্ছেন হঠাত্ হঠাত্। ফেরদৌসী বেগম ১৯৪৬ সাল থেকে বেতারে গান করা শুরু করেন। তখন তার বয়স ছিল মাত্র সাড়ে পাঁচ বছর। একটু বড় হয়েই রেকর্ডে—‘আমার প্রাণের ব্যথা কে বুঝবে সই’ গান খানি গাইলেন। এই গান দিয়েই তিনি বাঙালি শ্রোতাদের মনে গেঁথে গেলেন। সিনেমার গানে প্রথম কণ্ঠ দেন ১৯৫৮ সালে ‘আসিয়া’ ছবিতে। তবে ‘আসিয়া’ ছবিটি একটু বিলম্বে মুক্তি পাওয়ার কারণে প্লে-ব্যাক শিল্পী হিসেবে তার প্রথম মুক্তিপ্রাপ্ত ছবি ছিল ‘এ দেশ তোমার আমার’। এটি ১৯৫৯ সালে মুক্তি পায়। এ ছবিতে ফেরদৌসী বেগম গেয়েছিলেন, ‘চুপিসারে এত করে কামিনী ডাকে’ গানটি। ফেরদৌসী রহমান ১৯৫৯ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত ফিল্মে যেসব গান করেছেন তার সবগুলো আজও জনপ্রিয় হয়ে আছে। তার সময়ের গানগুলোর আবেদন কোনোদিন ফুরিয়ে যাওয়ার নয়। এ প্রজন্মের শিল্পীরাও তার গাওয়া সেদিনের গান আজও নতুন করে গাইছেন। ফেরদৌসী বেগমের শিল্পী জীবনের একটি বিরাট সৌভাগ্য, তিনি এ দেশের গুণী অনেক সুরকারের সুরে গান গাওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন। আবদুল আহাদের সুর করা আধুনিক গান সবচেয়ে বেশি তিনিই গেয়েছেন। এছাড়া খন্দকার নুরুল আলম, আজাদ রহমান, জালাল আহমদ, আবদুল লতিফ, ওসমান খান, কানাইলাল শীল, আনোয়ার উদ্দিন আহমেদ, সমর দাস, সুবল দাস, অজিত রায় প্রমুখ খ্যাতনামা সুরকারের সুরেও গান গেয়েছেন। প্রথম সুরকার হিসেবে তার আত্মপ্রকাশ ১৯৬১ সালে ‘রাজধানীর বুকে’ ছবির মাধ্যমে। ওই ছবিতে ফেরদৌসী বেগমের সঙ্গে রবীন ঘোষও সুরকার হিসেবে ছিলেন। স্বাধীনতার পর ফেরদৌসী বেগম ‘মেঘের অনেক রং’, ‘গাড়িয়াল ভাই’ ও ‘নোলক’ ছবির সঙ্গীত পরিচালক হিসেবেও কাজ করেছেন। আজকাল ফেরদৌসী রহমান তার বাবার নামে প্রতিষ্ঠিত আব্বাস উদ্দিন সঙ্গীত একাডেমির পেছনেও বেশ সময় দিচ্ছেন। এই একাডেমিকে আরও সম্প্রসারণ করার জন্য তিনি প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

বাংলাদেশের প্রথম মহিলা সংগীত পরিচালক ফেরদৌসী রহমান গান গাওয়ার পাশাপাশি অনেক গান পরিচালনাও করেছেন। ১৯৬০ সালে রবীন ঘোষের সাথে ‘রাজধানীর বুকে’ নামক চলচ্চিত্রে সংগীত পরিচালনা করেন। ফেরদৌসী রহমান নজরুল ইন্সটিটিউটের ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য ছিলেন। আমাদের সঙ্গীত ভুবনে অবদান রাখার জন্য তিনি জাতীয় পর্যায়ে নানাভাবে সন্মানিত হয়েছেন। তাঁর অর্জিত উল্লেখযোগ্য পুরস্কারের মধ্যে আছে লাহোর চলচ্চিত্র সাংবাদিক পুরস্কার (১৯৬৩ সাল), প্রেসিডেন্ট প্রাইড অব পারফরম্যান্স পুরস্কার (১৯৬৫ সাল),টেলিভিশন পুরস্কার (১৯৭৫), জাতীয় পুরস্কার শ্রেষ্ঠ সংগীত পরিচালক (১৯৭৭),বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সাংবাদিক সমিতি পুরস্কার (১৯৭৬), একুশে পদক (১৯৭৭ সাল)। এছাড়াও তিনি নাসিরউদ্দিন গোল্ড মেডেল পুরস্কার, মাহবুবুল্লাহ গোল্ড মেডেল, প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান পুরস্কার লাভ করেন।

You must be logged in to post a comment Login

মন্তব্য করুন