বাংলাদেশের গ্রুপ থিয়েটার চর্চা

প্রকাশ: May 18, 2015
1934431_103326016344724_4826422_n

– অভিজিৎ সেনগুপ –

শিল্প মাত্রই গড়ে উঠে জনগণের জন্য, তাই শিল্প এবং শিল্পী কোনোমতেই জনগণ বর্হিভূত নয়। শিল্পের উপজীব্য হল জনগণের সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা, আশা-আকাক্সক্ষা ও সংগ্রামের ইতিবৃত্ত। অর্থাৎ শিল্পের বিষয়বস্তু নির্বাচনের মূল উৎস জনগণ। জনগণকে বাদ দিয়ে কোনো শিল্পই সমাজের কল্যাণ বয়ে আনতে পারে না।

নাটকের ইতিহাসও অনেক সুপ্রাচীন। আনুমানিক আড়াই হাজার বছর। Aristole Gi Poetics এবং সংস্কৃত সাহিত্যে, ভরত মুনির নাট্যশাস্ত্রে এর উল্লেখ পাওয়া যায়। সুমহান গ্রীক সভ্যতার সাথে নাটকের এক অবিচ্ছেদ্য যোগ ছিল। কালের বা যুগের পরিবর্তনের সাথে সাথে নাটকের বিষয়বস্তুতে এসেছে পরিবর্তন। সভ্যতার গোড়ার দিকে মানুষের সাথে নিয়তির দ্বন্দ্ব হয়ে উঠে নাটকের প্রধান উপজীব্য। তারপর আস্তে আস্তে স্বরূপ গেল পাল্টে। শুরু হল এমনভাবে – মানুষের সাথে প্রকৃতির দ্বন্দ্ব, গোষ্ঠীর সাথে গোষ্ঠীর দ্বন্দ্ব, গোষ্ঠীর প্রধানের সাথে অন্যদের দ্বন্দ্ব, রাজার সাথে জনগণের দ্বন্দ্ব, যান্ত্রিক সভ্যতার সাথে মানুষের দ্বন্দ্ব, অসত্যের সাথে সত্যের দ্বন্দ্ব, সুন্দরের সাথে অসুন্দরের দ্বন্দ্ব, মানবিক মূল্যবোধের সাথে অবক্ষয়ের দ্বন্দ্ব, রাষ্ট্রের সাথে রাষ্ট্রের দ্বন্দ্ব, সর্বোপরি সর্বহারার সাথে শোষকের দ্বন্দ্ব। এমনি আরোও ক্রমবির্বতনের মধ্যদিয়ে নাটকের বিষয়বস্তুতে এসেছে পরির্বতন। বিষয়ের সাথে সাথে আঙ্গিকগত পরিবর্তনও এসেছে অনিবার্যভাবে।

আমাদের এই অঞ্চলেও নাটক প্রাচীন শিল্প মাধ্যম। সংস্কৃত সাহিত্যে বহু নাটক এবং ধারা-উপধারা নিয়ে পর্যালোচনা রয়েছে। সামাজিক বির্বতনের মধ্যদিয়ে যেমন সমাজের ক্রম বিকাশ হয়েছে, তেমনি যুগে যুগে নাটকের ক্ষেত্রেও এই পরিবর্তন লক্ষণীয়। এই বির্বতনের পথ ধরেই আজকের অবস্থা। বাংলা নাটকও ইতিহাসের বিভিন্ন চড়াই উৎরাই পেরিয়ে আজ এই অবস্থানে পৌঁছেছে। কালের বহমান ধারায় বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে আজ একটি জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে। যদিও প্রতিনিয়ত থিয়েটারের পরীক্ষা-নিরীক্ষার কাজটা চলছে এবং চলবে। যেহেতু থিয়েটার স্থবির কোনো বিষয় নয়।

1488
আজ থেকে দুইশত বছরেরও অধিক সময় আগে ভ্রমণ পিয়াসী রুশ সঙ্গীতজ্ঞ ও ভাষাবিদ গেরাসিম স্তেপানোভিচ লেবেদেফই প্রথম বেঙ্গল থিয়েটার প্রতিষ্ঠার মধ্যদিয়ে যে বীজ রোপন করেন তা আজ মহীরূহ রূপে আত্মপ্রকাশ করেছে। বঙ্গদেশে আধুনিক ইউরোপীয় ধাচের প্রসেনিয়াম থিয়েটারের প্রবর্তক হিসেবে তাঁকে স্মরণ করতেই হবে। ১৭৯৫ সালের ২৭ নভেস্বর, সংস্কৃত পণ্ডিত গোলকনাথ দাসের সক্রিয় উৎসাহে ও অনুবাদে উরংমঁরংব নামক প্রহসনটির মঞ্চায়নের মাধ্যমে আধুনিক বাংলা মঞ্চনাটকের সূচনা হয়। এরই ধারাবাহিকতা হিসেবে বিভিন্ন ধনাঢ্য ব্যক্তিবর্গরা রঙ্গশালা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বাংলা নাট্যচর্চার ধারাকে বিকশিত করে। যদিও সেই সময় মূলত ইংরেজী ও সংস্কৃত নাটকের অনুবাদগুলো মঞ্চায়িত হত। মৌলিক বাংলা নাটকের জন্য অপেক্ষা করতে হয় প্রায় অর্ধশত বৎসর। ১৮৫২ সালে কীর্তিবিলাস ও ভদ্রার্জুন নামে দু’টি নাটক রচিত হলেও ১৮৫৪ সালে রচিত রামনারায়ণ তর্করতেœর কুলীনকুল সর্বস্ব-কেই বাংলার সুধীজনরা প্রথম সার্থক মৌলিক নাটকের মর্যাদা দিয়েছেন। বাংলা নাটক সূচনা থেকেই তার সামাজিক দায়বদ্ধতাকে কোনোভাবেই অস্বীকার করতে পারে নি। আর পারে নি বলেই জীবন ও ইতিহাসের দ্বন্দ্ব এবং পরিণতিকে বুকে ধারণ করেছে। তারই পথ ধরে মাইকেল মধুসূদন দত্তের ইতিহাস আশ্রিত ট্র্যাজেডি ও প্রহসন এবং দীনবন্ধু মিত্রের প্রহসন সাড়া জাগিয়েছিল। তারপর মোনমোহন বসু, মীর মোশাররফ হোসেন, জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরসহ আরো অনেকের নাটক সমকালের মঞ্চকে সচল রেখেছিল।

527d19afcb6da-Untitled-7
সাধারণ দর্শকদের প্রত্যাশা পূরণের লক্ষ্যেই ১৮৭২ সালে স্থাপিত হল সাধারণ রঙ্গশালা । বাংলা থিয়েটারের ইতিহাসে সংযুক্ত হল আর এক নুতন অধ্যায়ের। এ সময়ের প্রধান পুরুষ, নট ও নাট্যকার গিরীশ ঘোষ ঐতিহাসিক, পৌরাণিক ও ধর্মাশ্রিত নাটকের পাশাপাশি সামাজিক সমস্যাকেও তুলে ধরেন তাঁর নাটকে। তবে সমকালীন রাজনৈতিক বিষয়, বিদ্রোহ ও জনগণের দাবি ও আন্দোলন নিয়ে নাটক করার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন উদাসীন।

বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী আন্দোলন তৎকালীন নাট্যজনদের চেতনায় নুতন করে অনুপ্রেরণা জাগায়, সেদিনের সে আন্দোলনের পথ ধরেই জন্ম নিল গণনাট্য সংঘের। গণনাট্য সংঘ গঠিত হবার আগে সর্বভারতীয় ভিত্তিতে কোনো সাংস্কৃতিক সংগঠন ছিল না। গণনাট্য গড়ে উঠেছিল ঐতিহাসিক প্রয়োজনে, মার্কসবাদী আর্দশে। গণনাট্য সংঘ সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সংগ্রাম ও সমাজতান্ত্রিক সমাজ গঠনের লক্ষ্যে ও আদর্শে গঠিত হয়। যদিও পরবর্তীকালে রাজনৈতিক সংকট ও আদর্শগত কারণে গণনাট্য ভেঙে যায়। এক সময় যাঁরা গণনাট্যের পতাকা তলে জড়ো হয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে অনেকেই বের হয়ে গেলেন গণনাট্য থেকে। এটা সত্য যে, ব্যক্তিস্বাতন্ত্রবাদ, পাতিবুর্জোয়া চিন্তাধারা ও বস্তুবাদী চিন্তার অভাবের কারণেই গণনাট্যের এই ভাঙন। পরবর্তী সময়ে তারই পথ ধরে শুরু হল নব নাট্যচর্চা বা আজকের গ্রুপ থিয়েটার।

১৮৭০ এর দশক থেকে বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদ অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করা লক্ষ্য নিয়ে সাম্প্রদায়িক রাজনীতিকে উস্কে দিতে থাকে। তারই প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদ ভারতীয় হিন্দু মুসলমানকে সরাসরি সাম্প্রদায়িক দল গঠনের জন্য উৎসাহিত করতে থাকে। শুধু উৎসাহ দিয়ে ক্ষান্ত হয় নি, তার ক্ষেত্র তৈরি করার জন্য একের পর এক পদক্ষেপও গ্রহণ করে। এই সব পদক্ষেপের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল, ১৯০৫ সালে বাংলাকে বিভক্ত করে পশ্চিম বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যা নিয়ে একদিকে এবং পূর্ববাংলা ও আসামকে নিয়ে অন্যদিকে সাম্প্রদায়িক ভিত্তিতে দু’টি স্বতন্ত্র প্রদেশ। বঙ্গ বিভাগকে কেন্দ্র করে বাংলা ও বাংলার বাইরেও সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিস্তার ঘটে এবং ১৯০৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় সারা ভারত মুসলীম লীগ ও সারা ভারত হিন্দু মহাসভা নামে দু’টি সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দল। বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদ তাদের উদ্দেশ্য গোপন করার কোনো চেষ্টাই করে নি। ১৯০৪ সালে ১৮ ফেব্রুয়ারি লর্ড কার্জন ঢাকায় তাঁর এক বক্তৃতায় বঙ্গভঙ্গ সম্পর্কে বলেন – পূর্ব বাংলার মুসলমানদেরকে এমন একধরনের ঐক্য প্রদান করবে যা পুরাতন মুসলমান ভাইসরয় ও রাজাদের সময় থেকে আজ পর্যন্ত তারা লাভ করে নি ( বঙ্গভঙ্গ ও সাম্প্রদায়িক রাজনীতি – বদরুদ্দীন উমর ) ১৯০৫ সালের ফেব্র“য়ারিতে বৃটিশ ভারতীয় সরকার, বাংলা সরকারকে লিখিত একটি পত্রে বলেন যে, তাদের বঙ্গভঙ্গের পরিকল্পনা ঢাকা শহরকে প্রদান করবে – একটি প্রাদেশিক রাজধানীর বিশেষ চরিত্র যেখানে মুসলমান স্বার্থ শক্তিশালীভাবে প্রতিনিধিত্ব পাবে, এমন কি প্রাধান্যে থাকবে (প্রাগুক্ত)।

বাংলার পূর্ব ও পশ্চিম উভয় অংশের হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে বঙ্গভঙ্গ প্রশ্নে ব্যাপক প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ গড়ে উঠে। শুধু তাই নয় উভয় অংশের মুসলমান সম্প্রদায়ের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বাংলাভাষী জনগণকে দ্বিধাবিভক্ত করার অন্যতম প্রচেষ্টা বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে আন্দোলনে হিন্দুদের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ হন। বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন তীব্র থেকে তীব্রতর হওয়ার কারণে ১৯১১ সালের ১২ ডিসেম্বর দিল্লীতে সম্রাট পঞ্চম জর্জের অভিষেক অনুষ্ঠিত হয় এবং সেই অনুষ্ঠানে তিনি বঙ্গভঙ্গ রদ করার ঘোষণা দেন।

১৯৪০ এর দশকে পাকিস্তানের দাবীতে বাংলাদেশের মুসলমানরা মুসলীম লীগের পতাকাতলে ঐক্যবদ্ধ হতে থাকে। ১৯৪৩ এর দুর্ভিক্ষ, ১৯৪৬ এর তেভাগা আন্দোলনসহ ১৯৪৬ সালের সাধারণ নির্বাচনে বিপুল বিজয়সহ বিভিন্ন ঘটনাবলী দ্রুত ঘটতে থাকে ভারতবর্ষে। বৃটিশ বিরোধী আন্দোলন প্রবল আকার ধারণ করে এই সময়ে। ১৯৪৭ এর ২৪ মার্চ ভারতের ভাইসরয় ও গর্ভনর জেনারেল হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন লর্ড মাউন্টব্যাটেন। বৃটিশ মন্ত্রিসভা তাকে ভারতের স্বাধীনতা ও সংবিধান বিষয়ে বিশাল ক্ষমতা প্রদান করে। সেই ক্ষমতার জোরে তিনি অসম্ভব দ্রুত গতিতে তার পরিকল্পনাসমূহ প্রস্তুত ও কার্যকর করতে উদ্যোগী হন। সেই সময়ে উত্তর ভারতব্যাপী সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বিস্তার লাভ করতে থাকে। এইসব দাঙ্গার পিছনে যে, বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদের প্রত্যক্ষ মদদ আছে সেই ব্যাপারে কারো সংশয় থাকলো না। তারই সুযোগে লর্ড মাউন্টব্যাটেন ভারতীয় নেতাদের কাছে একের পর এক পরিকল্পনা উপস্থাপন করতে লাগলেন। ১৯৪৭ সালের ১০ এপ্রিল ভারত বিভক্ত করার ব্যাপারে লর্ড মাউন্টব্যান্টেন বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী এট্লীকে এক পত্রে লেখেন – I can see little ground on which to build any agreed solution for the future of India. … the only conclusion I have been able to come is that unless I act quickly I will find the begining of a civil war on any hands (বঙ্গভঙ্গ ও সাম্প্রদায়িক রাজনীতি – বদরুদ্দীন উমর )। এইভাবে নানা কৌশলের ভিতর দিয়ে জাতিগত ঐক্যের স্তম্ভকে বিনষ্ট করে সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প বপন করে ভারতবর্ষ বিভাজনে বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদ মুখ্য ভূমিকা পালন করে। তারই ধারাবাহিকতা হিসেবে দ্বিজাতি তত্ত্বের উপর ভিত্তি করে পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয়।
1044670_638220152855305_1405375034_n

১৯৪৭ সালের দেশ বিভাগের পর নবগঠিত পাকিস্তান রাষ্ট্রের শিক্ষা-দীক্ষা, রাজনীতি, অর্থনীতি ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে অনগ্রসর মুসলমান সম্প্রদায়ের সামনে আত্ম প্রতিষ্ঠার সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়। দেশ বিভাগের আগে এই অঞ্চলের শিল্প-সাহিত্যে থেকে শুরু করে সর্বক্ষেত্রে একক আধিপত্য ছিল বিত্তবান হিন্দু সম্প্রদায়ের দখলে। এই প্রসঙ্গে সৈয়দ জামিল আহমেদ বলেন – দেশ বিভাগের পর তারা ক্রমবর্ধমান হারে পূর্ববঙ্গ ত্যাগ শুরু করলে স্থানীয় মুসলমান নাট্যকারদের আত্মপ্রতিষ্ঠার এক সুযোগ ও ক্ষেত্র সৃষ্টি হয়। নবোদ্ভুত পাকিস্তান রাষ্ট্রটির রাজনীতি ধীরে কিন্তু সুনিশ্চিতভাবে দুটি শিবিরে বিভক্তির দিকে এগোতে থাকে, যার একদিকে অবস্থান নেয় রক্ষণশীল ইসলামি মৌলবাদ এবং অন্যদিকে একত্রিত হতে থাকে প্রগতিশীল ও গণতান্ত্রিক মানবতাবাদী শক্তি (সৈয়দ জামিল আহমেদ- হাজার বছর : বাংলাদেশের নাটক ও নাট্যকলা )। ফলে এই সময়ে নাট্য রচনার ক্ষেত্রেও দুইটি ধারা বিকশিত হতে দেখা যায়। কয়েকজন নাট্যকার নুতন দেশের আদর্শ উদ্দেশ্য নিয়ে নাটক লিখতে শুরু করেন। মূলত রক্ষণশীল মৌলবাদীরা ইসলামি ঐতিহ্য প্রচারের লক্ষ্য নিয়ে ঐতিহাসিক নাট্য রচনায় আত্ম-মনোনিবেশ করেন। আর গণতান্ত্রিক মানবতাবাদীরা সমাজ জীবনের বিবিধ ঘটনা-সংঘাত, রাজনৈতিক অঙ্গিকার, শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদকে উপজীব্য করে নাট্য রচনায় ব্রতী হন। এই সময়ের উল্লেখ যোগ্য নাট্যকারদের মধ্যে সাহিত্যিক আবুল ফজল রচনা করেছিলেন – কায়েদা আজম, ইব্রাহিম খাঁ কামাল পাশা , আনোয়ার পাশা, ইব্রাহিম খলিল স্পেন বিজয়ী মুসা, আকবর উদ্দীন নাদির শাহ, মুজাহিদ ইত্যাদি। উপরোল্লিখিত নাটকগুলোতে সচেতনভাবে ইসলামের গৌরব গাথা প্রচারের আকাক্সক্ষা প্রকাশ পেয়েছে। আবার অন্যদিকে ইতিহাস ঐতিহ্য থেকে উপাদান নিয়ে নুতন দৃষ্টিভঙ্গির নাটকও লেখা হয়েছে এ সময়ে। যেমন , মুনীর চৌধুরী রক্তাক্ত প্রান্তর, শওকত ওসমান বাগদাদের কবি, আসকার ইবনে শাইখ তিতুমীর ও রক্তপদ্ম এই ধরনের প্রবণতাকে ধারণ করে।

সমাজ ও রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি সম্পন্ন নাটকও রচনা হতে থাকে এ সময়ে। যেমন- আবুল ফজল লেখেন প্রগতি, সয়ম্বরা, শওকত ওসমান তস্কর ও লস্কর, আমলার মামলা, সিকান্দর আবু জাফর মাকড়সা, আসকার ইবনে শাইখ বিদ্রোহী পদ্মা, দূরন্ত ঢেউ, আনিস চৌধুরী মানচিত্র এবং এ্যালবাম। এই সমস্ত নাটকগুলোতে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষের জীবন যন্ত্রণা উপস্থাপিত হয়েছে।

তাছাড়া একই সময়ে আধুনিক নাট্য ভাবনা নিয়ে সমাজ ও রাজনীতির বিষয়কে উপস্থাপন করার প্রবণতা দেখা যায় নাট্যকারদের মধ্যে। যেমন- নুরুল মোমেন নেমেসিস, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ তরঙ্গভঙ্গ ও বহিপীর, মুনীর চৌধুরী কবর, সাঈদ আহমদ কালবেলা, আলাউদ্দীন আল আজাদ ধন্যবাদ ইত্যাদি নাটক রচনা করেন ।

অপরদিকে লোক বাংলার প্রচলিত কাহিনীরও রূপায়ণ লক্ষ্য করা যায় এ সময়ে। যেমন- জসিম উদদীন বেদের মেয়ে ও মধুমালা, ফররুখ আহমেদ নৌফেল ও হাতেম, আ. ন. ম. বজলুর রশীদ ধনুয়া গাঙের তীরে, সাঈদ আহমদ তৃষ্ণায় ইত্যাদি নাটক এই ধারার উল্লেখ যোগ্য রচনা।

’৪৭ পরবর্তী পূর্ব পাকিস্তানের নাট্যচর্চার প্রধান অন্তরায় ছিল নাট্যমঞ্চের অভাব। ফলে নাট্য সাহিত্যের সমৃদ্ধির ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়েছে নিঃসন্দেহে। এই সময়ে যে সব নাটক রচিত হয়েছে তার অধিকাংশের মঞ্চায়িত হবার কোনো ইতিহাস পাওয়া যায় না। মূলত সাহিত্য হিসেবে বিবেচিত হয়েছে নাটকগুলো। সেই সময়ে পেশাদার বা সৌখিন কোনোধরনের নাট্যদল পূর্ব পাকিস্তানে ছিল না।

১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত সময়ের নাটকে উপস্থাপিত এ বিষয়গুলো মহান মুক্তিযুদ্ধের পর হয়েছে আরো পরিশীলিত ও শাণিত এবং আরো নুতন নুতন নাট্য ভাবনা যুক্ত হয় এর সাথে। বস্তুত পরাধীন অবস্থায় কোনো জাতির অর্ন্তগত চেতনায় স্বতঃস্ফূর্ততার অভাবে শিল্প সাহিত্য বাধাগ্রস্ত হয় বিকাশের ক্ষেত্রে। স্বাধীনতা লাভের পর এই অঞ্চলের নাটক দ্রুত বিকাশ লাভ করতে থাকে। এ সময়ে ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, বরিশালসহ সারাদেশে গড়ে উঠে বহু নাট্যদল।

বাংলাদেশের মঞ্চনাটক মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সুর্কীতি। মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী বাংলাদেশের শিল্প-সাহিত্যে এক বিরাট পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। আর এই পরিবর্তনে নতুন সম্ভাবনার দিগন্ত নিয়ে হাজির হয় মঞ্চনাটক। স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশের মঞ্চ নাটক নতুন এক ধারাবাহিকতার জন্ম দেয়। স্বাধীনতার পূর্বে এই অঞ্চলের নাটক শুধুমাত্র বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে স্বীকৃত ছিল। কিন্তু স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের নাটক হয়ে গেল রাজনীতি, সমাজ-চিন্তা প্রকাশের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে। নাটক হয়ে উঠল প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে। নাট্যকর্মীরা নাটককে গ্রহণ করলেন সমাজ-বদলের হাতিয়ার হিসেবে। সমাজ সম্পর্কিত বিষয়কে প্রতিপাদ্য করে রচিত হতে লাগল নাটক। আবির্ভূত হলেন নতুন নতুন নাট্যকার। আগেকার নাটকের সাথে এই নতুন ধরনের নাটকের প্রধান পার্থক্য হল বিষয়বস্তুতে। বিষয়বস্তুর কারণেই নাটকে উপস্থিত হতে লাগল সমাজ পরিবর্তনের কথা। স্বাধীনতা লাভের পর বেশিরভাগ নাটক রচিত হয় সমকালীন সমাজ নিয়ে। সমাজের মূল্যবোধ-অবক্ষয়, মানুষের হতাশা-বঞ্চনাকে উপজীব্য করে নাটক লিখতে লাগলেন নাট্যকাররা। অবশ্য কিছু সময় শ্রেণী সংগ্রাম ও সমাজতন্ত্রের রাজনীতি, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার রাজনীতি, ধর্মীয় মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িক শক্তির বিরুদ্ধে রাজনীতির স্লোগান তুলেছিল বাংলাদেশের নাট্যদলগুলো তাদের নাট্য প্রযোজনাগুলোতে। এই সময় নাট্যদলগুলো নাটক মঞ্চায়নের ক্ষেত্রে একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ব্যক্ত করেছিল। সেই উদ্দেশ্যগুলো বিভিন্ন নাট্যদল বিভিন্নভাবে ব্যক্ত করে। সকলের চিন্তা কোনো একটি বিশেষ লক্ষ্যে ধাবিত হয় নি। বরং অনেক ক্ষেত্রে চিন্তাগুলো বিভ্রান্তকরও ছিল। তা সত্বেও মঞ্চায়িত নাটকগুলোর মধ্যদিয়ে নানারকম প্রতিবাদ ধ্বনিত হয়েছে। এই বিষয়ে সকলে একমত পোষণ করেন। স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশের মঞ্চ নাটক তাই নতুন সব প্রশ্নকে সামনে নিয়ে আসে।

বাংলাদেশের এই নতুন নাট্যচর্চা গোড়া থেকেই গ্রুপ থিয়েটার আন্দোলন হিসেবে ব্যাপক জনগোষ্ঠীর কাছে পরিচিতি লাভ করে। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের নাট্যকর্মীদের দাঁড় করিয়ে দিল একেবারে জনতার মাঝখানে। ফলে নাট্যকর্মীরা উদ্যোগী হলেন নতুন নাট্য নির্মাণে এবং এই মাধ্যমে মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্তদের আশা-আকাক্সক্ষা, ক্ষোভ ও দ্রোহকে তুলে ধরলেন নাটকের মাধ্যমে। স্বাধীনতা পূববর্তী নাট্যচর্চার সাথে এই গ্রুপ থিয়েটার চর্চার মূল পার্থক্যটা যে কী সে ব্যাপারে বিশিষ্ট অভিনেতা ও নির্দেশক আলী যাকের বলেন – গ্রুপ থিয়েটার নামাঙ্কিত যে আন্দোলন তার কর্মীরা সাধারণত দেখা গেছে রাজনৈতিক চেতনায় অনুপ্রাণিত হয়েই দলবদ্ধ হয়েছেন শিল্পকলার এই শক্তিশালী মাধ্যমটির সাহায্যে বৃহত্তর জীবন বোধের কথা জনসাধারণকে পৌঁছে দেয়ার জন্য (গ্রুপ খিয়েটার চর্চা ও প্রতিবন্ধকতা – আলী যাকের , থিয়েটার ৭ম বর্ষ : ২য়-৪র্থ যুগ্ম সংখ্যা, ডিসেম্বর ১৯৭৯, পৃ-১১৬ )। যদিও সেই রাজনীতিটা কী সে ব্যাপারেই বাংলাদেশের নাট্যচর্চায় দেখা গেছে নানা অস্পষ্টতা। তবুও স্বাধীনতা পরবর্তী এই গ্রুপ থিয়েটার আন্দোলনের কারণেই পূববর্তী সৌখিন নাট্যচর্চার পথ রুদ্ধ হয়ে যায়। এটাই হল সবচেয়ে বড় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
আশির দশক থেকে বাংলাদেশের নাট্য আন্দোলন ভীষণভাবে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িয়ে পড়তে থাকে। সমকালীন বিভিন্ন রাজনৈতিক ঘটনায় নাট্যদলগুলো যেমন তাদের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে তেমনি সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে সরাসরি সোচ্চার হয়ে উঠে। নাটককে রাজনীতির পক্ষে ব্যবহার করার স্লোগান এবং সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে নাট্যকর্মীদের তৎপর হয়ে ওঠা এই সময়ের নাট্যচর্চাকে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে। এই সময়কার নাট্যচর্চার বিশেষ লক্ষণ হল এই, নাট্যদলগুলো অনুধাবন করল রাজনীতির সাথে নাটকের কোনো বিরোধ নেই। ফলে কিছু কিছু নাট্যদল সরাসরি ঘোষণা দিল নাটককে রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত করতে হবে। সেক্ষেত্রে নাট্যদলগুলো তা কতটা সমাজ বিজ্ঞান মনস্ক হয়ে বলেছিল সেটা ভিন্ন প্রসঙ্গ। তবে নাটককে রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত করা নাট্যকর্মীর একটি মূল দায়িত্ব সেটাই তারা সেদিন উপলব্ধি করতে পেরেছিল। সে সময়ের নাট্যদলগুলোর ঘোষণা লক্ষ্য করলে বিষয়টি আমাদের কাছে আরো সুস্পষ্ট হবে।

১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠিত আরণ্যক নাট্যদল আশির দশকে এসে তাদের নাটক মঞ্চায়ন সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট ঘোষণা দেয়। তারা বলেন- বর্তমান সমাজ সুস্থভাবে বসবাস করার অযোগ্য। তাই এর পরিবর্তন দরকার। নাটক সেক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে সক্ষম। সে কারণেই আরণ্যক এর প্রত্যয় ও প্রত্যাশা একজন নাট্যকর্মী হবেন প্রত্যাশিত সমাজ ব্যবস্থার দক্ষ রূপকার। জনগণের মানস চেতনায় তিনি তুলে ধরবেন আগামীকালের ছবি। সমাজ বিকাশের মূল চালিকা শক্তি শ্রেণী সংগ্রাম, সে সংগ্রামে নাটক শুধু বিনোদন নয়, কাক্সিক্ষত সমাজ নির্মাণে একটি শক্তিশালী হাতিয়ার (অবলোকন নাট্যচর্চা কেন্দ্র আয়োজিত নাট্য উৎসব’৮৯ এর স্মরণিকায় প্রকাশিত আরণ্যক এর বক্তব্য)। ১৯৭৫ সালে চট্টগ্রামের গণায়ন নাট্য সম্প্রদায় প্রতিষ্ঠিত হলেও আশির দশকে এসে তারা তাদের বক্তব্যের পরিবর্তন করে এবং বলেন – নিরপেক্ষ সংস্কৃতিতে আস্থাহীন গণায়ন বিশ্বাস করে নাটক শোষিতকে শ্রেণী চেতনা দান করে। আর শ্রেণী চেতনার অধিকারীদের বিদ্রোহ, আন্দোলন, শ্রেণী সংগ্রাম ও বিপ্লবের মর্মবস্তু বুঝতে সহায়তা করে। শিল্পের জন্য শিল্প পূজার নামে জীবনচ্যূত পলায়নী স্ববিরোধীতা অথবা নৈরাজ্যবাদী অপসংস্কৃতির উলঙ্গ প্রকাশে গণায়ন বিশ্বাসী নয় (গণায়ন নাট্য সম্প্রদায় প্রযোজনা শেষ সংলাপ এর স্মরণিকায় প্রকাশিত বক্তব্য দ্রষ্টব্য)। রাজশাহীর অনুশীলন নাট্যদলের বক্তব্য হল – নাট্য আন্দোলন সমাজ পরিবর্তন আন্দোলনের একটি অংশ (বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশান ও বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী আয়োজিত জাতীয় নাট্য উৎসব-১৯৯১ এর স্মরণিকা, পৃ.৭৮)। বগুড়ার সংশপ্তক থিয়েটারের বক্তব্য- জীবনের জন্য নাটক, নাটক শুধু জীবনের প্রতিচ্ছবি নয়, জীবন যুদ্ধের হাতিয়ার (বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশান এর রাজশাহী আঞ্চলিক সম্মেলন-৯২ এর স্মরণিকায় প্রকাশিত)। চট্টগ্রাম থিয়েটার তাদের বক্তব্যে বলেন- শ্রেণী বিপ্লবের আকাঙ্খা চট্টগ্রাম থিয়েটারের নাটক নির্মাণের মূল উপজীব্য (চট্টগ্রাম থিয়েটার প্রযোজিত কানামাছি খেলা নাটকের স্মরণিকায় প্রকাশিত বক্তব্য), হবিগঞ্জের জীবন সংকেত নাট্যগোষ্ঠীর স্লোগান হল- নাটক হোক গণ চেতনার হাতিয়ার (বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশান ও বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী আয়োজিত জাতীয় নাট্য উৎসব-১৯৯৮ এর স্মরণিকা), সিলেটের কথাকলি নাট্যদলের বক্তব্য হল – শিল্প ও শিল্পীর সামাজিক ও রাজিৈনতক দায়বদ্ধতা স্বীকার করেই আমরা আমাদের হাত উত্তোলিত করেছি (বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশান ও বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী আয়োজিত জাতীয় নাট্য উৎসব-১৯৯১ এর স্মরণিকা)। এই রকম সারাদেশের আরো আরো নাট্যদল তাদের ঘোষণায় রাজনৈতিক বক্তব্যকে সুস্পষ্ট করে। আবার কেউ কেউ স্পষ্ট করে বলেছিল তাদের লক্ষ্য সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা। এই অঞ্চলের নাট্যচর্চার ইতিহাসে এটা ছিল একেবারেই নতুন চিন্তা। নাট্যদলগুলোর বক্তব্য থেকে এটা সুস্পষ্ট হয় যে, বাংলাদেশের নাটক একটি রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে প্রবেশ করেছিল। তবে সত্য যে, বাংলাদেশের সবগুলো নাট্যদল কিন্তু শ্রেণী সংগ্রামের ঘোষণা দেয় নি। উল্লেখ্য যে, বাংলাদেশে নাট্যচর্চারত গ্রুপ থিয়েটারের প্রায় সবগুলো নাট্য সংগঠন বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশান এর সদস্যভুক্ত। আর বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশান হচ্ছে সারা দেশব্যাপী নাট্যচর্চারত নাট্যদলগুলোর সম্মিলিত একমাত্র বৃহত্তম মোর্চা। এই কথা সত্য যে, যারা শ্রমিক শ্রেণীর পক্ষে নাটক করার ঘোষণা দেয় তারা সরাসরি কোনো শ্রমিক শ্রেণীর রাজনৈতিক দলের সাথে যুক্ত ছিল না। এমনকি তারা মাকর্সবাদী চিন্তা চেতনায় বিশ্বাসী ছিলেন কিনা সেই বিষয়েও তর্কের অবকাশ থেকে যায়। পরবর্তী সময়ে এটা সুস্পষ্ট হয়ে যায় যে, শ্রেণী সংগ্রাম সম্পর্কিত স্লোগানগুলো তারা ব্যবহার করেছে অনেকটা পোশাকি হিসেবে।

স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশের নাট্য প্রচেষ্টা বা নাট্য আন্দোলন কখনো স্থির থাকে নি। আর স্থির থাকে নি বলেই বারবার তার ধারা পাল্টেছে এবং নাট্যদলগুলোর বক্তব্যও পাল্টেছে সমানভাবে। কেমন যেন অস্থিরভাবে দিকবিদিক ছোটাছুটি করেছে বাংলাদেশের নাট্যচর্চা। বহু ধরনের স্লোগান তুললেও প্রকৃত অর্থে নাট্য আন্দোলন কোথাও এসে দাঁড়াতে পারে নি। নানা স্লোগানের আড়ালে নাট্যদলগুলো মূলত নাটক মঞ্চায়নের মাধ্যমে নানাভাবে দর্শকদের মনোরঞ্জনের চেষ্টা করেছে মাত্র।

স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশের গ্রুপ থিয়েটার আন্দোলনের একটি বিরাট অংশ জুড়ে রয়েছে পথ-নাটক চর্চা। চট্টগ্রামে প্রথম এই ধারার নাটকের চর্চা শুরু হয়। যদিও ১৯৭১ সালে এই ধরনের নাটকের মঞ্চায়ন লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু তৎপরবর্তী সময়ে সেই চর্চা তেমনভাবে বিকশিত হয় নি। গণায়ন নাট্য সম্প্রদায় ১৯৭৬ সালে মিলন চৌধুরী রচিত ও নির্দেশিত যায় দিন ফাগুনের দিন। নাটক মঞ্চায়নের মধ্যদিয়ে এই নতুন আঙ্গিকের নাট্যধারার সাথে জনগণকে সম্পৃক্ত করে। প্রথাগত আঙ্গিকের বাইরে রচিত এই ধরনের নাট্য রচনা ও নির্মাণ ব্যাপকভাবে সাড়া জাগায় বাংলাদেশের নাট্যান্দোলনে। তারই ধারাবাহিকতা হিসেবে আরো আরো নাট্যকার নাটক রচনা এবং নাট্যদল নাট্য প্রযোজনা নিয়ে উপস্থিত হয়। সেলিম আল দীন এর চর কাঁকড়ার ডকুমেন্টারি; মামুনুর রশীদ এর মে দিবস, কদম আলীর মে দিবস, নীলা ; এস এম সোলায়মান এর ক্ষ্যাপা পাগলার প্যাঁচাল, এলেকশান ক্যারিকেচার; মান্নান হীরার ক্ষুদিরামের দেশে, ফেরারি নিশান, আদাব, শেকল, জননী বীরাঙ্গনা; সালাম সাকলাইন এর বানরের পিঠা বন্টন, কালো বেড়া বধ কর, মৃত্যুঞ্জয়ী মানুষেরা; তপন দাশের মহারাজার গুন কীত্তন, খেলা; সৈয়দ শামসুল হকের প্যাটের বিষ, জন্ম; আবদুল্লাহ আল-মামুনের বিবিসাব, উজান পবন, প্রতিবাদে প্রতিরোধে মা; মাসুম রেজার লেবাস, সারমেয়, সাদা বেনিয়ার কালো আইন, জীবন্ত পোস্টার; অলক বসুর বান্দরের কিস্সা, মাদার; লিয়াকত আলী লাকীর রয়েল বেঙ্গল টাইগার, মহাপ্রয়াণ; মিন্টু বসুর ঢোল, বিপ্লবের মৃত্যু নেই, এসো প্রতিবাদের রণাঙ্গনে; শংকর সাঁওজালের মহারাজার অনু প্রবেশ, সার্কাস, জাগো লক্ষ নূর হোসেন; দীপক চৌধুরীর চট্টগ্রাম গণহত্যা, রাজা এলেন রাজাকার; কাজী রফিকে সারি সারি লাশ, তারামন বিবি; শোভনময় ভট্টাচার্যের ৭১’এর তেলেসমাতি, দানব; বিজন মজুমদারের ধর্মঘট প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য নাট্য রচনা।

সত্যিকার অর্থে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের সময় বাংলাদেশের পথ-নাটক বিরাট ভূমিকা পালন করে। বাংলাদেশের পথ-নাটক শুধুমাত্র স্বৈরাচার বিরোধী দৃষ্টিকোণ থেকেই মঞ্চস্থ হয়েছে অধিকাংশ ক্ষেত্রে। যদিও অনেক সময় সেখানে শৈল্পিক দৃষ্টি বা নান্দনিক বিষয়টি গুরুত্ব পায় নি নির্মাণের ক্ষেত্রে। তারপরও স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশের নাট্যচর্চার কথা বলতে গেলে কোনোভাবেই অস্বীকার করা যাবে না পথ নাটককে। বিষয়বস্তুর ক্ষেত্রে নাট্যকাররা আধুনিকতার ছাপ রেখেছিলেন নাট্যরচনায়। অনেকগুলো নাট্যপ্রযোজনাতে নতুনতত্বের ছাপ ছিল নিঃসন্দেহে। যদিও স্বৈর শাসকের পতনের পর বিকাশমান এই ধারাটির চর্চা প্রায় স্তিমিত হয়ে পড়ে।

অন্যদিকে বাংলাদেশে সত্যিকার অর্থে বানিজ্যিক থিয়েটারের ধারাটি তেমন বিকাশমান নয়। এখানে বানিজ্যিক থিয়েটার বলতে যা হয় তা মূলত ভ্যারাইটি শো। স্থুল নাচ-গান সর্বস্ব নাট্যের প্রদর্শনী। নির্দিষ্ট কোনো মিলনায়তনে এর নিয়মিত প্রর্দশনী হয় না। মূলত শীতকালীন মৌসুমে বিভিন্ন জেলা শহরগুলোতে মেলার নামে এর আয়োজন চলে। সারাদেশে বানিজ্যিক নাট্যদল নেই বললেই চলে। তথাপিও ব্যক্তি বিশেষ নিজ উদ্যোগে এই ধরনের থিয়েটারের পৃষ্ঠপোষকতাসহ চর্চা করেন। পাশাপাশি বাংলাদেশের যাত্রা শিল্প মাধ্যমটিও এখন মৃত প্রায়। আর্থিক সংকটসহ প্রশাসনের নানা রকম বিধি-নিষেধের কারণে এই শিল্প মাধ্যমটি তেমনভাবে বিকশিত হতে পারছে না। বাংলাদেশে গ্রুপ থিয়েটার চর্চার পাশাপাশি নাটক সম্পর্কিত অন্যান্য মাধ্যমগুলোর এই হল সংক্ষিপ্ত অবস্থান।

অপরদিকে সাম্প্রতিক সময়ে তৃতীয় একটি নাট্যধারা বাংলাদেশে বেশ সরব। এই ধারাটির মূল চর্চাকারী হল এনজিও গোষ্ঠীগুলো। তারা একে বিশেষ নামেও নামাঙ্কিত করেছেন। মূলত নব্বই-এর দশকের শুরুর দিকে বাংলাদেশে এনজিওদের মাধ্যমে নতুন এই ধারাটির চর্চা শুরু হয়। এর নাম তারা দিয়েছেন – উন্নয়নধর্মী নাটক। পৃথিবীব্যাপী Development Theatre বা উন্নয়ন নাট্যের যে ইতিহাস আমরা দেখতে পাই তার একটি সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি ছিল। আর সেই উন্নয়নধর্মী নাট্যের প্রবক্তা হিসেবে আমরা পাই ঙগুজি, ফ্রেইরে এবং অগাস্ত বোয়ালের মত নাট্যব্যক্তিদের। জনগণের আশা আকাক্সক্ষার প্রতিফলন তাঁরা তাদের নাটকে দেখাতে চেয়েছেন। তাঁরা এমন নাট্য তৈরী করতে চেয়েছেন যেখানে নির্যাতিত নিপীড়িত মানুষ খুঁজে পাবে নিজেদের নাট্য সড়ক। নাট্যকলার শক্তিকে ব্যবহার করে তাঁরা যেন বিপ্লবের মহড়া দিতে পারে। অর্থাৎ এর রয়েছে এক বিদ্রোহী রূপ।

অথচ বাংলাদেশের উন্নয়ন নাট্যের হালহকিকত দেখে মনে হবে – উন্নয়ন নাট্য হল এমন এক পণ্য যা ব্যবসার উৎকৃষ্ট উপকরণ। পৃথিবীব্যাপী Development Theatre এর প্রবক্তরা চেয়েছেন জনগণকে সচেতন করতে, আর বাংলাদেশের উন্নয়নবাদীরা চান জনগণকে অচেতন করে দিয়ে ব্যক্তিগত লাভালাভ বুঝে নিতে। বাংলাদেশে Development Theatre তার তথাকথিত পরিভাষা উন্নয়নধর্মী নাট্য থেকে সরে গিয়ে আজ ডাবল লাভ থিয়েটারে পরিণত হয়েছে।

সাম্রাজ্যবাদ আগের মত করে মূলত কোনো দেশ দখল করে না। দখল করার নতুন পদ্ধতি ও কৌশল আবিষ্কার করেছে তারা। মুক্তবাজার অর্থনীতির মাধ্যমে ঢুকে পড়ছে তাদের পণ্য তৃতীয় বিশ্বের দেশে, ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে দেশীয় ক্ষুুদ্র শিল্প। সাম্রাজ্যবাদ শোষণের নতুন হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে এইসব এনজিওকে। বাংলাদেশের সর্বত্রই এই সংস্থাগুলোর কাজকর্ম রয়েছে। আর এই সংস্থাগুলো জনহিতৈষী নামক সাম্রাজ্যবাদী পণ্য বাজারজাত করছে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে। আর সাম্রাজ্যবাদ এই সংস্থাগুলোর মাধ্যমে বাংলাদেশের অর্থনীতি, প্রশাসনসহ সংস্কৃতির উপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করছে। আপাতদৃষ্টিতে এই এনজিওগুলোর কর্মকাণ্ডকে দাতব্য শিল্পালয় বলে মনে হবে।

কিন্তু বাস্তবিকভাবে নানা প্রকার মানবিক উন্নয়নের মুখোশ ধারণ করে এদেশে সাম্রাজ্য ও পুঁজিবাদী এবং সামন্তবাদী সমাজ ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখাই তাদের মূল লক্ষ্য।

কোনো জাতির অগ্রগতিকে ব্যহত করতে হলে তার সংস্কৃতির অগ্রগতির সম্ভাবনাকে রুদ্ধ করতে হয়। তাই সংস্কৃতির মত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে করায়ত্ব করতে না পারলে শোষণের ষোল কলা পূর্ণ হয় না। তার তাই সাম্রাজ্যবাদ বাংলাদেশে সাংস্কৃতিক এনজিওগুলোর মাধ্যমে সাংস্কৃতিক আগ্রাসন চালানোর ক্ষেত্রকে নিজেদের অনুকূলে রাখার কাজটাই করে যাচ্ছে। আপাত দৃষ্টিতে এই পুরো প্রক্রিয়াটাই একটি মানবিক সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড হিসেবে মনে হবে। কিন্তু অবাক হলেও সত্য যে, সাম্রাজ্যবাদ অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে এই কাজটি করে চলেছে বাংলাদেশে এনজিওগুলোর মাধ্যমে।

বাংলাদেশের উন্নয়নধর্মী নাট্যকলার প্রধান উদ্দেশ্য প্রকল্প বাস্তবায়ন করা। প্রকল্পের স্বার্থ রক্ষা করাই মূল লক্ষ্য। শিল্পের সৌন্দর্য্য বা নন্দনতত্ব সেখানে অনুপস্থিত। ফলে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়ে যাবার পর তার কোনো মূল্য থাকে না এবং এই কিম্ভুত নাট্যকে ছুঁড়ে ফেলে দেয়া হয় নর্দমায়। কারণ প্রকল্প শেষ হয়ে গেলে ওঠাই তার আসল জায়গা। এইসব নাটকে জীবন সমস্যার কোনো স্বরূপ নেই, সমস্যার গভীরে প্রবেশের ন্যূনতম ইচ্ছে নেই, শোষণের প্রকৃষ্ট রূপ নেই, নেই কোনো দর্শনগত ভাবনা ও চিন্তা। এগুলো মূলত নাট্য প্রেসক্রিপশন। অর্থাৎ প্রেসক্রিপশন দিয়ে জীবন সমস্যার স্বরূপ উন্মোচন সম্ভব নয়। এই প্রসঙ্গে বাংলাদেশের বিশিষ্ট নাট্যতাত্বিক ও নাট্যব্যক্তিত্ব ড. সৈয়দ জামিল আহমেদ বলেন- এটা এনজিও কর্মীদের নাটক, যারা উন্নয়ন প্রভুর অমৃত বচন প্রচারের জন্য ধর্মাচারী দেবদূত রূপে আর্বিভূত হয়েছেন (উন্নয়ন নাট্য, তত্ত্ব ও প্রয়োগ- ড. সৈয়দ জামিল আহমেদ)।

বাংলাদেশের গ্রুপ থিয়েটার চর্চায় মধ্যবিত্তের সচেতন অংশের একটি অবস্থান আছে। অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ ও শোষণমুক্ত সমাজ গঠন এবং স্বৈরাচারসহ সকল গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সাথে নাট্য ও সংস্কৃতিকর্মীরা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আর তাদের সমস্ত কার্যক্রম সাংস্কৃতিক বিপ্লবকে তরান্বিত করে। তাই সাম্রাজ্যবাদ এরকম সমূহ বিপদের ক্ষেত্রকে কোনোভাবেই বিকশিত হতে দিতে চায় না। তাই সাম্রাজ্যবাদের পৃষ্ঠপোষকতায় এই এনজিওগুলোর উৎপত্তি এবং তাদের প্রধান কাজ প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের ধারাকে অনুর্বর করে রাখা এবং নাট্য ও সংস্কৃতিকর্মীদের মধ্যে লুকিয়ে থাকা সুবিধাবাদী শ্রেণীর ধারাকে বিকশিত করা। এভাবেই সাম্রাজ্যবাদ এনজিওগুলোর মাধ্যমে বাংলাদেশে সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের ক্ষেত্রটি তৈরি করেছে।

মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী বাংলাদেশের গ্রুপ থিয়েটার চর্চার সূত্রপাত করে ঢাকার নাগরিক নাট্য সম্প্রদায় বাদল সরকারের বাকী ইতিহাস নাটকটি মঞ্চায়নের মধ্যেদিয়ে। এ্যাবসার্ড নাটকের মধ্যদিয়ে এই চর্চার দ্বার উন্মোচিত হলেও পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন নাট্যকারগণ মুক্তিযুদ্ধের বিষয়কে অবলম্বন করে বেশ কিছু নাটক রচনা করেন এবং এসব নাটক সারাদেশের নাট্যদলগুলো মঞ্চস্থ করে। এর মধ্যে মমতাজউদদ্ীন আহমেদের স্বাধীনতা আমার স্বাধীনতা, স্বাধীনতার সংগ্রাম, বর্ণচোরা, এবারের সংগ্রাম; জিয়া হায়দারের পঙ্কজ বিভাস, সাঈদ আহমদের প্রতিদিন একদিন কল্যাণ মিত্রের জল্লাদের দরবার, একটি জাতি একটি ইতিহাস; আলাউদ্দীন আল আজাদের নিঃশব্দ যাত্রা, নরকে লাল গোলাপ; আবদুল্লাহ আল মামুনের বিবিসাব, নাসির উদ্দীন ইউসুফ ’৭১ এর পালা, সৈয়দ শামসুল হকের পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়, তোরা সব জয়ধ্বনি কর, শান্তনু কায়সারের সাজন মেঘ, রাহমান চৌধুরীর শত্র“ ঘরে বাইরে, কালাম মাহমুদের সোয়াত জাহাজ ১৯৭১ এবং শান্তনু বিশ্বাসের ইন্ফরমার উল্লেখ যোগ্য।

রাজনৈতিক প্রতিবাদ- প্রতিরোধের নাটক এ সময়ে আরো তীক্ষè ও সচেতন মাত্রা নিয়ে রচিত হয়। যেমন- আবদুল্লাহ আল মামুনের শপথ, এখনও ক্রীতদাস; মামুনুর রশীদের ওরা কদম আলী, ওরা আছে বলেই; সেলিম আল দীনের বাসন, কীত্তনখোলা; আবদুল্লাহেল মাহমুদের সাত পুরুষের ঋণ, এস এস সোলায়মানের এই দেশে এই বেশে, সৈয়দ শামসুল হকের যুদ্ধ এবং যুদ্ধ ইত্যাদি এ ধারার উল্লেখযোগ্য নাটক।

পুরাণ ও ইতিহাস-ঐতিহ্য নিয়েও নাট্যকাররা এ সময়ে বেশ কয়েকটি নাটক রচনা করেছেন। যেমন- মমতাজউদদ্ীন আহমেদের স্পার্টাকাস বিষয়ক জটিলতা, সেলিম আল দীনের শকুন্তলা, সৈয়দ শামসুল হকের নুরলদীনের সারাজীবন, আবদুল্লাহেল মাহমুদের নানকার পালা, সাঈদ আহমদের শেষ নবাব, মামুনুর রশীদে লেবেদেফ, মাসুম রেজার নিত্যপুরাণ ইত্যাদি।

স্বাধীনতা পরবর্তী সময় হতে আজ অবধি সমাজ বাস্তবতা ও তার নানা দ্বন্দ্ব নিয়ে নাট্যকারগণ নাটক রচনা করেছেন প্রতিনিয়তভাবে এবং সেসব নাটকগুলো সারাদেশের নাট্যদলগুলো মঞ্চস্থও করেছে নিয়মিতভাবে। তবে এই কথা দিবালোকের মত সত্য যে, এই নাট্যচর্চার অন্যতম দুর্বল দিক হল নাট্যকারের শূন্যতা। নিয়মিত নাট্যচর্চা হলেও নতুন নতুন নাট্যকার কিন্তু সৃষ্টি হয় নি। আর হয় নি বলেই বাংলাদেশের নাট্যদলগুলোকে প্রায় সময় হাত বাড়াতে হয়েছে পশ্চিমবঙ্গের নাট্যকারদের কাছে। বাংলাদেশের নাট্যচর্চার দিকে দৃষ্টি নিবন্ধ করলে দেখবেন এখানকার নাট্যদলগুলোর বেশিরভাগ প্রযোজনা পশ্চিমবঙ্গের নাট্যকারদের লেখা নাটক। এটা অপরাধের কোনো বিষয় নয়, তবে সীমাবদ্ধতার বিষয়টি প্রকট হয়ে উঠে। নাট্যচর্চার ধারাকে বেগবান করতে পারে নাট্যকাররা। নতুন নতুন নাটক রচনার ভেতর দিয়ে নাট্যচর্চা তার কাঙিক্ষত লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যায়। এটাই হচ্ছে অমোঘ সত্য। নাট্যকাররাই পারে নাট্যচর্চাকে একটি শক্ত ভিত্তির উপর দাঁড় করিয়ে দিতে। আর এই শূন্যতাকে পূরণ করার লক্ষ্যে এখানকার নাট্যদলগুলো রূপান্তর ও অনুবাদ নাটককে অবলম্বন করে বাঁচার চেষ্টা করেছে। তাই আশির দশকের শুরু থেকে আজ অবধি একটা বিরাট অংশ জুড়ে রয়েছে এই ধরনের নাট্য নির্মাণ। সকল সীমাবদ্ধতার পরও রচিত হয়েছে কিছু ভালো নাটক।

image_1324_368781

স্বাধীনতা পরবর্তী এখানকার নাট্যচর্চাকে ‘গ্রুপ থিয়েটার আন্দোলন’ এই শিরোনামে নামাঙ্কিত করা হয়। এই ‘আন্দোলন’ শব্দটা আস্তে আস্তে বর্ণহীন হয়ে যেতে লাগল। পরবর্তী সময়ে আন্দোলনের স্থলে ব্যাপকভাবে ‘চর্চা’ শব্দটি ব্যবহারে সাধারণ নাট্যকর্মী থেকে নেতৃস্থানীয় সবাই খুব স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করল। তবে এর যে ব্যতিক্রম ছিল না তা কিন্তু নয়। শুরুর দিকের যে আবেগ, তাড়না ও দায়বদ্ধতা নাট্যকর্মীদের ছিল তা এখন কোন পর্যায়ে বলা কিন্তু বড় কঠিন। কারণ মোটা দাগের সুবিধাবাদের কাছে আজ আত্মসর্মপন করে বসে আছে সাধারণ থেকে গৌঢ় নাট্যজনরা। দীর্ঘদিন ধরে চর্চিত সুবিধাবাদ চেপে বসে আছে নাট্যজন ও নাট্যকর্মীদের উপর। তবে তার যে ব্যতিক্রম নেই তা বলছি না। কিন্তু সংখ্যায় তারা খুবই কম। দীর্ঘদিন ধরে চর্চিত এই সর্বগ্রাসী সুবিদাবাদের কারণেই এ সময়ের নাট্যচর্চা নানা প্রকার সীমাবদ্ধতার মধ্যে আটকে গেছে। তবে কেউ কেউ উত্তরণের চেষ্টা যে করছে না তাও কিন্তু নয়।

বাংলাদেশর বর্তমান নাট্যচর্চা একটা বলয়ের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। মধ্যবিত্তের গণ্ডি ভেদ করে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর সাথে এখনও সম্পৃক্ত হতে পারে নি। আর পারে নি বলেই নানা প্রকার হতাশা এবং না পাওয়ার বেদনায় ভুগতে থাকে নাট্যকর্মীরা। ফলে নাট্যদলগুলোও লক্ষ্যহীনভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছে একদিক থেকে অন্যদিকে। তাদের করণীয় যে কী সেটাই তারা উপলব্ধি করতে পারছে না। তথাপিও বাংলাদেশের নাট্যচর্চা বেঁচে থাকবে সংগ্রামী নাট্যকর্মীদের পদচারণায়। প্রতিনিয়ত লড়াইয়ের মধ্যদিয়ে শাণিত হবে ইস্পাত ফলার মত। ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ, সুবিধাবাদের মোহ কখনো আচ্ছন্ন করতে পারবে না একুশ শতকের সেসব মৃত্যুঞ্জয়ী নাট্যকর্মীদের। তাদের পল্লবিত পদযাত্রায় মুখরিত হবে একুশ শতকের বাংলাদেশের নাট্যচর্চা।

১৯৪৭ সাল থেকে বাংলা নাট্যের যে ধারা শুরু হয়েছিল বিষয় বৈচিত্র্যে , তা আজ হয়ে উঠেছে বেগবান ঋদ্ধ ও বিশ্বমনস্ক। বর্তমানে বাংলাদেশের নাটক দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও অর্জন করে চলেছে। জয় হোক বাংলা নাটকের। শত ফুলে বিকশিত হোক আমাদের নাট্যচর্চা।
তথ্য- থিয়েটারওয়ালা

You must be logged in to post a comment Login

মন্তব্য করুন