চার সংস্থার সমন্বয়হীনতাই যানজটের বড় কারণ

প্রকাশ: August 20, 2015
gari

রাজধানীর যানজট নিয়ে ২০ আগস্ট ২০১৫ তারিখে সমকাল পত্রিকায় প্রকাশিত এই প্রতিবেদনটি আমরা ঢাকার পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হল-

রাজধানীর যানজট নিরসনে নানা উদ্যোগ ব্যর্থ হওয়ার পর এবার যানজটের কারণ ও এর প্রতিকারে গবেষণা প্রতিবেদন তৈরি করেছে পুলিশ অধিদপ্তর। এ প্রতিবেদনে যানজটের কারণ তুলে ধরে তা সহনীয় পর্যায় রাখতে এবং নিরসনে দীর্ঘমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি ও স্বল্পমেয়াদি বেশ কিছু সুপারিশও তুলে ধরা হয়েছে। বলা হয়েছে, বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ), সিটি করপোরেশন, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) ও পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ এবং পরিবহন খাতের সংশ্লিষ্টদের মধ্যে সমন্বয়হীনতার অভাব যানজটের অন্যতম কারণ। এ ছাড়া সংশ্লিষ্ট সংস্থার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কর্তব্য পালনে অবহেলা, অনিয়ম ও দুর্নীতি রাজধানীর যানজট সৃষ্টির সহায়ক ভূমিকা পালন করে। সম্প্রতি পুলিশের গবেষণা প্রতিবেদনটিতে এ সব বিষয় উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল সমকালকে বলেন, ‘রাজধানীর যানজট দূর করতে পুলিশের পক্ষ থেকে যে গবেষণা প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে, সেটি আমলে নেওয়া হবে। সুপারিশগুলো সমন্বিতভাবে বাস্তবায়ন করা হবে। যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ে আন্তঃমন্ত্রণালয়ের আগামী সভায় এসব সুপারিশ বাস্তবায়ন নিয়ে সিদ্ধান্ত হবে।

এ বিষয়ে বুয়েটের অ্যাক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক শামসুল হক সমকালকে বলেন, ‘যে হারে ব্যক্তিগত গাড়ি বাড়ছে তাতে ২৫ ভাগ নয়, ঢাকা শহরে ৪০ ভাগ রাস্তা রাখলেও যানজট কমবে না। বরং এর আগে মেট্রোরেল, ওভারহেড এক্সপ্রেসওয়েসহ একসঙ্গে বেশি মানুষের চলাচলের উপযোগী গণপরিবহনের প্রয়োজন।’

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে দেওয়া গবেষণা প্রতিবেদনটিতে যানজটের কারণ সম্পর্কে বলা হয়েছে_ নগর উন্নয়নে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও ঢাকার জমির মালিকদের ভূমি
ব্যবহারে অদূরদর্শিতার কারণে ঢাকা অপরিকল্পিত শহর হিসেবে গড়ে উঠেছে। ৩৬০ বর্গকিলোমিটারের আয়তনের ঢাকা শহরের মধ্যে মাত্র ৮ শতাংশ ভূমি রাস্তায় ব্যবহার হচ্ছে। তার মধ্যে মাত্র আড়াই শতাংশ কার্যকরী সড়ক হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। অথচ আদর্শ নগরীর জন্য মোট আয়তনের ২৫ শতাংশ ভূমি প্রয়োজন রাস্তার জন্য। মহানগরীতে ২১৯টি বাস স্টপেজ এবং বিআরটিসি কর্তৃক অনুমোদিত ২০৮টি বাস রুটে প্রতিদিন ১২ হাজার বাস-মিনিবাস যাত্রী পরিবহন করে থাকে। অথচ বাস স্টপেজে বাস না থামিয়ে মূল রাস্তার ওপর যাত্রী ওঠানামা করা হচ্ছে। ঠেলাগাড়ি, রিকশা থেকে শুরু করে রেলগাড়ি পর্যন্ত প্রায় ৩০ ধরনের যান চলাচল করে রাজধানীতে। সে হিসেবে প্রতিদিন ৩ লাখ ২৫ হাজার যান্ত্রিক যান এবং ৭ লাখ অযান্ত্রিক বাহন ব্যবহৃত হচ্ছে। যা রাস্তার ধারণ ক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি। ফলে যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে।

প্রতিবেদনে যানজট নিরসনে দীর্ঘমেয়াদি সুপারিশে বলা হয়েছে, আধুনিক নগরায়নে বিশিষ্ট নগর উন্নয়নবিদদের নিয়ে একটি গবেষণা ইনস্টিটিউট গড়ে তুলতে হবে। বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাস, পয়ঃনিষ্কাশন, নগরায়ন ইত্যাদি সংস্থাসমূহের মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ের জন্য ঢাকা সিটি করপোরেশনকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে হবে, রাজধানীর পার্শ্ববর্তী এলাকাসমূহে স্যাটেলাইট শহর গড়ে তোলা এবং সারাদেশে ট্রাফিক ব্যবস্থার নিয়ম-কানুন সম্পর্কে ব্যাপক প্রচারণার ব্যবস্থা করতে হবে।

মধ্যমেয়াদি সুপারিশ অনুযায়ী গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোয় ফ্লাইওভার নির্মাণ করা, নগরীতে মেট্রো রেল, মনোরেল, ওভারহেড এক্সপ্রেসওয়ে ও ফুটপাত উন্নয়নে সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করা, পরিকল্পিত বাস রুট পরিচালনা করে গুরুত্বপূর্ণ সড়কে প্রাইভেট কার ও মিনিবাস বন্ধ করে অধিক সংখ্যক যাত্রী বহনের উপযোগী বাস চালু করা, অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা শিক্ষা ও চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান, শিল্প-কারখানা উপযুক্ত স্থানে স্থানান্তর করা, রাজধানীতে মানুষের চাপ কমাতে সকল পর্যায়ে সকল বিভাগ ও দপ্তরের ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণ করা এবং ঢাকা মহানগরীর ডিটেইল এরিয়া প্ল্যান বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। সর্বোপরি ব্যক্তিগত গাড়ি নিরুৎসাহিত করা প্রয়োজন।

স্বল্পমেয়াদি সুপারিশে বলা হয়েছে, অবৈধ যানবাহন আটক এবং নতুন গাড়ির রেজিস্ট্রেশন সীমিত করে পুরান গাড়ি নিষিদ্ধ নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সংখ্যক মোবাইল কোর্টের ব্যবস্থা নেওয়া। রাস্তার পাশে থাকা হাট-বাজার ও ফুটপাত হকারমুক্ত করা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও অফিস সময়সূচি সমন্বয় করা এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহের নিজস্ব পরিবহন ব্যবস্থা চালু করা, রাস্তার পাশে থাকা সিএনজি রিফুয়েলিং স্টেশনসমূহের নিজস্ব জেনারেটরসহ ক্যাপাসিটি বৃদ্ধির ব্যবস্থা নেওয়া। পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ স্থান থেকে সিএনজি স্টেশন অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া। আন্তঃজেলা বাস ও ট্রাক টার্মিনালগুলো নগরীর বাইরে স্থানান্তর করা, ট্রাফিক পুলিশ বিভাগকে আধুনিকায়ন করে ট্রাফিক কন্ট্রোল সিস্টেম ও ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম চালু করে আধুনিক কন্ট্রোল রুম স্থাপনের মাধ্যমে অটোমেটেড ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালু করা এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থানসমূহে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা এবং ঢাকা শহরের সকল রেলক্রসিং ও পৌর রাস্তার প্রয়োজনীয় সংখ্যক ওভারব্রিজ ও আন্ডারপাস নির্মাণ করা।

সূত্র: সমকাল

You must be logged in to post a comment Login

মন্তব্য করুন