ঢাকার উৎসব-পার্বণ

প্রকাশ: April 22, 2015
KITE

পুরান ঢাকার সব উৎসব-পার্বণ ছিল ধর্মীয় দিনগুলোকে কেন্দ্র করেই। এসব উৎসব পালিত হতো স্বকীয়তায়। এখনও কিছু কিছু অবশিষ্ট আছে। তবে বেশির ভাগই লুপ্তপ্রায়। মহররম মাসের এক তারিখ থেকে শুরু হতো নানা কর্মকা-। স্থানীয়রা সন্তানদের মঙ্গলার্থে মানত করে ‘বেহেস্তা’ বানাতো। বেহেস্তারা এ দশ দিন মাছ খাবে না। লালসালু কোমরে পেঁচিয়ে জরি-বাদলার ফুলের সাদা-লাল-কালো রঙের সুতার বিশেষ সাজ লালসালুর চারদিকে এবং শরীরের উপরের অংশে পেঁচিয়ে হাতে লম্বাটে ত্রিকোণ লাল-সবুজ জরি লাগানো পতাকা হাতে মহররমের মিছিলে এবং নানা কর্মকা-ে তারা অংশ নিত। আশুরার আগের দিনের সন্ধ্যা ও শেষ রাতে হোসেনী দালান থেকে মিছিল বের হয়ে শহর প্রদক্ষিণ করতো। সে রাতে স্থানীয় বিভিন্ন এলাকার দল লাঠিখেলা, তলোয়ার খেলাসহ নানা রকমারি যুদ্ধের খেলা প্রদর্শন করতো সড়কের মোড়ে মোড়ে। স্থানীয় ভাষায় এসব দলকে ‘আখাড়া’ বলা হতো। আখাড়ার দলের ঢাক ও ঢোলের শব্দে আমরা ছুটতাম সড়কের মোড়ে। এক দলের খেলা শেষে বাড়ি এসে তন্দ্রাচ্ছন্নতা এলে আবার অপর দলের আগমনের ঢাক-ঢোলের শব্দে ছুটে যেতাম। সারারাত পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন দলের নানান দৃষ্টিনন্দন খেলা উপভোগ করতাম আমরা। দূর-দূরান্তের আত্মীয়-পরিজনরাও চলে আসতো আখাড়ার টানে।

আশুরার দিন আজিমপুর মোড় থেকে পিলখানা পর্যন্ত বিশাল এলাকাজুড়ে মহররমের মেলা বসতো, যা এখন আর বসে না। মেলায় নাগরদোলা, নানা ধরনের খাবারসহ মাটির তৈরি জীব-জানোয়ার, পাখি-ফল, টিন ও এলুমনিয়ামের খেলনা, বাঁশের বাঁশি, ঢোল, খেলনা গাড়ি বিক্রি হতো। খৈ-বাতাসা, পাত-খিরসা, মাসকালাই ডালের বড়া হতে শুরু করে নানান রকমারি খাবার পাওয়া যেত। সাদা দুলদুল ঘোড়া আর লাল খুনি ঘোড়া বাড়তি আকর্ষণ হিসেবে থাকতো তাজিয়া মিছিলে। শিয়া সম্প্রদায়ের যুবকরা অনেকগুলো ছোট মাপের ছুরি শেকলে বেঁধে ‘ইয়া হোসেন, ইয়া হোসেন’ বলে নিজ পিঠে ক্রামগত আঘাত করতো। পিঠ দিয়ে রক্ত ঝরতো। বয়স্করা হাত দিয়ে বুকে আঘাত করে ‘ইয়া হোসেন, ইয়া হোসেন’ বলে বলে মিছিলে অংশ নিত। ছোটরা অনেকে এই মিছিল দেখে ভয়ে রীতিমতো কান্নাকাটি করতো। হোসেনি দালান থেকে বের হওয়া দুপুরের এ তাজিয়া মিছিল এবং ফরাশগঞ্জের বিবি রওজা হতে বের হওয়া বিকেলের ‘পাগলা গওড়া’ নামের ছুটে-চলা মিছিল পর্যায়ক্রমে অতিক্রম করতো মেলার পথ। আশুরার দিন বাড়ি বাড়ি খিচুড়ি রান্না করে এক বাড়ি থেকে অন্যবাড়িতে পৌঁছে দিতো স্থানীয়রা। বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান থেকে মিষ্টি শরবতও বিতরণ হতো। ঢাকার নবাবেরা মহররম মাসের আশুরাকে কেন্দ্র করে নানা আয়োজন-আনুষ্ঠানিকতা এবং আশুরা কেন্দ্রিক সব ধরনের কর্মকা-ের পৃষ্ঠপোষকতাও করতেন। নবাবদের কাল গত হলে পর স্থানীয় বিত্তবানেরা নবাবী অনুকরণে আশুরা উদযাপনের কর্মকা-ে নিজেদের যুক্ত রাখতেন।

মহররম মাসে আমরা বাড়তি আনন্দে আত্মহারা হতাম। আশুরার দিন স্থানীয়দের নতুন জামাই শ্বশুরবাড়িতে এসে অর্থ উপঢৌকন পেয়ে শ্যালক-শ্যালিকাদের মহররমের মিছিল-মেলা দেখাতে নিয়ে যেত। কিনে দিতো রকমারি খাবার ও খেলনা। এটি ছিল সামাজিক রীতি। মহররমের এই আচার-অনুষ্ঠানের সঙ্গে ধর্মের যে কার্যকর যোগসূত্র ছিল তা কিন্তু নয়। এর জৌলুস ও বৈচিত্র্যপূর্ণ অনুষ্ঠান আজ আর আগের মতো নেই। তাজিয়া মিছিল ও পাগলা গওড়া মিছিল আজো বের হয় তবে তা সে কালের মতো মোটেও নয়। এখন তা নিতান্তই দায়সারা গোছের প্রাণহীন আনুষ্ঠানিকতা মাত্র। শবেবরাতের উৎসব হতো বাড়িতে বাড়িতে। মসজিদে মসজিদে আলোকসজ্জা এবং মোমবাতি জ্বালানো হতো বাড়িতে ও কবরে-মাজারে। আতসবাজি পোড়ানো, বাজি ফাটানো, তারাবাতি জ্বালানো ছিল আবশ্যিক। হালুয়া রুটি তৈরি করে একে অপরের বাড়িতে পাঠানো, দরিদ্র ও ভিখারিদের অর্থ এবং রুটি-হালুয়া দেয়া, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে এবং বাড়িতে মিলাদ মাহফিল করা, জামাই বাড়িতে বা জামাইপক্ষকে বউয়ের বাড়িতে বিভিন্ন জন্তুর আদলে তৈরি এবং প্রতীকের বিশাল আকৃতির রুটি ও নানা পদের হালুয়া পাঠানো ছিল রেওয়াজ। শ্যালক-শ্যালিকাদের জন্য মোমবাতি, আতসবাজি, তারাবাতিসহ নানা ধরনের বাজি উপহার পাঠানো ছিল অতিআবশ্যিক। মসজিদে মসজিদে বিশেষ নামাজ আদায়, আজিমপুর কবরস্থানে জিয়ারত ও ভিখিরীদের অর্থদান ছিল ঐতিহ্যের অংশ। কিশোর-যুবকেরাই আসলে বাজি ফোটাতো। দু’দলে বিভক্ত হয়ে পটকাবাজি দিয়ে একপক্ষ আরেকপক্ষের বিরুদ্ধে যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা খেলতো। কিশোর-যুবকরা নামাজের উছিলায় সারারাত ঘরের বাইরে থাকার অনুমতি পেয়ে দুষ্টুমি করে বেড়াতো। হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা যেমনি ঘরে-মন্দিরে-শ্মশানে-সমাধিস্থলে মঙ্গল প্রদীপ জ্বালিয়ে উদযাপন করে শ্যামা পূজা বা কালী পূজা, ঠিক তারই আদলে পুরান ঢাকায় পালিত হতো শবেবরাত। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানকে উপলক্ষ করে পালিত বিভিন্ন উৎসবগুলো এখন আর পূর্বের ন্যায় নেই। বদলে গেছে, পাল্টে গেছে এবং লুপ্তও হয়েছে।

মুসলিম-অধ্যুষিত ইরাকে শবেবরাতের অভিজ্ঞতা এখনো স্মরণ করছি। আমার কর্মস্থল ছিল উত্তর ইরাকের কিরকুকে। সেখানেই প্রথম শবেবরাত পালন করেছিলাম ১৯৮১ সালে। সরকারি ছুটি ছিল না। এদিনকে কেন্দ্র করে সেদেশে ধর্মীয় বা সামাজিক বিন্দুমাত্র আচার-অনুষ্ঠান দেখিনি। আরবি ভাষী ও কুর্দি ভাষাভাষী ইরাকিদের এ দিনটির বিষয়ে জিজ্ঞেস করলে তারা তো রীতিমতো অবাক ও বিস্ময় প্রকাশ করেছিল। দিনটি পালন তো দূরের কথা এর তাৎপর্য সম্পর্কেও অজ্ঞতা প্রকাশ করেছে ওরা। আমাদের দেশের কিছু প্রবাসী কর্মজীবী মানুষ স্থানীয় এক মসজিদে মাগরিব-এশার নামাজ আদায়ের পরও বিশেষ নামাজ পড়ার জন্য মসজিদ ছেড়ে না যাওয়ার কারণে মসজিদের কেয়ারটেকার তাদের মসজিদ ত্যাগের বারংবার তাগিদ দিয়ে ব্যর্থ হয়ে পুলিশে খবর দেয়। পুলিশ এসে নামাজরত সবাইকে গ্রেফতার করে থানাহাজতে নিয়ে যায়। প্রবাসীদের মধ্যে হৈ চৈ পড়ে গেলে দূতাবাসের লোক ছুটে এসে পুলিশকে নানাভাবে বুঝিয়ে নামাজিদের হাজত থেকে মুক্ত করে। শবেবরাতের দিনটিকে বাগদাদসহ ইরাকের সর্বত্র অন্য দিনগুলো থেকে কোনভাবেই পৃথক মনে হয় নি। ইরাকে যততত্র মদের দোকান হতে শহরগুলোর বার, নাইটক্লাব, ক্যাসিনো অর্থাৎ পশ্চিমা বিনোদনের সব উপকরণ ইরাকে বিদ্যমান ছিল। শবেবরাতের রাতে কোনটি বন্ধ দেখিনি। সবই উন্মুক্ত ছিল। আরব ভূখ-ে শবেবরাত নামক ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান বলে কিছু নেই। অথচ আমাদের ক্ষেত্রে?

সেকালে রোজার মাসে পুরান ঢাকার চেহারা দ্রুত বদলে যেত। স্থানীয় ছোট-বড় সব হোটেলে সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত খাদ্যসামগ্রী এবং বেরোজদারদের আড়াল করতে কাপড়ের পর্দা টাঙানো হতো, এখনও তা একই কায়দায় বলবৎ রয়েছে। দুপুরের পরপরই সড়কের পাশে ইফতার বানানোর হিড়িক পড়ে যেত। বিক্রি হতো রকমারি ইফতার। চকবাজারের ইফতারি পূর্বের ধারাবাহিকতায় আজও টিকে আছে। তবে মানের ক্ষেত্রে ধস নেমেছে, সবই এখন নিম্নমানের। আকর্ষণীয় সেই ‘বড় বাপের পোলায় খায়’ হতে বিভিন্ন নামের আকর্ষণে এখনও দূর-দূরান্ত থেকে অনেকে ইফতারি কিনতে আসে। বিক্রিও হয় দেদার। তবে আগের কারিগরও নেই, স্বাদ ও মান পড়ে গেছে।

পুরান ঢাকার ইফতার অতীতে যেমনি বৈচিত্র্যপূর্ণ ছিল আজও তেমনি আছে। ফলমূল-মিষ্টি থেকে শুরু করে তেলেভাজা নানান পদের ইফতারের সঙ্গে মুড়ি-ভর্তা ছিল আবশ্যিক। পিয়াজু, ঘুঘনি, সুতা কাবাব, ফুলুরী, সর্ষে তেল মাখিয়ে মুড়ি মিশিয়ে বানানো মুড়ি-ভর্তা আজও অতীতের ইফতারের নিয়মিত মেন্যু হিসেবে এখনও স্থানীয়দের কাছে সমান জনপ্রিয়। মুড়ি-ভর্তা ছাড়া ইফতার এরা ভাবতেই পারে না। ইফতারের সময় এখনও সাইরেন বাজে। অতীতে প্রতি রাতে তিন দফায় পর্যায়ক্রমে মসজিদ থেকে সাইরেন বাজানো হতো, এখনো হয়। এছাড়া রোজাদারদের ঘুম থেকে জাগানোর জন্য কিছু লোক উর্দু ভাষায় সুর করে করে বাড়ির দরজায় দাঁড়িয়ে ডাকতো। এরকম মানুষ এখনও আছে তবে সংখ্যায় কমেছে। ঈদের দিন ওরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে এবং মসজিদের গেটে দাঁড়িয়ে বকশিশ আদায় করতো; এখনও করে।

নতুন জামাই চাঁনরাতে শ্বশুরবাড়ি এসে সালাম করে সেলামি নিয়ে যেত। রোজায় জামাইপক্ষ হতে যেমন কনেপক্ষ থেকেও তেমনি অঢেল ও রকমারি ইফতার বিনিময় হতো; এখনও হয়ে থাকে। নতুন জামাইবাড়িতে পাঠানো হতো ঈদ উপলক্ষে ঘি-মোরগ, পোলাওর চাল, সেমাই, চিনিসহ বিভিন্ন কাঁচা খাদ্য; সে প্রথা আজও রয়েছে। আর্থিক অবস্থার হেরফেরে পরিমাণটা কমবেশি হয়ে থাকে- এই যা।

এলাকায় ও মহল্লায় রোজায় গানের দল তৈরি করতো স্থানীয় যুবকরা। ‘কাসিদা’ নামে খ্যাত এই গানের দলগুলো রাতে এলাকার বাড়ি বাড়ি গিয়ে উর্দু গান কোরাসে গেয়ে টাকা তুলতো। আজকে এদের তেমন দেখা যায় না। ২৭ রোজার রাতে স্থানীয় মসজিদগুলোতে মুসুলি্লদের ভিড় উপচে পড়তো। এ দিনের বিশেষ নামাজ আদায় শেষে শুকনো কাঁঠাল পাতায় তৈরি স্থানীয় ভাষায় ‘দাওনা’ বলা হত। সেই দাওনায় বিরিয়ানি বিতরণ করা হতো। মসজিদে-আসা মুসুলি্লদের জন্য যেমন, একইভাবে প্রতিটি বাড়ির মহিলাদের জন্যও বিরিয়ানি পাঠানো হতো স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক যুবকদের মাধ্যমে।

চাঁনরাত মানেই পুরান ঢাকার যুবকদের জন্য সংযম ও পবিত্রতার ইতি। এশার নামাজের পর রাস্তায় রাস্তায় স্থানীয় কিছু যুবকের মদ্যপানে মাতলামি-খিস্তিতে চাঁনরাতের চেহারা হতো ভয়ঙ্কর। রাতে তারা কেউ বাসায় ফিরতো না, এদিক সেদিক পড়ে থাকতো। কাকভোরে বাসায় ফিরে নতুন জামা-কাপড় পরে ঈদের নামাজে অংশ নিত। ঈদের নামাজ শেষে কোলাকুলি, বাড়ি বাড়ি গিয়ে সালাম করে সেলামি নেয়ার হিড়িক পড়ে যেত। রাস্তার পাশের খাবারের দোকান থেকে খাবার কিনে খাওয়া, চকবাজারের ঈদের মেলা দেখতে যাওয়া এবং নানান ধরনের খেলনা-বাঁশি টুকিটাকি কিনে আনা ছিল কিশোর ও কৈশোর-উত্তীর্ণদের ঈদ পালন।

দুপুরের পর বুড়িগঙ্গার পাকা সিঁড়ি ঘাটগুলোতে বসে স্থানীয় যুবকরা তাস খেলতো। অনেকে দল বেঁধে তাজমহল, শাবিস্তান, লায়ন, স্টার, মুন, সিনেমা হলের দিকে ছুটতো লাহোরের নির্মিত ঈদে-মুক্তি-পাওয়া উর্দু ছবি দেখতে। সাবিহা-সন্তোষ, মোহাম্মদ আলী-জেবা, ওয়াহিদ মুরাদ-রানী, এসব পাকিস্তানি তারকারা ছিল স্থানীয়দের কাছে অধিক জনপ্রিয়। ঈদের দিনেও মাতালদের মাতলামি যত্রতত্র দেখা যেত। রিকশা-ঘোড়াগাড়িতে করে দল বেঁধে দূরের আত্মীয় বাড়ি, পুরাতন হাইকোর্ট সংলগ্ন ঢাকার চিড়িয়াখানা দেখতে যাওয়া, এসব ছিল অপেক্ষাকৃত কমবয়সীদের ঈদ বিনোদন।

ঈদের কেনা-কাটার জন্য ছিল প্রসিদ্ধ ছিল সদরঘাট আর নিউমার্কেট। বর্তমানের তুলনায় অনেক ছোট ছিল বায়তুল মোকাররম মার্কেট। মার্কেটের সিংহভাগ দোকানের মালিক ছিল অবাঙালি। দূরত্বের কারণে পুরান ঢাকার মানুষ সাধারণত বায়তুল মোকাররম মার্কেটে কেনাকাটা করতে যেত না। সেকালে ঈদে নতুন জামা-কাপড় সবাই পরলেও-পরিমাণে প্রত্যেকে একটির অধিক কল্পনাও করতো না। পোশাকের বিলাসিতা এতটা উগ্র ছিল না। ভোগবাদিতা এখনকার ন্যায় ভয়ঙ্কর মাত্রায়ও ছিল না। সমাজে বৈষম্য নিশ্চয় ছিল কিন্তু পরিমাণটা ভয়ানক পর্যায়ে ছিল না। এখন তো উৎসব মাত্রই বিত্তবানদের ভোগ-বিলাসিতা মেটাতে আসে। কেনা সেমাইর প্রচলন পুরান ঢাকায় খুব একটা ছিল না; হাতে ঘুরানো কলে ঈদের আগে বাড়িতে বাড়িতে সেমাই তৈরি হতো। রোদে শুকিয়ে হালকা আঁচে ভেজে সেসব তুলে রাখা হতো ঈদের অপেক্ষায়। ঈদের দিন ঘি-চিনি, জর্দা রং দিয়ে রান্না করা হতো সেই সেমাই। সেই সেমাই দিয়েই আগতদের আপ্যায়িত করা হতো। ঈদের দিন বিকেলে ঘুড়ি ওড়ানোর প্রতিযোগিতা হতো বুড়িগঙ্গার পাড়ে ও পাকা ঘরের ছাদে। তখন একতলা বাড়িই ছিল অধিক। ছাদে ঘুড়ি ওড়ানো তাই ছিল যুৎসই, যেটা আজ আর সম্ভব নয়। চারদিকে তিন-চার-পাঁচ-ছয় তলার ছড়াছড়িতে বাড়ির ছাদে ঘুড়ি ওড়ানো বন্ধ হয়ে গেছে। একতলার ছাদ বেশি থাকায় সবাই একতলার ছাদে ঘুড়ি ওড়াতো, তাতে একটা সামঞ্জস্য থাকতো। উপর-নিচ ছিল না। ঘুড়ি ওড়াতে আর ধরতে গিয়ে ছাদ থেকে পড়ে অনেক মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে। মনে পড়ে, পাকিস্তান টিভি চালু হওয়ার পর যাদের বাড়িতে টিভি ছিল সন্ধ্যার পর সবাই সে বাড়িতে টিভিতে ঈদের অনুষ্ঠান দেখতে ভিড় করতো।

কোরবানির ঈদ মূলত বিত্তবানদের আনন্দ উৎসব। সাধারণ মানুষের জন্য তা কখনো আনন্দের উৎসব ছিল না। আজও নেই। কোরবানির গরু কেনার ক্ষেত্রে আকার ও দামের একটা প্রতিযোগিতা ছিল, এখনও আছে। কে কত দামে কয়টি ও কত বড় গরু কিনেছে এ নিয়ে ছিল ঠা-া লড়াই। স্থানীয় আদি ঢাকাবাসী বিত্তবানরা অনেকগুলো গরু কোরবানি দিত। একটি গরু একা কোরবানি দেয়ার ন্যায় মধ্যবিত্ত মানুষের তুলনামূলক অভাব ছিল। আর স্থানীয়দের মধ্যে ভাগে কোরবানি দেয়ার কোন রেওয়াজ অতীতেও ছিল না। আজও নেই। স্থানীয়রা গরুর পায়ের হাঁটু থেকে নিচের অংশ ফেলে দিত বুড়িগঙ্গা নদীতে। রহমতগঞ্জের গনি মিয়ার হাট, গাবতলী, রমনা রেসকোর্স, হোসেনি দালান সংলগ্ন মাঠে গরুর হাট বসতো। মীর কাদিমের সাদা গাভীর কদর স্থানীয়দের কাছে পূর্বে যেমন ছিল আজও তেমনি রয়েছে। কোরবানি ঈদে গরুর রান বিনিময়ের সংস্কৃতি এখনও অপরিবর্তিত রয়েছে। মেয়ের বাড়ি, বোনের বাড়ি, জামাই বাড়ি, নিকট আত্মীয়দের বাড়ি বাড়ি রান বিনিময়ের রেওয়াজ পূর্বেও ছিল, আজও রয়েছে। পূর্বেই বলেছি কোরবানি ঈদ বিত্তবানদের উৎসব। সাধারণের নয়। সে কারণে বিত্তবানদের কোরবানি ঈদ কেন্দ্রিক সামাজিকতা তাদের শ্রেণীর মাঝেই সীমাবদ্ধ। সংখ্যাগরিষ্ঠদের ক্ষেত্রে সেই সামাজিকতা পালনের উপায় নেই। কোরবানির পশুর মাংসের বিলি বণ্টনে স্থানীয়রা আত্মীয়-পরিজনদের পর স্থানীয়দেরই বিবেচনা করে। মহল্লার স্থানীয় প্রতিটি ঘরে ঘরে এরা মাংস পৌঁছে দেয়। পরিমাণের হের-ফের নিশ্চয় থাকে। কোরবানির হাটে গরু কেনা হতে সব আয়োজন-আনুষ্ঠানিকতা সংখ্যালঘু বিত্তবানদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। সেক্ষেত্রে কোরবানির ঈদ উৎসব সংখ্যাগরিষ্ঠদের স্পর্শ করতে পূর্বেও পারেনি। আজও পারে না। কেবল মাংসের ভাগ পেয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয়। ইরাকে কোরবানি ঈদের স্মৃতি রয়েছে। পাঁচ বছর সেখানে ছিলাম। কোরবানি ঈদের দিন কোথাও পশু কোরবানির অস্তিত্ব খুঁজে পাইনি। স্থানীয়দের জিজ্ঞেস করে জেনেছিলাম তারাও কোরবানি দেয়- তবে হজের সময় এবং একবারই। কোরবানি ফরজ নয়, ওয়াজেব। প্রতিবার দিতে হবে ধর্মীয় তেমন বাধ্যবাধকতা নেই বিধায় তারা প্রতিবছর কোরবানি দেয় না।

১২ রবিউল আউয়ালকে কেন্দ্র করে পুরান ঢাকার প্রায় সবগুলো মসজিদে খাবার উৎসব হতো। স্থানীয়দের চাঁদার টাকায় এবং বিত্তবানদের আর্থিক সহায়তায় ব্যবস্থা হতো শিরনির। পনেরো-বিশটি গরু আগের দিন বিকেলে জবাই দিয়ে সারারাত রান্না করে সকাল থেকে খাওয়ানো হতো। পোলাও ও বুটের ডালের সঙ্গে গরুর মাংসের ভোজ মসজিদে লাইন করে বসে মাটির সানকিতে সবাই খেত। মসজিদের মূল ফটকে স্থানীয়দের দেখে দেখে ভেতরে ঢোকানো হতো। অস্থানীয়দের জন্য ঢোকার সুযোগ ছিল না। কামরাঙ্গীর চরের প্রচুর মানুষ খাবারের জন্য ভিড় করতো কিন্তু তাদের নানাভাবে নিগৃহীত হতে হতো। তারপরও প্রতিবারই তারা আসতো। কারো ভাগ্যে জুটতো, কারো ভাগ্যে জুটতো না। এখন অবশ্য বসে-খাওয়ানোর বিশাল আয়োজনটা সবখানে নেই। দু’একটি এলাকার মসজিদেই শুধু তা চালু রয়েছে।

পুরান ঢাকায় উৎসব-পার্বণ মাত্রই ধর্মীয় দিনগুলোকে উপলক্ষ করেই পালিত হতো এবং হয়ও। জাতীয় উৎসব তেমন ঘটা করে পালিত হয় না। একুশে ফেব্রুয়ারি, বিজয় দিবস, স্বাধীনতা দিবস, বাংলা নববর্ষ বিবিধ জাতীয় দিবসসমূহে স্থানীয়রা বরাবরই নির্লিপ্ত। তাই পুরান ঢাকার উৎসব মাত্রই ধর্মভিত্তিক দিনগুলোকে কেন্দ্র করে। তবে এতে কিন্তু উগ্র সামপ্রদায়িকতার উপস্থিতি নেই।

ঈদ নিশ্চয়ই আনন্দের উৎসব। কিন্তু ঈদে আমরা কিন্তু সমাজ জীবনে সর্বাধিক বৈষম্য দেখে থাকি। সমাজের সুবিধাভোগী এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ সুবিধাবঞ্চিতদের ক্ষেত্রে তীব্র বৈষম্য লক্ষ্য করা যায়। এককাতারে নামাজ আদায় করলেও সবার পরিধেয় বস্ত্র এক তো নয়ই, ভয়ানক মাত্রায় বৈষম্যপূর্ণ। কতিপয়ের বিত্ত-বৈভবে ভোগ-বিলাসিতার বহির্প্রকাশ ঘটে তাদের পোশাকে-আচরণে, খাওয়া-খাদ্যে ইত্যাদিতে। আমাদের সমাজে ধনী-দরিদ্রের অর্থনৈতিক বৈষম্য আকাশ-পাতাল ব্যবধানসম। রোজার মাসে যাকাত প্রদানের বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়েছে। অবশ্য যাকাত প্রদানের বিষয়টি সমাজে বৈষম্যকেই স্থায়ী করেছে। ধনীরা যাকাত দেবে আর দরিদ্ররা হাত পেতে নেবে। যাকাত আদান-প্রদানের ব্যবস্থাটি সমাজের শ্রেণী বৈষম্যকেই নিশ্চিত করেছে। বিভিন্ন বস্ত্রের দোকানে ব্যানার টাঙিয়ে যাকাতের কাপড় (শাড়ি-লুঙ্গি ইত্যাদি) বিক্রির বিজ্ঞাপন দেখা যায়। যাকাতের কাপড় মাত্রই অত্যন্ত নিম্নমানের এবং স্বল্পমূল্যের। সব দোকানি ওই স্বল্পমূল্যের এবং অতি নিম্নমানের যাকাতের বস্ত্র বিক্রি করে না। যে সব দোকানে তা বিক্রি হয়- সেসব দোকানে বিজ্ঞাপন প্রচারের আবশ্যিকতার প্রয়োজন হয়। সমাজের বিত্তশালী অংশ যাকাতের বস্ত্র বিলি বণ্টনে নিজেদের দাতারূপে জাহির করতে যে ব্যবস্থাটি অবলম্বণ করে থাকে; এতে অসহায় মানুষের পদদলিত হয়ে মৃত্যুর প্রচুর ঘটনাও ঘটে থাকে। ঈদ নিশ্চয় আনন্দ-উৎসব। তবে সবার জন্য নয়। ঈদে নজরকাড়া বৈষম্য অত্যন্ত তীব্ররূপে দেখা যায়। রোজা-ঈদ যেন বিত্তবানদের আহার-ভোজন এবং সীমাহীন ভোগ-বিলাসিতা মেটাতেই আসে। খাদ্যদ্রব্য পণ্যের বাজার অধিক মাত্রায় চড়া হওয়ার কারণে সংখ্যাগরিষ্ঠদের নাকাল অবস্থায় পড়তে হয়। ঈদের আনন্দের বার্তা সবার জন্য সমানভাবে আসে না। আসা সম্ভবও নয়। বৈষম্যপূর্ণ সমাজে তা আশা করাও মূর্খতা।

সব উৎসব-পার্বণে দুটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এক. উৎসবকে অসামপ্রদায়িক রূপে গড়ে তোলা। দুই. সমাজের অর্থনৈতিক বৈষম্য নিরসন। এই দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিশ্চিত হলেই ঈদসহ সব উৎসব-পার্বণ সর্বজনীন হবে এবং পরিপূর্ণরূপে সবার জন্য উৎসবের আনন্দ নিশ্চিত করতে পারবে। নয়তো ঈদ আসবে-যাবে, কেউ কেউ ভোগবাদিতায় ভাসবে আর সংখ্যাগরিষ্ঠরা চেয়ে চেয়ে কেবল দেখবে। উপভোগ করতে পারবে না। সেক্ষেত্রে ঈদ-পার্বণের আবেদনও পূর্ণতা পাবে না।

লেখক: মযহারুল ইসলাম বাবলা
তথ্যসূত্র: দৈনিক সংবাদ

You must be logged in to post a comment Login

মন্তব্য করুন