ঢাকার প্রথম বাংলা পত্রিকা ‘ঢাকাপ্রকাশ’

প্রকাশ: May 26, 2015
FirstPageDhakaProkash

ঢাকাপ্রকাশ বাংলাদেশের ঢাকা শহরের প্রথম বাংলা সংবাদপত্র যা বাংলা তারিখ ২৫ ফাল্গুন, ১২৬৭ (মার্চ ৭, ১৮৬১) প্রথম প্রকাশিত হয়। প্রথম প্রকাশের সময় পত্রিকার প্রচারসংখ্যা ছিল ২৫০; উনিশ শতকের নববইয়ের দশকে এ সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে হয় ৫০০০। এ থেকে সেসময়ে পত্রিকাটির জনপ্রিয়তা প্রমাণিত হয়। ঢাকা প্রকাশ প্রায় ১০০ বছর টিকে ছিল; পূর্ববঙ্গের আর কোনো পত্রিকার আয়ুষ্কাল এত দীর্ঘ ছিল না।

ঢাকার বাবুবাজারে প্রতিষ্ঠিত ‘বাঙ্গলাযন্ত্র’ নামে বাংলা মুদ্রণযন্ত্র বা প্রেস থেকে ঢাকাপ্রকাশ প্রকাশিত হয়। বাঙ্গলাযন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ঢাকার সাভারের তেঁতুলঝোড়া গ্রামের ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ব্রজসুন্দর মিত্র। প্রেস স্থাপনে তাকে আরও যারা সাহায্য করেন তাদের মধ্যে ঢাকার ধামরাইয়ের ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট দীনবন্ধু মৌলিক, মুন্সিগঞ্জের রাঢ়িখালের ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ভগবানচন্দ্র বসু (বিজ্ঞানী স্যার জগদীশচন্দ্র বসুর পিতা), ঢাকা কলেজিয়েট স্কুলের শিক্ষক ঈশ্বরচন্দ্র বসু (বিজ্ঞানী স্যার জগদীশচন্দ্র বসুর কাকা) ও মালাখানগরের ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট রামকুমার বসু অন্যতম। কারও মতে ঢাকাপ্রকাশ প্রথম আত্মপ্রকাশ করে ৭ই মার্চবৃহস্পতিবার ১৮৬১ সালে, আবার কারও মতে তারিখটি ছিল, ৮ই মার্চ ১৮৬১।

প্রথম দিকে পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠার বাঁদিকে থাকত বিজ্ঞাপন, ডানদিকে সম্পাদকীয় বা গুরুত্বপূর্ণ কোনো খবর বা বিশেষ কোনো বিষয়ের ওপর পত্রিকার নিজস্ব মতামত। পরে থাকত ‘সম্বাদাবলী’। এ বিভাগে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা থেকে সংগৃহীত বা নিজেদের সংগৃহীত সংবাদ ছাপা হতো। পত্রিকার তৃতীয় পৃষ্ঠায় কখনও বা শেষ পৃষ্ঠায় ছাপা হতো পাঠকদের চিঠিপত্র। সাপ্তাহিক পত্রিকাটি প্রতি বৃহস্পতিবার প্রকাশিত হতো। এর প্রথম পৃষ্ঠার উপরে বড় আকারে ‘ঢাকাপ্রকাশ’ এবং তার নিচে ছোট আকারে ‘সপ্তাহিক’ শব্দ লেখা থাকতো। এর নিচে থাকতো একটি ঋষি বাক্য ‘সিদ্ধিঃ সাধ্যে সমামুস্ত।’ পরে এর সাথে আরও যুক্ত হয় ‘প্রসাদাদিহ ধূর্জ্জটেঃ’। প্রথম বছরে প্রত্রিকাটি রয়েল আকারে আট পৃষ্ঠায় প্রকাশিত হত এবং ডাকমাশুল সহ বার্ষিক মূল ছিল পাঁচ টাকা।

ঢাকা প্রকাশের প্রথম সম্পাদক ছিলেন কবি কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদার। পরিচালকগণের মধ্যে প্রধান ছিলেন ব্রজসুন্দর মিত্র, দীনবন্ধু মৌলিক, ঈশ্বরচন্দ্র বসু, চন্দ্রকান্ত বসু প্রমুখ। কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদারের পর দীননাথ সেনের পরিচালনায় পত্রিকা প্রকাশিত হয়। এ সময় বৃহস্পতিবারের পরিবর্তে শুক্রবারে পত্রিকা প্রকাশিত হতে থাকে। চতুর্থ বর্ষের ২৩ থেকে ৩৬ সংখ্যা পর্যন্ত দীননাথ পরিচালনা করেন। পরে সে ভার অর্পিত হয় জগন্নাথ অগ্নিহোত্রী ও গোবিন্দপ্রসাদ রায়ের ওপর। পঞ্চম বর্ষ থেকে শুক্রবারের বদলে ঢাকা প্রকাশ রোববারে প্রকাশিত হতে শুরু করে।

রাজনৈতিক বিষয়ে পত্রিকাটি সব সময় মধ্যপন্থা অবলম্বন করত এবং শাসক ও শাসিতের মধ্যে শান্তি স্থাপনের চেষ্টা করত। এর ফলে বঙ্গভঙ্গ এবং স্বদেশী আন্দোলনের সময় পত্রিকাটিকে অনেক বিপদের সম্মুখীন হতে হয়।

ঢাকা প্রকাশ একটি প্রভাবশালী পত্রিকা ছিল, যার মতামতকে সরকার গুরুত্ব দিত। উনিশ শতকে পূর্ববঙ্গ থেকে যেসব সংবাদপত্র ও সাময়িকী প্রকাশিত হতো সেসবের মধ্যে প্রায় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ঢাকা প্রকাশের সংবাদ এবং মতামতকেই রিপোর্ট অন দ্য নেটিভ পেপারস গুরুত্বসহকারে উদ্ধৃত করত।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগারে, ‘ঢাকাপ্রকাশ’ এর সর্বশেষ সংখ্যাটির তারিখ ১২-৪-১৯৫৯। সম্পাদক আবদুর রশীদ খান। প্রকাশিত হয় ৫৯/৩ কিতাব মঞ্জিল, ইসলাম পুর থেকে। বিশ শতকের ষাটের দশকে পত্রিকাটির প্রকাশ বন্ধ হয়ে যায়। ঢাকাপ্রকাশ তার পাঠকপ্রিয়তার কারণে পরবর্তি প্রায় ১০০ বছর ধরে প্রকাশিত হয়। পত্রিকাটি প্রকাশের পরে প্রচার সংখ্যা ছিল আড়াইশো। পরবর্তিতে উনিশ শতকের নব্বই দশকে সে সংখ্যা দাঁড়িয়ে ছিল পাঁচ হাজারে।

সূত্র: বাংলাপিডিয়াউইকিপিডিয়া

You must be logged in to post a comment Login

মন্তব্য করুন