ঢাকার প্রথম মুসলিম নারী চিত্রশিল্পী: মেহের বানু খানম

প্রকাশ: May 13, 2015
femPaintd

প্রায় শত বছর আগে একজন নারীর, তা-ও আবার রক্ষণশীল সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবার থেকে চিত্রশিল্পী হওয়ার স্বপ্ন বাস্তবে রূপ দেওয়া মোটেই সহজ ছিল না। তখন রক্ষণশীল ধ্যানধারণা পোষণের ফলে বিশেষ করে নারীদের সাংস্কৃতিক চর্চার ক্ষেত্রটি ছিল রুদ্ধ। সাধারণ নিয়মানুযায়ী ঢাকার নবাববাড়ির মেয়েদের অন্দরমহলই ছিল একমাত্র ঠিকানা। কিন্তু শিল্প সৃষ্টির প্রেরণা যদি একবার সত্তায় জেগে ওঠে, তবে তাকে অবদমন করা সত্যিই কঠিন। আর তাই রক্ষণশীল পরিবার ও সমাজের বাধা অতিক্রম করে নিজেকে চিত্রশিল্পী হিসেবে প্রকাশ করতে পেরেছিলেন মেহের বানু খানম।

ঢাকার নবাব খাজা আহসানউল্লাহর কন্যা মেহের বানু খানমের (নবাব সলিমুল্লাহর ছোট বোন) মায়ের নাম ছিল কামরুন্নেসা খানম। মেহের বানুর জন্ম কবে, সে বিষয়ে সঠিক তথ্য পাওয়া যায়নি। লেখক অনুপম হায়াৎ অনুমান করেন, তাঁর জন্ম ১৮৮৫-৮৮ সালের মধ্যে। হায়াৎ তাঁর পুরনো ঢাকার সাংস্কৃতিক প্রসঙ্গ গ্রন্থে উল্লেখ করেন, ‘তাদের বাড়িতে ছিল দেশ-বিদেশের বহু খ্যাতনামা চিত্র শিল্পীর আঁকা ছবির সংগ্রহ। ছিল অনেক সচিত্র বই-পুস্তক, পত্র-পত্রিকা। তিনি এখান থেকেই অঙ্কন চর্চা শুরু করেন। তবে তাঁর অঙ্কন চর্চায় কখনো কোনো জীবজন্তুর অস্তিত্ব থাকতো না। তিনি সব সময়ই প্রকৃতি ও ইসলামের ধর্মীয় চেতনাকে তাঁর শিল্পসত্তায় ধরে রাখতেন।’
2011-07-09-17-20-09-071997500-5
দুঃখজনক বিষয় হলো, মোসলেম ভারত-এ প্রকাশিত ছবি দুটি বাদে মেহের বানুর আঁকা আর কোনো ছবি এখনো খুঁজে পাওয়া যায়নি। তবে মেহের বানুর চিত্রাঙ্কনরত অবস্থার একটি আলোকচিত্র পাওয়া যায়। তাতে দেখা যায়, তিনি ইজেলের ওপরের দিকে সেঁটে রাখা একটি চিত্রের অনুকরণে ঠিক নিচেই আরেকটি কাগজে ছবি আঁকছেন। লক্ষ করলে বোঝা যায়, এটি নদীতে একটি নৌকার দৃশ্য। আলোকচিত্রে দৃশ্যমান চিত্রটি এবং প্রকাশিত অন্য চিত্র দুটি বিবেচনা করলে বোঝা যায় যে তিনি ‘ল্যান্ডস্কেপ’ই বেশি আঁকতেন। এই তিনটিই নদীর দৃশ্য। সুতরাং নদী ও নৌকা, সম্ভবত, তাঁর আঁকা ছবিতে বারবার এসে থাকবে। এ সবই অনুমান মাত্র। মেহের বানুর আরও ছবি পাওয়া গেলে তাঁর ছবির বিষয় ও মান সম্পর্কে একটা ধারণা তৈরি হওয়া সম্ভব হবে।

2011-07-09-17-20-33-003320000-6
সম্ভবত, ১৯১২-১৩ সাল থেকে মেহের বানু ছবি আঁকা শুরু করেন। মেহের বানুর বিয়ে হয় ২৫ পৌষ ১৩০৮ বাংলা সালে অর্থাৎ ১৯০২ সালে। তাঁর স্বামী খাজা মোহাম্মদ আজম ছিলেন একজন সাহিত্যিক এবং ঢাকার পঞ্চায়েত সরদারদের তত্ত্বাবধায়ক। ঢাকার ওপর একটি উল্লেখযোগ্য বই দ্য পঞ্চায়েত সিসটেম অব ঢাকা তাঁরই লেখা। এ জন্য সংস্কৃতিমনা স্বামীর কাছ থেকে মেহের বানু শিল্পসাধনায় সহযোগিতা ও অনুপ্রেরণা পেয়েছিলেন।
এই সংস্কৃতিমনা পরিবারের পরবর্তী প্রজন্মের সন্তানেরাও ঢাকার ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে সেই সময়ে বিশেষ অবদান রেখেছিলেন। তাঁর এক ছেলে খাজা মোহাম্মদ আদিল ছিলেন ঢাকার বিখ্যাত উর্দু সাহিত্যিক ও জাদু পত্রিকার সম্পাদক। খাজা আদিল ও তাঁর ভাই খাজা আজমলের উদ্যোগে ঢাকায় ১৯২৯-৩১ সালে ঢাকার প্রথম চলচ্চিত্র দ্য লাস্ট কিস ও সুকুমারী নির্মিত হয়। দ্য লাস্ট কিস-এর নায়ক ছিলেন খাজা আজমল নিজেই।
মেহের বানু খানম ১৯২৫ সালের ৩ অক্টোবর ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন। তাঁকে দিলখুশা মসজিদের পূর্ব পাশে নবাব পরিবারের কবরস্থানে সমাহিত করা হয়। এ পর্যন্ত পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তিনিই ঢাকার প্রথম নারী চিত্রশিল্পী।

You must be logged in to post a comment Login

মন্তব্য করুন