তাজিয়া মিছিল

প্রকাশ: May 7, 2015
75621_33_169300

তাজিয়া কারবালার যুদ্ধে নিহত হযরত মুহাম্মদ (স.)-এর দৌহিত্র ইমাম হুসায়ন (রা.)-এর সমাধির প্রতিকৃতি। আরবি ‘তাজিয়া’ শব্দটি উর্দু ও ফারসি ভাষায়ও প্রচলিত এবং এর সাধারণ অর্থ শোক ও সমবেদনা প্রকাশ করা। তবে বিশেষ অর্থে শিয়া সম্প্রদায়ের মধ্যে শোকাবেগসঞ্চারী অনুষ্ঠানকেও তাজিয়া বলা হয় এবং ইমাম হুসায়ন (রা.)-এর শাহাদত লাভের বিষাদময় স্মৃতির উদ্দেশ্যে তা পালিত হয়।

শিয়া সম্প্রদায় মুহররম মাসের প্রথম দশদিন কারবালার ঘটনা উপলক্ষে শোক পালন করে এবংআশুরা বা দশম দিনে ইমাম হুসায়ন (রা.)-এর সমাধির প্রতিকৃতি নিয়ে মিছিল করে, কারণ এদিনই তিনি শাহাদত লাভ করেন। তাজিয়া নিয়ে মিছিল করার কারণে এর নাম হয়েছে তাজিয়া মিছিল।

শিয়ামতবাদের উদ্ভব ইরাকে ও ইরানে হলেও সেখানে এরূপ শোকমিছিলে তাজিয়া বহন করা হয় না। ভারতীয় উপমহাদেশে কখন থেকে তাজিয়া মিছিলের প্রবর্তন হয়, তা সুনির্দিষ্টভাবে জানা যায় না। বাংলাদেশে মুগল আমলে বিশেষত শাহ সুজা (১৬৩৯-১৬৫৯) বাংলার সুবেদার থাকাকালে শিয়াদের প্রভাব বৃদ্ধি পায়। সম্ভবত তখনই এখানে তাজিয়া মিছিলের প্রচলন হয়। শাহ সুজার সময়ে সৈয়দ মীর মুরাদ ১০৫২ হিজরি সনে (১৬৪২ খ্রি.) ঢাকার ঐতিহাসিক হোসেনী দালান নির্মাণ করেন। ঢাকার নায়েব-নাজিমদের অধিকাংশ ছিলেন শিয়া। তাঁদের দ্বারা দেশের বিভিন্ন স্থানে ইমামবারা নির্মিত হয়।

তাজিয়া মিছিলের কয়েকটি লক্ষণীয় দিক হলো: ১. হযরত হুসায়ন (রা.)-এর সমাধির প্রতিকৃতি বহন করা; এটি কাঠ, কাগজ, সোনা, রূপা, মারবেল পাথর ইত্যাদি দিয়ে তৈরি করা হয়; ঢাকার হুসেনী দালানের তাজিয়াটি কাঠ ও রূপার আবরণ দিয়ে তৈরি, যা নবাব সলিমুল্লাহ দান করেন। তাজিয়া মিছিলে মাতম করা, বুক চাপড়ানো ও জিঞ্জির দিয়ে পিঠের ওপর আঘাত করে রক্তাক্ত করা হয়।তাজিয়া মিছিলের অগ্রভাগে আলম বহনকারী বাহিনীর পেছনে থাকে বাদ্যকর; তৎপশ্চাতে কয়েকজন লোক লাঠি ঘোরাতে ঘোরাতে ও তরবারি চালাতে চালাতে অগ্রসর হয়। এ সময় দুটি শিবিকাসহ অশ্বারোহী সৈন্যের সাজে কয়েকজন লোক শোক প্রকাশ করতে করতে অগ্রসর হয় এবং তার পেছনে একদল গায়ক শোকগান গাইতে থাকে; পরে থাকে হুসায়ন (রা.)-এর সমাধির প্রতিকৃতি। এভাবে মিছিলটি নিয়ে লোকজন সম্মুখে অগ্রসর হয় এবং একটি পূর্ব নির্ধারিত স্থানে গিয়ে তা শেষ হয়।

তাজিয়া মিছিল ঢাকার কয়েকটি জায়গা থেকে বের হয়। যাদের মধ্যে মোহাম্মদপুর ও মিরপুরে বড় তাজিয়া মিছিল হয়। মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্প এলাকায় অনুষ্ঠানাদি শুরু হয় ১ মহররম থেকেই। প্রতিটি এলাকায় তাজিয়া তৈরির হিড়িক পড়ে। এখানে তাজিয়া তৈরি করা হয় ইমাম হোসেনের মাজারের আদলে। এখানে শরীর ক্ষত করার আচার থাকে না। তবে মুখে কেরোসিন নিয়ে আগুনের ফুলকি তৈরির খেলা চলে। এ মিছিলে সাধারণত জেনেভা ক্যাম্পের বিহারিরা অংশগ্রহণ করেন। মিরপুর ১১ নম্বরে বিহারি ক্যাম্পগুলোয় ১ মহররম থেকেই আশুরার আমেজ দেখা যায়। লাল-সবুজ-কালো নিশানে ছেয়ে যায় প্রতিটি মহল্লা। তরুণরা লাল-সবুজ পোশাকে থাকে এ ক’দিন। এছাড়া পুরান ঢাকার ফরাশগঞ্জের বিবিকা রওজা, পুরানা পল্টন ও মগবাজার থেকেও বের হয় মিছিল।

বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধেও এ মিছিলের যে জাঁকজমক ছিল তা বিভিন্ন কারণে আজ হ্রাস পেয়েছে। আগে তাজিয়া বিসর্জন হতো কারবালার ঝিলে (পুরানা পল্টন লাইনের কাছে), সে ঝিল এখন আর নেই। ঢাকার বাইরেও এর উৎসব হয়ে থাকে। যাদের মধ্যে আছে কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম, মানিকগঞ্জের গড়পাড়া, নীলফামারীর সৈয়দপুর, কুষ্টিয়া, পাবনার ঈশ্বরদী, খুলনার খালিশপুরসহ আরও অনেক জায়গা। এ উপলক্ষে উৎসবস্থলের আশপাশে মেলা বসে।

You must be logged in to post a comment Login

মন্তব্য করুন