দোলাই-বুড়িগঙ্গা তীরে হাজার বছরের ঢাকা

প্রকাশ: June 22, 2015
dhaka burigonga

লেখক: মো. আদনান আরিফ সালিম

দুটি নদী, যার একটিকে ভুল করে ডাকা হয় খাল, অন্যটি প্রচলিত নাগরিক ভাষ্যে নদ। সেই দোলাই-বুড়িগঙ্গার তীরেই বিকাশ ঘটেছিল ঐতিহ্যের ঢাকা নগরীর। দ্বিধা-দ্বন্দ্বে পড়তে হয় সবাইকে, কী নামে ডাকব তাকে, হাজার বছরের নগরী, প্রাচীন এক রাজধানী শহর, দূষণে বসবাসের অযোগ্য, যানজটে অতিষ্ঠ এক দুর্ভাবনার মহানগর নাকি অন্য কোনো উপমায়? যে নামেই পরিচয় করানো হোক না কেন; ইতিহাস-ঐতিহ্যে, বিস্তৃতিতে, নাগরিক জীবনের প্রসারিত মঞ্চ হিসেবে এর গুরুত্ব একবাক্যে বলার নয়। ইতিহাস, অবস্থান, বিস্তৃতি; যেদিক থেকেই বর্ণনা করা হোক না কেন, ঢাকা রয়েছে ঠিক তার মতো করেই; যার প্রতিটি পদে আছে অনিশ্চয়তার শিহরণ। বয়সকেন্দ্রিক অনিশ্চয়তার কথায় ধরা যাক না। কিছু ইতিহাস গবেষক প্রত্নতাত্ত্বিক সূত্রগুলোকে আমলে না এনে প্রচার শুরু করলেন, ঢাকার বয়স মাত্র ৪০০ বছর, যার শুরুটা কিনা মোগল যুগ থেকেই। এদিকে ইতিহাসবিদ-প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষক একেএম শাহনাওয়াজ প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ও লিপি-সাক্ষ্য হাজির করে দেখালেন, ঢাকার বয়স যদি ৪০০ বছর দাবি করা হয়, সেখান থেকে হারিয়ে যাচ্ছে আরো ৪০০ বছরের বেশি সময়। তার পর নানা তর্ক-বিতর্কে এগিয়ে যেতে থাকে ঢাকার বয়স সম্পর্কিত আলোচনা। একদিক থেকে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন আবিষ্কার আর অকাট্য দলিলের উপস্থিতি, অন্যদিকে আগের দাবিতে অনড় থাকার তীব্র মানসিকতার লড়াই নতুন প্রজন্মের গবেষকদের জন্য বেশ কঠিন করে দেয় ঢাকাকেন্দ্রিক চিন্তাকে।

প্রাচীন ঢাকা বুড়িগঙ্গা, নাকি দোলাইয়ের তীরে— এ নিয়ে ওঠে নতুন এক বিতর্ক। কেউ কেউ দোলাইকে যেখানে নদী হিসেবেই স্বীকার করতে চান না, তার তীরে গড়ে ওঠা শহরকে মেনে নেয়াটাও বেশ কঠিন বৈকি। তবে ইতিহাস বলছে, সেন শাসন যুগের শেষ দিক থেকে ঢাকায় নাগরিক জীবনের শুরু। আর ১৩ শতকের শেষাংশে কিংবা ১৪ শতকের শুরুর দিকে সোনারগাঁয় যখন মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠা পায়, তার প্রভাব পড়ে ঢাকায়ও। একটু গভীরে গিয়ে চিন্তা করলে দেখা যায়, সেন যুগের শেষ ভাগ থেকেই এখনকার পুরান ঢাকায় একদিকে গড়ে উঠতে থাকে বাণিজ্য নগরী, অন্যদিকে সোনারগাঁয় মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠার পর তার সীমা ছাড়িয়ে ঢাকার দিকেও ঘটেছে বসতির বিস্তার। পরবর্তী মোগল আমল ও ইংরেজ শোষণের যুগেও ঢাকার যাবতীয় উন্নতি-সমৃদ্ধি বেশি দেখা যায় পুরান ঢাকাকে ঘিরে।

আজকের রাজধানী ঢাকায় নাগরিক বিকাশ বিশ্লেষণ করতে গেলে স্থানিক পরিসরে এর ভৌগোলিকতা, বিশেষত জালের মতো ছড়িয়ে থাকা নদ-নদী ও খালগুলো অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল, নিঃসন্দেহে বলা যেতে পারে। জেলা গেজেটিয়ার ও ঢাকার প্রাচীন ভৌগোলিক মানচিত্র থেকে দেখা শহরটির আশপাশে বেশ কয়েকটি খাল ছিল, যার বেশির ভাগ এখন ভরাট হয়ে গেছে। আজ থেকে মাত্র দেড় দশক আগেও পুরান ঢাকায় ঐতিহ্যবাহী ধোলাই খালের উপস্থিতির কথা জানা গেছে নানা সূত্রে। নতুন রাস্তা নির্মাণে এখন ভরাট হয়ে গেছে নদীটির সিংহভাগ। ঢাকায় মানববসতি ও নাগরিক জীবনের বিকাশ নিয়ে আলোচনা করতে গেলে ঐতিহ্যের ধোলাই সম্পর্কে উপযুক্ত আলোকপাতও বেশ জরুরি।

জনপ্রিয় আখ্যানগুলো সামনে রেখে রচিত ইতিহাস যেমন ঢাকার প্রকৃত বয়স বিকৃতির জন্য দায়ী, তেমনি এর নাগরিক বিন্যাসে অহেতু বুড়িগঙ্গানির্ভর বিবরণের প্রবণতা ঐতিহ্যিক মূল্যকেও খণ্ডিত করেছে। বোদ্ধা মহলে বিতর্ক দেখা দিয়েছে, দোলাই আসলে খাল নাকি নদী! এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজে নেয়াটা অন্তত ঢাকার প্রকৃত ইতিহাস নির্মাণে বেশ গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাপিডিয়া চতুর্থ খণ্ডে মোগল সুবাদার ইসলাম খান কর্তৃক ১৬০৮-১০ সালের দিকে ঢাকায় খননকৃত একটি খালকে দোলাই বলে দাবি করতে দেখা গেছে। তবে ঐতিহাসিক পরিসর থেকে নানা অনিশ্চয়তা থাকায় তথ্যটি নির্দ্বিধায় গ্রহণ করা যাচ্ছে না। লভ্য তথ্যসূত্র থেকে একটু খেয়াল করলে স্পষ্ট হয়, অন্তত ১৬০৮-০৯ খ্রিস্টাব্দে ইসলাম খানের পক্ষে ঢাকায় খাল খনন সম্ভব নয়। আমরা জানি, ইসলাম খানকে ১৬০৮ খ্রিস্টাব্দে বাংলার সুবাদার হিসেবে সবে নিয়োগ দিয়েছিলেন সম্রাট জাহাঙ্গীর। এদিকে বারোভুঁইয়াদের পরাজিত করে সুবাদার হিসেবে ঢাকায় পৌঁছতে তার ১৬১০ খ্রিস্টাব্দ লেগে যায়। বিষয়টি আমলে নিলে খাল হিসেবে দোলাইয়ের খনন প্রশ্নবিদ্ধ হতে বাধ্য।

অন্যদিকে ঐতিহাসিক সূত্রের পাশাপাশি মানচিত্র থেকে বিশ্লেষণ করে একটি প্রবন্ধে অধ্যাপক শাহনাওয়াজ দাবি করেছেন, ‘ধোলাই খাল বলে পরিচিত জলধারা এককালে একটি পরিপূর্ণ উপনদী ছিল। ঢাকার পূর্বাঞ্চলে উত্তর-দক্ষিণে প্রবাহিত হয়েছে বালু নদের ধারা। বালু শীতলক্ষ্যার শাখা নদ। শীতলক্ষ্যা থেকে বেরিয়ে উত্তরে প্রবাহিত হওয়ার আগে ডেমরার কাছে সৃষ্টি হয়েছিল নদটির উপধারা। প্রাচীন সূত্রমতে, এর নামই দোলাই নদী; যা পূর্ব থেকে পশ্চিমে ঢাকার বুক চিরে এঁকেবেঁকে পশ্চিমে বুড়িগঙ্গা নদীতে পড়েছিল। আজকের গেণ্ডারিয়া, সূত্রাপুর প্রভৃতি লোকালয় এ দোলাইয়ের তীর ধরেই গড়ে ওঠে। ১৪ শতক থেকে ২০ শতক পর্যন্ত ঢাকা নগরীর বিকাশে দোলাই “নদী” অতঃপর “খালে”র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। এ নদীকে কেন্দ্র করে ঢাকায় ব্যবসা-বাণিজ্যের বিকাশ ঘটে।’

ঐতিহাসিক বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে মূল সমস্যা উপস্থিত করে মোগল অধিকার প্রতিষ্ঠার আগেই দোলাই শুকিয়ে যেতে থাকা। বিশেষ করে তখন নদীর পূর্ব দিকের ধারা একেবারেই শুকিয়ে পশ্চিমে বুড়িগঙ্গা থেকে পূর্ব দিকে কয়েক কিলোমিটার পর্যন্ত জলধারা টিকে থাকে। এক্ষেত্রে নদী হিসেবে চেনা দুষ্কর হয়ে যাওয়া দোলাইকে রূপান্তরিত হতে দেখা যায় খালে। তার পর মূল সত্য হারিয়ে যায় অন্তরালে, পরবর্তী প্রজন্মের ঢাকাবাসী একে চিনে নিতে বাধ্য হয় দোলাই খাল হিসেবেই। প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষকরা একটি ঐতিহ্য স্থানে জরিপ পরিচালনার ঠিক আগে সেখানকার যে বিষয়গুলো নিয়ে বিশ্লেষণ করেন, তার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে টপোনিম তথা স্থান-নাম। আর সেখানে দেখা গেছে, মানুষের মুখে মুখে প্রচলিত হয়ে বিকৃতি ও রূপান্তর ঘটছে এসব স্থান-নামের। সম্ভবত ‘দোলাই’ নদী মরে যাওয়ার পর তার ইতিকথা স্থান পায়নি কোনো ইতিহাসের খেরোখাতায়। তেমনি প্রচলিত বাংলা সাহিত্যেও এর তেমন উল্লেখ না থাকায় সহজেই নামটি হারিয়ে যায় পরবর্তী প্রজন্মের কাছে; পরিচিতি পায় খাল হিসেবেই। আর সে দোলাই নদী তাই মানুষের মুখে মুখে ‘দোলাই খাল’ হিসেবে চলতে গিয়েও থমকে যায়। হয়তো ঢাকাবাসীর কাছে ‘দোলাই’ শব্দটি নির্দিষ্ট সময় পর আবেদন হারিয়ে হয়ে গেছে ‘ধোলাই’; আর তার সূত্র ধরেই জনপ্রিয় হয়েছে ‘ধোলাই খাল’ নামটি। আর জনশ্রুতিতে যেহেতু এ খালের পানিতে ধোপাদের কাপড় কাচার কথাও জানা গেছে, তা ধোলাই খাল নামকরণের যৌক্তিকতা আরো বাড়িয়ে ইতিহাসকে ঠেলে দিয়েছে বাস্তবতা থেকে যোজন যোজন দূরে।

বুড়িগঙ্গাকে একটু পেছনে ঠেলে দোলাই কেন; পাঠকের মনে সহজেই এ প্রশ্ন জাগতে পারে। কারণটা নেহাত যৌক্তিক, মোগল ও ইংরেজ শাসনামলে এ অঞ্চলের আর্থরাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে ধোলাই খালের বিশেষ গুরুত্ব ছিল। তখনকার বুড়িগঙ্গা থেকে শহরের ঠিক ভেতরে পণ্য নিয়ে আসতে ব্যবহার হতো এ খালই। বলতে গেলে ঐতিহাসিক পরিসরে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির যুগে তথাকথিত ‘ধোলাই’ খালের তথা দোলাই নদীর তীরেই জমে উঠেছিল ব্যবসা-বাণিজ্য। আর সাংস্কৃতিক দিক থেকে বিচার করলে দেখা যায়, বিভিন্ন জাতীয় উত্সবে এ খালেই আয়োজন হতো বর্ণিল বাইচ। প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষক ও ইতিহাসবিদেরা মনে করেন, ঢাকার নওয়াব ও নায়েবে নাজিমরা আয়োজন করতেন নদীকেন্দ্রিক নানা উত্সব। সম্ভবত ঈদুল ফিতরের দিনে কিংবা তার পরদিন দোলাই নদী তথা এখনকার এ খালেই বসত বাইচের জাঁকালো আয়োজন।

ঢাকা নিয়ে প্রচলিত ও জনপ্রিয় ইতিহাসের মূল সমস্যা হচ্ছে মোগল সুবাদার ইসলাম খান চিশতির ১৬১০ খ্রিস্টাব্দে ঢাকায় প্রশাসন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা-পূর্ববর্তী কোনো তথ্যপ্রমাণ না থাকা। মোগল সুবার রাজধানী হলেও ঠিক তার আগে সুলতানি শাসন যুগে এবং বারোভুঁইয়াদের আমলে সোনারগাঁ ছিল শাসনকেন্দ্র। এ থেকেই ১৬১০ সালের আগে ঢাকায় নাগরিক জীবন নিয়ে নানা বিভ্রান্তির সূত্রপাত। তবে সম্প্রতি আবিষ্কৃত প্রত্নসূত্র এবং তার আঙ্গিকে বিষয়ভিত্তিক ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ ভিন্ন সাক্ষ্য দিচ্ছে। অন্তত শিলালিপি সাক্ষ্যই নিশ্চিত করছে, ঢাকার কোনো কোনো অংশে নাগরিক জীবনের অস্তিত্ব ছিল পনেরো শতকের মাঝপর্বেই; অর্থাত্ সুলতানি শাসন যুগেই। তখনকার ঢাকায় রাজনীতি, নিরাপত্তা, যাতায়াত, বাণিজ্য থেকে শুরু করে সিংহভাগ গুরুত্বপূর্ণ কাজে অঙ্গাঅঙ্গি জড়িত হতে দেখা যায় দুটি নদীকে।

অনেক ইতিহাসবিদ আলোচনার সুবিধায় ঢাকা নগরীকে পশ্চিমে বুড়িগঙ্গা ও পূর্বে শীতলক্ষ্যা নদীর মধ্যবর্তী ভূখণ্ড হিসেবে দাবি করেন। কিন্তু একটু গুরুত্বসহকারে খেয়াল করলে দেখা যায়, সেন যুগে বিক্রমপুর যখন বাংলার রাজধানী, ঠিক তখন এই ঢাকার কাছাকাছি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল ছিল সোনারগাঁ। এর অবস্থান শীতলক্ষ্যা নদীর আনুমানিক আট কিলোমিটার পূর্বে। তবে বুড়িগঙ্গা নদীর গুরুত্ব একটু ভিন্ন আঙ্গিকে বিশ্লেষণ করা যেতে পারে। বিশেষ করে পৃথিবীর প্রায় সবক’টি প্রাচীন সভ্যতা যেখানে নদীতীরে গড়ে উঠেছিল কৃষিভিত্তিক উদ্বৃত্তকে সামনে রেখে; সেখানে নদীর পানি ও পলিনির্ভর কৃষিভিত্তিক সমৃদ্ধ জনপদ গড়ে ওঠায় বুড়িগঙ্গার ভূমিকা নেই বললে ভুল হবে না।

প্রত্নতাত্ত্বিক তথ্যসূত্র থেকে শুরু করে ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিশ্লেষণে খুব সহজে বলা যায়, বুড়িগঙ্গা নদী কৃষিনির্ভর উন্নত সমাজ গড়ে ওঠা নয়; বরং রাজধানী হিসেবে ঢাকা নগরীর পত্তনে মূল প্রণোদনা এ নদীরই। পাশাপাশি অর্থনৈতিক কার্যক্রম গতিশীল রাখার মাধ্যমে একটি সমৃদ্ধ শহরের বিকাশকেও ত্বরান্বিত করেছিল নদীটি। উন্নত যাতায়াত ব্যবস্থার পাশাপাশি সহজে পণ্য পরিবহনসহ নানা ক্ষেত্রে এর ভূমিকা উল্লেখ করার মতো। একটু খেয়াল করলেই বোঝা যায়, প্রাচীন যুগ, মধ্য যুগ ও আধুনিক যুগের ঠিক গোড়ার দিকে এ অঞ্চলে সড়কপথের বিকাশ তেমন ঘটেনি। আর তার বিকল্প হিসেবে নৌপথই ছিল যাতায়াতের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র।

রাজধানী ঢাকার বিকাশ আলোচনা করলে স্পষ্টভাবে বলতে হবে প্রায় সমান্তরালভাবে বয়ে চলা শীতলক্ষ্যা ও বুড়িগঙ্গা নদীর মধ্যবর্তী অঞ্চলের কথা। সেখানে বর্তমান ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ প্রাচীনকাল থেকেই একটি সমৃদ্ধ জনপদ হিসেবে নিজ অবস্থান নিশ্চিত করেছে। বিশেষত, ১৪ শতকের প্রাথমিক দিকে আমরা দেখি সোনারগাঁকে কেন্দ্র করে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে স্বাধীন সুলতানি বাংলার প্রাণকেন্দ্র। এদিকে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলা প্রতিষ্ঠার পর নদীকেন্দ্রিক ভৌগোলিকতাই অনেকাংশে নির্দিষ্ট করে দেয় ঢাকার গৌরব। আর আমরা জানি, বাংলার স্বাধীন সুলতানরা প্রশাসনিক প্রয়োজনে বাংলাকে দুটো প্রদেশে বা ফারসি লেখকদের উচ্চারণে ‘ইকলিমে’ বিভক্ত করেন। এর একটি ইকলিম মুয়াজ্জমাবাদ, অন্যটি ইকলিম মোবারকাবাদ। সেখানে ১৫ শতকের মধ্যভাগে বাংলার সুলতান ছিলেন নাসিরউদ্দিন মাহমুদ। তখন ইকলিম মোবারকাবাদের রাজধানী হিসেবে আজকের ঢাকার নাম শিলালিপির সাক্ষ্যে নিশ্চিত করা গেছে। অন্তত ইকলিম মোবারকাবাদের রাজধানী হিসেবে ঢাকার এ গুরুত্ব অর্জনের পেছনেও বুড়িগঙ্গার ভূমিকা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই।

ভৌগোলিক মানচিত্রে দেখা যায়, সাভারের দক্ষিণে অবস্থিত ধলেশ্বরীর সাথে বিশেষ যোগসূত্র রয়েছে বুড়িগঙ্গার। সেখান থেকে ঢাকার দক্ষিণ দিক দিয়ে প্রবাহিত হয়ে মুন্সীগঞ্জের দিকে গেছে নদীটি। সেদিক থেকে ধরা হলে ঢাকা থেকে বুড়িগঙ্গার ধারা উত্তরে ধলেশ্বরী হয়ে যমুনা ও পদ্মায় মিলিত হওয়া বিচিত্র নয়। একইভাবে দক্ষিণে ধলেশ্বরীর অন্য ধারার সঙ্গে পদ্মা ও মেঘনার যোগসূত্র হওয়াটাও স্বাভাবিক বটে। প্রশাসনিক, বাণিজ্যিক ও নিরাপত্তাগত দিক থেকে এ সুযোগ মোগল ঢাকার প্রশাসকরা ব্যবহার করতে চেয়েছেন। তবে স্থানীয় ও বহির্বাণিজ্যে বুড়িগঙ্গা এ ভূমিকা ইংরেজ শাসন যুগেও অব্যাহত ছিল বলে ধরে নেয়া যেতে পারে।

১৯ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে ঢাকার নগর কমিশনার সি.টি. বাকল্যান্ডের চিন্তাকে এক্ষেত্রে গুরুত্ব দেয়া যায়। তিনি নাগরিক সুরক্ষা থেকে শুরু করে যাতায়াত ও পরিবহন সুগম করতে বুড়িগঙ্গার তীরে বাঁধ দিয়েছিলেন। সেজন্য শুরুতে বাঁধের পরিধি ঠিক করা হয় নর্থব্রুক হল ঘাট থেকে ওয়াইজ ঘাট পর্যন্ত, যা স্থানীয় প্রশাসনের অর্থসংকটে বাস্তবায়ন করা যায়নি। শেষ পর্যন্ত তা ঢাকার জমিদার নবাব খাজা আবদুল গণি এবং ভাওয়াল জমিদার কালীনারায়ণ রায়ের পাশাপাশি ঢাকার অনেক ধনাঢ্য ব্যক্তির অর্থ সাহায্যে নির্মিত। প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ও ঐতিহাসিক সূত্র থেকে বিশ্লেষণ করতে গেলে ঢাকায় নাগরিক জীবনের বিকাশ সম্পর্কিত এমন অজস্র তথ্যসূত্রের দেখা মেলে। এক্ষেত্রে নগর ঢাকার নদীকেন্দ্রিকতা বিশেষ গুরুত্বের দাবিদার। ঐতিহাসিক পরিসর থেকে রাজধানী ঢাকার বসতি বিন্যাস, জীবনযাত্রা, অর্থ-বাণিজ্য— এর সবকিছুর সঙ্গেই যোগসূত্র রয়েছে এ নদীর। অন্যদিকে বসতি বিন্যাসের সূত্র থেকে বিশ্লেষণ করলে লিনিয়ার ও ক্লাস্টার শেপের যে আবাস নির্মাণ পদ্ধতি নদীতীরে গড়ে ওঠা, ঢাকায় তার দুটি দিকেরই দেখা মেলে।

লেখক: পিএইচডি গবেষক, প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

সূত্র: বণিক বার্তা

You must be logged in to post a comment Login

মন্তব্য করুন