নারিন্দা খ্রিস্টান কবরস্থান

প্রকাশ: June 2, 2015

বলধা গার্ডেনের সামনে খ্রিস্টান কবরস্থান যারা দেখেছেন তাদের একটা বিশাল অংশই ভিতরে ঢুকে দেখেননি কী আছে সেখানে। অবশ্য ঢোকার দরজা বেশীরভাগ সময়ই বন্ধ হয়ে থাকে, এবং ঢুকতে ব্যাপটিস্ট চার্চের অনুমোদন লাগে।

christian cemetery 1

ভারতবর্ষে ঔপনিবেশিক ইউরোপিয়ান শক্তি অনেকগুলোই ছিল, কিন্তু অভিবাসী বোধহয় শুধু আর্মেনিয়ানরা। তারা বঙ্গভুমিকে পদানত করে শোষন করতে নয়, এখানে থাকতে এসেছিল। তাই বিয়ে এবং আরো অন্যান্য ভাবে স্থানীয়দের সাথে সম্পূর্নভাবে মিশে যায়। ঢাকার আরমানীটোলা কিংবা এই অংশতেই তাদের বেশিরভাগ বাড়ি করে স্থায়ী হয়। আর্মেনিয়ানরা খ্রিস্টান ছিল কিন্তু নবাবী আমলে স্থানীয় মুসলমানদের অনেক সংস্কৃতিকে তারা নিজের মত করে নেয়। মূলত ঢাকার আর্মেনিয়ান এবং অন্যান্য খ্রিস্টানরা শেষ ঠিকানা হিসাবে ব্যাবহার করত এই কবরস্থান। ১৭৫৭ সালে ইস্টইন্ডিয়া কোম্পানী নবাব সীরাজউদ্দৌল্লাহর কাছ থেকে বাংলা ছিনিয়ে নেবার পরেও এরা স্থানীয়দের মতই বাস করতে থাকে, ততদিনে স্থানীয়দের সাথে তারা আরও ভালোভাবে মিশে যেতে পেরেছিল। ইংরেজ, ডাচ, ফ্রেঞ্চ সবাই এই আর্মেনিয়ান কবরস্থান ব্যবহার করত।

নবাবী আমলে কিংবা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর যুগে সম্ভ্রান্তদের কবর গুলো মন্দির কিংবা এরকম প্রাচ্য স্টাইলের হত

নবাবী আমলে কিংবা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর যুগে সম্ভ্রান্তদের কবর গুলো মন্দির কিংবা এরকম প্রাচ্য স্টাইলের হত

ইংরেজ শাষনামলে কবরে ভাষ্কর্য রাখা মনে হয় জনপ্রিয় ছিল

ইংরেজ শাষনামলে কবরে ভাষ্কর্য রাখা মনে হয় জনপ্রিয় ছিল

christian cemetery 4

কবরস্থানের মুল গেইট দিয়ে ঢুকে কেয়ারটেকারের রুমের পাশ দিয়ে সোজা একটা রাস্তা চলে গেছে। একটু সামনে গেলে সাদা বিশাল তোরন চোখে পড়বে। হয়তো একসময় এটাই মুল দরজা ছিল। বিশালাকৃতির ভেতরের গেইটটির স্থাপত্যশৈলীও অসাধারণ। এ কবরস্থানের সবচেেয় পুরনো কবরটি ইংরেজ কুিঠর প্রধান ন্যাথানিয়েল হলের (১৩ সেপ্টম্বের, ১৭২৫), এরপর এখানে সমাহিত হন কম্পানির রাইটার সি ওয়ার্টকন্সি (২৫ জুন, ১৭২৬) এবং কলম্বো সাহেব (১৭২৮- ১৮২৪ সালে বিশপ হেবার ঢাকায় এলে পরর্দিশন করছেলেন এ স্থান। কিছু কিছু সমাধি বেশ সুন্দর। শুরুর দিকের কবর গুলো অনেক অনেক প্রাচীন। এখানেই অনেক গুলো কবর আছে যেগুলো ইউরোপিয়ানরা বাংলা দখল করতে পারারও আগের। বাম দিকে বাউন্ডারী ওয়াল বরাবর আরো কিছু কবর আছে। এগুলো মোটামুটি ১৮৩০-১৯৩০ এর মধ্যে। এই কবরগুলোর মধ্যে খ্রিস্টান ঐতিহ্য অনুসারে উচুমানের কিছু কারুকায করা স্তম্ভ ও মুর্তি আছে। যেমন এলিজাবেথ নামের এক মহিলার কবরে মা মেরীর ক্রন্দনরত ভাস্কর্যটি সবার চোখে পড়ার মত। কিংবা মাঝামাঝি যায়গায় তিনজন হোলি সৌলের হাটু গেঁড়ে থাকা ভাস্কর্য। পুরাতন কবরগুলোতে একটা আকর্ষনীয় বৈশিষ্ট আছে। তারা কবরগুলোর সৌধ প্রাচীন ভারতীয় ঐতিহ্য অনুসরণ করে বানাতো। অনেকটা মন্দির কিংবা নবাবী স্টাইলের।

এটা ঢাকায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর প্রথম গভর্নরের কবর, কবরটা বহুতলা, পলাশীর যুদ্ধের আগের তারিখ এপিটাফে

এটা ঢাকায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর প্রথম গভর্নরের কবর, কবরটা বহুতলা, পলাশীর যুদ্ধের আগের তারিখ এপিটাফে

কবর স্থানের শেষ দিকটা (বলধা গার্ডেনের দিকে) আধুনিক। সদ্য জন্মানো শিশুর কবর থেকে স্থানীয় বৃদ্ধ, সবার কবর। পাকিস্তান আমল থেকে বর্তমান যুগ পর্যন্ত অনেক কবর আছে। এগুলো মুলত আধুনিক সেমিটারীর মত সাদা ক্রস দিয়ে বানানো।

christian cemetery 6

ভ্যান ট্যাসেলের কবর:
জিনেট ভ্যান ট্যাসেল ছিলেন একজন অসীম সাহসী এবং বিশ্বখ্যাত মার্কিন মহিলা আস্ট্রোনট। নিউ মেক্সিকোতে জন্মানো এই নারী বেলুনে করে আকাশে নানা রকম খেলা দেখাতেন। এবং এভাবে অনেক সুনাম অর্জন করার পর ব্রিটিশ শাসিত ভারতবর্ষে আসেন। পরবর্তীতে ঢাকার নবাব বাড়িতে বেলুন উড্ডয়ন করার সময় দুর্ঘজটনায় নিহত হন ১৮৯২ সালের ১৬ই মার্চ। ঢাকার নবাবের নির্দেশে তাঁকে এই কবরস্থানে সমাহিত করা হয়।

জানা যায়, প্রতিবছর নভেম্বররে দুই তারিখে আয়োজন করা হয় কবর আর্শীবাদের। সেদিন সমাহিত প্রায় সবারই আপনজনরা এখানে আসেন। কাকরাইলের ঢাকা খ্রিস্টান সিমিটারি বোর্ড এর পরিচালনা করছে । রাজউকের সংরক্ষিত স্থাপনার তালিকায়ও রয়েছে এর নাম।

সূত্র: সামহোয়ার ইন ব্লগ -এ সৌম্যের প্রতিবেদন।

You must be logged in to post a comment Login

মন্তব্য করুন