পথ গড়েছেন লীলা নাগ

প্রকাশ: June 11, 2015
Leela Naag

লীলা নাগ একজন বাঙালি সাংবাদিক, জনহিতৈষী এবং রাজনৈতিক আন্দোলনে সক্রিয় ব্যক্তি ছিলেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম নারী শিক্ষার্থী ছিলেন। তিনি নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর সহকারী ছিলেন।

লীলা নাগ ১৯০০ সালের ২১ অক্টোবর জন্মগ্রহণ করেন। পিতা গিরীশচন্দ্র নাগ অবসর প্রাপ্ত ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন। তার পিতৃ-পরিবার ছিল তৎকালীন সিলেটের অন্যতম সংস্কৃতমনা ও শিক্ষিত একটি পরিবার। ১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দে লীলা নাগ বিয়ে করেন বিপ্লবী অমিত রায়কে।

১৯০৫ সালে আসামের দেওগর বিদ্যালয়ে লীলা নাগের শিক্ষা জীবনের শুরু। সেখানে দুবছর অধ্যয়নের পর ভর্তি হন কলকাতার ব্রাহ্ম গার্লস স্কুলে। ১৯১১ সালে ঢাকার ইডেন হাইস্কুলে ভর্তি হন। ১৯১৭ সালে ওই স্কুল থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষায় কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হন। ১৯১৭ সালে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণের পর লীলা নাগ উচ্চশিক্ষা গ্রহণের জন্য কলকাতার বেথুন কলেজে ভর্তি হন। কলেজে শিক্ষাকালীন ‘বড়লাট’ কে নতজানু হয়ে অভিবাদন জানানোর প্রথা বাতিলের আন্দোলনে তিনি নেতৃত্ব দেন। ১৯২১ সালে তিনি কলকাতার বেথুন কলেজ থেকে বি.এ পাশ করেন। পরীক্ষায় তিনি মেয়েদের মধ্যে প্রথম স্থান অধিকার করেন এবং পদ্মাবতী স্বর্ণ পদক লাভ করেন। ১৯২১ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যাল়য়ে ইংরেজি বিষয়ে এমএ ভর্তি হন। ১৯২৩ সালে তিনি দ্বিতীয় বিভাগে এমএ ডিগ্রী লাভ করেন। তিনিই ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম এমএ ডিগ্রীধারী। তখনকার পরিবেশে সহশিক্ষার কোনও ব্যবস্থা ছিল না বলে লীলা রায়ের মেধা ও আকাঙ্খা বিচার করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ভাইস চান্সেলর ডঃ হার্টস তাকে পড়ার বিশেষ অনুমতি প্রদান করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী থাকাবস্থায় তিনি কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র ও ঋষি রামানন্দের সান্নিধ্য লাভ করেন। ১৯২৩ সালে লীলা নাগ ইংরেজি বিষয়ে দ্বিতীয় বিভাগে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনিই ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম এমএ ডিগ্রীধারী।

১৯২৩ সালের ডিসেম্বর মাসে নারীশিক্ষা প্রসারের মূল উদ্দেশ্য নিয়ে লীলা নাগ দীপালি সঙ্ঘ নামে নারীদের একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। দীপালি সঙ্ঘের সাহায্য নিয়ে তিনি দীপালি স্কুল নামে একটি স্কুল ও অন্য বারোটি ফ্রি প্রাইমারি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি নারীশিক্ষা মন্দির ও শিক্ষাভবন নামে পরিচিত অন্য দুটি স্কুলও প্রতিষ্ঠা করেন। মুসলমান নারীদের শিক্ষায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। ঢাকায় তাঁর প্রতিষ্ঠিত একটি স্কুল (দীপালি- ১) পরবর্তীকালে কামরুন্নেসা গার্লস স্কুল হিসেবে পরিচিত হয়।

১৯২৫ সালে শ্রীসঙ্ঘ নামে অভিহিত একটি বিপ্লবী দলের সদস্য হন লীলা নাগ। ছাত্রীদের জন্য তিনি ঢাকাভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন এবং আসাম ও বাংলার অনেক স্থানে এর শাখা প্রসারিত করেন। ছাত্রীদের সুবিধার জন্য তিনি কলকাতায় একটি মহিলা হোস্টেল প্রতিষ্ঠা করেন। ঢাকায় গোপন বিপ্লবী দলের (এগুলির মধ্যে অনুশীলন সমিতি ও যুগান্তর উল্লেখযোগ্য) সদস্য হিসেবে লীলা তাদের সাহায্য করতেন এবং এ দলসমূহ ও বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের, বিশেষত নারী বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে সংযোগকারী হিসেবে কাজ করতেন। প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের মতো সুপরিচিত নারী বিপ্লবীদের প্রেরণার উৎস হিসেবে তিনি প্রভাব রেখেছেন।

১৯২৭-২৮ সালের বিক্ষুব্ধ বছরগুলিতে, যখন নারীরা শারীরিক আক্রমণের লক্ষ্যে পরিণত হয়, তখন লীলা নাগ মহিলা আত্মরক্ষা ফান্ড নামে একটি ফান্ড গঠন করেন, যা ছিল এ অঞ্চলে প্রথম মার্শাল আর্ট পদ্ধতিতে আত্মরক্ষামূলক দলের একটি। সাধারণ জনতার পর্যায়ে নারী শিক্ষা বিস্তারের জন্য তিনি গণ শিক্ষা পরিষদ নামে পরিচিত একটি প্রতিষ্ঠানও গঠন করেন।

১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর লীলা নাগ ও অনিল রায় দম্পতি পূর্ববঙ্গে বসবাস করার উদ্যোগ নেন। তিনি কাজ করেছিলেন পূর্ব বাংলার সংখ্যলঘু রক্ষা ও শরণার্থীদের পুনর্বাসনে। সক্রিয় ছিলেন রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে। এ সময়ে সুফিয়া কামাল কোলকাতা থেকে ঢাকায় শরনার্থী হয়ে আসলে লীলা নাগ তাকে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। তার উদ্যোগে গঠিত হয়েচিল পূর্ব পাকিস্তান মহিলা সমিতি। কিন্তু তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান মুসলিমলীগ সরকারের কোপানলে পরে ১৯৫১ সালের দিকে লীলা নাগ ও অনিল রায় দম্পতিকে জোরপূর্বক দেশত্যাগে বাধ্য করে। ১৯৫১ সালে তৎকালীন ভারত সরকার উদ্বাস্তু উচ্ছেদের বিল আনেন। এ বিলের প্রতিবাদ করায় গ্রেফতার হন লীলা নাগ।

১৯৫২ সালে লীলা নাগের স্বামী অনিল রায় ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। বিয়ের মাত্র ১৩ বছরের মাথায় অকাল বৈধব্য এবং দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রামের সাথী স্বামী অনিল রায়কে হারিয়ে শারীরিক ও মানসিকভাবে বিপর্যস্থ হয়ে পড়েন তিনি। অল্পদিনের মধ্যে গভীর শোককে কাটিয়ে ওঠে তিনি সমাজ বিপ্লবের সংগ্রামকে বেগবান করার কাজ শুরু করেন। ১৯৫৩ সালে তিনি জয়প্রকাশ নারায়নের সমাজবাদী শিবিরে যোগ দেন।
বাঙালি নারীদের মধ্যে শিক্ষা বিস্তারে লীলা নাগ বিশেষ ভুমিকা পালন করেছেন। তিনি ঢাকার আরমানীটোলা বালিকা বিদ্যালয়, কামরুন্নেসা গার্লস হাই স্কুল এবং শেরে বাংলা বালিকা মহাবিদ্যালয় (তৎকালীন নারীশিক্ষা মন্দির) প্রতিষ্ঠা করেন। ভারত বিভাগের পর লীলা নাগ কলকাতায় চলে যান এবং সেখানেও কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন।

১৯৬৪ সালের ২৫ মার্চ ‘পূর্ববাংলা বাঁচাও কমিটি’র আন্দোলনে নেতৃত্ব দেবার অপরাধে পুলিশ লীলা নাগকে গ্রেফতার করে। ১৯৬৬ সালে মুক্তিলাভের পর তিনি শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েন। ১৯৬৮ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি সকালে তিনি সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়লে তাঁকে কোলকাতার পি.পি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ২৩ দিন পর সংজ্ঞা ফিরে এলেও বন্ধ হয়ে যায় তাঁর বাকশক্তি। শরীরের ডান অংশ সম্পূর্ণভাবে অচল হয়ে যায়। এ অবস্থায় আড়াই বছর চলার পর ১৯৭০ সালের ১১ জুন ভারতে উপমহাদেশের মহীয়সী নারী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ছাত্রী, বাংলা ভাষায় মহিলা সম্পাদিত প্রথম পত্রিকা মাসিক ‘জয়শ্রী’র সম্পাদক, ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের অগ্নিকন্যা বিপ্লবী লীলা নাগ ৬৯ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

You must be logged in to post a comment Login

মন্তব্য করুন