পায়রা পুষতে ভুলে গেছে ঢাকার তরুণরা

প্রকাশ: May 20, 2015
Untitled-1

উঁচু উঁচু দালানকোঠা যেমন নীল আকাশ আর দিগন্ত কেড়ে নিচ্ছে শহুরে মানুষদের জীবন থেকে তেমনি কেড়ে নিচ্ছে অনেক ঐতিহ্য আর সংস্কৃতিও৷ ঢাকার তরুণদের কাছে পায়রা পোষা আর পায়রা ওড়ানোর প্রতিযোগিতা ছিল দারুণ আকর্ষণীয় এক ব্যাপার৷

উঁচু উঁচু দালানকোঠা যেমন নীল আকাশ আর দিগন্ত কেড়ে নিচ্ছে শহুরে মানুষদের জীবন থেকে তেমনি কেড়ে নিচ্ছে অনেক ঐতিহ্য আর সংস্কৃতিও৷ ঢাকার তরুণদের কাছে পায়রা পোষা আর পায়রা ওড়ানোর প্রতিযোগিতা ছিল দারুণ আকর্ষণীয় এক ব্যাপার৷
বর্তমানে কিন্তু উঁচু অট্টালিকায় ঢাকাপড়া ঢাকার দিগন্তে এখন আর পায়রা উড়াতে দেখা যায় না৷ ব্যতিক্রমী রুচি-অভ্যাস আর বিশেষ সংস্কৃতি ধরে রাখার জন্য খ্যাত ‘পুরনো ঢাকা’ বা ঢাকার পুরনো অংশে একসময় খুবই জনপ্রিয় ছিল পায়রা পোষা৷ উঠতি বয়সের ছেলেদের কাছে এটা ছিল নেশার মতো৷

ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় গায়ে গা লাগিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ছোটো ছোটো দোতলা-তিনতলা বাড়ির ছাদে, বারান্দায় কিংবা কার্নিশে, চবুতরায় চোখ পড়লেই দেখা যেত পায়রার খোপ৷ ছাদের ওপর টিভি অ্যান্টেনার মতো করে বাঁশ বা কাঠের তৈরি পায়রা বসার মাঁচা৷

পায়রা পোষা আজ যে আর ফ্যাশন নয়

পায়রা পোষা আজ যে আর ফ্যাশন নয়


অনেক পরিবারের ছেলেমেয়েদের জন্যই এটা ছিল উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া একটা আবশ্যিক শখ৷ কিন্তু এখন অন্য অনেক কিছু নিয়ে ব্যস্তসমেস্ত হাল জামানার ঢাকাইয়া তরুণরা এখন আর পায়রা পোষে না৷ ঐতিহ্যবাহী এই ‘হবি’ এখন ‘আউট অফ ফ্যাশন’৷
দীর্ঘদিন ধরে পায়রা পোষার সঙ্গে যুক্ত পেশাদাররা বলছেন, অন্য অনেক বিষয়ের সঙ্গে অ্যাপার্টমেন্ট সংস্কৃতির বিকাশ এ ঐতিহ্য হারিয়ে যাওয়ার জন্য বহুলাংশে দায়ি৷ আর সমতলের ফাঁকা জমি তো উঁচু উঁচু দালানে আকাশ গিলে খাওয়ার আগেই শেষ৷ ফলে পায়রা পোষার জায়গা কোথায়৷ আর কেউ যদি বা তা পোষেও তো সেই পায়রা উড়বে কোথায় ?
মসজিদ চত্ত্বরগুলো অবশ্য এখনও পায়রাদের জন্য নিরাপদ আস্তানা

মসজিদ চত্ত্বরগুলো অবশ্য এখনও পায়রাদের জন্য নিরাপদ আস্তানা


ঘুড়ি কাটাকাটির মতো এ মহল্লা ও মহল্লার ছেলেদের মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার লড়াইয়ে আকাশে বারবার চক্কর খেয়ে গিরিবাজ, টাট্টু আরও সব বাহারি নামের পায়রা খেলা দেখাবে কোথায় ? ওই রকম খোলা আকাশও নেই, নেই পায়রার খেলা দেখতে জড়ো হওয়া আশপাশের তিন মহল্লার ছাদে উৎসুক এলাকাবাসীর বৈকালিক আড্ডাও৷ সেই সময় বা জায়গা কোথায়৷

এভাবেই বিলুপ্ত হতে বসা পায়রা পোষার সংস্কৃতির নিয়ে আফসোস করছিলেন পুরনো ঢাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ জাকি৷ তিনি বলেন, ‘‘সত্যিকার অর্থেই পায়রা পোষাটা ছিল আমাদের সংস্কৃতির গভীরে শেকড় গাঁড়া খুবই দারুণ একটা অধ্যায়৷”

বিশ্বের অন্যতম জনবহুল ও ব্যস্ত নগরী ঢাকায় এখনও যাদের বাড়িতে এক টুকরো উঠোন আছে মোহাম্মদ জাকি সেই বিরল ভাগ্যবানদের একজন৷ উঠোনে চড়ে বেড়ানো পায়রার দিকে তাকিয়ে জাকি বলছিলেন, ‘‘পায়রাদের মাটিতে এবং আকাশে জায়গা দরকার৷ কিন্তু এ শহরে এখন জায়গাই নেই৷ এই পাখিদের এখন উড়ে এসে বসার জায়গা নেই ঘুরেফিরে খাওয়ার জায়গা নেই৷ ঢাকায় বহুতল দালান নির্মাণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গেই এই পায়রা পোষাও বিলুপ্ত হতে বসেছে৷”
51bf2b8c826b4-2
কিন্তু এই দু’এক দশক আগেও এই অবস্থা চিন্তাও করা যেত না৷ পুরনো ঢাকার পায়রার বাজারটা তখনো অনেক জমজমাট ছিল৷ ওই বাজার এখনও টিকে থাকলেও দোকান আর পায়রার সংখ্যা কমেছে ক্রেতার সংখ্যা কমার সঙ্গে সঙ্গেই৷

ঢাকাইয়ারা প্রথাগতভাবে দুই ধরণের পায়রা পুষতো৷ এমনিতেই খাওয়ার জন্য বাড়িতে বাড়িতে পালা হতো ‘গোল্লা’৷ আর তরুণরা গিরিবাজ, টাট্টু এসব পালতো খেলা দেখানো প্রতিযোগিতার জন্য৷ তিনি বলেন, ‘‘এই ঐতিহ্য হারিয়ে যাওয়ার আরেকটি কারণ এ বিষয়ে তরুণদের আগ্রহ কমে যাওয়া৷ কারণ এখন তাদের জন্য অন্য অনেক বিনোদন আছে৷ তারা সেসব নিয়েই ব্যস্ত৷”

জাকি বলেন, ‘‘মাঝে মধ্যেই লোকে আমাকে পায়রা পাগল বলে খেপায়৷ কিন্তু এটা আমার শখ৷ পাখিগুলোর সঙ্গ আমার ভাল লাগে এবং এটা অন্য অনেক প্রাণী পোষার মতো ব্যয়বহুলও না৷”

* দয়েচে ভেলেতে প্রকাশিত

You must be logged in to post a comment Login

মন্তব্য করুন