মুক্তিযুদ্ধের শব্দসৈনিক এম আর আখতার মুকুল

প্রকাশ: June 24, 2015
CREATOR: gd-jpeg v1.0 (using IJG JPEG v80), quality = 75

যারা মুক্তিযুদ্ধ করেছেন এবং সরাসরি দেখেছেন তাদের পক্ষে এম আর আখতার মুকুলের অবদানের কথা ভুলে যাওয়া সহজ নয়।

জনাব এম আর আক্তার মুকুল সাংবাদিক, লেখক, সম্পাদক এবং মুক্তিযুদ্ধের সময় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত সাড়া জাগানো অনুষ্ঠান ‘চরমপত্র’-এর কথক। তার জন্ম ১৯২৯ সালের ৯ আগস্ট বগুড়া জেলার মহাস্থানগড়ের অন্তর্গত চিংগাসপুর গ্রামে। পুরো নাম মুস্তাফা রওশন আখতার মুকুল। পিতা বিশিষ্ট সাহিত্যিক সাদত আলি আখন্দ, মাতা রাবেয়া খাতুন। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি সক্রিয় রাজনীতিতে জড়িত ছিলেন এবং এ কারণে তাঁকে একাধিকবার জেল খাটতে হয়েছে। ১৯৪৮-৪৯ সালে জেল থেকেই স্নাতক পরীক্ষায় অংশ নিয়ে তিনি সাফল্যের সঙ্গে উত্তীর্ণ হন এবং ১৯৪১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ ডিগ্রি অর্জন করেন। জীবিকার জন্য তিনি বীমা কোম্পানি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, বিজ্ঞাপনী সংস্থা, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, দুর্নীতি দমন বিভাগসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে চাকরি করেছেন। তবে সবচেয়ে বেশি সময় কেটেছে সাংবাদিকতার পেশায়। বিভিন্ন সময়ে তিনি দৈনিক আজাদ, দৈনিক ইত্তেফাক ও পূর্বদেশ পত্রিকায় কাজ করেছেন। এছাড়া তিনি বার্তা সংস্থা ইউনাইটেড প্রেস অফ পাকিস্তান (ইউপিআই)-এর ঢাকা ব্যুরো প্রধান ছিলেন।

স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্র ছিল মুক্তিযুদ্ধের প্রধান প্রচার মাধ্যম। দেশাত্মমূলক গান প্রচার ও মুক্তিযুদ্ধের খবর পরিবেশন করে এটি বাংলাদেশের স্বাধীনতায় বিরাট ভূমিকা রাখে। কিন্তু যে অনুষ্ঠানটির জন্য প্রতিদিন মুক্তিযোদ্ধাগণ অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতেন তার নাম ছিল “চরম পত্র”, যার পাঠক ছিলেন এম আর মুকুল। পাকিস্তানি সেনা আর রাজাকারদের প্রতি একরাশ ঘৃনা ছড়ানো কন্ঠে তিনি পড়তেন – “আইজ ভেড়ামারার কাছে আমাগো বিচ্চু পোলাপাইনরা এমুন মাইর দিচে, কমসে কম তেরজন পাকি সৈন্য প্যাঁকের মধ্যে পইড়্যা কাঁতরাইতাছে”। মুক্তিযোদ্ধাদেরকে তিনি “বিচ্ছু” বলতেন।

মুক্তিযুদ্ধের সূচনাপর্বের কষ্টকর সময়ে চরম পত্রই দেশবাসীকে চাঙ্গা করে রেখেছিল। “বর্ষা আগত। সারাদেশ জলমগ্ন হবে। পাকীরা সাঁতার জানেনা। বিচ্চুরা শুধু ওদের স্পীড বোট ফুটো করে দেবে। তারপরই কেল্লা ফতে। শত শত পাকসেনা ডুবে মারা পড়বে”। চরমপত্রের এরকম কল্প কাহিনী হতাশার মাঝে নিয়ে আসত সাহস আর আশার আলো। মনে হত যুদ্ধ জয়ের বুঝি আর দেরী নেই।

চরম পত্র স্বাধীনতার পক্ষের লোকদের যেমনি শক্তি, সাহস, মনোবল বৃদ্ধিতে সহায়ক ছিল, তেমনি বিপক্ষ শক্তিকে নিরোৎসাহ ও দূর্বল করে রাখত। চরম পত্র যুবকদেরকে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে অনুপ্রানিত করেছে। জয় সুনিশ্চিত জেনে অনেক বিপথগামী যুবক রাজাকারের দলে নাম লিখাতে বিরত থেকেছে।
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর প্রথমে এম আর আক্তার মুকুলকে বাংলাদেশ বেতারের মহাপরিচালক নিয়োগ করা হয়। ১৯৭২ সালে তিনি লন্ডনে বাংলাদেশ হাই কমিশনের প্রেস মিনিস্টার নিযুক্ত হন। ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এ চাকরি হারিয়ে অনেক বছর তিনি লন্ডনে স্বেচ্ছা নির্বাসনে ছিলেন। ১৯৮৭ সালে দেশে ফিরে তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্র সম্পাদনার দ্বিতীয় পর্যায়ে কিছুদিন কাজ করেছেন।পরে তিনি ঢাকায় সাগর পাবলিশার্স নামে একটি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন।

এ সংস্থাসহ বিভিন্ন প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান থেকে তাঁর রচিত ৬০টিরও বেশি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে।। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো: পল্লী এক্সপ্রেস (অনুবাদ, ১৯৬০), রূপালী বাতাস (১৯৭২), রূপালী বাতাস সোনালী আকাশ (১৯৭৩), মুজিবের রক্তলাল (১৯৭৬), ভাসানী মুজিবের রাজনীতি (১৯৮৪), পঞ্চাশ দশকে আমরা ও ভাষা আন্দোলন (১৯৮৫), চল্লিশ থেকে একাত্তর (১৯৮৫), আমি বিজয় দেখেছি (১৯৮৫), বায়ান্নোর ভাষা আন্দোলন (১৯৮৬), লন্ডনে ছক্কু মিয়া (১৯৮৬), ওরা চারজন (১৯৮৬), কোলকাতা কেন্দ্রিক বুদ্ধিজীবি (১৯৮৭), বায়ান্নোর জবানবন্দী (১৯৮৭), বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ: দলিলপত্র (সংক্ষিপ্ত সংস্করণ, ১৯৮৭), লেছড়াগঞ্জের লড়াই (১৯৮৭), নকশালদের শেষ সূর্য (১৯৮৯), একাত্তরের বর্ণমালা (১৯৮৯), বিজয় ’৭১ (১৯৯০), আমিই খালেদ মোশাররফ (১৯৯০), মহাপুরুষ (১৯৯১), একুশের দলিল (১৯৯২), দুমুখী লড়াই: আমরাই বাঙালী (১৯৯২), আমাকে কথা বলতে দিন (১৯৯৩), বাংলা নাটকের গোড়ার কথা (১৯৯৪), কে ভারতের দালাল (১৯৯৫), খন্দকার থেকে খালেদা (১৯৯৬), একাত্তুরের মুক্তিযুদ্ধে বুদ্ধিজীবিদের ভূমিকা (১৯৯৭), বঙ্গবন্ধু (১৯৯৭), জিন্নাহ থেকে মুজিব (১৯৯৮) এবং ভাষা আন্দোলন থেকে স্বাধীনতা (১৯৯৯)। ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে দীর্ঘদিন রোগভোগের পর ২০০৪ সালের ২৬ জুন তাঁর মৃত্যু হয়।

You must be logged in to post a comment Login