রাজধানীর কথকতা

প্রকাশ: July 30, 2015
dhaka

ঢাকার ৮০% জমির মালিক মাত্র ৩০ ভাগ মানুষ

1

অন্ন-বস্ত্রের পরই মানুষের মৌলিক অধিকার বাসস্থান। এজন্য প্রয়োজন একচিলতে জমি। তবে রাজধানীর জমির বড় অংশই মুষ্টিমেয় মানুষের দখলে। মূলত উচ্চবিত্ত ও উচ্চমধ্যবিত্তই এগুলোর মালিক। অর্থাৎ রাজধানীবাসীর বড় অংশেরই নিজস্ব কোনো জমি নেই। ভারসাম্যহীন এ পরিস্থিতির কারণে দিন দিন দুর্মূল্য হয়ে উঠছে জমি। অত্যধিক দামের কারণে অনেকেরই জমি কেনার সামর্থ্য থাকছে না। ফলে ভাড়া বাসাই তাদের মাথা গোঁজার একমাত্র অবলম্বন।

ঢাকার অপরিকল্পিত উন্নয়ন, তা থেকে উদ্ভূত নানা সমস্যা ও সেগুলো সমাধানে ‘ঢাকা স্ট্রাকচার প্ল্যান’ প্রণয়নে উদ্যোগ নিয়েছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। এজন্য কোরিয়ান স্যামন করপোরেশন, হ্যান-এ আরবান রিসার্চ ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশের ডেভ কনসালট্যান্টস লিমিটেড ও শেলটেক লিমিটেড যৌথভাবে একটি সমীক্ষা চালিয়েছে। তাতে উঠে এসেছে আবাসন নিয়ে ঢাকার অসামঞ্জস্যপূর্ণ এ চিত্র।

সমীক্ষা অনুযায়ী, রাজধানীর ৮০ শতাংশ জমির মালিক মাত্র ৩০ শতাংশ মানুষ। এর মধ্যে ৩ শতাংশ উচ্চবিত্তের কাছে রয়েছে ১৫ শতাংশ জমি। আর ২৭ শতাংশ মধ্য ও উচ্চমধ্যবিত্ত মানুষের মালিকানায় রয়েছে ৬৫ শতাংশ জমি। এছাড়া ১১ শতাংশ জমিতে রয়েছে বস্তি। বাকি জমির মধ্যে ৪ শতাংশ ঘিঞ্জি এলাকা, ৩ শতাংশ স্টাফ কোয়ার্টার ও কলোনি এবং ২ শতাংশ অন্যান্য ব্যবহার্য।

এতে আরো বলা হয়, ভূসম্পত্তির বাজারে ছোট একখণ্ড জমিও কেনার জন্য সচরাচর পাওয়া যায় না। আর সরকারিভাবেও ভর্তুকি মূল্যে জমি বিক্রির উদাহরণ খুব একটা নেই। ফলে অধিকাংশ রাজধানীবাসীর নিজস্ব কোনো জমি নেই, শতাংশ হিসাবে যা ৫৬। তাদের মাথা গোঁজার ঠাঁই একমাত্র ভাড়া বাসা। তবে স্টাফ কোয়ার্টার, কলোনি আর বস্তি বাদ দিলে ৭০ শতাংশ রাজধানীবাসীরই কোনো জমি নেই।

রাজধানীর জমির বণ্টন খুবই ভারসাম্যহীন বলে মত দেন রাজউকের চিফ টাউন প্ল্যানার ও ঢাকা স্ট্রাকচার প্ল্যান প্রণয়ন প্রকল্পের পরিচালক মো. সিরাজুল ইসলাম। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ভারসাম্যহীনতার পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে। দাম বেড়ে যাওয়ায় জমি অনেকের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে। উত্তরাধিকার সূত্রেও জমির মালিকানা একটি শ্রেণীর কাছে আটকে আছে। এছাড়া স্বাধীনতা-উত্তরকালে অনেকেই শুধু জমিতে বিনিয়োগ করেছেন। ফলে সাধারণভাবে যারা জমির মালিক, তাদের সংখ্যাই বাড়ছে।

ঢাকার জনসংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ায় আবাসন তথা জমির সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে বলে সমীক্ষা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ কারণেই জমির দাম বাড়ছে অস্বাভাবিক হারে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাজধানীর আবাসন চাহিদার মাত্র ৭ শতাংশ সরকারিভাবে মেটানো হচ্ছে। বাকি ৯৩ শতাংশ বেসরকারি খাতের ওপর নির্ভরশীল। এটিও রাজধানীর জমির মূল্যবৃদ্ধির অন্যতম কারণ। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে মধ্য ও নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণী। জমি তাদের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে।

জীবনযাত্রার ব্যয় মেটানোর পর আবাসন চাহিদা মেটানোর সামর্থ্য রাখেন রাজধানীর নিম্নমধ্যবিত্তের মাত্র ৫ শতাংশ। মধ্যবিত্তের মধ্যে এ সামর্থ্য রয়েছে ২২ শতাংশের। অর্থাৎ ৯৫ শতাংশ নিম্নমধ্যবিত্তের আবাসন চাহিদা মেটানোর সামর্থ্য নেই। আর মধ্যবিত্তের মধ্যে এ সামর্থ্য নেই ৭৮ শতাংশ মানুষের। তবে জীবনযাত্রার অন্যান্য ব্যয় মেটানোর পর উচ্চমধ্যবিত্তেরও ৫২ শতাংশের আবাসন চাহিদা মেটানোর সামর্থ্য নেই। সব মিলিয়ে গড়ে ৭০ শতাংশ রাজধানীবাসীর আবাসন চাহিদা মেটানো তথা জমি কেনার সামর্থ্য নেই।

গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন এ প্রসঙ্গে বলেন, রাজধানীবাসীর আবাসন চাহিদা মেটাতে সরকারিভাবে উদ্যোগ বাড়ানো হচ্ছে। এজন্য রাজউকের মাধ্যমে জমি তথা প্লট আর বিক্রি না করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। বরং রাজউক নিজেই ফ্ল্যাট নির্মাণ করে বিক্রি করবে। কয়েক বছরের মধ্যে উত্তরা অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্পে ১৩ হাজার ফ্ল্যাট বিক্রি করা হবে। ভবিষ্যতেও এ ধরনের আরো কিছু প্রকল্প নেয়া হবে।

প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, গত কয়েক বছরে ঢাকার বিভিন্ন এলাকার জমির দাম কয়েক গুণ বেড়েছে। ১৯৭৫ থেকে ১৯৯০ সালে রাজধানীতে জমির দাম বেড়েছে গড়ে ১৮০ শতাংশ। ১৯৯০ থেকে ২০০০ সালের মধ্যে এ হার ছিল গড়ে ২২ দশমিক ২৬ ও ২০০০ থেকে ২০১০ সালে গড়ে ৭৪ শতাংশ।

রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন এলাকায় জমির মূল্যবৃদ্ধির প্রবণতাও তুলে ধরা হয়েছে প্রতিবেদনে। তাতে দেখা গেছে, মতিঝিলে ১৯৭৫ সালে প্রতি বর্গমিটার জমির দাম ছিল ৭৫০ টাকা, ২০১০ সালে যা দাঁড়ায় গড়ে ৪ লাখ ৪৮ হাজার ৩৩৩ টাকায়। বারিধারায় এ সময়ে প্রতি বর্গমিটার জমির দাম ৩৭৩ থেকে বেড়ে দাঁড়ায় গড়ে ২ লাখ ৯৮ হাজার ৮৮৮ টাকা ও বাড্ডায় ৬০ টাকা থেকে বেড়ে ৭৪ হাজার ৭২২ টাকায়। একইভাবে গুলশানে প্রতি বর্গমিটার জমির দাম ২ হাজার ৩৯৮ থেকে বেড়ে ১ লাখ ৬ হাজার ৮৯১, ধানমন্ডিতে ২ হাজার ২৯৮ থেকে বেড়ে ৯১ হাজার ৮১৬, মোহাম্মদপুরে ১ হাজার ৭১৩ থেকে বেড়ে ৩৭ হাজার ৬৮৬, শান্তিনগরে ১ হাজার ৯১৮ থেকে বেড়ে ৩৭ হাজার ৬৮৬ ও মিরপুরে ৯৬০ টাকা থেকে বেড়ে দাঁড়ায় ২২ হাজার ৯৫৪ টাকায়।

শহরের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন এলাকায় জমির মূল্যবৃদ্ধি আবাসন কোম্পানিগুলোকে অ্যাপার্টমেন্ট বা ফ্ল্যাট নির্মাণে আগ্রহী করছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে এসব কোম্পানির কারণে ঢাকার আশপাশের বিভিন্ন এলাকার জমির দামও বাড়ছে। প্রতিবেদন বলছে, ২০০০ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে এসব এলাকায় বছরে ৬০ থেকে ৯৬ দশমিক ৭ শতাংশ পর্যন্ত জমির দাম বেড়েছে।

জমির দাম নিয়ে শেলটেকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. তৌফিক এম সেরাজ বলেন, চাহিদা ও জোগানের মধ্যে আসলে বড় ধরনের অসামঞ্জস্য রয়েছে। তাই জমির দাম অস্বাভাবিক বেড়েছে। তাছাড়া জমির বাজারটি ঝুঁকিপূর্ণ, কারণ নিষ্কণ্টক জমি পাওয়া খুব কঠিন। তবে বাজার একটু সুস্থ বা সংগঠিত হলে হয়তো এত দাম বাড়ত না।

তিনি আরো বলেন, গত কয়েক বছরে জমির দামের উল্লম্ফনকে অর্থনীতির কোনো সংজ্ঞায় সংজ্ঞায়িত করা যাবে না। গুলশান-বারিধারায় জমির মূল্যবৃদ্ধি এতই অসম যে, তা কিছুতেই একটি গাণিতিক লেখচিত্রে দেখানো সম্ভব নয়। অ্যাপার্টমেন্টের দাম বাড়ার পেছনে জমির মূল্যবৃদ্ধিরও বড় ধরনের ভূমিকা রয়েছে।

(সূত্র: বণিক বার্তা)

অনেক অভিভাবকের ভিড়ে অসঙ্গতির শহর

2

সিটি করপোরেশন, ওয়াসা, ডেসা, রাজউক, ডিটিসিএসহ ডজনখানেক কর্তৃপক্ষ রয়েছে; যারা ঢাকার পরিচালন ও নিয়ন্ত্রণের বিভিন্ন দিক দেখভাল করে। বিভিন্ন ধরনের পরিসেবাও এসব প্রতিষ্ঠানের হাতে। একক কর্তৃপক্ষের হাতে নেই শহরের নিয়ন্ত্রণ। ফলে অনেক অভিভাবকের ভিড়ে অসঙ্গতির শহরে পরিণত হয়েছে ঢাকা।

অপরিকল্পিত উন্নয়নের কারণে উদ্ভূত নানা সমস্যা সমাধানে সম্প্রতি ‘ঢাকা স্ট্রাকচার প্ল্যান’ প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। এজন্য কোরিয়ান স্যামন করপোরেশন ও হ্যান-এ আরবান রিসার্চ ইনস্টিটিউট এবং বাংলাদেশের ডেভ কনসালট্যান্টস লিমিটেড ও শেলটেক লিমিটেড যৌথভাবে একটি সমীক্ষা পরিচালনা করে। এ সমীক্ষার ভিত্তিতে একটি খসড়া প্রতিবেদন প্রকাশ করে রাজউক, যাতে ঢাকার বহু অভিভাবকের ভিড়ে অসঙ্গতির চিত্র উঠে এসেছে।

ঢাকার দুটি সিটি করপোরেশনে এখন দুজন মেয়র। যদিও সিটি করপোরেশন বিভক্ত হওয়ার আগেও ঢাকার নিয়ন্ত্রণ মেয়রের হাতে ছিল না। ঢাকার যোগাযোগ ও পরিবহন ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করছে একাধিক কর্তৃপক্ষ। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) শুধু গাড়ির নিবন্ধন দেয়। সড়ক অবকাঠামো নির্মাণ-নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব ঢাকা যানবাহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ)। আবার সড়ক দেখাশোনার দায়িত্ব দুই সিটি করপোরেশনের। রেল ব্যবস্থা পরিচালনা করে বাংলাদেশ রেলওয়ে। বিভিন্ন বিষয়ে একাধিক অভিভাবকের উপস্থিতি অথবা একক কর্তৃপক্ষের অভাবকেই ঢাকার এ অসঙ্গতির কারণ বলে মনে করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

নগর পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক নজরুল ইসলাম এ প্রসঙ্গে বণিক বার্তাকে বলেন, ঢাকার অপরিকল্পিত উন্নয়নের অন্যতম কারণ একক নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের অভাব। এতে নানা সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে। পরিবহন পরিকল্পনার সঙ্গে নগর পরিকল্পনার সামঞ্জস্য হচ্ছে না। আবার নগর পরিকল্পনা না মেনে বিভিন্ন প্রকল্প নেয়া হচ্ছে। এজন্য বিভিন্ন সময় সিটি গভর্ন্যান্সের কথা বলা হয়েছে। তবে কখনো এ-সংক্রান্ত উদ্যোগ নেয়া হয়নি। পরিকল্পিত নগর গড়তে একক নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ তথা সিটি গভর্ন্যান্সের বিকল্প নেই বলেই মনে করেন তিনি।

সমীক্ষার তথ্যমতে, ৮৭ হাজার হেক্টর জমিতে গড়ে উঠেছে রাজধানী শহর ঢাকা। এ আয়তনের মাত্র ২ দশমিক ৩১ শতাংশ বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহার হচ্ছে। ঢাকার জমির শিল্পভিত্তিক ব্যবহার আরো কম; মাত্র ১ দশমিক ৮ শতাংশ। অর্থাৎ রাজধানীর ৪ দশমিক ১১ শতাংশ জমি শিল্প ও বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহার হচ্ছে। ঢাকায় সড়ক ও রেল অবকাঠামো রয়েছে ৬ দশমিক ১৮ শতাংশ জায়গা নিয়ে। তবে মোটরযান চলার মতো বড় সড়কের উপস্থিতি বিবেচনা করলে তা ৪ শতাংশের মতো। আর উন্মুক্ত স্থান তথা বিনোদনের জন্য অবশিষ্ট এলাকা রয়েছে দশমিক ৯৬ শতাংশ।

যদিও বিশ্বের বিভিন্ন মেট্রোপলিটন শহরে ন্যূনতম ২৫ শতাংশ জমি বাণিজ্যিক ও শিল্প খাতে ব্যবহার হয়। আর সড়ক ও রেল অবকাঠামো থাকে ২০-৩০ শতাংশ। আর উন্মুক্ত স্থান তথা পার্ক-উদ্যান থাকে ২০-২৫ শতাংশ। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোও মোটামুটি এ আদলেই গড়ে উঠেছে বলে সমীক্ষা প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।

প্রতিবেদনের তথ্যমতে, রাজধানী ঢাকার বড় অংশজুড়ে শুধু আবাসিক এলাকা। ৩৭ হাজার ৫৮৪ হেক্টর তথা ৪৩ দশমিক ২ শতাংশ জমি ব্যবহার হচ্ছে আবাসিক কাজে। এছাড়া কৃষিজমি রয়েছে ২৩ দশমিক ৬৩ শতাংশ, জলাশয় ৮ দশমিক ৭৯, প্রবেশ সংরক্ষিত এলাকা ৬ দশমিক ৭৫, সরকারি পরিষেবা ৪ দশমিক ৩ ও মিশ্র ব্যবহার্য (আবাসিক ও বাণিজ্যিক) এলাকা ২ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ।

এ প্রসঙ্গে রাজউকের চিফ টাউন প্ল্যানার ও ঢাকা স্ট্রাকচার প্ল্যান প্রণয়ন প্রকল্পের পরিচালক মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, ঢাকার জমির ব্যবহারে অসামঞ্জস্যের কারণ রাজধানীর জমি ব্যবহারে কখনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা না নেয়া। ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যানে (ড্যাপ) কিছু উদ্যোগ নেয়া হলেও নানা জটিলতায় তা সংশোধনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। নগরের জমি বিক্ষিপ্তভাবে বিভিন্ন কাজে ব্যবহার হচ্ছে। পরিস্থিতির উন্নয়নে ঢাকা স্ট্রাকচার প্ল্যানে বেশকিছু সুপারিশ করা হয়েছে। এক্ষেত্রে কৃষিজমির বিকল্প ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে।

প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, ঢাকার উন্নয়নে নানা সময়ে বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়া হয়। বেশকিছু পরিকল্পনাও গ্রহণ করা হয়। কিন্তু কোনোটাই সঠিকভাবে বাস্তবায়ন হয়নি। উল্টো পরিকল্পনার বাইরে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। ১৯৯৫ সালে ঢাকার জন্য স্ট্রাকচার প্ল্যান নেয়া হয়। ২০ বছর মেয়াদি পরিকল্পনাটি ২০১৫ সালে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও বহু আগেই তা কার্যকারিতা হারায়।

প্রায় একই সময় নেয়া হয় ১০ বছর মেয়াদি আরবান প্ল্যান। ১৯৯৫ থেকে ২০০৫ মেয়াদি পরিকল্পনায় ক্ষেত্রভেদে বিশেষ পরিকল্পিত জোন গড়ে তোলার সুপারিশ করা হয়, যা বাস্তবায়ন হয়নি। ড্যাপ বাস্তবায়ন শুরু হয় ২০১০ সালে। তবে শুরুতেই ব্যাপক আকারে ভুল ধরা পড়ে এ পরিকল্পনায়। ফলে ২০ বছর মেয়াদি পরিকল্পনাটি পাঁচ বছরের মাথায় সংশোধনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। অথচ ড্যাপের মাধ্যমে প্রথম স্ট্রাকচার প্ল্যান ও আরবান প্ল্যান বাস্তবায়নের কথা ছিল। এর বাইরে ১৯১৭ সালে ঢাকা টাউন প্ল্যান, ১৯৫৯ সালের ঢাকা মাস্টার প্ল্যান ও ১৯৮১ সালের ঢাকা ঢাকা মেট্রোপলিটন এরিয়া ইন্টিগ্রেটেড ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট কোনোটিই বাস্তবায়ন হয়নি।

এ প্রসঙ্গে রাজউকের চিফ টাউন প্ল্যানার মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, রাজধানীর উন্নয়নে বিভিন্ন পরিকল্পনার সঠিক বাস্তবায়ন না হওয়ার পেছনে নানা কারণ রয়েছে। তবে পরিকল্পনা স্থির হলেও বাস্তব অবস্থা পরিবর্তনশীল। তাই নতুন স্ট্রাকচার প্ল্যানটি পাঁচ বছর পর পর মূল্যায়নের সুপারিশ করা হয়েছে। এক্ষেত্রে অবস্থা ও বাস্তবায়ন পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে পরিকল্পনাটি সমন্বয় করা হবে।

(সূত্র: বণিক বার্তা)

দুই দশকে দ্বিগুণ হবে যানজটের তীব্রতা: যানবাহনের গতি নামবে অর্ধেকে

আগামী ২০ বছরে ঢাকার জনসংখ্যা প্রায় ৬৪ শতাংশ বাড়বে। পাল্লা দিয়ে বাড়বে যানবাহনের চাহিদা ও সংখ্যা। নানা কাজে নগরবাসীর দৈনিক যাতায়াত (ট্রিপ) প্রায় ৭১ শতাংশ বাড়বে। কিন্তু গণপরিবহন ব্যবস্থায় নজর না দেয়ায় ব্যক্তিগত গাড়ির ওপর নির্ভরতা বাড়বে। ফলে তখন ঢাকার যানজটের তীব্রতা হবে দ্বিগুণ এবং যানবাহনের গতি অর্ধেকে নেমে আসবে।

দুই দশক পরের ঢাকার এ আশঙ্কাজনক ছবি উঠে এসেছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) প্রতিবেদনে। ঢাকার অপরিকল্পিত উন্নয়নজনিত সমস্যা নিরূপণ ও সম্ভাব্য সমাধানের পথনির্দেশ করতে সংস্থাটি সম্প্রতি ‘ঢাকা স্ট্রাকচার প্ল্যান’ শীর্ষক পরিকল্পনা প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে। এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় সমীক্ষার জন্য চারটি পরামর্শক সংস্থাকে নিয়োগ দেয় রাজউক। দক্ষিণ কোরিয়ার স্যামন করপোরেশন ও হান-এ আরবান রিসার্চ ইনস্টিটিউট এবং বাংলাদেশের ডেভ কনসালট্যান্টস লিমিটেড ও শেলটেক লিমিটেড যৌথভাবে এ সমীক্ষা পরিচালনা করে। এরই ভিত্তিতে একটি খসড়া প্রতিবেদন প্রকাশ করে রাজউক, যেখানে আগামী ২০ বছরে ঢাকার যোগাযোগ ও পরিবহন ব্যবস্থার সম্ভাব্য চিত্র উঠে এসেছে।

যৌথ সমীক্ষার তথ্যমতে, ঢাকার জনসংখ্যা বর্তমানে ১ কোটি ৫৯ লাখ। ২০৩৫ সালে এ শহরের জনসংখ্যা হবে ২ কোটি ৬০ লাখ। মানুষের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে যানবাহনের সংখ্যাও বাড়বে। বর্তমানে ঢাকায় মোট যানবাহনের সংখ্যা ৩ লাখ ৮৩ হাজার ৩০০। ২০৩৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়াবে ৯ লাখ ১৯ হাজারে। এর মধ্যে ব্যক্তিগত গাড়ি থাকবে ৭ লাখ ৯৮ হাজার ৩০০। বর্তমানে এ ধরনের যানবাহন রয়েছে ৩ লাখ ১২ হাজার ১৫০টি।

গাড়ির সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় সড়কের ওপর চাপ বাড়বে। ফলে অর্ধেকে নেমে আসবে গাড়ির গতি। এমনিতেই ঢাকার রাস্তায় গাড়ির গতির এখন করুণ অবস্থা। যান অবরুদ্ধতা (ট্রাফিক স্নার্ল আপ) ও যানজট (ট্রাফিক জ্যাম) প্রতিদিন নগরবাসীর কর্মঘণ্টার উল্লেখযোগ্য অংশ আত্মসাৎ করে। বর্তমানে পিক আওয়ারে রাজধানীতে গাড়ির গড় গতিবেগ ঘণ্টায় আট কিলোমিটার। ২০৩৫ সালে তা কমে চার কিলোমিটারে নেমে আসবে। অথচ নগর সড়কে (আরবান রোড) যানবাহন চলাচলের জন্য আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে স্বীকৃত আদর্শ গতি ঘণ্টায় ২৫-৩০ কিলোমিটার।

ঢাকার অপরিকল্পিত পরিবহন ব্যবস্থার চিত্রও তুলে ধরা হয়েছে রাজউকের খসড়া প্রতিবেদনে। এতে বলা হয়, ঢাকার বাস ব্যবস্থা খণ্ড খণ্ড ভাগে বিভক্ত। নগরীতে ১০৩টি কোম্পানির ৩ হাজার ৯২৬টি বাস থাকলেও শতাধিক বাস রয়েছে মাত্র সাতটি কোম্পানির। এছাড়া ৫০ শতাংশ কোম্পানির মালিকানায় ২৫টি করে বাস রয়েছে। এর বাইরে ১ হাজার ৫৩৯টি বাসের মালিক পৃথক পৃথক ব্যক্তি। সরকারি সংস্থা বিআরটিসির বহরে ৯৭০টি বাস থাকলেও অর্ধেকের বয়স ১০ বছর পেরিয়ে গেছে।

ঢাকায় শক্তিশালী ট্যাক্সি সার্ভিস নেই। দুটি কোম্পানিকে মাত্র ৫০০ ট্যাক্সি পরিচালনার লাইসেন্স দেয়া হয়েছে। তবে এগুলোর ভাড়া অনেক বেশি। এছাড়া ১৩ হাজার নিবন্ধিত অটোরিকশা থাকলেও মিটার অনুযায়ী ভাড়া আদায় করা হয় না। অত্যধিক ভাড়ার কারণে অনেকেই অটোরিকশায় যাতায়াত করতে পারে না। আর ট্রেনে ঢাকার ভেতরে চলাচলের কোনো সুযোগ নেই। এছাড়া রাজধানীর যানজটের আরেকটি কারণ হিসেবে অপরিকল্পিত ও অনিয়ন্ত্রিত পার্কিং ব্যবস্থাকেও দায়ী করা হয়েছে ওই প্রতিবেদনে।

এ প্রসঙ্গে রাজউকের চিফ টাউন প্ল্যানার ও ঢাকা স্ট্রাকচার প্ল্যান প্রণয়ন প্রকল্পের পরিচালক মো. সিরাজুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, যানজট ঢাকার নিত্যদিনের চিত্র। এটা এতই প্রকট আকার ধারণ করেছে যে, বিশ্বের যানজটপূর্ণ শহরের শীর্ষ ১০-এ সম্প্রতি ঢাকার নাম উঠে এসেছে। পরিকল্পিত বাস নেটওয়ার্কের অভাব, ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা ক্রমশ বৃদ্ধি ও অপরিকল্পিত সড়ক ব্যবস্থা রাজধানীর যানজটের মূল কারণ। এছাড়া আধুনিক গণপরিবহন ব্যবস্থা চালু না হওয়ায় ভবিষ্যতে ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা আরো বাড়বে। এতে যানজট আরো বাড়বে— এটাই স্বাভাবিক। পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে এখনই উদ্যোগ নিতে হবে।

২০ বছর পরের ঢাকা সম্পর্কে প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, জনসংখ্যা বাড়ায় বিভিন্ন কাজে নগরবাসীর দৈনিক যাতায়াত (ট্রিপ) বাড়বে। বর্তমানে ঢাকায় দৈনিক ট্রিপের সংখ্যা ৩ কোটি ৪৮ লাখ ৭৭ হাজার। এর মধ্যে ২৭ লাখ ৮৭ হাজার ট্রিপ ব্যক্তিগত গাড়িতে, ১ কোটি ৩৫ লাখ ৪১ হাজার ট্রিপ বাসে, ১ কোটি ২৭ লাখ ৮৬ হাজার ট্রিপ রিকশায়, ৩৭ লাখ ৭৪ হাজার ট্রিপ হেঁটে এবং ৮৭ হাজার ট্রিপ রেল ও নৌপথে নির্বাহ হয়।

২০৩৫ সালে ঢাকায় দৈনিক ট্রিপ বেড়ে দাঁড়াবে ৫ কোটি ৯৭ লাখ ৮০ হাজারে। এর মধ্যে ৯১ লাখ ৬৯ হাজার ট্রিপ ব্যক্তিগত গাড়িতে, ২ কোটি ৭৮ লাখ ৭৪ হাজার ট্রিপ বাসে, ৮৭ লাখ ৭৫ হাজার ট্রিপ রিকশায়, ৭০ লাখ ৫৩ হাজার ট্রিপ হেঁটে এবং ১ লাখ ৯৭ হাজার ট্রিপ রেল ও নৌপথের মাধ্যমে সম্পন্ন হবে।

দেখা যাচ্ছে, অন্যান্য মাধ্যমের চেয়ে ব্যক্তিগত গাড়িতে যাতায়াতের মাত্রা ২০ বছর পর সবচেয়ে বেশি বাড়বে। গণপরিবহন ব্যবস্থার অধোগতি ও এ ব্যবস্থার প্রতি অবজ্ঞাকে ব্যক্তিগত গাড়িনির্ভরতা বৃদ্ধির জন্য দায়ী করা হয়। উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত মেট্রোরেল চালু হলে ব্যক্তিগত গাড়ির ট্রিপ কিছুটা কমতে পারে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়। এর বাইরে মেট্রোরেল যানজট নিরসনে তেমন ভূমিকা রাখবে না। কারণ হিসেবে বলা হয়, মেট্রোরেলের ফলে নির্দিষ্ট একটি রুটে গাড়ির চাপ কমবে। এতে ব্যক্তিগত গাড়ির ট্রিপ কিছুটা কমে ২০৩৫ সালে দাঁড়াবে ৭০ লাখ ২৩ হাজারে। আর মেট্রোরেল না হলে এ ট্রিপের সংখ্যা হবে ৯১ লাখ ৬৯ হাজার।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) নগর ও অঞ্চল পরিবহন বিভাগের অধ্যাপক ও পরিবহন বিশেষজ্ঞ ড. সারওয়ার জাহান বলেন, মেট্রোরেল ঢাকার যানজট কমাতে খুব একটা ভূমিকা রাখতে পারবে না। কারণ রাজধানীর একটি মাত্র রুটের যাত্রীরা এর সুবিধা পাবে। এছাড়া শহরের বিভিন্ন পয়েন্টে ফ্লাইওভার, এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ করে ব্যক্তিগত গাড়িকে উৎসাহ দেয়া হচ্ছে। অথচ গণপরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন করা হচ্ছে না। শুধু একটি মেট্রোরেল দিয়ে রাজধানীর যানজট কমানো খুব সহজ নয়।

রাজধানীর যানজট পরিস্থিতি উন্নয়নে বেশকিছু সুপারিশ করা হয় ঢাকা স্ট্রাকচার পরিকল্পনায়। এতে বলা হয়, যানজট কমাতে সড়কের পরিমাণ বাড়াতে হবে। এজন্য অন্তত ১৫০ কিলোমিটার নতুন সড়ক নির্মাণ করতে হবে। আর ৬০ কিলোমিটার এক্সপ্রেসওয়ে চালু করতে হবে। ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ রুটগুলোয় পাঁচটি মেট্রোরেল ও তিনটি বাস র্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) চালু করতে হবে। বিদ্যমান বাস নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ করতে হবে। ট্রেনের ব্যবহার চালু করতে ঢাকার ভেতরে উড়াল রেলপথ নির্মাণ করতে হবে। এছাড়া ঢাকার চারপাশে বৃত্তাকার নৌপথ প্রবর্তন করতে হবে।

এসবের পাশাপাশি রাজধানীর যানজট কমাতে কিছু নীতিগত সুপারিশ করা হয়। এতে বলা হয়, অফিসের কর্মঘণ্টা এবং স্কুল-কলেজের সময়সূচি ভিন্ন করতে হবে। পার্কিং ব্যবস্থা চালু করতে হবে। ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হবে। মূল সড়কে অযান্ত্রিক যানবাহন চলাচল বন্ধ করতে হবে। ফুটপাত দখলমুক্ত করে মানুষের হাঁটার পথ প্রশস্ত করতে হবে। পাশাপাশি বিভিন্ন সরকারি সংস্থার কার্যক্রমে সমন্বয় সাধন করতে হবে।

এ প্রসঙ্গে রাজউকের চিফ টাউন প্ল্যানার মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, রাজধানীর যানজট কমাতে স্ট্রাকচার প্ল্যানের নির্দেশনা অনুযায়ী অবকাঠামো উন্নয়ন করতে হবে। এজন্য সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ আনতে হবে। নীতিগত সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবায়নের প্রতিও জোর দিতে হবে। তবেই ঢাকার যানজট কমানো সম্ভব হবে।

(সূত্র: বণিক বার্তা)

You must be logged in to post a comment Login