লালবাগ কেল্লায় লাইট এন্ড সাউন্ড শো

প্রকাশ: May 4, 2015
Lalbagh

সন্ধ্যা সাতটা। হঠাৎ করে জ্বলে উঠল আলো লালবাগ কেল্লায়। লাল, সবুজ, হলুদ বাহারি আলো জ্বলছে আর নিভছে; সঙ্গে কানে ভাসছে আওয়াজ। মনে হচ্ছে ইতিহাসের সেই দিনগুলোর সবার সামনে। শব্দে পাগলা ঘণ্টা আবার কখনো ঘোড়ার ডাক আবার করুণ সুর, কখনো আনন্দের বাদ্য। এভাবে শুরু হয় লালবাগ কেল্লার গল্প। এই গল্প আলো আর শব্দের খেলায়। সবার মনোযোগ সেই আলোর দিকে। কিন্তু মনোযোগ গল্পে কথায়। ক্ষণেই আলো জ্বলছে ডানদিকে আবার কখনো বামদিকে; কখনো আবার সামনেই। দর্শক-শ্রোতারা মুগ্ধ, তাই মাঝে মাঝেই তারা হাততালিও দিচ্ছে।

মুঘল স্থাপনা পুরান ঢাকার লালবাগ কেল্লায় লাইট অ্যান্ড সাউন্ড শো শুরু হয়েছে। দেশের ইতিহাসে এমন আয়োজন এটাই প্রথম। গত বছর ফেব্রুয়ারিতে ‘লাইট অ্যান্ড সাউন্ড শো’র উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

সাপ্তাহিক ছুটির দিন রোববার ছাড়া প্রতিদিন সন্ধ্যার পর এই শো দেখানো হয়। তথ্যচিত্র চলে ৩০ মিনিট। একদিনে শো চলে দুটি তবে দর্শকের উপস্থিতিতে প্রয়োজনে শো আরো একটি বাড়ানো হয়। প্রবেশমূল্য ২০ টাকা। সার্কভুক্ত দেশের জন্য ১০০ টাকা এবং অন্য দেশগুলোর জন্য ২০০ টাকা। ৫০০ দর্শক একই সঙ্গে লাইট অ্যান্ড সাউন্ড শো উপভোগ করতে পারেন। মাগরিব ও এশার নামাজের মাঝামাঝি সময়ে একটি এবং এশার নামাজের পর আরেকটি। এছাড়া বর্ষা বা প্রাকৃতিক দুর্যোগে এটি বন্ধ থাকে।

প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতর সূত্রে জানা যায়, লালবাগ কেল্লার গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস ও অনুপম স্থাপত্যশৈলীকে ভিন্নভাবে পর্যটকদের সামনে উপস্থাপনের জন্য এ লাইট অ্যান্ড সাউন্ড শো নির্মাণ করা হয়। এই লাইট অ্যান্ড সাউন্ড শো নির্মাণে ২ কোটি ৮৩ লাখ টাকা ব্যয় করা হয়। সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক এই কার্যক্রমের পাণ্ডুলিপি তৈরি করেন। দেশের প্রতিথযশা বুদ্ধিজীবী, ইতিহাসবিদ ও প্রতœতত্ত্ববিদদের পরামর্শে বুয়েটের বিশেষজ্ঞদের সহযোগিতায় ক্রিয়েশনস আনলিমিটেডের সার্বিক তত্ত্বাবধানে কাজটি বাস্তবায়ন করা হয়। এতে কণ্ঠ দিয়েছেন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব আসাদুজ্জামান নূর এবং শিমুল ইউসুফ।

লালবাগ কেল্লার নির্মাণ ইতিহাস সূত্রে জানা যায়, লালবাগ কেল্লার নির্মাণ কাজ শুরু করেছিলেন মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের তৃতীয় পুত্র মুহাম্মদ আজম শাহ। তিনি ১৬৭৮ সালের ২৯ জুলাই বাংলার সুবেদার হিসেবে ঢাকায় আসেন। মাত্র এক বছর তিনি সুবেদার ছিলেন। এর মধ্যেই তিনি বুড়িগঙ্গার তীরে এক প্রাসাদ-দুর্গ নির্মাণকাজে হাত দেন। পিতার নামানুসারে এর নাম রাখেন কিল্লা আওরঙ্গাবাদ। পরবর্তী সময়ে নাম হয় লালবাগ কেল্লা। অনেকে মনে করেন এ এলাকায় লাল গোলাপের বাগান ছিল। সেই থেকে এলাকার নাম এবং এলাকার নামে কেল্লার নামকরণ হয়।

পরবর্তী সময়ে মারাঠাদের সঙ্গে লড়াই করার জন্য আজম শাহকে ঢাকা থেকে চলে যেতে হয়। যাওয়ার সময় তিনি নতুন সুবেদার শায়েস্তা খাঁকে কেল্লার কাজ শেষ করার অনুরোধ করে যান। শায়েস্তা খাঁ কেল্লার কাজ সম্পন্ন করতে না পারলেও তার কন্যা পরীবিবির সমাধির কাজ শেষ করেছিলেন।

বর্তমানে লালবাগ কেল্লায় দেখার জন্য আছে- কেল্লার অভ্যন্তরে একটি হাম্মামখানা বা গোসলখানা, দরবার হল, মাটির প্লাটফরম, ঝর্ণা, জলাধারা, তিন গম্বুজবিশিষ্ট মসজিদ। মসজিদের ছাদে তিনটি গম্বুজের গোড়ার অংশ অষ্টকোণাকৃতি ড্রামের আকারের এবং পাতার নকশায় অলংকৃত। এতে রয়েছে পাড় বাঁধানো একটি পুকুর ও প্রতœতত্ত্ব অধিদফতরের নির্মিত জাদুঘর। কেল্লার উত্তর-দক্ষিণে অবস্থিত প্রধান ফটক, উত্তর তোরণ, পশ্চিম তোরণ ও তিনতলাবিশিষ্ট আকর্ষণীয় স্থাপত্য নিদর্শন হচ্ছে দক্ষিণ তোরণ। তোরণের সম্মুখে দু’পাশে তিনধাপে উপরে উঠেছে। প্রথম ধাপ একটি অর্ধগম্বুজ ছাদবিশিষ্ট আস্তরে তৈরি প্যানেল দ্বারা অলংকৃত। দরবার হলকে জাদুঘর হিসেবে রূপান্তরিত করা হয়। জাদুঘরে রয়েছে মুঘল আমলের অস্ত্রশস্ত্র, পাণ্ডুলিপি, মুদ্রা, মৃৎশিল্প, কার্পেট, চিত্র, হস্তলিপি ও রাজকীয় ফরমান।

সরকার দেশের ইতিহাস, প্রত্নতত্ত্ব, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির বিকাশকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিচ্ছে। বাংলাদেশ ইতিহাস ও ঐতিহ্যের দিক থেকে একটি সম্ভাবনাময় দেশ। আকারে ছোট হলেও প্রাচীনকাল থেকে আমাদের সম্পদ ও জনগণ বিদেশিদের আকর্ষণ করেছে। কালের বিবর্তনে দীর্ঘ ঔপনিবেশিক শাসন অবসানের পর এই দেশ থেকে বিদেশিরা চলে গেছে; কিন্তু তাদের স্মৃতিবিজড়িত প্রতিষ্ঠানগুলো মূল্যবান সম্পদ হয়ে আছে। এসব প্রতিষ্ঠান গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে। এসব প্রতিষ্ঠান শুধু ঐতিহাসিকভাবেই গুরুত্বপূর্ণ নয়, গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন কেন্দ্র হিসেবেও পরিচিত।

জানা গেছে, পাহাড়পুরের বৌদ্ধবিহার, বাগেরহাটের ষাটগম্বুজ মসজিদ, কান্তজীর মন্দির ও মহাস্থানগড়সহ দেশের ৪৪৮ প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানে এই শো চালু করা হবে।

দৈনিক মানবকণ্ঠে ৪ মে ২০১৫ প্রকাশিত।

You must be logged in to post a comment Login

মন্তব্য করুন