শাঁখারি বাজার

প্রকাশ: June 6, 2015
shakharibazar

শাঁখারি বাজার বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা শহরের পুরানো ঢাকার একটি ঐতিহাসিক এলাকা। ঢাকা বিখ্যাত ছিল শাঁখারীদের তৈরী শাঁখার জন্য। এটি বুড়িগঙ্গা নদীর কাছে ইসলামপুর রোড ও নওয়াবপুর রোডের সংযোগস্থলে অবস্থিত। এই এলাকায় বসবাসকারী শাঁখারীদের নামানুসারেই এলাকাটির নামকরণ করা হয়েছে। শাঁখারীরা বংশগত ভাবে শাঁখা তৈরির কাজে নিয়োজিত। ঢাকার শাঁখারীদের আবাসিক এলাকা ছিল শাঁখারীবাজার, যা এখনও বহন করছে সেই ঐতিহ্য।

Maduraikkanchi ও Silappathikaram (আনুমানিক ১ম শতকে লিখিত) নামে তামিল ভাষার দুটি কাব্য থেকে জানা যায় যে, কোরকাই ও গুজরাটের নানা শহরে শঙ্খশিল্প বিকশিত হয়েছিল। মাদ্রাজ সরকার কর্তৃক সংরক্ষিত শঙ্খশিল্পের নিদর্শন দেখে জেমস হরনেল বলেন যে, খ্রিস্টীয় ১ম-২য় শতকেই মহীশূর, হায়দ্রাবাদ, গুজরাট, কাথিয়াবার প্রভৃতি অঞ্চলে শঙ্খশিল্প বিকাশ লাভ করেছিল। পরে শঙ্খশিল্প সবচেয়ে বেশি প্রসার লাভ করে বাংলাদেশের ঢাকা শহরে এবং ক্রমে ঢাকা হয়ে ওঠে ভারতবর্ষে শঙ্খশিল্পের প্রধান কেন্দ্র।

shakh

কোরকাই থেকে ঢাকা শহরে শঙ্খশিল্প কেন্দ্রীভূত হওয়ার কারণ হিসেবে হরনেল মনে করেন, মালিক কাফুর কর্তৃক চতুর্দশ শতকে টিনেভেলি জেলায় হিন্দুরাজ্য ধ্বংসের পর সে অঞ্চলের শঙ্খশিল্পীরা ঢাকায় চলে আসে। কিন্তু দীনেশচন্দ্র সেনের মতে ঢাকায় স্বাধীনভাবেই শঙ্খশিল্পের বিকাশ ঘটে। তিনি প্রাচীন বাংলা সাহিত্যে বঙ্গনারীদের শঙ্খের ব্যবহার লক্ষ্য করেই এরূপ মন্তব্য করেছেন।

জেমস ওয়াইজের ১৮৮৩ খ্রিস্টাব্দের বর্ণনা অনুসারে ঢাকায় ঐ সময় ৮৩৫ জন শাঁখারী বসবাস করতেন। ধারণা করা হয় যে, বল্লাল সেনের শাসনামলে শাঁখারীরা পূর্ববঙ্গে আগমন করে। তখন তারা বিক্রমপুর এ একটি বাজার – শাঁখারীবাজারে অবস্থান করতেন। সতের শতকে মোগল শাসনামলে খাজনাবিহীন লাখেরাজ জমি প্রদান করে শাঁখারীদেরকে ঢাকা শহরে নিয়ে আসা হয়। শাঁখারীরা ঢাকায় এসে যে অঞ্চলে বসবাস শুরু করেছিল তা আমাদের কাছে বর্তমানে পরিচিত শাঁখারীবাজার নামে।

shakha

সপ্তদশ শতকের মোগল সুবেদার ইসলাম খাঁর সেনাপতি মির্জা নাথান এর লেখায় শাঁখারিবাজারের উল্লেখ রয়েছে। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী শাঁখারী বাজার গুড়িয়ে দিয়েছিল, হত্যা করেছিল অগণিত স্থানীয় মানুষকে। স্বাধীনতার পর শাঁখারীরা আবার এসে বসবাস শুরু করে সেই জায়গায়।

শাঁখারীদের বাসগৃহ ও এর স্থাপত্য স্বতন্ত্র ধরনের। জেমস ওয়াইজ এর কারণ দর্শন করেছেন এভাবে যে, শাঁখারীদের যে লাখেরাজ জমি দেয়া হয়েছিল তা ছিল আয়তনে অনেক ক্ষুদ্র। সেই আয়তন মেনেই নির্মিত হত বাসগৃহ। বাসগৃহের সামনের মূল ফটক হত ছয় ফিটের মত। এরপর বিশ-ত্রিশ ফিটের মত লম্বা করিডোর চলে যেত ভিতরে। এরপর দালানগুলো পশ্চাতদিকে বিশ গজ মত প্রসারিত। বাসগৃহ গুলো অধিকাংশই চারতলা। দুইটি বাসগৃহের মধ্যবর্তী দেয়াল লাগোয়া, দরজা বা জানালা বিহীন এবং মধ্যবর্তী কোন ফাঁকা জায়গা নেই। একতলার উপরের মধ্যবর্তী স্থান ছোট প্রঙ্গনের ন্যায় খোলা রাখা হয়।

দুর্গাপুজার সময় এভাবেই উৎসবমুখর হয়ে ওঠে শাঁখারিবাজার

দুর্গাপুজার সময় এভাবেই উৎসবমুখর হয়ে ওঠে শাঁখারিবাজার

শঙ্খনির্মিত সামগ্রীর ব্যবসা সবসময়ই ভাল ছিল। সাধারণভাবে শঙ্খনির্মিত সামগ্রী হিন্দুদের উৎসবাদিতে ব্যবহৃত হয়। প্রমাণ রয়েছে যে, সপ্তদশ এবং অষ্টাদশ শতাব্দীতে বাংলার শঙ্খজাত সামগ্রী রপ্তানি করা হতো। টেরাকোটা প্রমাণাদির সাক্ষ্য দেয় যে, প্রাচীন আমলেও শঙ্খনির্মিত বালা দক্ষিণ ভারতে রপ্তানি করা হতো। শঙ্খসামগ্রীর কেন্দ্র ছিল ঢাকা, বরিশাল, দিনাজপুর, রংপুর এবং সিলেট। বর্তমানে শাঁখারিবাজারে ঐতিহ্যবাহী নানা ধরনের শাঁখা বিশেষভাবে তৈরি করা হয়।

You must be logged in to post a comment Login