শিকড়ের খোঁজে স্বাধীনতা স্তম্ভে

প্রকাশ: June 10, 2015
fimage

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে নির্মিত স্বাধীনতা স্তম্ভ মূলত একটি গ্লাস টাওয়ার। টাওয়ার ছাড়াও এই কমপ্লেক্সে আরো রয়েছে ভূগর্ভস্থ মিউজিয়াম, ম্যুরাল ও শিখা চিরন্তন। আছে লিখিত আকারে ঐতিহাসিক ৭ মার্চে দেয়া জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণ।

ইস্পাতের কাঠামোর ওপর নির্মিত এই টাওয়ার ১৬ ফুট প্রস্থের এবং উচ্চতা ১৫০ ফুট। এর উপরিভাগে রয়েছে স্বচ্ছ কাঁচ যা সূর্যের আলো প্রতিসরিত ও প্রতিফলিত করে। রাতে আলোকচ্ছটা তৈরির জন্য রয়েছে বৈদ্যুতিক আলোর ব্যবস্থা। রাতেও কৃত্রিম আলোর প্রজেকশনে টাওয়ার ও নিচের জলাধার সৃষ্টি করে এক নয়নাভিরাম পরিবেশের। প্রতিদিন সন্ধ্যা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত টাওয়ারটিতে কৃত্রিম আলোর ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

রমনা রেসকোর্স ময়দান বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান নামে পরিচিত। এই উদ্যানে দাঁড়িয়ে উপস্থিত লাখো জনতার সামনে ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষণা দিয়েছিলেন ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’। এখানেই ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় মিত্র বাহিনীর যৌথ কমান্ডের কাছে হানাদার পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ করে। আর সেই উদ্যানেই নির্মিত হয়েছে এ গ্লাস টাওয়ার। এ টাওয়ারের নিচেই রয়েছে ভূগর্ভস্থ মিউজিয়াম। এ মিউজিয়ামে স্থান পেয়েছে মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বিজরিত নানা ঐতিহাসিক ঘটনাবলীর ছবি। টাওয়ারের পাশেই রয়েছে শিখা চিরন্তন।

স্বাধীনতা স্তম্ভ

বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের প্রায় সম্পূর্ণ চিত্র তুলে ধরা হয়েছে টেরাকোটা ম্যুরালের মধ্য দিয়ে। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে প্লাজা চত্বরের পূর্ব পাশের দেয়ালে তৈরি করা হয়েছে এ ম্যুরাল। ম্যুরালের প্রথম অংশে দৃশ্যমান বাঙালির চিরচেনা সেই বাক্য ধনধান্য পুষ্পভরা আমাদের এই বসুন্ধরা। পর্যায়ক্রমে এ ম্যুরালে স্থান পেয়েছে তেভাগা আন্দোলনের চিত্র। এ ম্যুরালের রূপকার পাঁচ বিখ্যাত শিল্পী হলেন- মোহাম্মদ ইউনুস, মুকুল মকসুউদ্দীন, শিশির ভট্টাচার্য, ইফতেখারউদ্দিন আহমেদ এবং শ্যামল চৌধুরী।

mural (2)

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে স্বাধীনতা স্তম্ভের সঙ্গে এক গৌরবময় মাত্রা হচ্ছে ভূগর্ভস্থ স্বাধীনতা জাদুঘর। প্লাজা চত্বরে টেরাকোটা ম্যুরালের নিচের অংশে এ জাদুঘরের অবস্থান। উপর থেকে নিচে প্রসারিত হয়েছে জাদুঘরের প্রবেশপথ। জাদুঘরে প্রবেশ করে যে হলঘর চোখে পড়বে তাতে দেখা মিলবে অসংখ্য ছবির। ৬৬-এর ছয় দফা আন্দোলন, ৬৯-এর গণআন্দোলন সব বিষয়ে সুষ্পষ্ট ধারণা লাভ করা যাবে এ অংশে নজর দিলে। পর্যায়ক্রমিক যুক্ত হয়েছে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ। এখানে একটি মনোরম ঝর্নাও রয়েছে। ঝর্না ঘিরে রয়েছে দর্শনার্থীদের বিশ্রাম নেওয়ার জন্য বসার ব্যবস্থা।

jadughor

jhorna

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বাংলা একাডেমির ঠিক বিপরীত পাশে তৈরি করা হয়েছে উন্মুক্ত মঞ্চ। রোমান অ্যামফিথিয়েটারের মতো আকৃতির এ মঞ্চের দায়িত্বে রয়েছে বাংলা একাডেমি।

স্বাধীনতা স্তম্ভের কাজ শুরু হয় ১৯৯৭ সালের ৭ মার্চ মশাল প্রজ্বলনের মধ্য দিয়ে। ওই বছরের ২৬ মার্চ শিখা চিরন্তন স্থাপন করা হয়। তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এ প্রকল্পের ৬৫ ভাগ কাজ শেষ করা হয়। পরবর্তী সময়ে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর এ প্রকল্পে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে নির্মাণকাজ বন্ধ রাখা হয়। তিন বছর এই প্রকল্পের কাজ বন্ধ রাখার পর ২০০৪ সালের ডিসেম্বরে পুনরায় এ প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। তবে প্রকল্প ব্যয় কাটছাঁট করে ১৭১ কোটি টাকার পরিবর্তে ৭৬ কোটি ১২ লাখ ৭১ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়। স্বাধীনতা স্তম্ভের কাচের টাওয়ারের উচ্চতা দেড়শ ফুটের স্থলে একশ ফুট করা হয়। এ প্রকল্পের নির্মাণকাজের শেষ সময়সীমা ধরা হয় ২০০৬ সালের ৩০ জুন। এ মেয়াদ শেষ হওয়ার পরে বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় এসে এ প্রকল্পের কাজ শেষ করার মেয়াদ ২০০৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ায়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত টাওয়ার নির্মাণ ছাড়াই প্রকল্পের কাজ বন্ধ ঘোষণা করা হয়। পরে ২০০৯ সালের ডিসেম্বরের নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পরে গ্লাস টাওয়ার নির্মাণের জন্য নতুন করে ব্যয় নির্ধারণের পাশাপাশি মূল প্রকল্প নকশা অনুযায়ী এ টাওয়ারের উচ্চতা দেড়শ ফুট নির্ধারণ করা হয়। স্বাধীনতা স্তম্ভ নির্মাণ প্রকল্পের এ দ্বিতীয় পর্যায়ের ব্যয় নির্ধারণ করা হয় ১৮১ কোটি ৬২ লাখ টাকা। প্রকল্পের কাজ শেষ হয়েছে। সোহরাওয়ার্দী উদ্যান পরিণত হয়েছে এক দর্শনীয় স্থানে।

শিখা চিরন্তন

২৬ মার্চ ২০১৫ তারিখে স্বাধীনতা স্তম্ভ ও জাদুঘর সকলের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। প্রতি শনিবার সকাল সাড়ে ১০টা থেকে বুধবার বিকেল সাড়ে ৫টা পর্যন্ত ও শুক্রবার বিকেল ৩টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত জাদুঘর খোলা থাকবে। সর্বসাধারণের জন্য প্রবেশমূল্য মাথাপিছু ১০ টাকা এবং ১২ বছরের কম বয়সী শিশু-কিশোরদের জন্য প্রবেশমূল্য ২ টাকা। উদ্বোধনের অনেক আগে থেকেই এই কমপ্লেক্স পরিনত হয়েছে ঢাকাবাসীর ইতিহাস অন্বেষণ ও অবকাশ যাপনের অন্যতম স্থানে।

You must be logged in to post a comment Login

মন্তব্য করুন