স্বাধীন বাংলার ধাত্রী তাজউদ্দীন আহমদ

প্রকাশ: July 23, 2015
T A

স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদ জন্মগ্রহণ করেন ১৯২৫ সালের ২৩ জুলাই কাপাসিয়ার দরদরিয়া গ্রামে। শিক্ষাজীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে মেধার স্বাক্ষর রাখা বাংলাদেশের এই ধাত্রী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক পরিবেশে দেশ ও রাজনীতি নিয়ে ভাবতে প্ররোচিত হন এবং জড়িয়ে যান সক্রিয় রাজনীতিতে।

আরবি মাধ্যমে তাজউদ্দীনের পড়াশোনা শুরু হলেও মায়ের ইচ্ছায় তিনি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে লেখাপড়া করেন। তিনি পড়েছেন কালিগঞ্জ সেন্ট নিকোলাস ইনস্টিটিউশন, ঢাকার মুসলিম বয়েজ হাই স্কুল ও সেন্ট গ্রেগরিজ হাই স্কুলে। এসময় একজন স্কাউট হিসেবে স্কাউট আন্দোলনের সাথে যুক্ত হন। পরবর্তী কর্মজীবনে যা তাঁর প্রেরণা ও কাজ করার ক্ষমতা জুগিয়েছে।

তাজউদ্দিন আহমদের রাজনৈতিক চেতনার বিকাশ হয়েছিল কৈশোরে, কাপাসিয়াতে থাকতেই। তিনি কাপাসিয়া মাইনর স্কুলের ছাত্র থাকাকালীন কাপাসিয়াতেই নির্বাসিত হয়েছিলেন ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের তিন বিপ্লবী রাজেন্দ্র নারায়ণ চক্রবর্তী, বিরেশ্বর বন্দ্যাপাধ্যায় ও মনীন্দ্র শ্রীমানী। তাজউদ্দীনের প্রখর মেধার পরিচয় পেয়ে তারা তাকে ভূগোল, অর্থনীতি, রাজনীতি ও মনীষীদের জীবনী সম্পর্কে জানতে সাহায্য করেন। বিপ্লবীরা তার চেতনার মাঝে রোপন করেন শোষণ ও বঞ্চনাহীন সমাজ আর অধিকার আদায়ের রাজনীতির বীজ। তাজউদ্দীন আহমদ সেই বিপ্লবী চেতনাকে ধারণ করে ১৯৪৮এ প্রতিষ্ঠিত পূর্ব বাংলা ছাত্রলীগের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। তিনি আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠনের উদ্যোক্তাদেরও অন্যতম ছিলেন।

১৯৪৪ সালের দিকে তাজউদ্দীন জড়িয়ে পড়েন মুসলিম লীগের রাজনীতির সাথে। হয়ে ওঠেন পার্টির সক্রিয় সদস্য। এবছর নির্বাচনে বঙ্গীয় মুসলিম লীগের কাউন্সিলর নির্বাচিত হন। কিন্তু দলটির গণবিচ্ছিন্ন রাজনীতির প্রতিবাদে, পরবর্তীতে দলের সাথে সম্পর্ক ত্যাগ করেছিলেন। একই বছর কলকাতায় শেখ মুজিবুর রহামনের সাথে পরিচয় হয় তার। বাকিটুকু তো ইতিহাস।

ভাষা আন্দোলনেও তাজউদ্দীন ছিলেন বজ্র কন্ঠ। ১৯৪৮-এর ১১ এবং ১৩ মার্চ সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবে ধর্মঘট-কর্মসূচি ও বৈঠক করেন। ২৪ মার্চ মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর সাথে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের নেতারাসহ তিনি বৈঠক করেন। যদিও জিন্নাহর অসহিষ্ণু আচরণের কারণে এ বৈঠক কোনো সুফল বয়ে আনেনি।

১৯৫৯ সালের ২৬ এপ্রিল সৈয়দা জোহরা খাতুন লিলির সাথে পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হন তাজউদ্দীন। ৩ কন্যা ও ১ পুত্রসন্তানের জন্ম দেন তারা।

১৯৫৩ সালে শেখ মুজিবুর রহমান দলের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। এ সময়ই আওয়ামী লীগে সক্রিয়ভাবে যোগ দেন তাজউদ্দীন আহমদ। এ বছরই তিনি ঢাকা জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হন। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে মাত্র ২৯ বছর বয়সে ঢাকা উত্তর-পূর্ব আসনে যুক্তফ্রন্ট প্রার্থী হিসেবে বিজয়ী হন তাজউদ্দীন। ১৯৬৪ সালে সাংগঠনিক সম্পাদক হন আওয়ামী লীগের। ১৯৬৬ সালে হন সাধারণ সম্পাদক।

১৯৭১ সালে বাঙ্গালি জাতির চরম দুর্দিনে দেশের হাল ধরেছিলেন তাজউদ্দীন আহমদ। পাকিস্তানে বন্দী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি, সৈয়দ নজরুল ইসলামকে শেখ মুজিবের অনুপস্থিতিতে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি আর নিজে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ১০ এপ্রিল সরকার গঠন করেন ও ১৭ এপ্রিল মেহেরপুরের বদ্যিনাথ তলার আম্রকাননে শপথ গ্রহণ করেন। তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সাথে দেখা করেন এবং মুক্তিযুদ্ধে ভারতের সহযোগিতাপ্রাপ্তি নিশ্চিত করেন। শত বাধা বিপত্তির মাঝে তিনি প্রবাসী সরকার চালিয়ে যেতে থাকেন। তিনি প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বের পাশাপাশি প্রতিরক্ষা মন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেছিলেন। যুদ্ধকালীন ঘুরে বেড়িয়েছেন বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকা। মুক্তিবাহিনীকে, সাধারণ মানুষকে সাহস জুগিয়েছেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধের সাফল্যের পশ্চাতে তার কৌশলগত চিন্তা, সাংগঠনিক দক্ষতা ও দূরদর্শিতার বিশাল ভূমিকা ছিল। বিশ্ব রাজনীতির বিভিন্ন বিষয়ের সাথে সমন্বয় সাধন এবং নতুন জন্ম নেয়া বাংলাদেশের প্রতি সমর্থন আদায়ের লক্ষ্যে কূটনৈতিক তৎপরতাও চালিয়ে যান তিনি। এমনিভাবে যুদ্ধের সময়ে কখনও যুদ্ধক্ষেত্রে, কখনও শরণার্থী শিবিরে, কখনো ভারতীয় মন্ত্রীদের সাথে বৈঠক করে আবার কখনও স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সংগ্রামী শিল্পীদের সাথে নিয়ে তার যুদ্ধের প্রতিটি দিন কেটেছে।

দেশ স্বাধীনের পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেশে ফিরে এলে মন্ত্রী পরিষদ শাসিত সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়। তাজউদ্দীন আহমদ হন নয়া সরকারের অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী। ১৯৭৩-এ ঢাকা-২২ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির ব্যবস্থাকে চাঙা করার জন্য প্রচেষ্টা চালিয়ে যান তিনি। কিন্তু যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি ভঙ্গুর অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে চাঙা করে তুলতে বেগ পেতে হয় তাকে। তার উপর নতুন দেশে নেতা কর্মীদের সাথে দলের, আর জনগণের সাথে সরকারের দূরত্ব বাড়তে থাকে। এদিকে সুবিধাভোগী, দুর্নীতিপরায়ণ, চাটুকার রাজনীতি সংশ্লিষ্টদের নির্লজ্জ তৎপরতা বেড়েই চলে। পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে মন্ত্রীপরিষদ থেকে পদত্যাগ করেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধের সফল নেতা মন্ত্রীসভা থেকে বিদায় নিলেন স্বাধীনতা লাভের মাত্র ২ বছর ১০ মাসের মাথায়।

তাজউদ্দীন আহমেদ জানতে পেরেছিলেন বঙ্গবন্ধুকে হত্যার ষড়যন্ত্র হচ্ছে। বঙ্গবন্ধুকে সতর্কও করেছিলেন তাজউদ্দীন। তার আশঙ্কাকে সত্য করে দিয়ে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট শেখ মুজিবুর রহমানকে স্বপরিবারে হত্যা করা হয়। হত্যাকান্ডের পর কাছে সবাই তাজউদ্দীন আহমদকে আত্মগোপনে যাবার জন্য বলতে থাকেন। কেননা বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে পরবর্তী লক্ষ্য হবেন তার কাছের মানুষরা, এ ছিল সকলের জানা। কিন্তু তিনি আত্মগোপন করতে অস্বীকৃতি জানান। সবার আশঙ্কাই সত্য হয়। ১৫ আগস্ট প্রথম গৃহবন্দী ও পরে ২২ আগস্ট গ্রেফতার করা হয় তাকে।

কারা অন্তরীণ তাজউদ্দীনসহ আরও ৩ জাতীয় নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, এম. মনসুর আলী, এ.এইচ.এম কামরুজ্জামানকে ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর অস্ত্রের দমকে স্তব্ধ করে দেওয়া হয়। বাঙালী জাতির স্বাধীনতার কান্ডারীরা নিহত হন।

১৯৭১ সালের নিজ কর্মকান্ড সম্পর্কে তাজউদ্দীন আহমদ বলেছিলেন, ‘আমি সেদিন সাড়ে সাত কোটি বাঙালীর স্বার্থে যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম তা হলো: একটি স্বাধীন সরকার প্রতিষ্ঠা করে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম পরিচালনার জন্য কাজ শুরু করা।’ (তাজউদ্দীন আহমদ-ইতিহাসের পাতা থেকে। পৃষ্ঠা-২৯১)। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের ৪ জানুয়ারি এক টিভি ভাষণে তিনি বলেছিলেন- ‘৩০ লক্ষাধিক মানুষের আত্মাহুতির মাঝ দিয়ে আমরা হানাদার পশুশক্তির হাত থেকে পদ্মা-মেঘনা-যমুনা বিধৌত বাংলাদেশকে স্বাধীন করে ঢাকার বুকে সোনালি রক্তিম বলয় খচিত পতাকা উত্তোলন করেছি’। ১৯৭১ সালে কারা অন্তরীন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ছাড়াই বিশাল যুদ্ধক্ষেত্রে দখলদার বাহিনীর সাথে যুদ্ধ, বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে সরকার গঠন এবং পরিচালনা, একই সঙ্গে নিজের দলের লোকজনের আত্মঘাতী আক্রমণ মোকাবেলা করেছেন, কিন্তু জর্জরিত হয়েছেন অন্তর্ঘাতে। কর্মময় জীবনে কোনো কাজেই দাবি করেননি নিজ কৃতিত্বের। কর্তব্য বিবেচনা করে নিঃস্বার্থভাবে, একাগ্রচিত্তে কাজ করে গেছেন। বলেছেন- ‘মুছে যাক আমার নাম কিন্তু বেঁচে থাক বাংলাদেশ’।

বাংলাদেশ তাজউদ্দীনের নাম মোছে নি, মুছবে না কোনোদিন।

You must be logged in to post a comment Login

মন্তব্য করুন