হোসেনী দালান

প্রকাশ: May 30, 2015
hoseni dalan..

হোসেনী দালান পুরানো ঢাকায় অবস্থিত শিয়া সম্প্রদায়ের একটি ইমারত। এটি মুগল আমলে নির্মিত হয়েছিল বলে মনে করা হয়। ৬১ হিজরির ১০ মুহররম (৬৮০ খ্রিস্টাব্দের ১০ অক্টোবর) তারিখে ইরাকের কারবালার যুদ্ধে ইমাম হোসেনের শহীদ হওয়াকে স্মরণ করার জন্য ইমারত নির্মাণ করা ছিল শিয়া সম্প্রদায়ের মধ্যে প্রচলিত একটি সাধারণ রীতি। শাহ সুজার শাসনকালে জনৈক সৈয়দ মুরাদ প্রথম এ ইমারত নির্মাণ করেন বলে মনে করা হয়। শাহ সুজা নিজে সুন্নি মুসলমান হলেও শিয়াদের মধ্যে প্রচলিত রীতিনীতির পৃষ্ঠপোষকতা করতে আগ্রহী ছিলেন।

প্রায় সাড়ে ৩০০ বছরের পুরনো এ স্থাপনা মোগল আমলের ঐতিহ্যের নিদর্শন। মোগল সম্রাট শাহজাহানের আমলে এটি নির্মিত হয়। এর নির্মাণকাল নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতপার্থক্য আছে। ইমামবাড়ার দেয়ালের শিলালিপি থেকে জানা যায়, শাহ সুজার সুবেদারির সময় তাঁর এক নৌ-সেনাপতি মীর মুরাদ এটি হিজরী ১০৫২ সনে (১৬৪২ খ্রিস্টাব্দ) সৈয়দ মুরাদ কর্তৃক নির্মিত হয়। তিনি প্রথমে তাজিয়া কোণা নির্মাণ করেন। ইমামবাড়া তারই পরিবর্ধিত আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়া তাঁর ‘বাংলাদেশের প্রত্নসম্পদ’ বইয়ে ভবনের দেয়ালে লাগানো শিলালিপির কথা উল্লেখ করেছেন। প্রত্নতাত্ত্বিকরা পরীক্ষার পর দেখেছেন ওই শিলালিপিটি নকল নয়। শিলালিপিতে উল্লেখ রয়েছে নির্মাতা হিসেবে মীর মুরাদের নাম। ঐতিহাসিক এম হাসান দানীও বলেছেন, ‘মীর মুরাদই এখানে প্রথম ছোট আকারের একটি ইমামবাড়া স্থাপন করেছিলেন। পরে এটি ভেঙে যায় এবং নায়েব-নাজিমরা নতুন করে তা নির্মাণ করেন। ইতিহাসবিদ জেমস টেলর তাঁর বইয়ে উল্লেখ করেন, ১৮৩২ সালেও আদি ইমামবাড়া টিকে ছিল। ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানির আমলে দুই দফায় ইমামবাড়ার সংস্কার হয়। ১৮৯৭ সালের ভূমিকম্পে ভবনটি প্রায় বিধ্বস্ত হয়।পরে খাজা আহসানউল্লাহ লক্ষাধিক টাকা ব্যয় করে তা পুন:নির্মাণ ও সংস্কার করেন। ১৯৯৫-এ একবার এবং পরবর্তীতে ২০১১ তে পুনর্বার দক্ষিণের পুকুরটির সংস্কার করা হয়। ২০১১ খ্রিস্টাব্দে হোসেনী দালান ইমামবাড়ার সংস্কারসাধন ও সৌন্দর্যবর্ধন করা হয়।

Imambara_Hosseini_Dallan_Dhaka_1904

এই হোসেনী দালান একটি উঁচু মঞ্চের উপর স্থাপিত। পূর্বদিকের একটি সিঁড়ির সাহায্যে এই মঞ্চে উঠতে হয়। মূল ইমারতটি পাশাপাশি সংস্থাপিত দুটি হলকক্ষ নিয়ে গঠিত। দক্ষিণমুখী ‘শিরনি’ হলটি হোসেনের মৃত্যুর জন্য দুঃখ ও শোক প্রকাশের উদ্দেশ্যে কালো রঙ করা হয়েছিল। অন্যদিকে উত্তরমুখী খুতবা হলে রয়েছে সাতধাপবিশিষ্ট একটি কাঠের তৈরি মিম্বর। শেষোক্ত হলটিতে বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতীক ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। এই দুটি হলের ডানে ও বামে সম্ভবত নারীদের জন্য দ্বিতল বিশিষ্ট সম্পূরক হলকক্ষ নির্মিত হয়েছে। দক্ষিণ দিকের সম্মুখভাগের দুপ্রান্তে দুটি তিনতলা বহুভুজ ফাঁপা বুরুজ রয়েছে। বুরুজগুলির শীর্ষে রয়েছে গম্বুজ। হোসেনী দালানের দক্ষিণাংশে রয়েছে একটি বর্গাকৃদির পুকুর। এর উত্তরাংশে শিয়া বংশোদ্ভূত ব্যক্তিদের কবরস্থান অবস্থিত। দালানটি সাদা বর্ণের, এবং এর বহিরাংশে নীল বর্ণের ক্যালিগ্রাফি বা লিপিচিত্রের কারূকাজ রয়েছে। একটি উঁচু মঞ্চের ওপর ভবনটি নির্মিত। মসজিদের অভ্যন্তরেও সুদৃশ্য নকশা বিদ্যমান।

ইমারতটির প্যারাপেটে রয়েছে রঙিন পদ্ম-পাঁপড়ির নকশা, আর এর চার কোণের শীর্ষে রয়েছে চারটি ছত্রী। সামগ্রিকভাবে ইমারতটিকে দেখতে একটি আধুনিক ইমারত বলেই মনে হয়, তবে এর কোথাও কোথাও পুরানো আমলের স্থাপত্যের চিহ্ন দেখা যায়। মুহররমের ১ থেকে ১০ তারিখে হোসেনী দালান ঢাকা শহরের মূল আকর্ষণে পরিণত হয়। মুসলমান সম্প্রদায়ের লোকেরা এখানে সমবেত হয়ে ‘হায় হোসেন, হায় হোসেন’ বলে মাতম করতে থাকে। আশুরার দিনে (অর্থাৎ ১০ মুহররম) এখান থেকে বিশাল একটি তাজিয়া মিছিল বের করা হয়, প্রধান প্রধান সড়কগুলি প্রদক্ষিণ করে নগরীর পশ্চিম প্রান্তে প্রতীকীভাবে কারবালা নাম দেওয়া একটি স্থানে গিয়ে তা শেষ হয়।

ইরান সরকারের উদ্যোগে ২০১১ খ্রিস্টাব্দে হোসেনী দালানের ব্যাপক সংস্কার সাধন করা হয়। ইরান সরকার এতে আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা প্রদান করে। ইরানের স্থপতিবিদ ও শিল্পীরা এতে অংশগ্রহণ করেন। ফলে ইরানের ধর্মীয় স্থাপনার বাহ্যিক রূপ ও নান্দনিকতা এ সংস্কার কাজে প্রতিফলিত হয়েছে। মধ্য দিয়ে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। সংস্কারের আগে ভেতরে রং-বেরঙের নকশা করা কাচের মাধ্যমে যে সৌন্দর্য ফুটিয়ে তোলা হয়েছিল, তা পরিবর্তন করে বিভিন্ন আয়াত ও মুদ্রা লিখিত নীল রঙের টাইলস লাগানো হয়েছে। একইভাবে এর পূর্বদিকের ফটকে এবং উত্তর দিকের চৌকোনা থামগুলোয় আয়াত ও সুরা লিখিত নীল রঙের টাইলস লাগানো হয়েছে। টাইলসগুলো ইরান থেকে আমদানি করা এবং এতে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে ইরানের ধর্মীয় শিল্পকলা ক্যালিগ্রাফি। ইরানের বেশ কিছু ধর্মীয় স্থাপনায় এ ধরনের টাইলস রয়েছে বলে জানা যায়।

You must be logged in to post a comment Login

মন্তব্য করুন