৭১এর বন্ধু নীলিমা ইব্রাহিম

প্রকাশ: June 18, 2015
nilima

ড. নীলিমা ইব্রাহিম বাংলাদেশের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, সাহিত্যিক ও সমাজকর্মী। ১৯৫৬ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন এবং ১৯৭২ সালে অধ্যাপক পদে উন্নীত হন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের অব্যবহিত পরেই বীরাঙ্গনাদের পূনর্বাসন ও তাদের মনোবল ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে কাজ করা মানুষদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন নীলিমা ইব্রাহীম। ১৯৭৪-৭৫ সালে তিনি বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক ছিলেন। এ কাজের জন্য তিনি বেতন কিংবা সম্মানী নেননি।

ড. নীলিমা ইব্রাহিম ১৯২১ সালের ১১ অক্টোবর বাগেরহাট জেলার ফকিরহাট উপজেলার মূলঘর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা প্রফুল্ল কুমার রায় চৌধুরী ও মাতা কুসুম কুমারী দেবী। ১৯৩৫ সালে তিনি খুলনা করোনেশন গার্লস্‌ স্কুল হতে প্রথম বিভাগে মেট্রিক পাশ করেন। এই স্কুল থেকে মাধ্যমিক পাশের পর বাবা তাঁকে ভর্তি করিয়ে দিয়েছিলেন কলকাতার বিখ্যাত ভিক্টোরিয়া ইনস্টিটিউশনে। সেখান থেকেই উচ্চমাধ্যমিক ও অনার্স (অর্থনীতি) সম্পন্ন পাশ করেন। তারপর এম.এ. পড়া শুরু করলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতিতে। তবে অর্থনীতিতে এম.এ.-টা আর করা হয়ে উঠেনি। শেষ পর্যন্ত স্কটিশ চার্চ কলেজ থেকে বি.টি. সম্পন্ন করেন। কিন্তু এম.এ. পাশের অদম্য ইচ্ছা থেকেই গিয়েছিল তাঁর। এরপর ভর্তি হলেন বাংলায়, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে, এখানে এম.এ. সম্পন্ন করেছিলেন তিনি।

১৯৪৫ সালের ডিসেম্বর মাসে নীলিমা ইব্রাহিমের বিয়ে হয়। স্বামী ইন্ডিয়ান আর্মি মেডিকেল কোরের ক্যাপ্টেন ডাঃ মোহাম্মদ ইব্রাহিম। বিয়ের পর তিনি তার পূর্বের নাম নীলিমা রায় চৌধুরী পরিবর্তন করে হয়ে যান আমাদের সকলের পরিচিত নীলিমা ইব্রাহিম। স্বামীর বদলির চাকরির কারণে এরপর স্বামীর সাথে গিয়েছেন পিরোজপুর, যশোর, বরিশাল, খুলনায়। তিনি আবারও পড়াশোনা শুরু করেন ১৯৫৬ সালে। এ সময় তিনি ঢাকায় আসেন পিএইচডি করতে। একই বছর জুন মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাষক হিসাবে যোগদানের পর উনসত্তরের গনঅভ্যুত্থান থেকে শুরু করে ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা সংগ্রামে দেশের জন্য, দেশের স্বাধীনতার জন্য নিরলসভাবে কাজ করে গেছেন নীলিমা ইব্রাহিম। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ ক্যাম্পাসেই ছিলেন তিনি। তাই প্রত্যক্ষ করেছিলেন নরঘাতক পাকিস্তানি সেনাদের তান্ডব। ২৭ তারিখ ক্যাম্পাস ছেড়ে নারিন্দায় গেলেন, ৩০ মার্চ ঢাকা ছাড়েন। আবার আগস্টে ফিরে আসেন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য অর্থ সংগ্রহ, প্রচারপত্র বিলিসহ ছাত্র-ছাত্রীদের সংঘবদ্ধ করে মুক্তিসংগ্রামে প্রেরনের জন্য কাজ করে গেছেন। এজন্য তিনি তৎকালীন সামরিক শাষক টিক্কা খানের বিরাগভাজন হয়েছিলেন। তাকে টিক্কা খান তার অন্তর্ঘাতী কর্মকান্ডের জন্য কঠোর ভাবে হুশিয়ার করে সতর্কপত্র দেন যা জাতীয় যাদুঘরে সংরক্ষিত আছে। বিজয়ের দু’দিন পর ১৮ ডিসেম্বর সকালে মুনীর চৌধুরী, আনোয়ার পাশাদের উদ্ধারের কথা বলে মিরপুর বদ্ধভূমিতে নিয়ে যেতে চেয়েছিলো পাকিস্তানিদের দোসররা। শুধু বেঁচে যান আত্মীয় ড. মুজিবুল হকের কারণে।

মুক্তিযুদ্ধে হানাদার বাহিনীর পৈশাচিকতা, বর্বর হত্যাকান্ড তাকে প্রবলভাবে নাড়া দেয়। মিরপুরে শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থান ও শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ নির্মান তার ঐকান্তিক প্রচেষ্টার ফসল।

মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে দেশ স্বাধীন হবার পর তিনি দেশ গড়ার কাজে ঝাপিয়ে পড়েন। মুক্তিযুদ্ধের পর মুক্তিযুদ্ধে হানাদার কর্তৃক নির্যাতিত নারীদের পুনর্বাসনে ও তাদের বেচে থাকার প্রেরনা যোগাতে তিনি নারী পূনর্বাসন বোর্ড গঠনে অগ্রনী ভূমিকা পালন করেন। তিনি নিজ উদ্যোগে অনেক বীরাঙ্গনা নারীকে সদ্য স্বাধীন দেশে সম্মানের সাথে বসবাসের জন্য প্রতিষ্ঠিত করেন।

যুদ্ধপরবর্তী সময়ে নীলিমা ইব্রাহিম নারী পূনর্বাসন বোর্ডের সদস্য হিসাবে বিভিন্ন নারী পূনর্বাসন কেন্দ্রে ঘুরে বেড়িয়েছেন, বীরাঙ্গনাদের বেচে থাকতে উৎসাহ দিয়েছেন অবিরাম। এভাবেই তার সুযোগ হয়েছিল বীরাঙ্গনা নারীদের সাথে কথা বলার। তিনি বিভিন্ন সময়ে অনেক বীরাঙ্গনাদের সাথে কথা বলে জেনেছেন তাদের নির্যাতনের ইতিহাস। কতটা নিষ্ঠুর ও অমানবিক নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন তারা। তিনি এ সমস্ত বীরাঙ্গনাদের মাত্র কয়েকজনের ঘটনা সংকলন করেছেন “আমি বীরাঙ্গনা বলছি” নামক স্মৃতিচারণমূলক গ্রন্থে।

ড. নীলিমা ইব্রাহিম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রধান, রোকেয়া হলের প্রভোস্ট এবং সংস্কৃত ও পালি বিভাগের অধ্যক্ষের পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। এ ছাড়াও তিনি বাংলাদেশ মহিলা সমিতির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, বাংলাদেশ পরিবার পরিকল্পনা সমিতির সভাপতি, এসোসিয়েটেড কান্ট্রি উইমেন অব দা ওয়ার্ল্ড এর সাউথ ইস্ট এশিয়ার এরিয়া প্রেসিডেন্ট এবং ইন্টারন্যাশনাল এলায়েন্স অব উইমেন-এর ভাইস প্রেসিডেন্টের মত গুরুত্বপূর্ণ অনেক দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৫ সালে তিনি বাংলাদেশের একমাত্র নারী প্রতিনিধি হিসেবে মেক্সিকোতে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক নারী কংগ্রেসে যোগদান করেন। শরৎ প্রতিভা, বাংলার কবি মধুসূদন, বাংলা নাটক : উৎস ও ধারা, বাঙালি মানস ও বাংলা সাহিত্য, আমি বীরাঙ্গনা বলছি ইত্যাদি তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ। তাঁর প্রাপ্ত পদক ও পুরস্কারের মধ্যে বাংলা একাডেমী পুরস্কার-১৯৬৯, বেগম রোকেয়া পদক-১৯৯৬ এবং একুশে পদক-২০০০ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি ২০০২ সালের ১৮ জুন মৃত্যুবরণ করেন।

স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধ ক্ষেত্রে অসামান্য ও কৃতিত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ অকুতোভয় দেশপ্রেমিক ড. নীলিমা ইব্রাহিম-কে (মরণোত্তর) ‘স্বাধীনতা পুরস্কার-২০১১’ প্রদান করা হয়।

You must be logged in to post a comment Login

মন্তব্য করুন