ঘুরে আসি বৈশাখের প্রথম দিনে

প্রকাশ: April 12, 2015
New-year

আমরা ঢাকা ডটকম:
পহেলা বৈশাখে বিশ্বের সব প্রান্তের সব বাঙালি নানা আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে নতুন বছরকে বরণ করে নেয়। আর ভুলে যাবার চেষ্টা করে অতীত বছরের সব দুঃখ-গ্লানি। সবার কামনা থাকে যেন নতুন বছরটি সমৃদ্ধ ও সুখময়ী হয়। বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যবসায়ীরা একে নতুনভাবে ব্যবসা শুরু করার উপলক্ষ হিসেবে বরণ করে নেয়।

মঙ্গল শোভাযাত্রা: ঢাকার বৈশাখী উৎসবের একটি আবশ্যিক অঙ্গ মঙ্গল শোভাযাত্রা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে পহেলা বৈশাখে সকালে এই শোভাযাত্রাটি বের হয়ে শহরের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে পুনরায় চারুকলা ইনস্টিটিউটে এসে শেষ হয়। এই শোভাযাত্রায় গ্রামীণ জীবন এবং আবহমান বাংলাকে ফুটিয়ে তোলা হয়। শোভাযাত্রায় সব শ্রেণী-পেশার বিভিন্ন বয়সের মানুষ অংশগ্রহণ করে। শোভাযাত্রার জন্য বানানো হয় রঙ-বেরঙের মুখোশ ও বিভিন্ন প্রাণীর প্রতিলিপি। ১৯৮৯ সাল থেকে এই মঙ্গল শোভাযাত্রা পহেলা বৈশাখের উৎসবের একটি অন্যতম আকর্ষণ।

রমনার আয়োজন: বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা শহরে পহেলা বৈশাখের মূল অনুষ্ঠানের কেন্দ্রবিন্দু সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানটের গানের মাধ্যমে নতুন বছরের সূর্যকে আহ্বান। পহেলা বৈশাখ সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে ছায়ানটের শিল্পীরা সম্মিলত কণ্ঠে গান গেয়ে নতুন বছরকে আহ্বান জানান। স্থানটির পরিচিতি বটমূল হলেও প্রকৃত পক্ষে যে গাছের ছায়ায় মঞ্চ তৈরি হয় সেটি বট গাছ নয়, অশ্বত্থ গাছ। ১৯৬০-এর দশকে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর নিপীড়ন ও সাংস্কৃতিক সন্ত্রাসের প্রতিবাদে ১৯৬৭ সাল থেকে ছায়নটের এই বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের সূচনা।

বৈশাখী মেলা: পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে যেন পুরো ঢাকায় মেলা বসে। মেলায় ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পজাত হরেক রকম পণ্য প্রদর্শন ও বিক্রি ছাড়াও আগতদের মনোরঞ্জনের জন্য নানা ব্যবস্থা করা হয়। মেলায় আপনি পাবেন কাঠের আসবাবপত্র, হস্ত শিল্প, মৃতশিল্প সহ নানা রকমের খেলনার জিনিস। বাঙালি চেতনা ও বাঙালি সংস্কৃতির প্রবহমান ধারা হচ্ছে বাংলা নববর্ষ ও বৈশাখী মেলা। আগের অবস্থার কিছু পরিবর্তন ঘটলেও মেলা এখনও জমজমাট। সব স্তরের সব বয়সের মানুষের কাছে মেলা অনাবিল আনন্দের উৎস হিসেবে চিহ্নিত। মেলার মাধ্যমে স্থানীয় সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও সামাজিক অবস্থার পরিচয় মেলে। পহেলা বৈশাখ আত্মীয়স্বজনদের উপহার দেয়ার প্রথা অতীতে ব্যাপকভাবে ছিল, এখনও আছে। নববর্ষ ও বৈশাখী মেলা বাঙালির জীবনে এক অদ্ভুত আকর্ষণ তৈরি করে। তুচ্ছ প্রাত্যহিকতার ঊধর্্েব উঠে সবার সঙ্গে মিলিত হওয়ার উত্তম ক্ষেত্র হচ্ছে মেলা। কেনাকাটা ও চিত্ত বিনোদনের পাশাপাশি অর্থনৈতিক দিক থেকেও মেলার গুরুত্ব রয়েছে। পহেলা বৈশাখ মেলা, বিনোদন, মিষ্টিমুখ ও ফলাহারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। উৎসব-আনন্দের পাশাপাশি অর্থনৈতিক পরিমন্ডলেও পহেলা বৈশাখের সুনির্দিষ্ট কর্মকাণ্ড রয়েছে।

বৈশাখ মাস বলতে তো মেলার মাসকেই বোঝায়। একসময় শুধু গ্রামগঞ্জে মেলা হলেও এখন এর পরিধি ছড়িয়েছে শহরে। তবে পার্থক্য থাকে গ্রামের আর শহুরে মেলার। বাঁশের বেতের তৈজষ আর নানা জাতের খেলার সামগ্রী, নারকেল মুড়কিসহ আরও কত কী থাকে এসব মেলায়, তার ইয়ত্তা নেই।

বৈশাখী খাবার
বাঙালির উৎসব উদযাপনের সঙ্গে খাবারের বিষয়টি বেশ ভালো ভাবে জড়িত। প্রতিটি উৎসবের জন্য রয়েছে ভিন্ন ধরনের খাবার। বাঙালিদের নববর্ষের আয়োজনেও এর ব্যতিক্রম হয় না। নববর্ষের ভোর থেকে শুরু হওয়া অনেক আয়োজনের একটি অংশ হলো পান্তা-ইলিশ খাওয়া। আমাদের দেশে পান্তা খাওয়ার রীতি অনেক পুরানো। সাধারণত কৃষক, দিনমজুর যাদের প্রচুর শারীরিক শ্রম দিতে হয় তারা সকালের নাস্তা হিসেবে পান্তা খেয়ে থাকেন। গ্রামে এখনও পান্তা খাওয়ার প্রচলন আছে। ভাতে পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি দিয়ে সারা রাত ঢেকে রাখা হয়। এর ফলে তৈরি হয় পান্তা। বর্ষবরণের অন্যতম অনুষঙ্গ হলো পান্তা-ইলিশ। যেন এই পান্তা-ইলিশ না হলে আর পহেলা বৈশাখের কোন আমেজই থাকে না। সঙ্গে থাকে কাঁচামরিচ। মানে সম্পূর্ণভাবেই বাঙালিয়ানার পরিচয় দিতে যেন ব্যস্ত সবাই। শহরে গ্রামে সব জায়গায় এখন পান্তা ইলিশের প্রচলন চালু হয়েছে। আপনি শহরের হোটেল, রেস্তরাঁয়, রমনা পার্কসহ অন্যান্য পার্কেও পাবেন পান্তা-ইলিশ। পান্তা-ইলিশ দিয়ে আপনি বরণ করে নিতে পারেন এবারের নববর্ষ। তবে অবশ্যই সঙ্গে থাকবে আপনার পরিবার-পরিজন ও প্রিয় মানুষজন। আপনি নিজের বাসায়ও আয়োজন করতে পারেন পান্তা-ইলিশের। নিমন্ত্রণ করতে পারেন আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুদের। সকালে এক সঙ্গে পান্তা-ইলিশ খেয়ে বেড়িয়ে পড়তে পারেন রমনার বটমূলে।

ইতিহাস: হিন্দু সৌর পঞ্জিকা অনুসারে বাংলা বারটি মাস অনেক আগে থেকেই পালিত হতো। এই সৌর পঞ্জিকার শুরু হত গ্রেগরীয় পঞ্জিকায় এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি সময় হতে। হিন্দু সৌর বছরের প্রথম দিন আসাম, বঙ্গ, কেরল, মণিপুর, নেপাল, উড়িষ্যা, পাঞ্জাব, তামিল না এবং ত্রিপুরার সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে অনেক আগে থেকেই পালিত হত। ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দের ১০ মার্চ বা ১১ মার্চ থেকে বাংলা সাল গণনা শুরু হয়। আধুনিক নববর্ষ উদযাপনের খবর প্রথম পাওয়া যায় ১৯১৭ সালে। প্রথম মহাযুদ্ধে ব্রিটিশদের বিজয় কামনা করে সে বছর পহেলা বৈশাখে হোম কীর্তন ও পূজার ব্যবস্থা করা হয়। এরপর ১৯৩৮ সালেও অনুরূপ কর্মকাণ্ডের উল্লেখ পাওয়া যায়। পরবর্তী সময়ে ১৯৬৭ সালের আগে ঘটা করে পহেলা বৈশাখ পালনের রীতি তেমন একটা জনপ্রিয় হয়নি।

You must be logged in to post a comment Login

মন্তব্য করুন