ঢাকায় নৌকা বাইচ

প্রকাশ: May 14, 2015
rowing-(1)

আরো জোরে হেইয়্যো/মারো টান হেইয়্যো/আগে চল হেইয়্যো/জিতা যামু হেইয়্যো- গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী প্রাচীন খেলা নৌকা বাইচে প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারীদের (দাঁড়িদের) হাঁকডাক।

বাংলাদেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও খেলাধূলার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে আছে এদেশের নদ-নদী। এরই ধারাবাহিকতায় দেশের লোক সংস্কৃতির অন্যতম অনুষঙ্গ হয়ে আছে নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতা।

বাইচ শব্দটি ফারসি যার অর্থ বাজি বা খেলা। নৌকার দাঁড় টানার কসরত ও নৌকা চালনার কৌশল দ্বারা জয়লাভের উদ্দেশ্যে নৌকা বাইচ অনুষ্ঠিত হয়। জাতীয় নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতায় দূরত্ব হয় ৬৫০ মিটার। প্রতিটি নৌকায় ৭, ২৫, ৫০ বা ১০০ জন মাঝি বা বৈঠাচালক থাকতে পারে। নদীমাতৃক বাংলাদেশে নৌকা বাইচ প্রচলিত আছে স্মরণাতীত কাল থেকে।

155

বুড়িগঙ্গা নদীতে নৌকা বাইচ
বাংলাদেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও খেলাধুলায় নদ-নদীর উপস্থিতি প্রবল এবং নৌকা বাইচ এদেশের লোকালয় ও সংস্কৃতির এক সমৃদ্ধ ফসল। নৌ-শিল্পকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন জায়গায় বন্দর ও বাজার গড়ে ওঠে, গড়ে ওঠে দক্ষ ও অভিজ্ঞ নৌকারিগর ও নৌ-শিল্পী। বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় নৌকার বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য দেখতে পাওয়া যায়। ঢাকা, গফরগাঁও, ময়মনসিংহ ইত্যাদি এলাকায় বাইচের জন্য ব্যবহূত হয় সাধারণত কোশা ধরনের নৌকা। এর গঠন সরু এবং এটি লম্বায় ১৫০ ফুট থেকে ২০০ ফুট হয়। এর সামনের ও পিছনের অংশ একেবারে সোজা। এটি দেশিয় শাল, শীল কড়ই, চাম্বুল ইত্যাদি গাছের কাঠ দ্বারা তৈরি করা হয়।

নৌকা বাইচ হত ধোলাই খালে

নৌকা বাইচ হত ধোলাই খালে


মুসলিম যুগের নবাব-বাদশাহগণ নৌকা বাইচের আয়োজন করতেন। অনেক নবাব বা বাদশাহদের জল বা নৌ বাহিনীর দ্বারা নৌকা বাইচ উৎসবের গোড়াপত্তন হয়। পূর্ববঙ্গের ভাটি অঞ্চলে প্রশাসনিক অন্যতম উপায় ছিল নৌশক্তি। বাংলার বারো ভুঁইয়ারা নৌবলে বলিয়ান হয়ে মুগলদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন। মগ ও হার্মাদ জলদস্যুদের দমন করতেও নৌশক্তি ব্যবহূত হয়েছে। এদের রণবহরে দীর্ঘ আকৃতির ‘ছিপ’নৌকা থাকত। বর্তমান যুগে সাধারণ নৌকাকেন্দ্রিক ঐ রকম নৌবিহার বা নৌবাহিনী না থাকলেও নৌশক্তির প্রতিযোগিতামূলক আনন্দোৎসব আজও নৌকা বাইচ-এর মাধ্যমে বাংলাদেশের জাতীয় জীবনে বিরাজমান।
মগ নৌযান, সরঙ্গ

মগ নৌযান, সরঙ্গ


উপমহাদেশের স্বর্ণযুগ মোগল আমলে বাংলার এক সময়ের সুবেদার বা প্রাদেশিক শাসনকর্তা ছিলেন শায়েস্তা খাঁ। সুবেদার শায়েস্তা খাঁ সুবে বাংলার রাজধানী ঢাকায় বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডের ব্যাপক প্রসারে নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করেন। এরই অংশ হিসাবে খনন করান বিশাল খাল। নিজের অতিপ্রিয় কন্যা দোলাই বিবি’র নামানুসারে এর নামকরণ করেন ‘দোলাই খাল’। কালক্রমে পূর্ববঙ্গের বৃহত্তর ঢাকা অঞ্চলের লোকধারায় এর নাম হয়ে যায় ধোলাই খাল। নামে খাল হলেও যথেষ্ট প্রশস্ত ছিল বলেই ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়। ইসলাম খাঁর সংস্কার করা খালটি বাবু বাজারের কাছে বুড়িগঙ্গা থেকে শুরু হয়ে তাঁতীবাজার হয়ে নবাবপুর ও নারিন্দা রোডের পাশ দিয়ে এগিয়ে গিয়ে সুত্রাপুর ও গেন্ডারিয়ার ভেতর দিয়ে মিলব্যারাকের কাছে আবার বুড়িগঙ্গায় মিলিত হয়। মাঝে মাঝে এখানে নৌকা বাইচও হত। নৌকাবাইচের সময় বহু লোক জড়ো হত খালের দু’ধারে। ধোলাই খালে নৌকাবাইচের সময় ঘটে যাওয়া নানান কৌতূহলোদ্দীপক ঘটনা বহুকাল পর্যন্ত ফিরত ঢাকাইয়াদের মুখে মুখে।

rowingএখন আগের মতো নৌকা বাইচ না হলে ও বাংলাদেশে নৌকা বাইচের সংগঠন ও উন্নয়নের জন্য ১৯৭৪ সালে গঠিত হয় বাংলাদেশ রোয়িং ফেডারেশন। এই ফেডারেশন সনাতন নৌকা বাইচ ও রোয়িং-এর মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করেছে। এই ফেডারেশন বিভিন্ন আন্তর্জাতিক রোয়িং ফেডারেশনের সদস্য। দেশিয় নৌকা বাইচকে উৎসাহিত করার জন্য প্রতি বছরই অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণভাবে জাতীয় নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়, এছাড়াও ১৯৯০ সালে বাংলাদেশে একটি আন্তর্জাতিক নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়।

এই সংগঠনটি নিরবচ্ছিন্নভাবে নৌকা বাইচকে আমাদের অন্যতম প্রধান সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড হিসেবে সমুন্নত রাখার লক্ষ্যে কাজ করে চলেছে। এই ক্রীড়াক্ষেত্রটিকে সজীব ও প্রাণবন্ত রাখার উদ্দেশ্যে প্রতি বছরই নানাধরনের বর্ণাঢ্য নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়ে থাকে। এসব বিভিন্ন প্রতিযোগিতার মধ্যে বাংলালিংকের সহায়তায় ৩৮তম জাতীয় নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতা ২০১৪ কে ইতিমধ্যে বাংলাদেশের ইতিহাসেরই সবচেয়ে বড় নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন অভিজ্ঞজনেরা।
14103442561212
এই প্রতিযোগিতা ঢাকা বিভাগীয় তথা আরো বৃহৎ অর্থে পুরো দেশের সাধারণ মানুষের এক মিলনমেলায় পরিণত হয়, যেখানে বয়স, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সব শ্রেণী-পেশার মানুষ সমবেত হয়ে বিপুল আনন্দে নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতা উপভোগ করতে পেরেছে। বাংলাদেশ রোইং ফেডারেশন এই প্রতিযোগিতার আয়োজক এবং এটি অনুষ্ঠিত হয় রাজধানী ঢাকার বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সেতু সংলগ্ন বুড়িগঙ্গা নদীতে।

You must be logged in to post a comment Login

মন্তব্য করুন