সাদা-কালো দিনগুলো এবং ঢাকার মেয়র আনিসের কথা

প্রকাশ: May 27, 2015
Annisul Huq

স্মৃতি সততই সুখের। রংপুর কারমাইকেল বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের শতবর্ষের স্মৃতিচারণ উপলক্ষে লেখিকা তাঁর সহপাঠীদের কথা বলতে গিয়ে বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন মেধাবী সহপাঠী আনিসুল হকের কথা। সেই আনিসুল হক বিপুল ভোটে নির্বাচিত হয়ে বর্তমানে ঢাকা সিটি উত্তরের মেয়র। শিক্ষাজীবনে কেমন ছিলেন তিনি তা জানা যাবে দৈনিক জনকন্ঠে চারদিন ব্যাপী প্রকাশিত এই প্রতিবেদন থেকে। আমরা ঢাকার পাঠকদের জন্য চারটি লেখা একত্রে তুলে ধরা হল-

প্রথম কিস্তি:
মূল গেট পেরিয়েই পেয়েছিলাম একটা ছন্দময় পথ, যার দু’পাশ দিয়ে দাঁড়ানো সারি সারি সবুজ দেবদারু। অদূরেই টেনিস কোর্টের জাল ঘেঁষে মহীরুহসম রোদমাখা কিছু ইউক্যালিপ্টাস। আমার মুগ্ধ চোখ দেখেছিল শ্বেতমর্মরে গাঁথা এক বিশাল রাজপ্রাসাদ উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছে তাদের পাতার ফাঁক দিয়ে। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শৈলী, মোগল স্থাপত্যকলার সংমিশ্রণে অপূর্ব কারুকার্যময় কারমাইকেল কলেজকে কাছে থেকে দেখার সেটাই আমার প্রথম দিন। প্রাঙ্গণের শত শত ছাত্র-ছাত্রী পরিবেষ্টিত হয়ে বিস্ময় আনন্দে ভেবেছিলাম- ‘হৃদয় আজি মোর কেমনে গেল খুলি, জগৎ আসি যেথা করিছে কোলাকুলি!’

ব্রিটিশ বাংলায় সাড়ে নয় শ’ বিঘা জমির ওপর রংপুর কারমাইকেল কলেজ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর কেবল দৃষ্টিনন্দন হিসেবে নয়, এক সময় এই ঐতিহ্যমন্ডিত বিদ্যাপীঠের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিল ভারতের বহুদূরব্যাপী। এমন সুবিশাল, দর্শনীয় এবং খ্যাতনামা কলেজ ব্রিটিশ বাংলায় ছিল আঙ্গুলে গোনা। কারমাইকেলের শিক্ষক ও ছাত্রসমাজ দীর্ঘ সময় ধরে দেশ ও সমাজে রেখে গেছেন যুগপৎ গুরুত্বপূর্ণ ও প্রশংসনীয় অবদান। রেবতী মোহন দত্ত চৌধুরী (অসম সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক), শহীদ জননী জাহানারা ইমাম অধ্যয়ন করেছিলেন এই কলেজেই। পরবর্তীতে ছাত্র ছিলেন আসাদুজ্জামান নূর এবং আরও অনেক প্রথিতযশা ব্যক্তিত্ব।
কারমাইকেলে আমার উচ্চ মাধ্যমিক শেষ হওয়ার পর তদানীন্তন পূর্ববাংলার ঐতিহাসিক স্বাধীনতা আন্দোলনের ঘনঘটায় হয়ে উঠেছিল উত্তাল। এই সময়টাতে কারমাইকেলে কলেজ ছাত্রসমাজের গৌরবময় ভূমিকা হয়ে ওঠে দিগন্তপ্রসারী। স্বাধীনতার আন্দোলন ও পরবর্তীতে মুক্তিযুদ্ধে সমগ্র উত্তরবঙ্গের নেতৃত্ব দিতে তারা রেখেছিল অগ্রণী ভূমিকা।

আমার কলেজজীবনের সাদা-কালো দিনগুলোয় বিদ্যা অর্জনের সঙ্গে বাঁধা পড়েছিল চেনা-অচেনা নানা দুর্লভ বৃক্ষ ও পুষ্পে-লতায়। আমি কারমাইকেল প্রাঙ্গণেই দেখেছি গানের শিরীষ শাখা- রাধাচূড়া নামের ফুল। ক’মাস আগে জনকণ্ঠের রিপোর্টে পড়লাম কারমাইকেল ক্যাম্পাসে এখনও দূর অতীতের স্মৃতি নিয়ে মাথা দোলায় অতি দুর্লভ কাইজ্যালিয়া বৃক্ষ।

১৯১৫ সালে কারমাইকেল কলেজের ভবনগুলোর নির্মাণ সমাপ্ত হয়েছিল। তদানীন্তন বাংলার বড়লাট লর্ড কারমাইকেল ১৯১৬ সালে উদ্বোধন করেন নিজ নামে প্রতিষ্ঠিত সেই কলেজ। দেশ স্বাধীনতা লাভের পর কারমাইকেল কলেজ হলো বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ। আজ আমার বিদ্যানিকেতন শতবর্ষের মুখোমুখি। আর এই মুখোমুখি দিনে সহপাঠী আনিসুল হক সম্প্রতি নির্বাচিত হয়ে গেল রাজধানী ঢাকা উত্তরের মেয়র হিসেবে।

ভর্তি হওয়ার পর নবীনবরণ অনুষ্ঠানে আমাদের একজন ইংরেজীর শিক্ষক শামসুল হক কৌতুকের সুরে জানিয়েছিলেন- কারমাইকেল কলেজ মূলত দাঁড়িয়ে আছে বড় একটি শূন্যের ওপর। আমরা ভেবেছিলাম হয়ত স্যার নতুনদের সঙ্গে মজা করছেন। কিন্তু সেদিন তাঁর মুখে এক অসামান্য গল্পের মাধ্যমে জানলাম- কৌতুক নয়, ব্যাপারটা সত্যই বটে।

কলেজ প্রতিষ্ঠায় সিংহভাগ অনুদানের শপথ ছিল রংপুরের অন্যতম বিখ্যাত জমিদার তাজহাটের মহারাজা গোবিন্দ লাল রায় বাহাদুরের। তিনি শহরের প্রান্তসীমায় কলেজের জন্য ভূমি এবং নগদ দশ হাজার টাকা প্রদানের অঙ্গীকার করেছিলেন কর্তৃপক্ষের কাছে।

ভূমি হস্তান্তরের পর একদিন যথারীতি গোবিন্দ লাল তার সরকারকে সামনে বসিয়ে নির্দেশ দিলেন কলেজের জন্য দশ হাজার টাকার একটি দানপত্র রচনা করার। কিন্তু দলিল লিখতে গিয়ে ঘটে গেল একটি অভাবনীয় কা-। সরকারবাবু ভুলক্রমে দিয়ে ফেললেন অতিরিক্ত আরেকটি শূন্য। তাতে করে টাকার অঙ্কটা হয়ে গেল এক লাখ! কিন্তু লজ্জিত সরকার মশাইয়ের নতুন দানপত্র তৈরিতে বাধা দিলেন গোবিন্দ লাল- শোনো সরকার ভুল যখন হয়েই গেল তখন এই দানপত্রটিই থাক।
পাঞ্জাব থেকে আগত তাজহাট মহারাজার প্রথম পুরুষ ছিলেন রতœ ব্যবসায়ী। এই অঞ্চলে পুরুষানুক্রমে ব্যবসা করে বিশাল বিত্তবৈভবের অধিকারী হয়েছিলেন তারা। কিন্তু মহারাজা গোবিন্দ লাল রায় সম্রাট শাহ্জাহানের মতোই জানতেন, ‘কালস্রোতে ভেসে যায় জীবন যৌবন ধনমান।’ কিন্তু একটি বিদ্যাপীঠ তাজমহলের মতো অক্ষয় হয়ে থাকবে যুগ যুগ ধরে।

আজ রংপুর তাজহাটে শূন্য রাজবাড়িটাই কেবল পড়ে আছে জাদুঘর হয়ে। রাজা রানী রাজপুত্র কেউ সেখানে নেই, তাদের বিত্ত-সম্পদও কিছু নেই। কিন্তু মহারাজার সেই একদা শূন্যের মহিমায় একশত বছর ধরে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে বড়লাট লর্ড কারমাইকেলের নামে প্রতিষ্ঠিত সেই বিদ্যাস্থান। রংপুরের অন্য জমিদারবর্গসহ অর্থবান ব্যক্তিরাও কলেজের জন্য দিয়েছিলেন সাধ্যমতো অনুদান।

আমরা ষাট দশকের শেষদিকে কলেজের ফার্স্ট ইয়ারে ভর্তি হওয়া মেয়ের দল খুব আমোদ পেতাম অফ পিরিয়ডগুলোতে কমন রুমের পেছনের চোরকাঁটা ভরা মাঠ পেরিয়ে প্রিন্সিপাল স্যারের বাড়ির সামনে ফুলে ফুলে ভরা নির্জন পথটা দিয়ে ছুটে বেড়াতে। বালিকা বিদ্যালয়ের পাঁচিলঘেরা দিন ফুরিয়ে উপভোগ করতাম মুক্তির আনন্দ। ওখানে কোন গাছ থেকে সম্ভবত বারো মাসই ঝরে পড়ত বকুল ফুল। এটা যেন ছিল ‘তুমি যে গিয়াছ বকুল বিছানো পথে’। আমার শৈশবে নানা গাইতেন শচীন কর্তার এই গান। ওপথে শুধু বকুল নয় আরও ঝরে থাকত স্বর্ণচাঁপা, কাঁঠালিচাঁপারা। সেদিন আমরা ওড়নার আঁচলে কুড়িয়ে নিতাম নরম বকুল ও কাঁঠাল রঙের সুগন্ধি ফুল। এখন কেমন বানানো গল্পের মতো শোনায়!

একটু পুরনো হলে যখন কোন কারণে ক্লাস সাসপেন্ড হতো তখন মেয়েরা সদলবলে চলে যেতাম আরও দূরে। লন্ডনের মতো লাল রঙে রাঙানো জি এল হোস্টেল ছাড়িয়ে বহুদূরের এক গ্রামে। বিকেল পাঁচটার আগে আমাদের কলেজ বাস ছাড়ত না যে! ফার্স্ট ইয়ার, সেকেন্ড ইয়ারে আমরা আসা-যাওয়া করতাম একটি পুরনো সবুজ বাসে করে।

সিনিয়র মেয়েদের মধ্যে রক্ষণশীল দু-একজন খুবই অপছন্দ করত এমন নির্মল আনন্দের ব্যাপারটি। একদিন শাসনের সুরে এক আপা বললেন, ‘কলেজে ভর্তি হয়ে তো দেখি তোমাদের দুটো করে ডানা গজিয়েছে। শুনে রাখ, এক সময় এই কলেজের মেয়েরা একা একা ক্লাসে পর্যন্ত যেত না। স্যাররা ক্লাস নেয়ার আগে কমন রুমের সামনে এসে অপেক্ষা করতেন এবং ছাত্রীরা তাদের পেছনে পেছনে যেত শ্রেণীকক্ষে।’

যখন খুব ছোট ছিলাম দেখতাম কলেজের বাস এসে দাঁড়াত বাড়ির সামনের রাস্তায়। পড়শী পাপড়ি আপা, রুবি আপা দু’বোন নতমুখে বই-খাতা বুকে করে কলেজের বাসে উঠতেন। অথচ তাদের বাড়ির গ্রামোফোনেই বাজত মান্নাদের গান- ‘ও আমার মন যমুনার অঙ্গে অঙ্গে ভাব তরঙ্গে কতই খেলা’… তাদের পরনে থাকত চিকন পাড় সাদা শাড়ি আর সে পাড়ের নামই নাকি ছিল কলেজ পাড়। কিন্তু আমাদের সিনিয়র মেয়েরা রং-বেরঙের শাড়িতে হয়ে উঠেছিল বর্ণিল প্রজাপতি।

দ্বিতীয় কিস্তি:
ছাত্রীরা ঘোড়ার গাড়িতে খড়খড়ি লাগিয়ে কলেজে আসতেন আমার মায়েদের যুগে। যদিও বিবাহের কারণে কলেজে যাওয়ার আগেই তার বিদ্যা অর্জনের ইতি ঘটেছিল- সে নিয়ে আজও তার দুঃখ ঘোচেনি। কিন্তু সে সময়ের রংপুর ছিল একটি প্রগতিশীল শহর। হিন্দু সমাজের প্রথম সংস্কারক ও ইংরেজী শিক্ষার অগ্রদূত রাজা রামমোহন কর্মসূত্রে রংপুরে বসবাস করেছিলেন অনেক দিন। এ শহরে তার প্রতিষ্ঠিত লাইব্রেরীটি আজও ইতিহাসের সেই স্মৃতি বহন করে চলছে।

মায়েরা যখন চল্লিশের মধ্য দশকে যে গার্লস স্কুলটাতে পড়তেন আজও আছে সে স্কুল। তখন সেখানে পড়তেন অগুনতি হিন্দু-মুসলমান মেয়ে। কোন পর্দা প্রথার চলও ছিল না সমাজে। তিনি এখনও গল্প করেন- ‘ছুটির সময় আমরা যখন বাড়ি ফিরতাম চারদিকে তখন শুধু হাঁটছে স্কুলের স্কার্ট পরা ঘরে ফেরা মেয়ের দল।’ যাই হোক, ছোটবেলা থেকেই দেখতাম পরিবারের কেউ কেউ ও পাড়া-প্রতিবেশী ছেলেমেয়েরা বিএ অবধি কারমাইকেল কলেজেই পড়তেন। কলেজের পুরনো ও সাম্প্রতিক নানা গল্প করতেন তারা। কাঁচা বয়সেই শুনে ফেলেছিলাম কলেজে আমাদের সম্পর্কীয় এক মামার বহু পূর্বের দুষ্কর্মের কথা, যার ডাকনাম ছিল পুটু।

ক্লাসে ছিল হাতেগোনা মেয়ে। তারা চমৎকার কবরী রচনা করে কলেজে আসতেন। পুটু মামা ক্লাসে আড়ে আড়ে তাকিয়ে থাকতেন একটি মেয়ের খোঁপার দিকে। কে জানে মনে বোধ হয় দেগেছিল নজরুলের সেই গান- আলগা করগো খোঁপার বাঁধন দিল ওহি মেরা ফাঁস গায়া’। একদিন সেই সুন্দরীটি যখন ঘোড়ার গাড়িতে আরোহণ করছিলেন ফাঁসা দিলের পুটু মামা নির্জনতার সুযোগে বুঝি বা আলগা করতেই টান দিলেন সহপাঠিনীর খোঁপায়। কিন্তু আলগা খোঁপা নিয়ে মুখ বুজে বাড়ি ফেরার পাত্রী ছিল না সেই তরুণী ছাত্রী। এই রংপুরেই তো বহু বছর আগে প্রবল প্রতাপে তিন যুগব্যাপী জমিদারী করে গিয়েছিলেন দেবী চৌধুরানী। তার উত্তরসূরি মেয়েটি সরাসরি অধ্যক্ষের রুমে গিয়ে হাজির হয়ে নালিশ করল পুটু মামার বিরুদ্ধে। আর সঙ্গে সঙ্গে আজীবনের জন্য শিক্ষাজগত থেকে বহিষ্কৃত হয়েছিলেন পুটু মামা।
আমাদের সময়ের ছেলেগুলো এমন দুর্ধর্ষতার কথা চিন্তাতেও আনেনি বোধ হয়। তবে মেয়েদের সঙ্গে কো-এডুকেশনে পড়তে এসে কয়েকটা প্রথম প্রথম ভারি ফচকেমি করত অধ্যাপকদের আড়ালে। ক্লাসের আগে বা পরে নানা কমেন্ট করে, হি হি করে হেসে সহপাঠিনীদের বিরক্ত করাই ছিল তাদের কাজ। কিন্তু একদিন পড়বি পড় মালির ঘাড়ে। দেখে ফেললেন ইংরেজীর হেড কুতুব উদ্দিন আহমেদ। যেমন ছিল তার ব্যক্তিত্ব তেমনি পোশাক-আশাক। স্যার পড়াতেন সৌন্দর্যের কবি কিটস এবং ক্লাস শুরু হতো ‘বিউটি ইজ ট্রুুথ এ্যান্ড ট্রুথ ইজ বিউটি’ দিয়ে। কখনও টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে চোখ বুজে আবৃত্তি করতে পছন্দ করতেন রবীন্দ্রনাথের মানসী।

তৃতীয় কিস্তি:
কিন্তু সেদিন স্যার অনেকক্ষণ চুপচাপ থেকে শুরু করেছিলেন পাঠের বাইরে দীর্ঘ এক ভাষণ- ‘অসুন্দর দিয়ে কোন মেয়ের মন জয় করা যায় না আর এমন সেন্সটুকু না থাকায় তোমরা কেউ কেউ নুইসেন্সের মতো কাজ শুরু করেছ! শোনো হে, জীবনটা তো সবে শুরু, লেখাপড়া শেষ করতে অনেক পথ বাকি। তোমরা জান কি এই শহরে কিছু ব্যাচেলর তরুণ ছেলে ম্যাজিস্ট্রেট, এসডিও এসব লুক্রেটিভ পদে যোগদান করেছে? আর নৈশ আহারে অভিজাত কোন না কোন বাড়িতে প্রতিদিনই এদের নেমতন্ন থাকে? এটা জেনে ঈর্ষান্বিত হবে যে, সেসব গৃহে রয়েছে সুন্দরী কোন অবিবাহিত কন্যা। এমনটি যদি হতে পারো তবে শুধু মেয়েরা নয়, মেয়ের বাবারা সুদ্ধ তোমাদের পেছনে ছুটবে।’

এ মতো জ্ঞানার্জনের পর সরলমতি ফচকেগুলো সত্যি সত্যি খুবই চুপচাপ হয়ে বেশ মন দিয়েছিল পাঠে।

আমরা প্রথম দিন লজিক ক্লাসে এমন এক শিক্ষককে পেয়েছিলাম, যিনি পোশাকে চালচলনে সে সময়ের স্মার্ট অধ্যাপকদের থেকেও একেবারে ব্যতিক্রমধর্মী। তিনি ফিলোসফির প্রধান কলিমুদ্দিন আহমেদ। হাঁটুর অনেক নিচে পাঞ্জাবির ঝুল, মুখের দাড়িটিও বেশ লম্বা। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়েন। শ্মশ্রুম-িত হাস্যোজ্জ্বল মুখটি ছিল প্রশান্ত এক দার্শনিকের। প্রথম ক্লাসেই কলিম স্যার লজিক থেকে চলে গিয়েছিলেন তার কলকাতার ছাত্রবেলার গল্পে। আমরা আশ্চর্য হয়ে শুনলাম, সে সময় তার সবচেয়ে প্রিয় অভ্যাস ছিল খ্রীস্টানদের সমাধিস্থানে ঘুরে বেড়ানো। কারণ সমাধিপ্রস্তরে লেখা ইংরেজী কথামালা ও কবিতাছত্র দুর্বার আকর্ষণে যুবক কলিমুদ্দিনকে টেনে নিয়ে যেত সেখানে। একদিন তিনি সেই প্রান্তরে হাঁটতে হাঁটতে দর্শন পেয়েছিলেন বাংলা ভাষায় লেখা রতœসম এক কবিতা দিয়ে আকীর্ণ সমাধিস্তম্ভ।
‘দাঁড়াও, পথিক-বর, জন্ম যদি তব বঙ্গে! তিষ্ঠ ক্ষণকাল!
এ সমাধিস্থলে (জননীর কোলে শিশু লভয়ে যেমতি বিরাম )
মহীর পদে মহানিদ্রাবৃত
দত্তকুলোদ্ভব কবি শ্রীমধুসূদন!’

বাংলা ভাষার একমাত্র মহাকবি মধুসূদন দত্ত নিজ সমাধির জন্য লিখে গিয়েছিলেন যে কবিতা তা আমরা স্কুলের শেষ বর্ষেই পড়েছিলাম। অথচ সেটা মুখস্থ ছিল না। কিন্তু সম্পূর্ণ কবিতাটি কী অবলীলায় আবৃত্তি করে গেলেন স্যার ! দ্বিপ্রহরের আহার ও নামাজ শেষ করে তিনি আসতেন অনার্স সাবসিডিয়ারির ফিলোসফি ক্লাসে। তারপরই হয়ত পড়াতে শুরু করতেন হিন্দু ফিলোসফি- ব্যাখ্যা করতেন বেদ-বেদান্তের।

প্রবাস জীবনের শুরুর দিকে বসন্তের প্রথম দিনে কর্মস্থলের লবিতে এক ফুলওয়ালীকে দেখেছিলাম হলুদ রঙয়ের ড্যাফোডিল কুঁড়ি বিকোতে। ফার্স্ট ইয়ারের কবিতার ফুলকে সেদিনই আমার প্রথম দর্শন। প্রথম বর্ষে ওয়ার্ডসওয়ার্থের ড্যাফোডিল ফুলের অদেখা রূপ আমাদের অন্তরে যেন শিল্পীর তুলিতে আঁকতেন সাইফুল ইসলাম স্যার। তিনি ছিলেন সম্ভবত কলেজের সবচেয়ে তরুণ ও মেধাবী অধ্যাপক। তখন জানতাম না স্যার ছিলেন কলকাতা প্রেসিডেন্সির ছাত্র। পাকিস্তান সিভিল সার্ভিস (সিএসপি) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে তিনি চলে গিয়েছিলেন শিক্ষকতা ছেড়ে। পরবর্তীতে বাংলাদেশ সরকারের সচিব যখন তখন সৌভাগ্যক্রমে প্রবাসেই দেখা। কিন্তু মাঝখানে পেরিয়ে গেছে দু’যুগের বেশি। কেউ পরিচয় করিয়ে না দিলে চেনা ছিল দুঃসাধ্য। কিন্তু তাকে সত্যই চিনেছিলাম যখন নিউইয়র্কে স্যারের একমাত্র শপিং ছিল রবীন্দ্রনাথের গান। তিনি এরপর হয়েছিলেন এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (এডিবি ) এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর। অবসর নিয়ে ঢাকার নিকুঞ্জে বাড়ি বানিয়ে আমাদের ড্যাফোডিল পড়ানো শিক্ষক ই-মেইলে লিখলেন- ‘বাড়ির দেওয়াল ঘেঁষে লাগিয়েছি প্রতিটি ঋতুতে ফুটবে এমন ছটি সুগন্ধি ফুলের চারা।’

ষাট ও সত্তরের দশকে কলেজের ক্রীড়া, সাহিত্য ও সংস্কৃতি প্রতিযোগিতার দিনগুলো ছিল উৎসবের দিন। কলেজ অঙ্গন ছাড়িয়েও সেগুলো সাড়া জাগাত সমগ্র শহরজুড়ে। এছাড়া ক্যাম্পাসে বছরে একদিন অনুষ্ঠিত হতো ওয়ানডে ক্রিকেট প্রতিযোগিতা- শিক্ষক বনাম ছাত্র একাদশ। ছাত্ররাই মাঠে দখলদারি করবে এমনটিই ছিল স্বাভাবিক। কিন্তু ঘটনা ঘটত উল্টো, স্যাররাই সাধারণত জিততেন। কারণ ছিল রাজপুত্র স্যার এবং সুনীলবরণ স্যারের অসাধারণ জুটি। কেমিস্ট্রির আজিজুর রহমান দেখতে ছিলেন খুবই হ্যান্ডসাম। সায়েন্সের মেয়েরা সে কারণে লুকিয়ে তার নাম দিয়েছিল রাজপুত্র। সুনীলবরণ ছিলেন কাঞ্চন বর্ণের আর এক সুপুরুষ। প্রতি বিকেলে নিয়মিত টেনিসও খেলতেন। তাদের ব্যাটিংয়ে যখন ঝড় উঠত মনে হতো একজন গ্যারি সোবার্স, অন্যজন পতৌদির নবাব।

উচ্চ মাধ্যমিক শেষে বাংলা সাহিত্যে অনার্স নিয়ে ভর্তি হওয়ার পরপরই এলো ছাত্র সংসদের নির্বাচন। ছাত্র-ছাত্রীদের বাড়ি পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল নির্বাচনী প্রচারণার ঢেউ। এমনি একদিন ক্যারম খেলছিলাম কমন রুমে। হঠাৎ জানালাপথে কানে এলো বহু কণ্ঠের গগনবিদারী স্লোগান। এক ছুটে বাইরে এসে দেখি কলেজের ছেলেরা দিক-দিগন্ত প্রকম্পিত করে ধ্বনি তুলছে অনন্য এক ভাষায়- ‘জয় বাংলা’! সমাবেশের নেতৃত্বে দেখেছিলাম আমাদের সিনিয়র ও সহপাঠীদের মধ্যে যারা মেধাবী বলে পরিচিত সেইসব ছাত্রকে।

শেষ কিস্তি:
মুক্তিযুদ্ধের উথালপাতাল দিনগুলো যেন উড়িয়ে নিয়ে গেল সমাজের নানা অংশের মতো আমাদেরও রক্ষণশীলতার ভারি আবরণ। চোখের জল মুছে আমরা ডিপার্টমেন্টের ছেলেমেয়েরা পরস্পরের কাছে এক সময় বন্ধু হয়ে উঠলাম- আপনি থেকে তুই হলো। কমনরুমের ছোট্ট ঘরটিতে বসাই হয় না বলতে গেলে। ফার্স্ট ইয়ারের ফুল খেলবার দিন পেরিয়ে আমরা সিঁড়িতে বসে আড্ডা মারি সহপাঠীদের সঙ্গে। কলকলিয়ে কথা বলি, লাইব্রেরীতে বই পড়ি দলবেঁধে। কলেজ ফাংশানগুলো এক সময় উপভোগ করতাম ওপরের ব্যালকনি থেকে। আমরা সে সময় নিচের হলে আসন দখল করেছি শিক্ষক ও ছাত্রদের পাশাপাশি। কলেজে সিনিয়র হওয়াটাও এর কারণ ছিল বৈকি।

আনিস নামের সহপাঠী ছাত্রটির সঙ্গে বিশেষত আমার কোনো সাবজেক্টে মিল ছিল না বলে কথাবার্তাও ছিল না। তদুপরি সে কারমাইকেল কলেজে ভর্তি হয়েছিল আমাদের দু’বছর পর ইকোনমিক্সে অনার্স নিয়ে। কিন্তু আমরা অবাক হয়েই দেখেছিলাম নবাগত অচেনা ছেলেটি কলেজে পা দিয়েই কেমন জয় করে নিল সাহিত্য-সংস্কৃতির মাঠ। ওকে সবাই চিনে ফেলল, প্রিয় করে নিল তার ডিবেটের তীক্ষ্ণতায়, উপস্থিত বক্তৃতার পারঙ্গমতায়। সেইসঙ্গে অসাধারণ কবিতা আবৃত্তি করে সে মুগ্ধ করত মহাবিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষকদের। প্রতিটি প্রতিযোগিতায় ও ছাড়া কে আর প্রথম হবে!

মনে আছে কলেজ জীবনের শেষ প্রতিযোগিতার কথাটি। কোন একজন আমাকে টানাটানি করতে লাগল সাহিত্য-সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের জন্য। এক সময়ে লাজুক প্রকৃতিরই ছিলাম। জীবনে মঞ্চে খুব বেশি ওঠা হয়নি, তারপর আবার প্রতিযোগিতা! কিন্তু সেবার পা রাখলাম সন্তর্পণে এবং খুব খারাপও করলাম না। অবশ্য বেঁচে গিয়েছিলাম ছোটগল্প ও কবিতা লেখায় প্রথম হয়ে। আর আনিস তো তার চার ইভেন্টের সবগুলোতেই প্রথম।

মনে পড়ে বাংলা বিভাগের রেজাউল হক স্যারের কথা। পড়াতেন জীবাননন্দ দাস- ‘পাখীর নীড়ের মত চোখ তুলে নাটোরের বনলতা সেন।’ সেই সাংস্কৃতিক সপ্তাহের গল্প ও কবিতা বিভাগের প্রধান বিচারক ছিলেন তিনি। কলেজ থেকে বেরোনোর কয়েক বছর কেটে গেছে। স্যার তখন কারমাইকেলের অধ্যক্ষ। কোত্থেকে যেন জেনেছেন আমি একটি সরকারী অফিসে আছি। কারও হাতে পাঠিয়েছিলেন চোখে জল আনা ছোট্ট চিরকুট- ‘আমরা ভেবেছিলাম তুমি লেখালেখির জগতে থাকবে।’ জানি না স্যার এখন কোথায়!

সে বছর আনিসুল হক বরাবরের মতো চ্যাম্পিয়ন আর আমি রানারআপ।

এ কারণেই কথাটা বলা যে, একসঙ্গে কটা পা চললে যেন বন্ধু হয়! এক্ষেত্রে বোধ হয় বলা ভাল- আমাদের সময় বন্ধু এবং প্রেমিক দুটো সম্পর্ক ছিল ভিন্ন মেরুর। সাহিত্য-সংস্কৃতি সপ্তাহে ওর সঙ্গে শুধু চলা নয়, প্রতিযোগিতার দৌড়েও নেমেছিলাম। কিন্তু ব্যাপারটা আজও ভারি আনস্মার্ট মনে হয় বিজয়ী সহপাঠীকে অভিনন্দন পর্যন্ত জানানোর কায়দাটিও রপ্ত হয়নি সে সময়।

কিন্তু আনিস ও অন্যদের নিয়ে কিছু মণিময় স্মৃতি জমা আছে হৃদয়ের কোঠায়। কারমাইকেল থেকে অনার্স করে পুরো ব্যাচটাই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে গেলাম আমরা। সবাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে চায় বলে সে দরজা তখন শক্তভাবে বন্ধ উত্তরবঙ্গের ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য। রংপুর থেকে দলবেঁধে ট্রেনে করে রাজশাহী যাই একসঙ্গে। সদ্য স্বাধীন দেশে সে সময়ে ট্রেনের দুর্গতি অকল্পনীয়। রেলের ওপর চলেছে বিশাল ধ্বংসযজ্ঞ। যদিও ভারতীয় রেল কর্তৃপক্ষ ব্রিজ তৈরি, লাইন পুনর্¯’াপন, বগি মেরামত ইত্যাদি করে দিয়ে চলাচল উপযোগী করেছে। কিন্তু ওই সময়টিতেও পুরো ট্রেনে সুব্যবস্থা ফেরেনি। আলো-পাখা তো নেই-ই, বিপদ হাতে করে রেলের অমুক ম্যান তমুক ম্যান চালাচ্ছে গাড়ি। কারণ পাকিস্তান আমলে রেলের ড্রাইভার-কর্মচারী সবাই ছিল মূলত অবাঙালী।

রাজশাহী যাওয়ার একটিমাত্র মিটারগেজ ট্রেন সন্ধে নাগাদ রওনা হয়ে যায়- যায় পার্বতীপুর পর্যন্ত। সেখান থেকে আবার ব্রডগেজ লাইনের ট্রেনে বদলি এবং রাত বারোটার পরে যাত্রা রাজশাহীর দিকে। অন্ধকার সেই ট্রেনের কামরায় মেয়েদের সিটে বসিয়ে বাক্স-পেটরা ওপরে তুলে রেখে আনিসরা কখনই নিজ আসনে বসত না। দরজার দিকে চলে যেত সহপাঠী থেকে ভ্রাতার ভূমিকায়। আমাদের জন্য রাতভর দুয়ারে প্রহরীর মতো ঠায় দাঁড়িয়ে থাকত ওরা। সেই দীর্ঘপথ একঠায়ভাবে বসে যেতে পারতাম না আমি। ওদের ফেলে রাখা আসনে গুটিসুটি মেরে শুয়েই পড়তাম চাদরের আড়াল দিয়ে।

পুরো বগিটাই আমাদের। কিন্তু প্রতি স্টেশন বিনা টিকেটের যাত্রী ওঠে। এতগুলো সিট একজনকে দখল করা দেখে তারা দাঁড়িয়ে যেতে রাজি নয়- ‘হ্যাঁ, একজন শুয়ে আছে দেখা যাচ্ছে।’

এক্ষেত্রে লোকাল লোকজনের সঙ্গে তর্ক-ঝগড়া চলে না। বন্ধুদের কেউ একজন দরজা থেকে ছুটে এসে করুণ গলায় বলত- ভাই রোগী নিয়ে রাজশাহী যাচ্ছি। বসিবা ইচ্ছুকজনের বিরক্ত প্রশ্ন- ‘কিসের রোগী উনি?’ বন্ধুদের কেউ কেঁদে ফেলে এবার- ‘ভাই এ রোগী রাজরোগী। জানেন তো- যার হয় যক্ষ্মা তার নাই রক্ষা।’
সেই মুহূর্তে ছুটন্ত ট্রেনের দরজা থেকে ভেসে আসত এক উদ্বিগ্ন প্রশ্ন এবং কণ্ঠটি আনিস ছাড়া আর কার- ‘ওরে তোর কাশিটা কি কমল?’ আমার দমফাটানো হাসিকে রূপান্তরিত করতে হতো কাশিতে। পরের স্টেশনেই নিশ্চিত ভেগে যেত অবৈধ যাত্রীদল। এরপর ছুটে যাওয়া ট্রেনের ঝিকঝিক শব্দ ছাপিয়ে কানে আসত আনিসের অফুরন্ত ভান্ডার থেকে একে একে বের করা হাসির গল্প। একটু ঘুম কি দেব- হাসতে হাসতে সবারই তো পেট ফুটো।

এখনও দেখতে পাই আমাদের নিরাপত্তায় আনিস ও অন্য বন্ধুগুলো সারারাত ধরে নির্ঘুম চোখে ট্রেনের দরজার হ্যান্ডেল ধরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে চলছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় অভিমুখে। ভোরে যখন পৌঁছাতাম রাজশাহী, ওরা পেছনে পেছনে রিক্সা করে আমাদের হলে পৌঁছে দিয়ে ফিরে যেত নিজেদের আস্তানায়। পরবর্তীতে আনিসকে টেলিভিশনে দেখেছি, দীর্ঘদিন ধরে তার খবর পড়েছি মিডিয়ায়। কিন্তু মেয়র পদে যখন ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করল, তখন মেনিফেস্টোতে নজর কেড়েছিল ‘নারীবান্ধব’ কথাটি। আমরা সেদিনের সহপাঠিনীরা জানি, আনিসের মতো এমন নারীবান্ধব মেয়র আর কে হবে?

সহস্র অভিনন্দন মেয়র আনিস!

লেখক : শরীফা খন্দকার, নিউইয়র্ক প্রবাসী লেখিকা
sharifa.k@outlook.com

সূত্র: দৈনিক জনকন্ঠ

You must be logged in to post a comment Login

মন্তব্য করুন