অবকাঠামো উন্নয়নের অভিজাত দৃষ্টিভঙ্গি যানজট বাড়াচ্ছে

প্রকাশ: July 14, 2015
flyover

যানজট নিরসনে নগর পরিকল্পনার ত্রুটিকে উল্লেখ করে এই প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়েছে ১৪ জুলাই ২০১৫ তারিখের বণিক বার্তা পত্রিকায়। প্রতিবেদনটি আমরা ঢাকার পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হল-

ব্যক্তিগত গাড়ির মালিক মাত্র ১ শতাংশ নাগরিক। বাকি ৯৯ শতাংশেরই যাতায়াতের মাধ্যম মূলত গণপরিবহন। যদিও গণপরিবহন ব্যবস্থার আধুনিকায়নে কোনো প্রকল্পই এখনো শুরু হয়নি। মেট্রোরেল ও বাস র্যাপিড ট্রানজিটের (বিআরটি) কথা বলা হলেও ১০ বছরে তা আলোর মুখ দেখেনি। যানজট নিরসনে ফ্লাইওভারের মতো যেসব অবকাঠামো, তার সবই ওই ১ শতাংশের জন্য। অবকাঠামো উন্নয়নের অভিজাত এ দৃষ্টিভঙ্গির কারণে নগরীর যানজট তো কমছেই না, উল্টো বাড়ছে। এমনটাই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্য বলছে, মোটরগাড়ি রয়েছে দেশের মাত্র দশমিক ৭ শতাংশ মানুষের। শহরে এ হার ১ দশমিক ৭ ও গ্রামে দশমিক ৪ শতাংশ। বিভাগভিত্তিক হিসাবে, ঢাকাবাসীর মধ্যে ১ দশমিক ২ শতাংশের মোটরগাড়ি রয়েছে।

যানজট নিরসনের নামে রাজধানীতে গড়ে উঠছে ফ্লাইওভারের মতো অবকাঠামো। মহাখালী ও মিরপুর-বনানী ফ্লাইওভার দিয়ে যান চলাচল আগেই শুরু হয়েছে। খুলে দেয়া হয়েছে গুলিস্তান-যাত্রাবাড়ী (মেয়র হানিফ) ফ্লাইওভারও। কাজ চলছে মগবাজার-মৌচাক ফ্লাইওভারের। আর সেপ্টেম্বরেই শুরু হওয়ার কথা ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ। এগুলোর জন্য সব মিলিয়ে ব্যয় ৩০ হাজার কোটি টাকার বেশি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কয়েক বছর ধরে একের পর এক ব্যক্তিগত গাড়িনির্ভর অবকাঠামো তথা ফ্লাইওভার নির্মাণ করা হচ্ছে। এর সুবিধা সাধারণ জনগণ পাচ্ছে না। আবার যানজট কমাতেও কোনো ভূমিকা রাখছে না এসব অবকাঠামো। উল্টো গণপরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত করছে।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ড. সারওয়ার জাহান এ প্রসঙ্গে বণিক বার্তাকে বলেন, রাজধানীর যানজট নিরসনে ফ্লাইওভার বা এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ করা হলেও তা সাধারণ মানুষের কাজে আসছে না। ফলে বিনিয়োগের সুফল মিলছে না। বিশ্বের কোনো দেশেই ফ্লাইওভার নির্মাণ করে যানজট হ্রাসের নজির নেই। বরং যানজট কমাতে বিভিন্ন শহরে ফ্লাইওভার ভাঙা হচ্ছে। ভবিষ্যতে ঢাকায়ও যানজট হ্রাসে এ ধরনের উদ্যোগ নিতে হবে।

রাজধানীবাসীর বড় একটি অংশের ফ্লাইওভারের সুবিধা না পাওয়ার তথ্য উঠে এসেছে বুয়েটের সাম্প্রতিক এক সমীক্ষায়। সমীক্ষা অনুযায়ী, স্বাভাবিক সময়ে রাজধানীতে দৈনিক দুই কোটির বেশি ট্রিপ (যাতায়াত) হয়। এর মধ্যে ৩৮ দশমিক ৩ শতাংশ হয় রিকশায়, ২৮ দশমিক ৩ শতাংশ বাসে ও ১৯ দশমিক ৮ শতাংশ হেঁটে। এ হিসাবে ৮৬ দশমিক ৪ শতাংশ যাতায়াতকারীই ফ্লাইওভারের সুবিধা পায় না। এর বাইরে রাজধানীবাসীর ৬ দশমিক ৬ শতাংশ যাতায়াত করে অটোরিকশায় ও ৫ দশমিক ১ শতাংশ ব্যক্তিগত গাড়িতে। এর মধ্যে মূলত ফ্লাইওভার ব্যবহার করে কিছু ব্যক্তিগত গাড়ি ও অটোরিকশা; মোট ট্রিপের যা মাত্র ৫ শতাংশ। অর্থাৎ রাজধানীর ৯৫ শতাংশ ট্রিপে ফ্লাইওভারের কোনো ব্যবহার নেই।

ভবিষ্যতেও রাজধানীর যানজট নিরসনে ফ্লাইওভার বা এক্সপ্রেসওয়ের ভূমিকা রাখার সুযোগ নেই। কারণ ২০২৫ সালে ঢাকার জনসংখ্যা বেড়ে দাঁড়াবে প্রায় আড়াই কোটি। সে সময় ট্রিপ বেড়ে দাঁড়াবে দৈনিক প্রায় সাড়ে ৬ কোটি। এর মধ্যে রিকশা ও বাসে ট্রিপ হবে প্রায় ৪ কোটি এবং পায়ে হেঁটে ১ কোটি। আর ৭০ লাখ ট্রিপ হবে ব্যক্তিগত গাড়িতে ও ৬৬ লাখ অটোরিকশায়।

সমীক্ষায় আরো বলা হয়, বিভিন্ন ধরনের বাহনের মধ্যে সবচেয়ে কম যাত্রী পরিবহন করে ব্যক্তিগত গাড়ি। কারণ ঢাকায় একটি রিকশা যাত্রী পরিবহন করে গড়ে ১ দশমিক ৬ জন, ব্যক্তিগত গাড়ি ১ দশমিক ৫ ও বাস ৫২ জন। অর্থাৎ একটি বাসের সমান যাত্রী পরিবহনে দরকার ৩৫টি ব্যক্তিগত গাড়ি।

বিবিএসের তথ্যমতে, আরেক গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ চট্টগ্রামে ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার করে দশমিক ৭ শতাংশ মানুষ। এখানকার অবকাঠামোও ব্যক্তিগত গাড়ির মালিকদেরই সুবিধা করে দিচ্ছে। যানজট কমাতে চট্টগ্রাম শহরে তিনটি ফ্লাইওভার নির্মাণ করা হয়েছে। অথচ গণপরিবহন তো দূরের কথা, পরিকল্পিত বাস নেটওয়ার্কও গড়ে ওঠেনি নগরীতে।

গণপরিবহন ব্যবস্থার আধুনিকায়নে ২০০৬ সালের মহাপরিকল্পনায় তিনটি মেট্রোরেল ও তিনটি বিআরটি চালুর কথা বলা আছে। যদিও এখন পর্যন্ত আলোর মুখ দেখেনি এর কোনোটিই। সম্প্রতি একটি মেট্রোরেল ও একটি বিআরটির কার্যক্রম শুরু হলেও তা একেবারেই প্রাথমিক পর্যায়ে।

বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. সামছুল হক এ প্রসঙ্গে বলেন, অপরিকল্পিতভাবে একের পর এক ফ্লাইওভার নির্মাণ গণপরিবহন ব্যবস্থার সম্ভাবনাকে নষ্ট করছে। ফ্লাইওভার নির্মাণের ফলে মহাখালী, মগবাজার-মৌচাক বা গুলিস্তান-যাত্রাবাড়ী রুটে ভবিষ্যতে কখনই গণপরিবহন ব্যবস্থা চালু করা যাবে না। অথচ ঢাকার যানজট হ্রাসে শহরের গুরুত্বপূর্ণ এ অংশগুলো মেট্রোরেল বা বিআরটির আওতায় আনা দরকার ছিল।

তিনি আরো বলেন, গাড়ি ব্যবহারের দিক থেকে বিশ্বের ১৯২টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ নিচের সারিতে রয়েছে। প্রতি হাজারে মাত্র ১৪ জনের গাড়ি রয়েছে দেশে। আর শুধু ঢাকার কথা বিবেচনা করলে এ সংখ্যা দাঁড়াবে ৪০। অথচ পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে প্রতি হাজারে ১২৮ জনের গাড়ি রয়েছে। আর নয়াদিল্লি বা মুম্বাইয়ের কথা হিসাব করলে এ সংখ্যা ৪০০-এর বেশি। এছাড়া মালয়েশিয়ায় প্রতি হাজারে ৪০২ ও যুক্তরাষ্ট্রে ৮৮০ জনের গাড়ি রয়েছে। এ থেকেই বোঝা যায় ঢাকায় কত কম সংখ্যক মানুষ গাড়ি ব্যবহার করে। তবু তাদের জন্য সব ধরনের আয়োজন চলছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, আদর্শ শহরে সড়ক থাকতে হয় এর আয়তনের ২৫ শতাংশ। অথচ রাজধানীতে সড়ক রয়েছে মাত্র ৮ শতাংশ। যানবাহন চলাচলের মতো প্রধান সড়ক আবার আরো কম, মাত্র ৩ শতাংশ। ফ্লাইওভার ও এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের মাধ্যমে রাস্তার পরিমাণ বাড়ছে মনে করা হলেও তা ঠিক নয়। বরং ফ্লাইওভার নির্মাণের ফলে নিচের সড়ক সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে। এতে যানজট আরো বাড়ছে।

ঢাকা যানবাহন সমন্বয় বোর্ডের সাবেক নির্বাহী পরিচালক ও পরিবহন বিশেষজ্ঞ ড. এসএম সালেহউদ্দিন বলেন, রাজধানীর যানজট নিরসনে ২০ বছর মেয়াদি কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনায় (এসটিপি) গণপরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়নে গুরুত্বারোপ করা হলেও বাস্তবে তার অগ্রগতি নেই বললেই চলে। এক্ষেত্রে স্বল্পমেয়াদি সমাধান হিসেবে ফ্লাইওভার-এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ করা হচ্ছে। ফলে সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। তাই দীর্ঘমেয়াদে রাজধানীর যানজট নিরসনে শক্তিশালী গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলার বিকল্প নেই।

সূত্র: বণিক বার্তা

You must be logged in to post a comment Login

মন্তব্য করুন