গ্যাস খাতে বিশৃঙ্খলা: নতুন আবাসিক সংযোগ আবার বন্ধ হতে পারে

প্রকাশ: June 17, 2015
gas

গ্যাসের আবাসিক সংযোগ আবার বন্ধ হতে পারে উল্লেখ করে ১৭ জুন ২০১৫ তারিখে প্রথম আলোতে প্রকাশিত এই প্রতিবেদনটি আমরা ঢাকার পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হল-

গ্যাস খাতে বেজায় বিশৃঙ্খল অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। শিল্প ও বাণিজ্যিক খাতে ছয় বছর ধরে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় নতুন গ্যাস-সংযোগ বন্ধ রয়েছে। আবাসিক খাতে আবারও সংযোগ বন্ধের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এদিকে অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার উদ্যোগও নেই।

জ্বালানি মন্ত্রণালয় ও বিতরণ কোম্পানিগুলোর সূত্র বলছে, আসন্ন রমজান মাসে গ্যাসের চাহিদা আরও বাড়বে। ফলে বৈধ-অবৈধ নির্বিশেষে যেকোনোভাবে সংযোগ পাওয়ার জন্য বিভিন্ন শ্রেণির গ্রাহকের চেষ্টা-তদবির বাড়বে। বাড়বে চলমান বিশৃঙ্খলাও। রমজানে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে ইতিমধ্যে সরকার ওই খাতে গ্যাস সরবরাহ বাড়িয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

শিল্প ও বাণিজ্যিক: এই খাতে গ্যাস-সংযোগ বন্ধের বিষয়ে রয়েছে অস্পষ্টতা ও বিভ্রান্তি। সরকার ২০০৯ সালের ৩১ জুলাই থেকে এই খাতে নতুন সংযোগ দেওয়া বন্ধ রেখেছে। তবে সিলেট অঞ্চল এ নিষেধাজ্ঞার বাইরে। কারণ হিসেবে জ্বালানি মন্ত্রণালয় বলেছিল, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতায় সিলেটের ক্ষেত্রগুলো থেকে তোলা সব গ্যাস দেশের অন্যত্র সঞ্চালন করা যাচ্ছে না। তাই উদ্বৃত্ত গ্যাস ব্যবহারের জন্য সিলেট অঞ্চলে নতুন সংযোগ বন্ধ করা হয়নি। গত ছয় বছরেও অবকাঠামোর সেই সীমাবদ্ধতা কাটেনি।

এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের জন্য রাজশাহীতে নতুন সংযোগ চালু রাখা হয়েছিল। সম্প্রতি আবার তা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ফলে ইতিমধ্যে যাঁরা সংযোগ পেয়েছেন এবং যাঁরা পাবেন বলে অপেক্ষা করছেন, তাঁদের মধ্যে বৈষম্য সৃষ্টি হয়েছে। আর যাঁরা পাননি, তাঁরা নানাভাবে চেষ্টা করছেন সংযোগ পাওয়ার।

সরকার শিল্প ও বাণিজ্যিক গ্রাহকদের নতুন সংযোগ বন্ধ করার পর কোনো গ্রাহকের জরুরিভিত্তিক আবেদন নিষ্পত্তি করার জন্য একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি করেছিল। কমিটি এখন পর্যন্ত প্রায় ২০০ শিল্প ও বাণিজ্যিক গ্রাহকের আবেদন মঞ্জুর করেছে। এখনো নয় শতাধিক আবেদন জমা আছে। কমিটির একাধিক সদস্য প্রথম আলোকে বলেন, তাঁদের কাজের প্রক্রিয়ার মধ্যেই ওই আবেদনকারীরা পর্যায়ক্রমে সংযোগ পাবেন।

অপরদিকে গত এপ্রিল থেকে জ্বালানি মন্ত্রণালয় থেকে বলা হচ্ছে, নির্দিষ্ট শিল্প এলাকা ছাড়া কোথাও শিল্পে গ্যাস-সংযোগ দেওয়া হবে না। আবার অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বাজেটপূর্ব এক আলোচনায় অর্থনীতিবিদ ও শিল্পপতিদের বলেছিলেন, ২০১৫-১৬ অর্থবছরের বাজেটে বিধান রাখা হবে নতুন শিল্পকারখানার জন্য ২ শতাংশ গ্যাস মজুত রাখার। বিনিয়োগ বোর্ডের মাধ্যমে এই গ্যাস পাবে সেসব শিল্প। কিন্তু বাজেটে তেমন কিছু উল্লেখ করা হয়নি। শিল্পে গ্যাস ব্যবহারেই মূল্য সংযোজন হয় সবচেয়ে বেশি। তবু এই খাতে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় সংযোগ বন্ধ রাখায় সংশ্লিষ্ট গ্রাহকেরা হতাশ।

আবাসিক খাত: এই খাতে ২০১০ সালের ১৩ জুলাই নতুন সংযোগ বন্ধ করা হয়। ২০১৩ সালের ৭ মে আবার তা চালু করার মধ্যবর্তী সময়ে ব্যাপক দুর্নীতির মাধ্যমে প্রায় এক লাখ অবৈধ সংযোগ দেওয়া হয়। এখন আবার আবাসিক সংযোগ বন্ধ করা হলে আগের মতোই দুর্নীতির ক্ষেত্র তৈরি হবে বলে আশঙ্কা করছে সংশ্লিষ্ট মহল।

গত ৯ এপ্রিল বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আবাসিকে সংযোগ বন্ধের নির্দেশনা দেন। এরপর প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ একাধিক অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের বলেন, আবাসিক সংযোগ বন্ধ করা হবে। বিকল্প হিসেবে এলপি গ্যাস সহজলভ্য করা হবে।
কিন্তু বিতরণ কোম্পানিগুলো আবাসিক গ্রাহকদের নতুন সংযোগ দিয়ে যাচ্ছে। কারণ জানতে চাইলে সবচেয়ে বড় বিতরণ কোম্পানি তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক নওশাদ ইসলাম বলেন, সংযোগ বন্ধ করা সংক্রান্ত সরকারি কোনো আদেশ এখন পর্যন্ত তাঁদের কাছে পৌঁছেনি।
মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে সরকারি আদেশ তৈরি হয়নি। বিষয়টি নিয়ে সরকারের মধ্যে দ্বিধা আছে। কারণ, এ ব্যাপারে অতীতের অভিজ্ঞতা ভালো নয়। সরকারি আদেশে সংযোগ যত দিন বন্ধ ছিল, তত দিন অবৈধভাবে সংযোগ দেওয়া-নেওয়ায় বিতরণ কোম্পানিগুলোতে ব্যাপক দুর্নীতি হয়েছে।

মন্ত্রণালয় ও বিতরণ কোম্পানিগুলোর কর্মকর্তারা বলেন, ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় সরকারি দলের নেতা-কর্মী এবং কোনো কোনো এলাকায় সাংসদেরাও সরকারি আদেশ উপেক্ষা করে অবৈধভাবে গ্যাস-সংযোগ দেওয়া-নেওয়ার সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। ফলে গ্যাসের অপচয় বেড়ে যায়। বিতরণ অবকাঠামোও বিপজ্জনকভাবে নাজুক হয়ে পড়ে। সে কারণে আবারও সংযোগ বন্ধ করা হবে কি না, তা নিয়ে সরকারের মধ্যে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব কাজ করছে।

বিতরণ কোম্পানিগুলোর সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০১৩ সালের ৭ মে আবাসিকে নতুন সংযোগ চালু করার পর যে গ্রাহকদের আবেদনপত্র গ্রহণ করা হয়েছে, তাঁদের সবাইকে এখন পর্যন্ত সংযোগ দেওয়া যায়নি। কিন্তু সংযোগ বন্ধ থাকার সময় যাঁরা অবৈধভাবে সংযোগ নিয়েছিলেন, তাঁরা সবাই গ্যাস ব্যবহার করছেন।

এই প্রেক্ষাপটে আবার সংযোগ বন্ধ করা হলে কার্যত অবৈধ সংযোগ গ্রহণকারীরাই বেশি উপকৃত হবেন। এটি কোনো ভালো দৃষ্টান্ত হবে না। তা ছাড়া অবৈধ সংযোগ বন্ধ ও বিচ্ছিন্ন করার ক্ষেত্রে প্রশাসনের পূর্ণ সহযোগিতা পাওয়া যায় না। স্থানীয় পর্যায়ের রাজনীতিকেরা এ ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধক সৃষ্টি করছেন বলে বিতরণ কোম্পানিগুলোর অভিযোগ।

আবাসিকে নতুন সংযোগ বন্ধ করার কারণ হিসেবে সরকার বলছে বিপুল অপচয়ের কথা। কিন্তু সরকারি খাতের বিতরণ কোম্পানি তিতাসের সমীক্ষা প্রতিবেদনেই বলা হয়েছে, প্রতিদিন সারা দেশে আবাসিক খাতে যে পরিমাণ গ্যাস সরবরাহ করা হয়, শিল্পে প্রতিদিন সে পরিমাণ গ্যাসই অপচয় হয়।

এ ছাড়া সরকার আবাসিক খাতে ব্যবহারের জন্য এলপি গ্যাস সহজলভ্য ও দাম নিয়ন্ত্রণের কথা বলছে। কিন্তু গত পাঁচ বছরেও এ ব্যাপারে কার্যকর কিছু করে উঠতে পারেনি। এই সার্বিক অবস্থায় গ্যাস খাতের সব শ্রেণির গ্রাহকই অনিশ্চয়তার মধ্যে আছেন।

সূত্র: প্রথম আলো

You must be logged in to post a comment Login

মন্তব্য করুন