জলাবদ্ধতার সার্বিক পরিস্থিতি ভীতিকর : আনিসুল হক

প্রকাশ: July 12, 2015
Annisul Huq

আগামী বর্ষার আগে ঢাকা উত্তরের জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধানে সব চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন মেয়র আনিসুল হক। তার প্রাসঙ্গিক বক্তব্য নিয়ে ১২ জুলাই ২০১৫ তারিখের বাংলাদেশ প্রতিদিন পত্রিকায় প্রকাশিত খবরটি আমরা ঢাকার পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হল-

ঢাকা উত্তর সিটির জলাবদ্ধতা সমস্যাকে সবচেয়ে ‘ভীতিকর’ বলে মনে করছেন মেয়র আনিসুল হক। তিনি বলেন, ‘স্যুয়ারেজ সিস্টেম নষ্ট করে বিভিন্ন এলাকায় অবৈধ স্থাপনা গড়ে তুলেছে প্রভাবশালীরা। দখলদারদের দৌরাত্ম্যে অনেক ক্ষেত্রে ওয়াসাও অসহায় হয়ে পড়েছে। সব মিলিয়ে জলাবদ্ধতার সার্বিক পরিস্থিতি আমার জন্য খুবই ভীতিকর। তবে এ বছর বর্ষা চলে আসায় এ মুহূর্তে তেমন কিছু করতেও পারছি না। তাই বলে হাল ছেড়ে দিয়ে বসে আছি তাও নয়। আগামী বর্ষার আগে এর স্থায়ী সমাধানে সব চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।’ নিজ কার্যালয়ে উত্তর সিটির সার্বিক সমস্যা ও অগ্রগতি নিয়ে বাংলাদেশ প্রতিদিনকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে গতকাল মেয়র এসব কথা বলেন। আনিসুল বলেন, জলাবদ্ধতা এমন একটি সমস্যা, যেটি চাইলেই রাতারাতি সমাধান করা যায় না। এটি ১০-১৫ বছর আগের সমস্যা। গুলশান-বনানীসহ গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় যেখানে বড় ধরনের সোয়ারেজ সিস্টেমের দরকার ছিল, তা তৈরি করা হয়নি। অন্য যেসব এলাকায় করা হয়েছে তাও অতিবৃষ্টির কারণে বেহাল। কোথাও মাঠ তৈরি করে, কোথাও খাল-বিল বন্ধ করে অবৈধ বাড়ি কিংবা দোকান বানিয়ে সোয়ারেজ সিস্টেম নষ্ট করে ফেলা হয়েছে। প্রভাবশালী হাউজিং কোম্পানিগুলো প্লট তৈরি করে জায়গা ভরাট করছে। আবার অনেক এলাকায় বর্জ্য ফেলে খাল ভরতি করে ফেলা হয়েছে। ফলে পানি নিষ্কাশনের সুবিধা না থাকায় সবখানেই জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে। তার মতে, ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা ও নগর পরিকল্পনাও আজকের জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণ। তিনি বলেন, কয়েক লাখ লোকের জন্য প্রস্তুত একটি শহরে আজ অন্তত পাঁচশ গুণ বেশি লোক বসবাস করছে। সুতরাং এ শহরে পানি নিষ্কাশনের মতো কোনো সুবিধাই আর নেই। এমন পরিস্থিতিতে মেয়র হিসেবে কী পদক্ষেপ নিচ্ছেন, জানতে চাওয়া হলে আনিসুল বলেন, ‘এ বছর বর্ষা চলে আসায় তেমন কিছুই করতে পারব না। তবে আগামী বছর যাতে এ সমস্যাটি আর আমাদের বিপদে না ফেলে সে জন্য এখন থেকেই সব চেষ্টা শুরু করেছি। বিষয়টি নিয়ে ওয়াসা, রাজউকসহ সংশ্লিষ্ট সব দফতরের সঙ্গে নিয়মিত বৈঠক করছি। বিভিন্ন এলাকা ঘুরে সার্বিক পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করছি। সরকারি সংস্থার লোকদের সঙ্গে নিয়ে তাদের বাস্তব চিত্র দেখাচ্ছি। তাৎক্ষণিকভাবে সমস্যা সমাধানে সংশ্লিষ্টদের চাপ দিচ্ছি।’

সোয়ারেজ সিস্টেমে বাধাদানকারী অবৈধ দখলদার বিষয়ে মেয়রের অবস্থান কী-জানতে চাইলে আনিসুল হক বলেন, দরকার হলে খালপারের অবৈধ বাড়ি ভেঙে ফেলা হবে। খাল-বিল দখল করে যারা হাউজিং করছে সেসব কোম্পানির সঙ্গে যোগাযোগ করে খাল উদ্ধার করা হবে। এ ক্ষেত্রে রাজউক, ওয়াসা বা ডিএনসিসি সমন্বয়ের মাধ্যমে কাজ করবে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘ওয়াসাকে একা দোষী করলে হবে না। যেখানে একটি বাড়ি দখল করে সোয়ারেজ বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে, সেখানে ওয়াসা কী করবে। মাঠ তৈরি করে ফেলছে, ওয়াসা কী করবে। সুতরাং কাউন্সিলরদের বলেছি, আপনারা সমস্যা চিহ্নিত করে নিয়ে আসুন। এলাকার অবৈধ দখলদারদের তুলে দিন। অথবা সম্ভাব্য সমাধান দিন। এরপর আপনাদের পরামর্শমতো ওয়াসা-রাজউককে নিয়ে তা সমাধান করা আমার দায়িত্ব।’বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রসঙ্গে আনিসুল হক বলেন, ‘আগেও বলেছি, এখনো বলছি, আগামী জানুয়ারির ১ তারিখের মধ্যেই এর সমাধান হবে।’ তবে সমাধানের দৃশ্যমান কোনো আলামত দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না কেন-জানতে চাইলে ব্যাখ্যায় যান তিনি। আনিসুল হক বলেন, আমরা রাস্তায় রাস্তায় বর্জ্য ফেলে রাখছি। কেন ফেলে রাখছি? কারণ আপনার-আমার বাড়ি থেকে যে ময়লাগুলো নিয়ে যাওয়া হচ্ছে তা ফেলার কোনো জায়গা নেই। সবচেয়ে বড় যে জায়গাটি, সেটি হচ্ছে আমিনবাজার। কিন্তু আমিনবাজারে তো আর ঠেলাগাড়িতে ময়লা নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। সেখানে নিয়ে যেতে হলে ট্রাক লাগে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কাজে আমাদের যে ট্রাকগুলো রয়েছে এর ৮০ ভাগই ২০-২৫ বছর আগের। এর অর্ধেক চলে, অর্ধেক চলে না। সবচেয়ে বড় কথা, সুষ্ঠু পরিকল্পনার মাধ্যমে এ শহরের কোথাও বর্জ্যরে জন্য ‘মিড ট্রান্সফার স্টেশন’ (ময়লা ফেলার মধ্যবর্তী জায়গা) করা হয়নি। নগর পরিকল্পনাবিদরা এসব নিয়ে ভাবেননি। তারা সিটি করেছেন তিন লাখ লোকের জন্য। এখন সেখানে বাস করছে হয়তো ৩০ লাখ।’ তিনি বলেন, ‘কাউন্সিলরদের সহযোগিতায় জায়গা নেওয়ার চেষ্টা করছি। সেখানে মিড স্টেশন করা হবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী নগরজুড়ে মোট ৭২টি স্টেশন করা হবে। সেটি হলে রাস্তায় আর বর্র্জ্য থাকবে না।’ভাঙাচোরা ও ঝুঁকিপূর্ণ রাস্তাঘাট নিয়ে মেয়র বলেন, ‘আমরা ডিএসসিসিকে বলেছি, কোনোভাবেই বর্ষাকালে রাস্তাঘাট করা যাবে না। রাস্তার কাজ অবশ্যই শীতের সময়ে করতে হবে।’ এ নিয়ে একটি সমস্যার কথা তুলে ধরেন আনিসুল হক। তিনি বলেন, ‘আমরা রাস্তা না কাটলেও সারা বছর বিভিন্ন সময় কখনো ওয়াসা, কখনো গ্যাস তাদের প্রয়োজনমতো রাস্তা কাটে। আমাদের সঙ্গে তাদের পরিকল্পনার মিল না থাকায় এ নিয়ে মুশকিলে পড়তে হয়। এ ছাড়া সারা বছর আমাদের টাকাও থাকে না। একেক সময় একেকভাবে বরাদ্দ হয়। আবার কোনো বিদেশি সংস্থার টাকায় কাজ চললে তাদের পরিকল্পনামতোই চলতে হয়।’ এর পরও সর্বোচ্চ সমন্বয়ের চেষ্টা চালাচ্ছেন বলে জানান তিনি। নগরীর আরেক সমস্যা যানজট নিয়ে প্রশ্ন করা হলে পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে দেন মেয়র। তিনি বলেন, ‘যে ঘরে আঁটে ১০ জন সেখানে যদি এক হাজার লোক ঢুকিয়ে দিই তাহলে কীভাবে চলবে। এখানে শহর বাড়লেও রাস্তাঘাট বাড়েনি। অথচ প্রতিদিনই বাড়ছে যানবহন। তবে এর সঙ্গে সিটি করপোরেশন সরাসরি সম্পৃক্ত নয় উল্লেখ করে নগরপিতা বলেন, ‘আমাদের কাজ হলো ট্রাফিক লাইটগুলো লাগিয়ে দেওয়া। আমরা সেটি করব। বাকিটা ট্রাফিক পুলিশ নিয়ন্ত্রণ করবে।’ এর বাইরে বিভিন্ন অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে কথা বলে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণেরও চেষ্টা করছেন বলে জানান তিনি। মেয়র বলেন, ‘আমরা কারওয়ান বাজার সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছি। তাতে যানজট কমবে। এ ছাড়া প্রচণ্ড দরকষাকষির মাধ্যম বাস-ট্রাক মালিকরা যাতে তেজগাঁও, আমিনবাজার, গাবতলী-সংলগ্ন রাস্তাগুলোতে বাস-ট্রাক দাঁড় করিয়ে না রাখেন তার একটি সমঝোতা চুক্তির চেষ্টা করছি। এগুলো হলে শহরের ওপর থেকে বাড়তি চাপ কিছুটা হলেও কমবে।’ জনগণকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি পূরণে কোনটিকে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে হচ্ছে-জানতে চাইলে দৃঢ় কণ্ঠে মেয়র বলেন, ‘সবগুলো বিষয়কেই চ্যালেঞ্জ মনে করছি। বর্জ্য, জলাবদ্ধতা, রাস্তাঘাট, সবুজায়ন, বিলবোর্ড, যানজট সব। যেটি নিয়ে কাজ করতে যাচ্ছি সেটিই আমার কাছে চ্যালেঞ্জ মনে হচ্ছে।’ প্রতিশ্রুতির অন্যতম ‘গ্রিন সিটি’র অগ্রগতি নিয়ে জানতে চাইলে আনিসুল হক বলেন, এ ক্ষেত্রে নগরবাসীর জন্য বড় একটি সারপ্রাইজ অপেক্ষা করছে। সব পরিকল্পনা শেষ। সেটি বাস্তবায়িত হতে বছরখানেক লাগবে। তখন নগরবাসী অবাক হয়ে দেখবেন সিঙ্গাপুরসদৃশ এ সবুজ শহর।’ মেয়র হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর সম্পূর্ণ পাল্টে গেছে আনিসুল হকের দৈনন্দিন জীবন। তিনি বলেন, “২৫ বছরে যত স্বাক্ষর করিনি, গত ২৫ দিনে তা করতে হয়েছে। আমার জন্য এ জীবন একদমই ‘আনন্যাচারাল’। দায়িত্ব গ্রহণের পর শুধু এক শনিবার অফিসে আসিনি। এ ছাড়া শুক্রবারসহ প্রতিদিনই রাত ৮-৯টা পর্যন্ত অফিস করছি। ডিএনসিসির সব কর্মকর্তা-কর্মচারীরও এক অবস্থা।” আনিসুল হক বলেন, ‘সহকর্মীদের কাছ থেকে প্রচণ্ড সহযোগিতা পাচ্ছি। যদিও একটা সিস্টেম এক দিনে পাল্টে দিতে পারব না। তবু চেষ্টা করছি। আর সে কারণেই অফিসের লোকজন এখন সতর্ক। তারা সোয়া ৯টার মধ্যেই অফিসে আসেন। কাজ করেন নিজের সবটুকু শ্রম দিয়ে।’

সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন

You must be logged in to post a comment Login

মন্তব্য করুন