ঢাকার অর্ধেক সড়কই ভাঙা

প্রকাশ: August 12, 2015
vanga sorok

ঢাকার বেহাল সড়ক নিয়ে ১২ আগস্ট, ২০১৫ তারিখের যুগান্তর পত্রিকায় প্রকাশিত এই প্রতিবেদনটি আমরা ঢাকার পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হল-

অতিবর্ষণ এবং নিম্নমানের উপকরণ দিয়ে তৈরি রাজধানীর সড়কগুলো ভেঙেচুরে একাকার। প্রধান সড়ক থেকে অলিগলি সর্বত্র একই চিত্র। বৃষ্টির পানি সরে যাওয়ায় ভেসে উঠেছে ক্ষতবিক্ষত রাজপথ। সড়কের বুকজুড়ে ছোটবড় গর্তগুলো প্রায় স্থায়ী হয়ে গেছে। এসব খানাখন্দে যানবাহন আটকে অহরহ দুর্ঘটনা ঘটছে। হতাহতের পাশাপাশি সৃষ্টি হচ্ছে দুঃসহ যানজট। ৩০ মিনিটের পথ যেতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় লাগছে। শুধু ঢাকা সিটি কর্পোরেশন এলাকা নয়, সারা দেশের প্রায় পাঁচ হাজার কিলোমিটার সড়ক-মহাসড়কের অবস্থা ভয়াবহ। অসাধু ঠিকাদার ও প্রকৌশলীদের দুর্নীতির কারণে এর বড় অংশই ক্ষতি হয়েছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

জানা গেছে, ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনের মোট রাস্তার পরিমাণ হচ্ছে ২ হাজার ৫০০ কিলোমিটার। এর অর্ধেকই ভাঙাচোরা বলে জানা গেছে। দুই সিটি কর্পোরেশন এসব ভাঙাচোরা সড়কের তালিকা তৈরি করেছে। গত অর্থবছরে (২০১৪-১৫) রাজধানীর এসব সড়ক সংস্কারে দুই সিটি কর্পোরেশন ব্যয় করেছে ২৮ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের (২০১৫-১৬) বাজেটে সড়ক সংস্কার খাতে ৫২ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। বর্ষার মৌসুম শেষে এসব সড়কের সংস্কার কাজ শুরু করা হবে বলে জানিয়েছেন দুই সিটি কর্পোরেশনের সংশ্লিষ্টরা।

এ প্রসঙ্গে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র মো. সাঈদ খোকন মঙ্গলবার যুগান্তরকে বলেন, ‘অতিবর্ষণ এবং জলাবদ্ধতার কারণে রাজধানীর সড়কগুলো ভেঙেচুরে একাকার হয়ে গেছে। আমরা ভাঙা রাস্তার একটা হিসাব করেছি। এতে দেখা গেছে প্রায় অর্ধেক সড়কের অবস্থা খারাপ।’ তিনি বলেন, ‘অর্থ, কাজ করার সামর্থ্য থাকলেও বর্ষার মৌসুম শেষ না হলে এসব সড়কের সংস্কারে হাত দেয়া সম্ভব নয়। বর্ষার পর কাজ শুরু হবে বলে তিনি জানান।

ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের মেয়র মো. আনিসুল হক মঙ্গলবার যুগান্তরকে বলেন, ‘রাজধানীর সড়ক সংস্কার সিটি কর্পোরেশনের রুটিন কাজ। আমরা আমাদের রুটিন কাজ করছি। যেসব সড়ক বর্ষার কারণে ভেঙে গেছে, সেগুলো সংস্কার করা হবে।’ শুধুু ঢাকার দুই সিটিতেই নয়, সারা দেশের রাস্তার অবস্থা খুবই খারাপ। এবার অতিবর্ষণে সারা দেশে কমপক্ষে ৫ হাজার কিলোমিটার সড়ক ভেঙে একাকার। সড়ক-মহাসড়কজুড়ে এখন শুধু খানাখন্দ। সর্বত্রই বর্ষণের ক্ষত। ক্ষতিগ্রস্ত এসব সড়ক-মহাসড়ক সড়ক ও জনপথ বিভাগ, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল, পৌরসভা ও সিটি কর্পোরেশনগুলোর অধীন। অতিবর্ষণে রাস্তার ক্ষতি হয়েছে এটা মানতে নারাজ সরকারি প্রতিষ্ঠানের এক প্রকৌশলী। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এ প্রকৌশলী বলেন, অতিবর্ষণ শুধু বাংলাদেশেই হয় না, অন্য দেশেও হয়। কিন্তু ওইসব দেশের রাস্তা কি এভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তিনি বলেন, আমাদের দেশে সড়ক-মহাসড়ক, অলিগলির রাস্তা নির্মাণ ও সংস্কারে ব্যাপক দুর্নীতি হয়ে থাকে। এসবের সঙ্গে দুর্নীতিবাজ সরকারি কর্মকর্তা এবং অসাধু ঠিকাদাররা জড়িত। অধিকাংশ রাস্তা নির্মাণে ব্যবহার করা হয় নিুমানের সামগ্রী। যেমন ভালো ইট ব্যবহারের নিয়ম থাকলেও দেয়া হচ্ছে নিম্নমানের ইট। সড়ক নির্মাণ বা সংস্কারে একটি নির্দিষ্ট পুরুত্বে কাজ করার কথা। কিন্ত দুর্নীতিবাজ প্রকৌশলী এবং অসাধু ঠিকাদার মিলেমিশে নির্দিষ্ট মাত্রার চেয়ে অনেক কম পুরুত্ব দিয়ে রাস্তা তৈরি বা সংস্কার করছে। সামান্য বৃষ্টিতেই পানি পুরুত্ব ভেদ করে ভেতরে ঢুকে যাচ্ছে। এ অবস্থায় ভারি যানবাহন চলাচল করায় রাস্তা ভেঙে যাচ্ছে। ওই প্রকৌশলী জানান অর্থ লুটপাটের জন্যই এসব করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতিবাজ প্রকৌশলী এবং একই ধরনের ঠিকাদার সড়ক নির্মাণ বা সংস্কারের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থ ভাগবাটোয়ারা করে নিয়ে কাজ খারাপ করছে। টাকার বাটোয়ারা শুরু হয় দরপত্র দেয়ার সময় থেকেই। ১০ কোটি টাকার কাজ ১২ কোটি টাকায় ঠিকাদারকে দেয়া হচ্ছে। দরপত্র চূড়ান্তের সময়ই কারসাজির মাধ্যমে অর্থ লুটের ব্যবস্থা পাকা হয়। প্রাক্কলিত বরাদ্দের বেশি অর্থ শুরুতেই ভাগ হয়ে যায়। এরপর নির্ধারিত অর্থ থেকেও ভাগ দিতে হয়। এক ঠিকাদার নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীকে ঘুষ না দিলে বিলই পাস হয় না। টেবিলে টেবিলে টাকা দিতে হয়। তিনি বলেন, আমরা তো লাভের অংশ থেকে ঘুষ দিতে পারব না। কাজেই কাজ খারাপ করে টাকা বাচাই। সেখানে থেকে ঘুষ দেই। যে কারণে রাস্তা বেশি দিন টিকে না। বছর ঘুরে আসার আগেই নতুন রাস্তা ভেঙেচুরে একাকার।

সরেজমিনে রাজধানীর সায়েদাবাদ, যাত্রাবাড়ী, সদরঘাট, মিরপুর, বাসাবো, উত্তরা মডেল টাউন এলাকা, পুরান ঢাকার লালবাগ, চকবাজার, জুরাইন, অভিজাত, গুলশান, বনানী, বারিধারা সড়কগুলো ঘুরে দেখা গেছে খানাখন্দে ভরা এ এলাকার সড়কগুলো। পিচ ঢালাই, ইট, খোয়া উঠে মাটি বেরিয়ে এসেছে। এসব সড়কে চলাচলে দুর্ভোগে নাকাল হচ্ছে রাজধানীবাসী।

মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা এনায়েতুর রহিম যুগান্তরকে বলেন, ‘আমি প্রাইভেটকারে চলাচল করি। ব্যবসায়িক কাজে প্রতিদিন মতিঝিলসহ বিভিন্ন জায়গায় ঘুরতে হয়। গুলশান, বনানী, বারিধারা ও উত্তরায় চলাচল নিত্যদিনের বিষয়। ভাঙাচোরা সড়কের কারণে ঝুঁকি তো আছেই, সেই সঙ্গে গর্তে গাড়ির চাকা আটকে যাওয়ার আতংকে থাকতে হয়। ভাঙাচোরা সড়কের কারণে গাড়ির ফিটনেস দুর্বল হয়ে পড়েছে। ভাঙা অংশ বাঁচিয়ে চলতে চায় সাবই। এতে এক দিকে চাপ পড়ে। সৃষ্টি হয় যানজটের।’

বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা আবু আলী যুগান্তরকে বলেন, ‘পেশাগত কারণে হোন্ডা চালানো খুবই জরুরি। রাজধানীর সড়কগুলোতে এখন হোন্ডা চালানো মানে জীবন নিয়ে খেলা করা। সড়কগুলোতে এত গর্ত যে কখন, গর্তে পড়ে যায় তা নিয়ে সংশয়ে থাকি।’

কলাবাগানে লন্ডন কলেজ অব লিগ্যাল স্টাডিজের ছাত্র মাহমুদুল হাসান যুগান্তরকে বলেন, ‘রায়েরবাজারের বাসা থেকে কলাবাগানের দূরত্ব সর্বোচ্চ তিন কিলোমিটার। প্রতিদিন আমাকে এ দূরত্ব পাড়ি দিতে হয়। রাস্তার এমনই করুণ হাল যে, প্রতিদিন বাসায় ঢোকার পর মনে হয়, পরের দিন যেন আর এ সড়কে আসতে না হয়।’
দুই সিটি কর্পোরেশনের প্রকৌশল বিভাগের তথ্যমতে, সাম্প্রতিক সময়ের ভারি বর্ষণে প্রতিটি রাস্তায় তৈরি হয়েছে বড় বড় খানাখন্দ। কোথাও কোথাও পুরো রাস্তা ভেঙে গেছে। পিচ ঢালাই, ইট-খোয়া বেরিয়ে পড়েছে। পানি জমা অংশগুলোর বিটুমিন-কার্পেটিং উঠে এবড়োখেবড়ো হয়ে গেছে পুরো সড়ক। ভিআইপি সড়ক থেকে রাজধানীর অলি-গলির কোনোটিই বাদ যায়নি । পাড়া-মহল্লার রাস্তাগুলোর অবস্থা বেশি খারাপ।

সরেজমিনে দেখা গেছে, শান্তিনগরের দুই লেনের সড়কটি ১২০ ফুট চওড়া। কিন্তু বর্তমানে ২০ ফুটও ব্যবহার উপযোগী নেই। অতিবর্ষণ আর জলাবদ্ধতায় ভেঙেচুরে একাকার হয়ে গেছে সড়কটি। এ সড়কে চলাচলে অন্তহীন দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে পথচারীদের।

সরেজমিনে আরও দেখা গেছে, তেজগাঁও শিল্প এলাকা, মৌচাক মার্কেটের সামনে থেকে কাকরাইল সড়কের সংযোগস্থল পর্যন্ত পুরো সড়ক ভাঙা। সামান্য বৃষ্টি হলে কাদাপানিতে ভেসে যায় এ এলাকা। হানিফ ফ্লাইওভারের ওঠার আগের প্রায় ৫০ মিটার সড়কটির অবস্থা এতই খারাপ হয়েছে যে, ওই পথ মাড়িয়ে গাড়িগুলোর ফ্লাইওভারে ওঠাই কঠিন হয়ে গেছে। তারপরও ভাঙা রাস্তা দিয়ে গাড়িগুলো ফ্লাইওভারে গিয়ে উঠছে। রাজধানীর প্রধান ভিআইপি সড়ক কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউয়ের বনানী চেয়ারম্যান বাড়ি এলাকার রাস্তার পুরো কার্পেটিং উঠে গেছে। বনানীর ১৩ নম্বর সড়কের সংযোগস্থলের রাস্তাও বেহাল। নৌবাহিনীর সদর দফতরের সামনে তৈরি হয়েছে বড় বড় গর্ত। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত বাইপাস সড়কের কয়েক মিটার পরপর শুধুই ছোটবড় গর্ত চোখে পড়ে। বনানীর কামাল আতাতুর্ক এভিনিউয়ের সড়কটি কিছুদিন আগেও ভালো ছিল। বাংলামোটর ও হোটেল সোনারগাঁওয়ের মধ্যবর্তী সড়কেও ছয়-সাত ইঞ্চি গভীর গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। গুলশান-তেজগাঁও সংযোগ সড়কটি গত বছর নতুন করে কার্পেটিং করা হলেও রাস্তাটির অবস্থা অত্যন্ত খারাপ। বিজয় সরণি-তেজগাঁও ফ্লাইওভারের তেজগাঁও পয়েন্টে ভেঙে গেছে। নীলক্ষেত এলাকায় সড়কগুলোও ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। রাজধানীর ভাঙাচোরা, চলাচল অনুপযোগী এমন সড়কের উদাহরণ অহরহ।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. নুরুল আমিন যুগান্তরকে বলেন, ‘ক্ষতিগ্রস্ত সড়কের উন্নয়ন কার্যক্রম দ্রুতই শুরু করা হবে। এজন্য পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ রয়েছে। বর্ষা কমলেই কার্যক্রম শুরু করা হবে।’

ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. কুদরত উল্লাহ যুগান্তরকে বলেন, ‘অতিবর্ষণের কারণে উত্তর সিটি কর্পোরেশন এলাকার অনেক সড়কে গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। এসব দ্রুত সংস্কার করা হবে। এজন্য প্রয়োজনীয় অর্থও বরাদ্দ রাখা হয়েছে।’

এই প্রকৌশলী আরও বলেন, ‘উত্তর সিটি কর্পোরেশন এলাকার প্রধান সড়কগুলোর বেশির ভাগই ভালো। শুধু কুড়িল প্রগতি সরণি রোডের অবস্থা কিছুটা খারাপ। এছাড়া পাড়া-মহল্লার সড়কগুলোর অবস্থা ভালো নয়। যেসব সড়কে বড় বড় গর্ত হয়েছে সেগুলো এরই মধ্যে আমরা সংস্কার শুরু করেছি। গর্তগুলো যাতে বড় না হয় সেজন্য প্রাথমিক সংস্কার কাজ শুরু হয়েছে।

সূত্র: যুগান্তর

You must be logged in to post a comment Login

মন্তব্য করুন