দেশে হাস্যকর জন্মনিবন্ধন তথ্যভান্ডার গড়ে উঠবে

প্রকাশ: May 23, 2015
UNI135429-Birth-reggroup

জন্মনিবন্ধন প্রক্রিয়ার ত্রুটি চিহ্নিত করে জুন ০৮, ২০১৪ তারিখে প্রথম আলোতে এই প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়েছে। প্রাসঙ্গিক বিবেচনায় প্রতিবেদনটি আমরা ঢাকার পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হল-

মানসুরা হোসাইন

জন্ম তারিখ পাল্টানোর জন্য জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালকের কাছে তদবির করছেন ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনের জনপ্রতিনিধিরা। অথচ এই জনপ্রতিনিধিরাই জন্মনিবন্ধনের জন্য নিবন্ধকের দায়িত্বে আছেন।

নিবন্ধকেরা কারও জন্মতারিখ পরিবর্তন করতে পারেন না। তাই এই তদবির। তদবিরে যখন কাজ হয় না, তখন নিজের জনপ্রিয়তা বজায় রাখতেই ভিন্ন পন্থা বেছে নেন নিবন্ধকেরা। ব্যক্তির চাহিদা মোতাবেক জন্মতারিখ পাল্টে নতুন করে জন্মনিবন্ধনে সহায়তা করেন তাঁরা।

এমন পরিস্থিতিতে দেশে একটি হাস্যকর জন্মনিবন্ধন তথ্যভান্ডার বা ব্যবস্থাপনা গড়ে উঠবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক আ ক ম সাইফুল ইসলাম চৌধুরী। তিনি তাঁর আশঙ্কার কথা জানিয়ে সম্প্রতি স্থানীয় সরকার বিভাগের জ্যেষ্ঠ সচিবকে একটি চিঠি দিয়েছেন।

ব্রিটিশ সরকার ১৮৭৩ সালে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন আইন প্রবর্তন করে। সেই আইন বাতিল করে ২০০৪ সালে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন আইন করে সরকার। ২০০৬ সালের জুলাই থেকে আইনটি কার্যকর হয়।

আইন অনুযায়ী, ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা এবং সিটি করপোরেশন, ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড, দূতাবাস জন্মনিবন্ধনের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত। নিবন্ধক হিসেবে সিটি করপোরেশনের মেয়র, পৌরসভা বা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডের প্রেসিডেন্ট, দূতাবাসের রাষ্ট্রদূত বা এ বিষয়টিতে ক্ষমতা বা দায়িত্বপ্রাপ্ত অন্য প্রতিনিধিরা দায়িত্ব পালন করছেন।

স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগের অধীনে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন প্রকল্পে ২০০১ সাল থেকে জাতিসংঘ শিশু তহবিল-ইউনিসেফ সহায়তা করছে। ২০০১ সাল থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত পাইলট আকারে প্রকল্পটি পরিচালিত হয়। বর্তমানে প্রকল্পের তৃতীয় পর্যায় চলছে।

আইন অনুযায়ী, জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন সবার জন্য বাধ্যতামূলক। জন্মের ৪৫ দিনের মধ্যে শিশুর অভিভাবক জন্ম-সংক্রান্ত তথ্য নিবন্ধকের কাছে দিতে বাধ্য। দুই বছর বয়স পর্যন্ত এখন বিনা মূল্যে জন্মনিবন্ধন করা যাচ্ছে। তবে এর পরে টাকা লাগছে। বাংলাদেশিদের বাইরে বাংলাদেশে বসবাসকারী বিদেশিদের বাংলাদেশে জন্ম নেওয়া শিশু, প্রবাসে বসবাসকারী বাংলাদেশিদের মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট পাওয়ার জন্যও জন্মনিবন্ধন সনদ প্রয়োজন।

প্রকল্প পরিচালক বলেন, ‘প্রতিদিন জনপ্রতিনিধিদের ফোনে তদবিরের যন্ত্রণায় জীবন অতিষ্ঠ হয়ে যাচ্ছে। দিনে কম করে হলেও ৫০টি ফোন আসছে। তাঁদের আবদার একটাই, জন্মতারিখ পাল্টে দিতে হবে। এটি সম্ভব নয় বলার পর তাঁরা নিজের উদ্যোগে নতুন করে জন্মনিবন্ধন করে দিচ্ছেন। অনলাইনে নামের বানানে ‘স’ এর পরিবর্তে ‘ছ’ লিখে নতুন করে নিবন্ধন করে দিচ্ছেন।’

প্রকল্প পরিচালক আরও বলেন, ‘জন্মনিবন্ধনের জন্য যাঁরা দায়িত্বপ্রাপ্ত, সেই প্রতিনিধিরাই যদি জন্মতারিখ পাল্টানোর বিষয়টিকে প্রশ্রয় দেন, তাহলে আর এ প্রকল্পের কোনো কার্যকারিতা থাকে না। তাই জনপ্রতিনিধিদের এ ধরনের প্রবণতা রোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট বিভাগকে চিঠি দিতে বাধ্য হয়েছি। এ প্রবণতা রোধ করা না গেলে এক ব্যক্তির একাধিক জন্মনিবন্ধনের তথ্য সংরক্ষিত হচ্ছে।’

জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন প্রকল্পের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, এ পর্যন্ত প্রায় ১৬ কোটি ২৫ লাখ জন্ম এবং ৬৯ লাখ মৃত্যু নিবন্ধন করা হয়েছে। ১০ কোটি ৮৭ লাখ জন্মনিবন্ধন অনলাইনে সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়েছে।

জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন আইন অনুযায়ী, পাসপোর্ট পেতে, বিয়ে নিবন্ধনে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তিতে, সরকারি, বেসরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত সংস্থায় নিয়োগ পেতে, ড্রাইভিং লাইসেন্স পেতে, ভোটার তালিকা তৈরিতে এবং জমি নিবন্ধনে বয়স প্রমাণের জন্য জন্ম সনদ ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ২০০৬ সালে ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, সিটি করপোরেশন, ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড এবং দূতাবাসে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের জন্য পৃথক বিধিমালা জারি করা হয়। বিধিমালা অনুযায়ী, ব্যাংক হিসাব খুলতে, আমদানি ও রপ্তানি লাইসেন্স পেতে, গ্যাস পানি, টেলিফোন এবং বিদ্যুত্সংযোগের অনুমতি, করদাতা শনাক্তকরণের নম্বর, ঠিকাদারি বা চুক্তির লাইসেন্স, ভবন নকশার অনুমোদন, ট্রেড লাইসেন্স প্রাপ্তি, মোটর যানের নিবন্ধন এবং জাতীয় পরিচয়পত্র পাওয়ার ক্ষেত্রে জন্মনিবন্ধন সনদপত্রের প্রয়োজন।

প্রকল্প পরিচালক আ ক ম সাইফুল ইসলাম চৌধুরী জন্ম সনদের গুরুত্ব সম্পর্কে বলেন, জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের মাধ্যমে দেশের প্রকৃত জনসংখ্যা কত, তা জানা সম্ভব। একই ব্যক্তির যদি একাধিক সদন থাকে, তবে সব উদ্দেশ্যই বিফলে যাবে।

You must be logged in to post a comment Login

মন্তব্য করুন