‘নগর বন্যা’ থেকে মুক্তির পথ

প্রকাশ: June 29, 2015
jolaboddhota.

লেখক: অধ্যাপক নজরুল ইসলাম

গত কয়েক দিনের মাঝারি বর্ষণে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা দেখা গেল। এটাকে আমরা অনেক সময় বলি ‘নগর বন্যা’। এ ধরনের জলাবদ্ধতা দিন দিন বাড়ছে। অবশ্য সাধারণ যে বন্যা, যেটা নদীর পানি বাড়ার কারণে কূল উপচে ঘটে থাকে, সেই ‘নদী বন্যা’ ঢাকায় কম দেখা যায়। ঢাকার চারপাশেই যদিও নদী রয়েছে; বড় ধরনের বন্যা হলে তবেই সেই পানি ঢাকায় প্রবেশ করে। এর কারণ ঢাকা নগরীর পশ্চিমাঞ্চলের শহররক্ষা বাঁধ। ১৯৮৮ সালের প্রলয়ঙ্করী বন্যার পর ঢাকার উত্তরা থেকে টঙ্গী খালের পাশ দিয়ে, তুরাগ নদের পাড় ধরে বুড়িগঙ্গার সদরঘাট পর্যন্ত বাঁধটি নির্মিত হয়েছিল। ঢাকার পূর্বপাশে যদিও আনুষ্ঠানিক বাঁধ নেই, মৌচাক থেকে নিকুঞ্জ পর্যন্ত যে হাইওয়ে বা প্রগতি সরণি নির্মিত হয়েছে, সেটাই অনেকাংশে বাঁধের কাজ করছে। মূলত পশ্চিমাংশের বাঁধ ও পূর্বাংশের হাইওয়েটির কারণে বর্ষাকালের স্বাভাবিক বন্যা থেকে ঢাকা শহর রক্ষা পেয়ে আসছে। বর্ষাকালে ঢাকার চারপাশের নদীগুলোতে টঙ্গী খাল, তুরাগ, বুড়িগঙ্গা, বালু ও শীতলক্ষ্যায় পানির উচ্চতা শহরের ভেতরের উচ্চতার চেয়ে বেশি থাকলেও বাঁধের কারণে ঢুকতে পারে না। কিন্তু কয়েক বছর ধরে ক্রমবর্ধমান হারে নাগরিক জীবন বিঘি্নত করছে ‘নগর বন্যা’ বা জলাবদ্ধতা।

ঢাকা নগরীতে মাঝারি বা ভারি বৃষ্টিজনিত জলাবদ্ধতা হচ্ছে। তার কারণ কিন্তু আবার ওই দুই বাঁধ ও হাইওয়ে। কারণ বৃষ্টির পানি শহর থেকে স্বাভাবিকভাবে বের হতে পারছে না। পশ্চিমাংশের বাঁধে মাত্র তিনটি পয়েন্ট দিয়ে পানি নিষ্কাশনের সুযোগ রয়েছে_ গোরান, কল্যাণপুর, হাজারীবাগে নির্মিত তিনটি স্লুইস গেট ও পাম্প হাউস। পূর্বদিকে রয়েছে একটিমাত্র স্লুইস গেট ও পাম্প হাউস। এটা রামপুরায় টিভি ভবনের পাশে অবস্থিত। ওই পাম্পের কারণে গুলশান, বনানী, বারিধারা, মগবাজার, কারওয়ান বাজার এলাকা থেকে সহজে পানি নিষ্কাশিত হয়। কিন্তু পশ্চিমাংশে অবস্থিত স্লুইস গেট ও পাম্প হাউসগুলো কতটা কাজে আসছে এখন এ নিয়ে আমার সন্দেহ রয়েছে। ফলে ঢাকার বিস্তীর্ণ এলাকায় জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। পশ্চিমাঞ্চলের বাঁধ ও পূর্বাংশের হাইওয়ে আমাদের ‘নদী বন্যা’র বিপদ থেকে রক্ষা করেছে; কিন্তু ‘নগর বন্যা’র আপদ তৈরি করেছে।

তবে জলাবদ্ধতার জন্য কেবল বাঁধ ও হাইওয়েকে দায়ী করা অন্যায় হবে। ঢাকা শহরের ভেতরে অনেক খাল, নিম্নভূমি, জলাশয়, লেক ও সরকারি-বেসরকারি অসংখ্য পুকুর ও দীঘি ছিল। গত ৩০ বছরে পুকুর ও দীঘিগুলো ক্রমান্বয়ে নগর উন্নয়নের নামে ভরাট করে ফেলা হয়েছে। অথচ মাঝারি বৃষ্টিতে এ পুকুরগুলো চমৎকার জলাধার হিসেবে কাজ করত। গলি বা বাড়ির উঠোন থেকে বৃষ্টির পানি পুকুরে গিয়ে জমা হতো। ঢাকার লেকগুলো মোটামুটি সংরক্ষিত রয়েছে। বিশেষ করে রমনা, ধানমণ্ডি, গুলশান, বনানী, উত্তরা লেক। অতিসম্প্রতি হাতিরঝিল ও বেগুনবাড়ি খাল উদ্ধার করে সংরক্ষণের চমৎকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এটা উদ্ধার করা না হলে, সাম্প্রতিক বর্ষণে কারওয়ান বাজার থেকে রামপুরা হয়ে তেজগাঁও, মহাখালী, গুলশান এমনকি শাহবাগ পর্যন্ত ভয়াবহ জলাবদ্ধতা দেখা দিতে পারত।

সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে ঢাকার ভেতরে জালের মতো ছড়িয়ে থাকা খালগুলো হারিয়ে যাওয়া। স্বাধীনতার পরও ঢাকায় অর্ধশতাধিক খাল ছিল। এই খালগুলো পরিকল্পিত ও অপরিকল্পিতভাবে মেরে ফেলা হয়েছে। অপরিকল্পিত হচ্ছে দখল বা ভরাট। ‘পরিকল্পিত’ হচ্ছে বক্স কালভার্ট করা। বাবুবাজার থেকে সূত্রাপুর পর্যন্ত চন্দ্রাকৃতি বেশ প্রশস্ত ও গভীর ধোলাইখাল ছিল। কিন্তু সেটাকে বক্স কালভার্ট করে ফেলা হয়েছে। পান্থপথের খালটি ধানমণ্ডি থেকে হাতিরঝিলে পতিত হতো। সেটাকে বক্স কালভার্ট করে রাস্তা বানানো হয়েছে। এই খালগুলো ছিল বর্ষার পানি নিষ্কাশনের চমৎকার প্রাকৃতিক ব্যবস্থা। অর্ধশতাধিক খালের মধ্যে এখন বড়জোর ১৫টা খাল রয়েছে। তাও সেগুলোকে খাল না বলে সরু নালা বলা ভালো। দখল থেকে রক্ষায় এর কয়েকটির পাড় ঢাকা ওয়াসা পাকা করেছে; কিন্তু সেখানে অনবরত বর্জ্য ফেলা হয়। ওয়াসার কর্মচারীরা পরিষ্কারের চেষ্টা করেন; কিন্তু বর্জ্য ফেলার গতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে পারেন না। এই খালগুলো ঢাকার পানি নিয়ে চারপাশের নদীগুলোতে ফেলত। এখন আর ঢাকার পানি নিষ্কাশিত হয় না।

পুকুর, লেক, খালের পাশাপাশি ঢাকা শহরের ভেতরে ও আশপাশে অনেক নিম্নভূমি ছিল। এগুলোই ঢাকার মূল জলাধারের কাজ করত। শহরের ভেতরের নিম্নভূমিগুলো ছিল রূপনগর, রামপুরা, কল্যাণপুর। এগুলো ইতিমধ্যে ভরাট করে বাড়িঘর তৈরি করা হয়েছে। এখন ক্রমাগতভাবে ভরাট হয়ে চলছে শহরের আশপাশের নিম্নভূমিগুলো। পশ্চিমাঞ্চলীয় বাঁধের বাইরে মিরপুর ও উত্তরাসংলগ্ন আশুলিয়ায় আক্ষরিক অর্থেই মাইলের পর মাইল ভরাট করে ফেলা হয়েছে। মোহাম্মদপুর আবাসিক এলাকাও এখন বাঁধ ছাড়িয়ে বুড়িগঙ্গা নদী পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে।

পূর্বাংশে প্রগতি সরণি থেকে বালু নদ পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকা ছিল নিম্নাচল। এই নিম্নাঞ্চল বর্ষাকালে অথৈ বিলে পরিণত হতো। দক্ষিণে ডেমরা পর্যন্ত ছিল বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চল। এই দুই এলাকাতেই মাটি ভরাট করে বিশাল বিশাল আবাসিক প্রকল্প গড়ে তোলা হয়েছে। এমনকি সরকারিভাবেও সেখানে আবাসন প্রকল্প হচ্ছে। অবশ্য রাজউক যেখানে পূর্বাচল উপশহর করছে, সেই এলাকা উচ্চভূমিই ছিল। কিন্তু এর মধ্যেও খণ্ড খণ্ড নিম্নভূমি। আমি আশা করি, সরকারি আবাসন প্রকল্পগুলোতে যথেষ্ট পরিমাণের জলাধার এলাকা রাখা হবে। ওই এলাকায় ৩০০ ফুট চওড়া যে দীর্ঘ লিংক রোড তৈরি হচ্ছে, তাতে পানি নিষ্কাশনের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকলে নতুন করে বিস্তীর্ণ এলাকায় জলাবদ্ধতার ঝুঁকি তৈরি হবে।

প্রশ্ন হচ্ছে, উপশহরগুলোতে না হয় জলাধার থাকল; মূল শহরের জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি পাব কীভাবে? লক্ষণীয়, ঢাকা নিয়ে যত নগর পরিকল্পনা হয়েছে বা হচ্ছে, সবগুলোতে কিন্তু জলাধার রাখার কথা বলা হয়েছে। ঢাকা মেট্রোপলিটন ডেভেলপমেন্ট প্ল্যানে ওয়াটার রিটেনশন পন্ড বা জলাশয় রাখার কথা ছিল। ডিটেইল এরিয়া প্ল্যানেও জলাভূমি চিহ্নিত করা ছিল। রাজউক এখন নতুন করে স্ট্রাকচার প্ল্যান করছে। সেখানেও জলাধার সংরক্ষণের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু কথা হচ্ছে, নীতিগত এই অবস্থান মাঠপর্যায়ে প্রতিপালিত হচ্ছে না। সরকারি বা বেসরকারি পর্যায়ে ক্রমাগত ঢাকার জলাধারগুলো মেরে ফেলা হচ্ছে।

এটা ঠিক যে, ঢাকা নগরীর সম্প্রসারণ আমরা অর্থনৈতিক কারণেই থামিয়ে রাখতে পারব না। কিন্তু সেই সম্প্রসারণ হতে হবে নিয়ম মেনে। আমার হিসেবে একটি নগর ব্যবস্থায় অন্তত ২০ শতাংশ এলাকা জলাধার হিসেবে থাকতে হবে। ইতিমধ্যে যেসব জলাভূমি ও নিম্নাঞ্চল ভরাট করে ফেলা হয়েছে, সেসব খাল বক্স কালভার্ট করে ফেলা হয়েছে, যেসব পুকুর হারিয়ে গেছে; সেগুলো আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা প্রায় অসম্ভব, স্বীকার করতেই হবে। কিন্তু নতুন করে যাতে আর কোনো নিম্নভূমি দখল ও ভরাট না হয়; যে কয়েকটি খাল এখনও কোনো রকমে অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে, সেগুলো যাতে উদ্ধার ও কার্যকর করা যায়_ সে ব্যবস্থা করতেই হবে। বিশেষ করে বেসরকারি আবাসন কোম্পানিগুলো অনেকটা নির্বিচারে জলাভূমি ভরাট করে প্লট তৈরি করছে। এগুলো বন্ধ করা না গেলে খুবই বিপজ্জনক পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে ঢাকাবাসীকে।

অনেকে লক্ষ্য করে থাকবেন, একই মাত্রার বৃষ্টিতে ঢাকায় এখন জলাবদ্ধতার মাত্রা ক্রমে বেশি হচ্ছে। এটা হচ্ছে জলাধার ভরাট প্রক্রিয়া অব্যাহতা থাকার প্রতিক্রিয়া। যদি জলাধার ভরাট বন্ধ করা না যায়, তাহলে আগামী কয়েক বছরে জলাবদ্ধতা আরও প্রকট আকার ধারণ করবে। পানি যেহেতু বের হওয়ার ও কোথাও জমা হওয়ার পথ পাবে না, ঢাকা শহরের বিস্তীর্ণ এলাকা বছরের বেশিরভাগ সময় ডুবেই থাকবে। যেমনটি হয়েছে ডিএনডি এলাকায়। পাশাপাশি জলাবদ্ধতা নিরসনে দক্ষতা ও আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করতে হবে।

জলাবদ্ধতা নিরসনের ব্যর্থতার সময় নাগরিকদের দিক থেকে প্রধানত ঢাকা ওয়াসাকে দায়ী করা হয়। এটা ঠিক, ওয়াসার আরও দক্ষতার সঙ্গে কাজ করার প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু মনে রাখতে হবে, ঢাকা নগরীর মাত্র ৩০-৩৫ ভাগ এলাকার পানি নিষ্কাশন ওয়াসার এখতিয়ারে। বাকি এলাকার পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা নির্ভর করে সিটি করপোরেশন, রাজউক, পানি উন্নয়ন বোর্ড ও এলজিইডির আন্তরিকতা, দায়িত্বশীলতা ও দক্ষতার ওপর।

জলাবদ্ধতা নিরসনে আমি মনে করি, দীর্ঘমেয়াদে নগর পরিকল্পনাগুলো কার্যকর করতে হবে। আমরা ডিটেইল এরিয়া প্ল্যান বাস্তবায়ন করতে পারিনি। এটা বিশ বছরে বাস্তবায়নের কথা ছিল। কিন্তু কাজই শুরু হয়েছে, ১৫ বছর পর। এখন রাজউক নতুন করে ঢাকা স্ট্রাকচার প্ল্যান তৈরি করছে। এর প্রয়োগ নিয়ে কথাবার্তা এখনই শুরু করতে হবে। রাজউক বলতে পারে যে, এখনও চূড়ান্ত হয়নি। তাকে কী? কথা বলতে তো দোষ নেই! তাহলে সমৃদ্ধ হবে, নাগরিকের অংশগ্রহণ থাকবে। স্ট্রাকচার প্ল্যানে স্পষ্ট বলা আছে, পূর্ব ঢাকার যাবতীয় নগর উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে ওয়াটার রিটেনশন পন্ড বা জলাধার ও খালগুলোকে সংরক্ষিত রেখে সম্পন্ন হতে হবে। স্ট্রাকচার প্ল্যানের পর রিভাইজড ডিটেইল এরিয়া প্ল্যান হবে। ওদিকে জলাবদ্ধতা ক্রমেই বাড়ছে। ফলে বসে থাকার সময় নেই। ওয়াসা, সিটি করপোরেশন, এলজিইডি, পানি উন্নয়ন বোর্ড মিলে এখনই ঢাকাকে জলাবদ্ধতামুক্ত করার কাজ শুরু হতেই পরে!

ঢাকার জলাবদ্ধতা নিরসনে সিটি করপোরেশনের একটা বড় ভূমিকা রয়েছে। সেটা কারিগরি দিক থেকে নয়; বরং জনসচেতনতা ও জনসম্পৃক্ততার নিরিখে। কারণ জনগণের অসহযোগিতার কারণেও খালগুলো আবর্জনায় বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, দখল হচ্ছে। আমরা দেখছি ঢাকার দুই মেয়র বিভিন্ন কাজে যথেষ্ট সক্রিয়তার পরিচয় দিচ্ছেন। একই সঙ্গে কাউন্সিলরদেরও সক্রিয় হতে হবে। বিশেষ করে জলাধার ও খালগুলো রক্ষার ক্ষেত্রে। ঢাকা ওয়াসায় বোর্ড রয়েছে; যেখানে বিশেষজ্ঞদের অন্তর্ভুক্তির সুযোগ রয়েছে। তার বাইরেও বিশেষজ্ঞ ও পরিবেশবাদীদের সহযোগিতা নিতে পারে ওয়াসা। এর বাইরে যাতে করে ড্রেনগুলো সচল থাকে, ম্যানহোল পরিষ্কার থাকে; সেদিকে ওয়াসাকে আরও সক্রিয় হতে হবে। তাহলে স্থানীয় জলাবদ্ধতা দূর করা সহজ হবে।

দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বড় বড় বিষয় নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হতে দেখি। দুর্ভাগ্যজনকভাবে ঢাকার জলাবদ্ধতা, জলাধার সংরক্ষণ, খাল উদ্ধার, নগর উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়ে নিয়ে খুব বেশি আলোচনা দেখি না। এই যে স্ট্রাকচার প্ল্যান হচ্ছে, কোথাও আলোচনা আছে! অথচ এগুলোও খুবই জরুরি। রাজনীতি ও অর্থনীতির মতোই এবং কোনো কোনো বিবেচনায় তার চেয়েও বড় ইস্যু। ঢাকা ডুবে গেলে সবই ডুবে যেতে বাধ্য।

লেখক: অবৈতনিক সভাপতি, নগর গবেষণা কেন্দ্র; সাবেক সভাপতি, ঢাকা ওয়াসা; সাবেক অধ্যাপক, ভূগোল ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

সূত্র: সমকাল

You must be logged in to post a comment Login