নামেই আধুনিক, যাত্রীসেবা নেই: বাস টার্মিনালে হয়রানি চরমে

প্রকাশ: June 22, 2015
bus terminal

রাজধানীর বাস টার্মিনালগুলোতে অব্যবস্থা নিয়ে ২২ জুন ২০১৫ তারিখের বাংলাদেশ প্রতিদিন পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনটি আমরা ঢাকার পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হল-

রাজধানীতে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে তিনটি আধুনিক বাস টার্মিনাল নির্মাণ করা হলেও সাধারণ যাত্রীরা কোনো সুফল পাচ্ছেন না। নামেই এসব আধুনিক বাস টার্মিনাল, কোনোরকম যাত্রীসেবা নেই। তার বদলে নিয়মিত চলছে যাত্রী হয়রানি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অবহেলা ও উদাসীনতায় এ দশা হয়েছে বলে অনেকেরই অভিযোগ।

সরেজমিন রাজধানীর মিরপুর (গাবতলী), মহাখালী ও সায়েদাবাদ আন্তঃজেলা ও নগর বাস টার্মিনাল ঘুরে এ ধরনের নানা অভিযোগ পাওয়া গেছে। ভুক্তভোগীরা জানান, দিনভর এ তিন বাস টার্মিনাল যাত্রীতে ভরপুর থাকলেও তারা নানাভাবে দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন, ভোগ করছেন চরম বিড়ম্বনা। ওয়াকিবহালরা জানান, প্রতিবছর ঈদ এলেই বেড়ে যায় যাত্রী হয়রানি। প্রতিবাদ করলে কপালে জোটে শারীরিক নির্যাতন। এবারও সে একই অবস্থা। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, নগরীর তিন বাস টার্মিনালের সার্বিক দেখভালের দায়িত্ব ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের। তিন টার্মিনাল থেকে প্রতিদিন গড়ে চার থেকে সাড়ে চার হাজার দূরপাল্লা ও সিটি সার্ভিসের বাস-মিনিবাস যাতায়াত করে। এর মধ্যে গাবতলী থেকে ১৪০০, মহাখালী থেকে ৮০০ ও সায়েদাবাদ থেকে ৯০০ দূরপাল্লার বাস ছেড়ে যায়। এ ছাড়া এসব টার্মিনাল থেকে সিটি সার্ভিসের ৪১ রুটে আরও এক হাজার মিনিবাস ছেড়ে যায়।তিন বাস টার্মিনাল ঘুরে দেখা গেছে, মাদকসেবীদের অবাধ বিচরণ, হকারদের উৎপাত, নোংরা বিশ্রামাগার ও টয়লেটের করুণ দশা। অনেকেই জানান, এ অবস্থার কারণে যাত্রীরা মুখ ফিরিয়ে নিতে শুরু করেছেন। তিন আন্তঃজেলা বাস টার্মিনালের বদলে তারা নগরীর অন্য কাউন্টারগুলোতে ভিড় করছেন।

সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল: গতকাল সকালে সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালে গিয়ে দেখা যায়, টার্মিনালের নির্ধারিত জায়গার সামান্য দূরে শতাধিক দূরপাল্লার ও সিটি সার্ভিসের বাস-মিনিবাস এলোমেলোভাবে রাখা হয়েছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটের প্রিন্স পরিবহনের একটি বাসের হেলপার যাত্রী ধরার জন্য হাঁকডাক করছেন। বলছেন, ‘ডাইরেক্ট চট্টগ্রাম। মাত্র ৪৫০ টাকা।’ এভাবে চার থেকে পাঁচ মিনিট ডাকাডাকির পর আলম নামের এক যাত্রী এগিয়ে আসেন। তিনি ৩৫০ টাকা দিতে চান। শুনে তেড়ে যান হেলপার জসিম। এই টাকায় সিট ছাড়াই তাকে দাঁড়িয়ে যেতে হবে বলে সাফ জানিয়ে দেন। শরিফা জামান নামের আরেক গার্মেন্ট কর্মী ফেনীতে যাওয়ার আশায় টার্মিনালে আসেন। তাকে দেখে তিন বাসের কর্মচারীরা ঘিরে ধরেন। যেতে না চাইলেও তাকে টানাহেঁচড়া করে নবীন পরিবহন নামে একটি বাসে উঠিয়ে নেয়। এভাবে আরও তিনজন যাত্রীকে ওই বাসে ওঠায়। টার্মিনালের ভিতরের এক বাস থেকে হৈচৈ-এর শব্দ শুনে এগিয়ে গিয়ে দেখা যায়, প্রিন্স পরিবহনের এক কর্মচারীর সঙ্গে দুই যাত্রীর ঝগড়া চলছে। নির্ধারিত সময়ে বাস না ছাড়ায় এ বাকবিতণ্ডার সৃষ্টি। দেখা যায়, টার্মিনালের যাত্রী বিশ্রামাগারে ১০-১২টি ভাঙা চেয়ার। পাশে কয়েকজন হকার ও বখাটে মিলে গল্প করছে। রুমের বাইরে চাঁদপুর যাওয়ার অপেক্ষায় একটি পরিবার অসহায়ের মতো দাঁড়িয়ে আছে। বিশ্রামাগারের পাশেই টয়লেট। সেখানে দেখা যায়, ভিতরের অবস্থা বড়ই শোচনীয়। দুর্গন্ধে ভিতরে ঢোকা একেবারেই কঠিন। তারপরও বাধ্য হয়ে নাক-মুখে কাপড় চেপে ঢুকছেন যাত্রীরা। কালাম নামের এক যাত্রী আক্ষেপ করে বললেন, ‘টার্মিনালে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের তিনজন সুইপার থাকলেও তারা ডিউটি না করে সারাদিন টার্মিনালের ভিতর পান-সিগারেট বিক্রি করে। আর কাজ ছাড়াই মাস শেষে বেতন তোলে।’

গাবতলী বাস টার্মিনাল : গাবতলী বাস টার্মিনালের ভিতরে ঢুকতেই চোখে পড়ে নানা ধরনের দুর্ভোগ ও বিড়ম্বনার চিত্র। বিশ্রামাগারে দেখা যায় চার-পাঁচ যুবক বসে তাস খেলছে। টেলিভিশনের নির্ধারিত স্থানে টেলিভিশন নেই। আছে একপাশে রহিম নামে এক জুতার কারিগরের জুতা পালিশের বাক্স। আরেক পাশে চিনাবাদাম বিক্রির সরঞ্জাম। টয়লেটের সামনে ময়লা-আবর্জনার স্তূপ। দূর থেকেও ভেসে আসছে উৎকট দুর্গন্ধ। সাধারণ বাস মালিকদের অভিযোগ, এ টার্মিনালে চলছে রমরমা চাঁদাবাজি। প্রতিটি বাস ও মিনিবাসকে গুনতে হয় চাঁদার অঙ্ক। শিরিন বানু নামের খুলনার এক যাত্রী বলেন, ‘গাবতলী নামেই আধুনিক টার্মিনাল। নেই পরিচ্ছন্ন টয়লেট। নেই কোনো পরিষ্কার বিশ্রামাগার। টার্মিনালের সর্বত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে ময়লা-আবর্জনা। রোদ-বৃষ্টির সময় অপেক্ষা করার জায়গা নেই। এ ছাড়া বাস কর্মচারীদের টানাটানির কারণে পছন্দের বাসে যাওয়া যায় না।’ অথচ এভাবে এখান থেকে ১৪০০ বাস দেশের ৩৫ জেলায় ছেড়ে যায়। জানতে চাইলে টার্মিনালে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের দায়িত্বপ্রাপ্ত সুপারভাইজার মো. সিদ্দিক বলেন, ‘জনবল সংকটে সব কিছুর লক্ষ্য রাখা যাচ্ছে না।’ তিনি টয়লেট ও টামিনালে অপ্রতুল সেবার প্রসঙ্গ টেনে বলেন, ‘ভাসমান ও বখাটেদের উৎপাতের কারণে কেউ মুখ খুলতে পারে না। এই কারণে টার্মিনালে আসা যাত্রীরা সেবার পরিবর্তে দুর্ভোগ ও যন্ত্রণা ভোগ করেন।’

মহাখালী বাস টার্মিনাল : টার্মিনালের প্রবেশমুখে সিটি সার্ভিসের বাস ও মিনিবাসের কারণে সারাদিন যানজট লেগেই থাকে। টার্মিনালের ভিতরেও সিটি সার্ভিসের মিনিবাস যত্রতত্র থামিয়ে রাখার কারণে যাত্রীরা ভিতরে ঢুকতে পারে না। ময়মনসিংহগামী যাত্রী ফারুক হোসেন বলেন, ‘টার্মিনালে এলেই শুরু হয় টানাটানি। এসব কারণে অনেকে টার্মিনালের বাইরে থেকে বাসে ওঠেন।’ তিন টার্মিনাল ঘুরে দেখা যায়, যাত্রীদের বিশ্রামাগার হকারদের দখলে। টয়লেটে যাওয়ার পরিবেশ নেই। দুই টয়লেটের দরজার ছিটকিনি নেই। পানির লাইন থাকলেও কলে পানি নেই। এ ছাড়া কোনো যাত্রী ভিতরে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে বাসের কর্মচারীরা টিকিট কেনার জন্য পীড়াপীড়ি শুরু করে। বিশ্বব্যাংকের কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে টার্মিনাল আধুনিকায়ন করা হলেও যাত্রীরা তার কোনো সুফল পাচ্ছেন না। রাতের টার্মিনাল চলে যায় মাদক ও গাঁজাসেবীদের দখলে। অভিযোগ রয়েছে, গভীর রাতে টার্মিনালগুলো অসামাজিক কার্যকলাপের আখড়া হয়ে ওঠে।

ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন করতে মন্ত্রণালয়ের ১৩ সিদ্ধান্ত : ঈদকে সামনে রেখে যাত্রীবাহী গাড়ি পারাপারসহ লঞ্চ ও স্টিমারে যাত্রী পরিবহন নির্বিঘ্ন করতে ১৩ সিদ্ধান্ত নিয়েছে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়। গতকাল রাজধানীর বিআইডব্লিউটিসি ভবনে এক সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এরমধ্যে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হচ্ছে- ১ জুলাই থেকে পরবর্তী সিদ্ধান্ত না দেওয়া পর্যন্ত ফেরিঘাটে ইজারা প্রথা বন্ধ থাকবে। এ সময় ফেরিতে উঠার আগে বড় বাস ও ট্রাক প্রতি ৪০ টাকা এবং ছোট গাড়ি প্রতি ২০ টাকা দিতে হবে।বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন করপোরেশন (বিআইডব্লিউটিসি) কর্তৃক পরিচালিত ১৪টি ফেরিঘাট ও ফেরিঘাট সংলগ্ন লঞ্চ ঘাটগুলোতে এ সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে। সভায় যেসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় সেগুলো হচ্ছে- ঈদের পূর্বে তিন দিন ও পরে তিন দিন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ব্যতীত সাধারণ ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান ফেরিতে পারাপার বন্ধ থাকবে, রাতে সব মালবাহী জাহাজ, বালুবাহী বাল্কহেড চলাচল বন্ধ থাকবে, মাওয়া ও পাটুরিয়াঘাটে অধিক যাত্রী হলে প্রয়োজনে ফেরি দিয়ে যাত্রী পার করা হবে, সূর্যাস্তের পর স্পিডবোট চলবে না, স্পিডবোটের যাত্রীদের অবশ্যই লাইফ জ্যাকেট পরতে হবে, ঈদের সময় লঞ্চে যাত্রী ও মালামাল ওভারলোড করা যাবে না, লোড লেভেল ক্রস করার আগেই লঞ্চ ছেড়ে দিতে হবে, সদরঘাট থেকে লঞ্চ ছাড়ার পর পথিমধ্যে নৌকা বা অন্য কোনো মাধ্যমে যাত্রী বা মালামাল উঠানো যাবে না, ঈদের সময় লঞ্চে অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়া যাবে না, নৌপথে সব মাছ ধরার জাল পাতা বন্ধ রাখতে হবে এবং লঞ্চে যাত্রীর ওঠার সময় থেকে লঞ্চের চালক, মাস্টার ও অন্যান্য কর্মচারীদের অবস্থান নিশ্চিত করতে হবে।সভায় নৌপরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খান ছাড়াও মন্ত্রণালয়ের সচিব শফিক আলম মেহেদী, বিআইডব্লউটিএ’র চেয়ারম্যান কমডোর এম মোজাম্মেল হক, বিআইডব্লিউটিসি’র চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান, সমুদ্র পরিবহন অধিদফতরের মহাপরিচালক কমডোর এম জাকিরুল ইসলাম ভূঁইয়া, লঞ্চ মালিক, শ্রমিক, সড়ক পরিবহন ফেডারেশন, ট্রাক ও কাভার্ডভ্যান মালিক সমিতির প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন

You must be logged in to post a comment Login

মন্তব্য করুন