পলিথিন ও পুঁজিবাদী অপরাধ

প্রকাশ: July 26, 2015
poly ethylene

পাভেল পার্থ

অন্যায়ভাবে আবারো পলিথিনের জটলায় আটকে যাচ্ছে দেশের দম। নালা-খন্দ থেকে শুরু করে বুড়িগঙ্গার মতো ঐতিহাসিক নদীরও নিস্তার নেই এর থেকে। পণ্য বিক্রিসহ সর্বত্র দেদার ব্যবহার হচ্ছে পলিথিন। অথচ পলিথিনের বিরুদ্ধে আইন আছে, আছে প্রশাসন। এ বিষয়ে আছে এক জলজ্যান্ত মন্ত্রণালয়। তাহলে পলিথিন পয়দা হচ্ছে কোথায়? পলিথিনের কাঁচামাল আসছে আর উৎপাদিত পণ্য যাচ্ছে কোথায়? যাচ্ছে মাটির তলায়, জলের শরীরে। সবকিছু আটকে ফেলছে লাগাতার। আর এবারের অল্প বর্ষায় কীভাবে ঢাকা ও চট্টগ্রাম বারবার ডুবে যাচ্ছে, তা তো আমরা ডুবে মরেই বুঝতে পারছি। সম্মানিত মেয়ররা ঢাকা ও চট্টগ্রাম নগরের জলাবদ্ধতার বিরুদ্ধে নানা নির্বাচনী দাওয়াই বিলিয়েছিলেন। কিন্তু এক বিঘত জলাবদ্ধতাও কাটাতে পারেননি। কারণ তারা পলিথিনের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারেননি এখনো।

পলিথিন এক জ্যান্ত পুঁজিবাদী পাপ। নয়া উদারবাদী বাণিজ্য সাম্রাজ্যের দুঃসহ ক্ষত হিসেবে পলিথিন এ সভ্যতাকে গলা টিপে ধরছে বারবার। ১৯৩৩ সালে এই পলিমার পণ্য আবিষ্কৃত হলেও ১৯৫৮ সাল থেকে ভোক্তার ক্রয়সীমানা দখল করে নেয়। পরিবেশ অধিদফতরের সূত্রমতে, ১৯৮২ সালে বাংলাদেশে পলিথিন বাজারজাত ও ব্যবহার শুরু। পলিথিন গলে না, মেশে না, পচে না। ৫০০ থেকে হাজার বছরে এটি আবারো প্রকৃতিতে রূপান্তরিত হয়। ২০০২ সালের এক সমীক্ষা অনুযায়ী, ঢাকা শহরে প্রতিদিন একটি পরিবার গড়ে চারটি পলিথিন ব্যাগ ব্যবহার করত। পরিবেশ অধিদফতরের মতে, ১৯৯৩ সালে বাংলাদেশে দৈনিক ৪৫ লাখ পলিথিন ব্যাগ ব্যবহার হতো, ২০০০ সালে ৯৩ লাখ। ব্যবসায়ীদের সূত্র দিয়ে দৈনিক কালের কণ্ঠকে জানিয়েছে, চলতি সময়ে বাংলাদেশে প্রতিদিন ১ কোটি ২২ লাখ পলিথিন ব্যবহার হচ্ছে (সূত্র: ২১ জুন ২০১৫)। দুনিয়ায় প্রতি বছর প্রায় ৬০ মিলিয়ন টন পলিথিন সামগ্রী তৈরি হয়।

১৯৯৫ সালের পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের ৬(ক) (সংশোধিত ২০০২) ধারা অনুযায়ী, ২০০২ সালের ১ জানুয়ারি ঢাকা শহরে এবং একই সালের ১ মার্চ বাংলাদেশে পলিথিন নিষিদ্ধ করা হয়। পলিথিন নিষিদ্ধকরণ প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, ‘…যেকোনো প্রকার পলিথিন ব্যাগ অর্থাত্ পলিথাইলিন, প্রলিপ্রপাইলিন বা উহার কোনো যৌগ বা মিশ্রণের তৈরি কোনো ব্যাগ, ঠোঙা বা যেকোনো ধারক যাহা কোনো সামগ্রী ক্রয়বিক্রয় বা কোনো কিছু রাখার কাজে বা বহনের কাজে ব্যবহার করা যায়, উহাদের উৎপাদন, আমদানি, বাজারজাতকরণ, বিক্রয়, বিক্রয়ের জন্য প্রদর্শন, মজুদ, বিতরণ, বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে পরিবহন বা বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার দেশে সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করা হইল।’ প্রজ্ঞাপনে বিস্কুট, চানাচুরসহ বিভিন্ন খাদ্যদ্রব্য, ওষুধ, সিমেন্ট, সারসহ ১৪টি পণ্যের ক্ষেত্রে সাময়িকভাবে পলিথিন ব্যাগ ব্যবহার করার কথা বলা হয়েছে। পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫ (সংশোধিত ২০০২) এর ১৫(১) অনুচ্ছেদের ৪(ক) ধারায় পলিথিন উৎপাদন, আমদানি ও বাজারজাতের জন্য অপরাধীদের সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা জরিমানা অথবা ছয় মাসের কারাদণ্ডের বিধান আছে। আইন অনুযায়ী ১০০ মাইক্রোনের কম পুরুত্বের পলিথিন ব্যাগ উৎপাদন ও ব্যবহার নিষিদ্ধ। আইন অমান্যকারীর জন্য ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং ১০ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। বাজারজাত করলে ছয় মাসের জেল ও ১০ হাজার টাকা জরিমানা। মাঝে মধ্যে এ আইন মেনে ভ্রাম্যমাণ আদালত ‘লোক দেখানো’ কিছু জরিমানা আর অভিযান চালালেও পলিথিন থামছে না। পলিথিন যেন আইন, বিচার কাঠামো, সরকার, রাষ্ট্র সবকিছুর চেয়ে শক্তিময় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কী এক বিস্ময়কর কারণে রাষ্ট্র পলিথিনকে থামাতে ব্যর্থ হচ্ছে। ২০০২ থেকে ২০১৫ অবধি। একটি দুটি নয়। দীর্ঘ ১৩ বছর। এ ১৩ বছরে বুড়িগঙ্গা, বালু, তুরাগ, ধলেশ্বরী, মেঘনা, পদ্মা, যমুনা, ছোট যমুনা, মনু, সুরমা, কর্ণফুলীসহ শহরের ধারেকাছের নদীপ্রবাহগুলো পলিথিনের আঘাতে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেছে। পলিথিন জমতে জমতে নদীর তলায় দীর্ঘ অভেদ্য স্তর পড়েছে। কোথাও এ স্তর এতই শক্ত যে, বর্ষা মৌসুমেও আটকে যাচ্ছে জলযান। পলিথিন মাছের বিচরণে বাধা দেয়। শৈবাল, অণুজীবসহ জলজ বাস্তুসংস্থান তছনছ করে ফেলে। জলের তাপমাত্রা, স্বাদ, বর্ণ, গন্ধ, বৈশিষ্ট্য সবকিছু বদলে দেয়। পলিথিন মাটিতে দ্রুত মিশতে পারে না বলে এটি মাটির অভ্যন্তরীণ খাদ্যশৃঙ্খলকে আঘাত করে। অণুজীব ও মাটিতে জন্মানো উদ্ভিদ ও প্রাণীর সহাবস্থানকে যন্ত্রণাকাতর করে তুলে। ধীরে ধীরে মাটির বৈশিষ্ট্য ও গঠনে দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন তৈরি করে। পলিথিন জমে জমে মাটির দীর্ঘ অঞ্চল শস্য-ফসল জন্মানোর অনুপযোগী করে ফেলে।

পলিথিনের বিপদ কমবেশি প্রচারিত হলেও তা বিক্রি হচ্ছে। কোনো একটি পলিথিন কারখানা বন্ধ হয়ে গেলে আরেকটি চালু হচ্ছে। বাংলাদেশের পাশাপাশি আয়ারল্যান্ড, নিউজিল্যান্ড, ভারতের মুম্বাই ও হিমাচল প্রদেশ, তাইওয়ান, আমেরিকার সানফ্রান্সিসকো ও ক্যালিফোর্নিয়া রাজ্য, কানাডা, ইরিত্রিয়া, রুয়ান্ডা, সোমালিয়া, কেনিয়া, উগান্ডায় পলিথিন নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু পলিথিনকে কি থামানো যাচ্ছে? গ্রামের ক্ষুদে হাট থেকে শুরু করে বড় শহরের বাণিজ্য বিপণি পর্যন্ত কোথাও? ১০ম জাতীয় সংসদের পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটিতে পলিথিন বিষয়ে অভিযোগ জমা হতে শোনা যায়। ২০১৪ সালের ২৩ নভেম্বর সংসদীয় কমিটির বৈঠকে যেখানে সেখানে নিষিদ্ধ পলিথিনের ব্যবহার বন্ধে করণীয় নির্ধারণে ওয়ার্কার্স পার্টির সংসদ সদস্য টিপু সুলতানকে আহ্বায়ক করে একটি সাব-কমিটি গঠিত হয়েছিল। সাব-কমিটি বাজার পরিদর্শন ও কয়েক দফা বৈঠক শেষে পলিথিন নিষিদ্ধকরণে করণীয় সম্পর্কিত একটি প্রতিবেদন মূল কমিটির কাছে জমা দেয়। ২০১৫ সালের ৭ মে মূল কমিটির বৈঠকে প্রতিবেদনটি অনুমোদন করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য মন্ত্রণালয়কে বলা হয়। কিন্তু পলিথিন থামেনি। দুরদার করে সবকিছু চুরমার করে পলিথিন নির্ভয় প্রশ্নহীন বাড়ছে। টিকে থাকছে। পলিথিন টিকে থাকার অন্যতম কারণ বাজার। চলতি সময়ের করপোরেট কোম্পানি নিয়ন্ত্রিত পুঁজিবাদী বাজারটি সম্প্রসারণ হয়েছে পলিথিনকে কেন্দ্র করে। এ বাজার পলিথিন উপযোগী। এখানকার পণ্য, ক্রয়-বিক্রয়, বিজ্ঞাপন, ক্রেতা-ভোক্তার রুচি ও চাহিদা, সহজলভ্যতা, লাগাতার ভোগবাদী মনস্তত্ত্ব সবকিছুই মানুষকে পলিথিনমুখী করে তুলে। পলিথিন বিমুখ কোনো জোরদার রাষ্ট্রীয় প্রচারণা এখনো তৈরি হয়নি। অনেকেই বলবেন, এখন আগের সেই দিন নেই, পদ্মপাতায় গুড় বা কেচকি মাছ কেউ বেঁধে দেবে না। তাতে যে ক্রেতার সম্মানহানি হবে। বাজার করতে কেউ বাঁশের খলই, ঝুড়ি, পাটের থলে, নকশা করা কাপড়ের ব্যাগ নিয়ে ঘর থেকে বেরোয় না। অবশ্য প্রকৃতিতে এত লতাগুল্ম আর নেই যে, এই বিশাল বাজারের চাহিদা সামাল দিতে পারবে। এখন সবকিছু তাই হয়তো প্যাকেটবন্দি। দোকানের মাংস থেকে ক্রেতা-ভোক্তার মন। সবকিছুই পলিথিনে জড়াতে চায় বা জড়াতে হয়। এ যেন এক অনিবার্য পুঁজিবাদী নিয়তি। পলিথিনের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হলে এই অন্যায় পুঁজিবাদী অনিবার্যতাকে প্রশ্ন করতে হবে। ধাক্কা মারতে হবে করপোরেট নিয়ন্ত্রিত পলিথিনমুখী বাজারকে।

অনেকে পলিথিনের বিরুদ্ধে পাটকে দাঁড় করিয়েছেন। পাটের নানা পদের ব্যাগ আর কাগজের নানা রকমের ঠোঙা। পুরনো পত্রপত্রিকা আর কাপড়ের নানা কারবারও করছেন অনেকে। কিন্তু পলিথিনের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে গিয়ে এসব পরিবেশ উপযোগী ঠোঙা ও থলে হয়ে উঠছে ধনীর আরেক শখের কারবারি। দেশের গরিষ্ঠ ভাগ মেহনতি নিম্নবর্গকে পলিথিনের ভেতর ঠেসে দিয়ে পরিবেশ উপযোগিতাকে বগলে নিয়ে ‘প্রকৃতির নষ্টালজিয়াকে’ বেচাবিক্রি করার ধরনটি ‘বাণিজ্য’ হিসেবে অর্থবহ। কিন্তু ন্যায়পরায়ণতার বিচারে এও তো আরেক অন্যায়। আজ ধনীর যে দুলাল পরিবেশ উপযোগী পাটের থলে বা কাগজের ব্যাগ হাতে দুলিয়ে অভিজাত বিপণিবিতান থেকে হাসিমুখে বের হয়, তাদের স্মরণে রাখা জরুরি পলিথিন বাণিজ্য কিন্তু টিকে আছে ধনীদেরই ব্যবসা হিসেবে। গরিবের নয়। করপোরেট দুনিয়া পলিথিন বাজার চায় বলেই এটি চাঙ্গা থাকছে, গরিব শুধু পলিথিন কারখানার মজুর আর প্রশ্নহীন ব্যবহারকারী। কী নির্দয় পরিবেশ-যন্ত্রণা!

প্রাকৃতিক আঁশের সঙ্গে এই ভূগোলের রয়েছে এক ঐতিহাসিক জনসম্পর্ক। বৈচিত্র্যময় পাট প্রাণসম্পদকে ঘিরে পাটচাষী নারী-পুরুষ, পাটকলের শ্রমিক-মালিক, পাট বাজার, ক্রেতা-ভোক্তা মিলিয়ে পাটনির্ভর প্রায় কয়েক কোটি মানুষের যাপিত জীবন থেকে ছিঁড়েখুঁড়ে উধাও করা হয়েছে পাটের স্মৃতিকথা। বিশ্বব্যাংকের খবরদারিতে সবগুলো জলজ্যান্ত পাটকল দুম করে বন্ধ করে দেয়া হয়। একদিকে পলিথিন নিষিদ্ধ, আরেকদিকে পাটকলও বন্ধ। ধনীদের না হয় দামি পাটের থলে কি কাগজের নানা পদের ব্যাগ আছে। এসি গাড়ি থেকে নেমে অভিজাত বিপণিবিতান থেকে আবার গাড়িতে। ধনীদের তো আর মেহনতি নিম্নবর্গের মতো পাঙ্গাশ মাছ কি ছোট মাছ নিয়ে বা বাজারসদাই করে হেঁটে ঘরে পৌঁছতে হয় না। তাই একটি কাগজের প্যাকেটে ধনী ক্রেতার চাহিদা পূরণ হলেও নিম্নবর্গের কি তা হয়! অথচ নিম্নবর্গের পাটকে নিম্নবর্গের কাছ থেকেই সরিয়ে রাখা হয়েছে। জলবায়ু বিপর্যয়ের জন্য যেমন বাংলাদেশ দায়ী নয়, ঠিক তেমনি পলিথিন-সন্ত্রাসের জন্য দেশের মেহনতি নিম্নবর্গ দায়ী নয়। পুঁজিবাদী এ অপরাধকে টেনে এনেছে এবং চাঙ্গা করে চলেছে করপোরেট এজেন্সি মালিকরাই। আইনত এদের বিচার ও শাস্তি হওয়া জরুরি। পলিথিন রুখতে রাষ্ট্রকে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আইন ও জনগণ রাষ্ট্রের পক্ষে আছে। আশা করি দ্রুতই পলিথিনের বিরুদ্ধে আমরা জোরদার এক রাষ্ট্রীয় সাড়া দেখতে পাব।

লেখক: গবেষক
animistbangla@yahoo.com

সূত্র: বণিক বার্তা

You must be logged in to post a comment Login

মন্তব্য করুন