ফুটপাতে রাজনৈতিক দলের ১০৬ অবৈধ কার্যালয়, খরচ জোগাতে চাঁদাবাজি

প্রকাশ: July 28, 2015
footpath

ফুটপাতের অবৈধ দখল নিয়ে ২৮ জুলাই সমকাল পত্রিকায় প্রকাশিত এই প্রতিবেদনটি আমরা ঢাকার পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হল-

২৫ জুন। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে সড়কের ফুটপাত ঘিরে গড়ে ওঠা অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে অভিযান চালায় শাহবাগ থানা পুলিশ। অভিযানে দেড় শতাধিক খুপরি দোকান গুঁড়িয়ে দেওয়া হলেও অক্ষত থাকে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের কার্যালয়গুলো। এদিকে উচ্ছেদ অভিযানের একদিন পরই আবার দখল হয়েছে ওই এলাকার ফুটপাত। ফুটপাত ব্যবসায়ীরা জানান, পাশের দলীয় কার্যালয়ের নেতাদের সহযোগিতায় তারা আবারও দোকান বসিয়েছেন। এ জন্য ওই নেতাদের চা-নাশতা করার জন্য কিছু টাকা দিয়েছেন। এসব কার্যালয়ের নেতাদের নিয়মিত মাসোয়ারা দেন বলেও জানান ফুটপাত ব্যবসায়ীরা।

শুধু ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনের এ ফুটপাতে নয়, রাজধানীর অধিকাংশ এলাকায়ই ফুটপাত দখল করে গড়ে তোলা হয়েছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও অঙ্গ সংগঠনের ইউনিট কার্যালয়। ফুটপাতের হকারদের বিরুদ্ধে ঝটিকা উচ্ছেদ অভিযান চালানো হলেও ‘অক্ষত’ থাকে দলীয় কার্যালয়গুলো। ঢাকা উত্তর ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, রাজধানীর ফুটপাত দখল করে অবৈধভাবে অন্তত ১০৬টি দলীয় কার্যালয় গড়ে তোলা হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকায় ৬৭টি ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় ৩৯টি কার্যালয় চিহ্নিত করা হয়েছে। তবে রাজনৈতিক কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এর সংখ্যা আরও বেশি। প্রতি থানা এলাকায় কমপক্ষে সাত-আটটি করে কার্যালয় রয়েছে বলেও নেতাকর্মীরা দাবি করেছেন। শ্রমিক লীগের নেতাদের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, রাজধানীর প্রতিটি ওয়ার্ডের অধীনে গড়ে পাঁচ-ছয়টি ইউনিট রয়েছে। অধিকাংশ ইউনিটের নেতাকর্মীদের বসার জন্য ফুটপাত অথবা পরিত্যক্ত ফাঁকা স্থানে অস্থায়ী, আবার কোথাও কোথাও ইট-বালু দিয়ে পাকা কার্যালয় তৈরি হয়েছে।

শুধু ফুটপাত বা সিটি করপোরেশনের জায়গাই নয়, রেলওয়ে, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর, গণপূর্ত বিভাগ, ওয়াসার জায়গাসহ সরকারি জমি দখল করে অবৈধভাবে গড়ে উঠেছে রাজনৈতিক দল ও এর অঙ্গ সংগঠনের কার্যালয়।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা খালিদ আহমেদ দাবি করেছেন, ফুটপাত দখল করে গড়ে ওঠা রাজনৈতিক দলের কার্যালয় উচ্ছেদে মাঝে মধ্যেই অভিযান চালানো হয়। তিনি বলেন, ‘গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় একযোগে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়েছিল। তবে অভিযানের পর পরই আবার দখল হয়ে যায়।’ পুলিশের নজরদারির অভাবে ফুটপাত দখল করে অবৈধ কার্যালয় গড়ে উঠছে দাবি করে খালিদ আহমেদ বলেন, কিছু কিছু ক্ষেত্রে পুলিশের যোগসাজশও থাকে।

এদিকে পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ফুটপাতে অবৈধ দখল ঠেকাতে পুলিশ সাধ্যমতো নজরদারি করে। উচ্ছেদ অভিযানও চালায়। ঢাকা মহানগর পুলিশের উপ-কমিশনার (মিডিয়া) মুনতাসিরুল ইসলাম বলেন, পুলিশের প্রধান দায়িত্ব আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা। পুলিশ সে দায়িত্বের পাশাপাশি আরও অনেক দায়িত্ব পালন করে। যার একটি অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ। তবে এই অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের জন্য অথরিটি সংস্থা রাজউক এবং সিটি করপোরেশন। সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করলে অন্যের জমি দখল করে অথবা ফুটপাত, সড়কে অবৈধ স্থাপনা গড়ে তোলা সম্ভব হতো না।

গত এক সপ্তাহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, থানা আওয়ামী লীগ, ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, শ্রমিক লীগ, ছাত্রলীগ থেকে শুরু করে বঙ্গবন্ধুর নামে ভুঁইফোড় সংগঠনের সাইনবোর্ডও আছে ফুটপাতে গড়ে তোলা অফিসে। তবে অবৈধ দখলদারিত্বে শ্রমিক লীগের নামেই বেশি অফিস দেখা গেছে। কোথাও কোথাও অফিসের আশপাশে দোকান তুলে তা ভাড়া দেওয়া হয়েছে।

পোস্তগোলায় বুড়িগঙ্গা প্রথম সেতুর পাশে গড়ে তোলা হয়েছে জাতীয় শ্রমিক লীগের একটি কার্যালয়। স্থানীয় শ্রমিক লীগের নেতারা গ্যারেজ ও স্ট্যান্ড থেকে চাঁদা তোলেন বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। তবে এ নিয়ে নেতারা কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। মতিঝিলে জীবন বীমা ভবনের পাশে পাকা স্থাপনায় যুব শ্রমিক লীগের অফিস বসানো হয়েছে। মহাখালীর রেলগেট সংলগ্ন উড়াল সড়কের নিচে রেলের জায়গায় পাকা স্থাপনা তৈরি করে ২০ নম্বর ওয়ার্ড শাখা আওয়ামী যুবলীগ ও জাতীয় শ্রমিক লীগ অফিস নির্মাণ করা হয়েছে। তেজগাঁও রেলক্রসিংয়ের পাশে বানানো হয়েছে ৩৯ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ অফিস। অন্যদিকে, শাহবাগে ৫৭ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের ৫ নম্বর পাবলিক লাইব্রেরি ইউনিট শাখা, শিশুপার্কের জায়গায় ২০ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ পার্ক এভিনিউ ইউনিট এবং বঙ্গবন্ধু জাতীয় যুব পরিষদের অফিস। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগের কার্যালয় রয়েছে।

যোগাযোগ করা হলে শাহবাগ থানা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক মঈনুদ্দিন মইন জানান, তারা সিটি করপোরেশন নয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জায়গায় দলীয় কার্যালয় স্থাপন করেছেন। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের সেবা দেওয়ার উদ্দেশ্যেই মূলত তারা কার্যালয়টি তৈরি করেছেন। সংগঠনের কর্মীরা মধ্যরাত পর্যন্ত রোগীদের সেবায় নিয়োজিত থাকেন বলেও তিনি দাবি করেন।

সড়ক দখল করে যাত্রাবাড়ী থানা এবং টিঅ্যান্ডটি ভবনের পাশে সংগঠনের অফিস বানিয়েছে শ্রমিক লীগ। এ এলাকার ডেমরা রোডে ফ্লাইওভারের দুই পাশেই ছাত্রলীগ, যুবলীগের অফিস রয়েছে। রয়েছে মুক্তিযুদ্ধ প্রজন্ম লীগ ও ওলামা লীগের অফিসও। অভিযোগ রয়েছে, এসব এলাকায় দলের নাম ভাঙিয়ে প্রতিদিনই অটোরিকশা, টেম্পো-লেগুনা ও লক্কড়ঝক্কড় বাস থেকে চাঁদাবাজি করা হচ্ছে।

এদিকে অবৈধ কার্যালয় তৈরি করে সংগঠনের সদস্যদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ মিথ্যা বলে দাবি করেছেন জাতীয় শ্রমিক লীগের সাধারণ সম্পাদক সিরাজুল ইসলাম। তবে তিনি ফুটপাত দখল করে কার্যালয় স্থাপনের কথা স্বীকার করলেও এটাকে অবৈধ বলতে নারাজ। তিনি বলেন, শ্রমিক লীগের কর্মীরা নিজ নিজ অফিসের অনুমতি নিয়ে কার্যালয় তৈরি করে। রাজধানীতে ব্যাংক-বীমাসহ বিভিন্ন অফিসকেন্দ্রিক এমন অফিসের সংখ্যা অন্তত ৫০টি। তবে এর বাইরেও অনেক কার্যালয় রয়েছে। যার হিসাব রাখা সম্ভব নয়। তিনি বলেন, পুরো রাজধানীতেই শ্রমিক লীগের কর্মীরা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। সংশ্লিষ্ট এলাকার শ্রমিকরা নিজেদের বসার সুবিধার্থে ফুটপাতের পাশে অথবা ফাঁকা পরিত্যক্ত স্থানে কার্যালয় স্থাপন করে। এটা মূলত তৈরি করা হয় নিজেদের কাজ শেষে বিশ্রামের জন্য। এসব কার্যালয় ঘিরে চাঁদাবাজির অভিযোগ ওঠা ভিত্তিহীন বলে তিনি দাবি করেন।

তিন বছর আগে ২০১২ সালের ২ জুলাই ফুটপাত দখল করে অবৈধভাবে গড়ে তোলা সব দলীয় স্থাপনা উচ্ছেদের নির্দেশ দেয় স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের এক সভায় সিটি করপোরেশন ও ঢাকা মহানগর পুলিশকে যৌথভাবে অভিযান চালিয়ে ফুটপাতে থাকা দলীয় কার্যালয় সরিয়ে নিতে বলা হয়। সব স্থাপনা সরানোর জন্য ২৪ ঘণ্টা সময় বেঁধে দিলেও গত তিন বছরে তা কার্যকর হয়নি।

সূত্র: সমকাল

You must be logged in to post a comment Login