বেসরকারি হাসপাতালে ‘ভুয়া নার্স’র ছড়াছড়ি

প্রকাশ: June 25, 2015
nurse

সারা দেশের প্রায় সব বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান ও উপযুক্ত প্রশিক্ষণবিহীন নার্স দিয়ে চলছে উল্লেখ করে ২৫ জুন ২০১৫ তারিখে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে যুগান্তর পত্রিকায়। প্রতিবেদনটি আমরা ঢাকার পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হল-

প্রায় তিন বছর আগে গুরুতর অসুস্থ হয়ে রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন একজন সাবেক স্বাস্থ্য সচিব। তাকে সার্বক্ষণিক দেখভালের জন্য নিযুক্ত করা হয় ছয়জন নার্স। নার্সদের কর্মদক্ষতা দেখে সন্দেহ হয় সাবেক ওই স্বাস্থ্য সচিবের। পরবর্তীকালে খোঁজ নিয়ে তিনি জানতে পারেন, নার্সিং বিষয়ে তাদের কোনো ডিপ্লোমা বা বিএসসি ডিগ্রি নেই। শিক্ষাগত যোগ্যতা কারও মাধ্যমিক অথবা উচ্চমাধ্যমিক। ওই হাসপাতালে নিয়োগের পর তাদের সবাইকে ৫ থেকে ৭ দিনের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। এরপর থেকেই তারা নার্স হিসেবে রোগীদের সেবায় নিয়োজিত আছেন।

এ চিত্র রাজধানীর একটি বা দুটি হাসপাতালের নয়, সারা দেশের প্রায় সব বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকেরই একই অবস্থা। বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান ও উপযুক্ত প্রশিক্ষণবিহীন নার্স দিয়ে চলছে হাসপাতালগুলো। তাদের নেই নার্সিং কাউন্সিলের নিবন্ধন। ডিপ্লোমা ও বিএসসি নিবন্ধিত নার্সরা তাদের নাম দিয়েছেন ‘ভুয়া নার্স’।
সংশ্লিষ্টদের মতে, এসব প্রশিক্ষণ ও নিবন্ধনবিহীন অর্ধশিক্ষিত ব্যক্তি নার্স হিসেবে নিয়োগের ফলে প্রকৃত নিবন্ধিত ও প্রশিক্ষিত নার্সরা চাকরি পাচ্ছেন না। পাশাপাশি হাসপাতালের রোগীরাও তাদের কাছ থেকেও কাক্সিক্ষত স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এমন কি ডাক্তারদের বিভিন্ন নির্দেশনাও তার সহজেই বুঝতে পারেন না। ফলে চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র অনুযায়ী রোগীকে ওষুধ দেয়াসহ অন্যান্য বিষয়ে মারাত্মক ভুল হওয়ার আশংকা থাকছেই। এরপরও বেসরকারি হাসপাতালের মালিকরা নার্সিং কাউন্সিলের আইন অমান্য করে কয়েকদিনের নামমাত্র প্রশিক্ষণ দিয়েই তথাকথিত নার্সদের নিয়োগ দিচ্ছেন। মোট অঙ্কের অর্থ ব্যয় করে হাসপাতালে ভর্তি হলেও স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে থাকছেন রোগীরা। নিবন্ধিত নার্সদের নিয়োগ দেয়া হলে তাদের নির্ধারিত স্কেলে বেতনসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা দেয়া বাঞ্ছনীয়। অন্যদিকে তথাকথিত নার্সদের নামমাত্র বেতন দিলেই চলে। শুধু আর্থিক দিক বিবেচনা করেই ক্লিনিক মালিকরা তাদের নিয়োগ দেন বলে জানা গেছে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে নার্সিং কাউন্সিলের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সোমবার যুগান্তরকে বলেন, শুধু ঢাকা নয়, সারা দেশেই এসব ভুয়া নার্স রয়েছে। অনিবন্ধিত নার্স নিয়োগ দেয়া আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ হওয়া সত্ত্বেও কেউ আইন মানছে না। এর কারণ হিসেবে তিনি বলেন, আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার ক্ষমতা নার্সিং কাউন্সিলের না থাকায় এ সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। তিনি রোগীদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে নার্সিং কাউন্সিলের ক্ষমতা বাড়াতে সরকারে দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সারা দেশে প্রায় অর্ধ লাখের বেশি ভুয়া নার্স বিভিন্ন হাসপাতাল ও ক্লিনিকে কর্মরত আছেন। রাজধানীর বেশকিছু নামিদামি হাসপাতালেও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ‘ভুয়া নার্স’ কাজ করছেন। বাংলাদেশ নার্সিং কাউন্সিলের পক্ষ থেকে এসব হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে সতর্ক করা হলেও নেয়া হয়নি কার্যকরী কোনো উদ্যোগ। বাংলাদেশ নার্সিং কাউন্সিলের পক্ষ থেকে হাসপাতাল ও ক্লিনিকসমূহে অনিবন্ধিত নার্স নিয়োগ না করতে একাধিকবার সতর্কীকরণ বিজ্ঞপ্তি প্রদান করা হয়। কিন্তু সেদিকে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই বেসরকারি হাসপাতালগুলোর কর্তৃপক্ষের।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের উপপরিচালক হাসপাতাল ডা. স্বপন কুমার তপাদার বুধবার রাতে টেলিফোনে যুগান্তরকে বলেন, কাউন্সিলের নিয়মানুযায়ী দেশে পর্যাপ্ত নার্স নেই। তাই যাদের ন্যূনতম পেশাগত শিক্ষা আছে আদের ক্ষেত্রে কিছুটা শিথিল আচরণ করা হয়। বেশি কঠোর হলে প্রশিক্ষিত নার্সের অভাবে হাসপাতাল পরিচালনা কষ্টকর হয়ে যাবে।

বাংলাদেশ নার্সিং কাউন্সিল অর্ডিনেন্স ১৯৮৩ অনুযায়ী বাংলাদেশ নার্সিং কাউন্সিলের রেজিস্ট্রেশন/লাইসেন্স (পেশাগত সনদ) ব্যতীত কোনো নার্সকে কোনো হাসপাতাল, ক্লিনিক, স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান বা কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ প্রদান সম্পূর্ণ অবৈধ ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ। ভুয়া নার্স-মেডিকেল টেকনোলজিস্ট নির্মূল কমিটির আহবায়ক মো. আসাদুজ্জামান জুয়েল বলেন, সামান্য কিছু মুনাফার আশায় কিছু আসাধু স্বাস্থ্য ব্যবসায়ী লোকদের রাস্তা থেকে ধরে এনে সাদা এপ্রোন পরিয়ে নার্স আর মেডিকেল টেকনোলজিস্ট বানিয়ে জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করছে। জনস্বাস্থ্যকে হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।

রাজধানীর কয়েকটি হাসপাতলের চিত্র
ইব্রাহিম কার্ডিয়াক হাসপাতাল ও রিসার্স ইন্সটিটিউট: অনুসন্ধানে জানা গেছে, দেশের বেসরকারি হাসপাতালগুলোর মধ্যে অন্যতম ইব্রাহিম কার্ডিয়াক হাসপাতাল ও রিসার্স ইন্সটিটিউট। দেশের হৃদরোগীদের আস্থার এ প্রতিষ্ঠানটিতে কমপক্ষে ১৫ জন ভুয়া নার্স কর্মরত। সংশ্লিষ্টরা জানান, তারা সরাসরি স্টাফ নার্স হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হলেও বাংলাদেশ নার্সিং কাউন্সিল কর্তৃক প্র্যাকটিস লাইসেন্স এবং এ বিষয়ে কোনো শিক্ষাগত যোগ্যতা নেই তাদের। পরিচয় জানতে চাইলে এসব ভুয়া নার্স নিজেদের মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে পরিচয় দিয়ে থাকেন।

বিষয়ের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন প্রতিষ্ঠানের নার্সিং অ্যান্ড প্যারামেডিক্স সার্ভিসেসের ব্যবস্থাপক আবদুল আজিজ শিকদার। তিনি যুগান্তরকে বলেন, প্রতিষ্ঠানের নীতিমালা অনুযায়ী এদের নিয়োগ প্রদান করা হয়। তারা সনদপ্রাপ্ত না হওয়ায় নার্সদের সহকারি হিসেবে কাজ করে। পরবর্তীকালে এদের কেউ যদি ৪ বছরমেয়াদি ডিপ্লোমা করে আসেন, তাহলে তাদের পদোন্নতি দেয়া হয়। অনিবন্ধিত নার্স নিয়োগ দিয়ে নার্সিং কাউন্সিলের আইন ভঙ্গ করা হচ্ছে কিনা জানতে চাইলে তিনি দাবি করেন, আইন ভঙ্গ হচ্ছে না।

বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল (ধানমণ্ডি): দেশের অন্যতম এ বেসরকারি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল ভুয়া নার্সের সংখ্যা প্রায় অর্ধশত। এরা এইড নার্স ও এইড ২ নার্স হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত। বাংলাদেশ নার্সিং কাউন্সিলের প্র্যাকটিস লাইসেন্স এবং এ বিষয়ে কোনো শিক্ষাও নেই এসব এইড নার্সের। এমনকি হাসপাতালের সাবেক পরিচালনা পরিষদের এক সদস্যের বাসার কাজের বুয়াও এখানে নার্স হিসেবে দাপটের সাঙ্গে কাজ করছেন এ প্রতিষ্ঠানে। অভিযোগ আছে- এ প্রতিষ্ঠানের বেশিরভাগ নার্স জাল সনদের মাধ্যমে নিয়াগ পেয়েছেন।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজের উপপরিচালক ডা. নাফিস আহমেদ চৌধুরী জানান, এ প্রতিষ্ঠানের নিয়োগ ট্রাস্টি বোর্ড নিয়ন্ত্রিত। তবে অনিবন্ধিত যেসব নার্স রয়েছে তারা ওয়ার্ড চিফ হিসেবে দায়িত্ব পান না। তারা সহকারী হিসেবে কাজ করেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজের একটি নার্সিং প্রশিক্ষণ আছে। যেখান থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে এইড নার্স হয়। তারাই পরবর্তীকালে এ হাসপাতালে নার্স হিসেবে কাজ করেন। তবে এই কারিকুলাম নার্সিং কাউন্সিল অনুমোদিত নয়। তাই এসব নার্স নিবন্ধত হতে পারে না। ডা. নাফিস বলেন, নার্সিং কাউন্সিলের দুর্বলতার কারণেই নার্স নন, এমন লোকদের নিয়োগের সুযোগ নিচ্ছে হাসপাতালগুলো।

ঢাকা ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল: এ হাসপাতালে ‘ভুয়া নার্স’ রয়েছে প্রায় ৪০ জন। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সুকৌশলে তাদের এইড নার্স ও সেবিকা সহযোগী হিসেবে নিয়োগ প্রদান করেছে।

সূত্র: যুগান্তর

You must be logged in to post a comment Login

মন্তব্য করুন