ভবন নির্মাণে নিয়ম মানা হচ্ছে না

প্রকাশ: May 28, 2015
Untitled-1

বাংলাদেশে যে ৭২ হাজার ঝুঁকিপূর্ণ ভবন রয়েছে এর বেশির ভাগই ঢাকা শহরে। পুরান ঢাকায় রয়েছে কয়েক শ’ বছরের পুরনো স্থাপনা। আবার নিজেদের প্রয়োজনে বাড়ির মালিকরাই ইচ্ছামতো উপরের দিকে বাড়িয়ে নিয়ে ঝুঁকির মাত্রা বাড়াচ্ছে।

২০১০ সালে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের হিসাবে রাজধানীতে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের সংখ্যা ৮০ হাজার। কিন্তু ভবন তৈরির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) ঘোষণা কার্যত কাগজে-কলমেই রয়ে গেছে। অবৈধ ভবনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং নির্মিতব্য ভবনগুলো তদারকির জন্য দুই বছর আগে পাঁচটি মনিটরিং কমিটি গঠন করা হলেও বাস্তবে এগুলোর তেমন কোনো কার্যক্রম নেই। রাজউকের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের কারণেই মূলত মনিটরিং কমিটিগুলো অকার্যকর হয়ে আছে। তাদের কারণে কমিটির নিয়মিত বৈঠক হয় না এবং সরেজমিন পরিদর্শন কার্যক্রমও তেমন একটা নেই। এসব কারণেই রাজধানীতে বিল্ডিং কোড না মেনেই প্রতিনিয়ত গড়ে উঠছে অবৈধ ভবন।

২০১১ সালের ৫ জানুয়ারি রাজউকের এক বৈঠকে নিয়মবহির্ভূতভাবে ভবন নির্মাণ ঠেকাতে রাজউক পাঁচটি মনিটরিং কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নেয়। রাজধানীকে পাঁচটি এলাকায় ভাগ করে গঠন করা হয় ১২ সদস্যের মনিটরিং কমিটি। কমিটিতে রাজউকের কর্মকর্তা ছাড়াও জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ, ইনস্টিটিউট অব আর্কিটেক্টস বাংলাদেশ, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন, রিহ্যাব, বিএলডিএ ও পরিবেশবাদী সংগঠনের একজন করে প্রতিনিধি রয়েছেন। কমিটির সভাপতি হিসেবে রয়েছেন যুগ্ম সচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তা। মনিটরিং কমিটির কাজ নির্মাণাধীন বাড়িগুলো সশরীরে পরিদর্শন করে কেউ অপরাধ করলে বাড়ির মালিকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া। কিন্তু আজ পর্যন্ত কমিটির তেমন কোনো কার্যক্রম নেই। হয় না নিয়মিত বৈঠকও। এ সুযোগে অবৈধ ভবন মালিকদের কাছ থেকে তারা সুবিধা নিচ্ছে।

আইন
বহুতল ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে আইনে পরিবেশ ছাড়পত্র নেওয়া বাধ্যতামূলক করা হলেও তেমন কেউই তা মানছে না। ফলে পরিবেশ ছাড়পত্র ছাড়াই কিংবা নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করেই গড়ে তোলা হচ্ছে বহুতল ভবনগুলো। পরিবেশ অধিদফতর জানায়, বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন-১৯৯৫ (সংশোধিত-২০১০) অনুযায়ী বহুতল আবাসিক/বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণে পরিবেশ ছাড়পত্র গ্রহণ বাধ্যতামূলক। আবার ইমারত বিধিমালায় বলা হয়েছে, সর্বোচ্চ সাততলা ভবন নির্মাণের সময় ফায়ার সার্ভিস, পরিবেশ অধিদফতর, গ্যাস, ওয়াসা ও বিদ্যুত্ বিভাগের ছাড়পত্র নেওয়া বাধ্যতামূলক। পাশাপাশি হাইরাইজ ভবনে ফায়ার ডিটেক্টর, স্মোক ডিটেক্টর, উচ্চগতির পানি স্প্রে সিস্টেম ও কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমন সিস্টেম থাকাও বাধ্যতামূলক। বাংলাদেশ ইমারত নির্মাণ বিধিমালা-১৯৯৬-এর ১২ নম্বর ধারার (১) উপধারা অনুযায়ী আটতলা উচ্চতার বিল্ডিং নির্মাণের ক্ষেত্রে ইমারতের সামনে কমপক্ষে ২৫ ফুট এবং ছয়তলা উচ্চতার বিল্ডিং নির্মাণের ক্ষেত্রে কমপক্ষে ১৫ ফুট প্রশস্ত রাস্তা থাকা বাধ্যতামূলক। এ বিধিমালার ৮ নম্বর বিধির ৫ উপবিধি অনুযায়ী উল্লিখিত ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে নিকটবর্তী সড়কের কেন্দ্র থেকে কমপক্ষে চার দশমিক পাঁচ মিটার অথবা সড়ক সংলগ্ন ইটের সীমানা থেকে এক দশমিক পাঁচ মিটার দূরে ইমারত নির্মাণ করতে হবে। এছাড়া সর্বোচ্চ সাততলা ভবন নির্মাণের সময় পরিবেশ অধিদফতরের ছাড়পত্র নেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। কিন্তু আইনে পরিবেশ ছাড়পত্র বাধ্যতামূলক হলেও নগরীর বেশিরভাগ ভবন নির্মাণে এসবের তোয়াক্কা করা হচ্ছে না।

ভবন নির্মাণে নাগরিকদের নিরাপত্তা, স্বাচ্ছন্দ্য ও পরিবেশসম্মত ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার জন্য পরিবেশ ছাড়পত্র এবং বিল্ডিং কোড মানা আবশ্যক। যেসব প্রতিষ্ঠান আইন অমান্য করে বহুতল ভবন নির্মাণ করবে তাদের বিরুদ্ধে পর্যায়ক্রমে অভিযান চালিয়ে নির্মাণ বন্ধ করে দেওয়ার নিয়ম রয়েছে। পরিবেশ আইন অমান্য করে ভবন নির্মাণ করা হলে জরিমানার পাশাপাশি ভবনের পানি, গ্যাস ও বিদু্যুত্ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করারও নিয়ম রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এসব কিছুই মানা হয় না। মনিটরিং কমিটি ঠিকমতো কাজ করলে অবৈধ ভবন নির্মাণ বন্ধ করা সম্ভব হবে। এতে করে দুর্ঘটনার হারও কমবে।

ঢাকাকে পরিকল্পিত নগরী হিসেবে গড়ে তোলার জন্য যাদের দায়িত্ব ছিল তারা যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করেনি। করলে অনুমোদন ছাড়াই একের পর এক বহুতল ভবন নির্মাণ করা সম্ভব ছিল না। রাজধানীতে অবৈধ ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবন চিহ্নিত করা উচিত। যেসব কর্মকর্তার আমলে এসব ভবন নির্মাণ করা হয়েছিল তাদের এবং ভবন মালিককে শাস্তির আওতায় আনতে হবে। বহুতল অধিকাংশ ভবনেরই নকশা নেই। এসব ভবনে আগুন লাগলে বিদ্যুত্ সংযোগ বন্ধ থাকে। তখন ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের নকশা না দেখেই অন্ধকারে উদ্ধার কাজ চালাতে হয়। এ কারণে ক্ষয়ক্ষতি বাড়ে। যারাই ভবন নির্মাণ করুক না কেন, অন্তত যথাযথভাবে অনুমোদন নিয়ে তৈরি করলে ভবনগুলো ঝুঁকির হাত থেকে রক্ষা পাবে এবং দুর্ঘটনা তেমন একটা ঘটবে না। কিন্তু অনেক ভবনের ক্ষেত্রেই এসব নিয়ম না মানার কারণে দুর্ঘটনার আশঙ্কা বেড়ে যাচ্ছে।

You must be logged in to post a comment Login

মন্তব্য করুন