‘লাল’ শ্রেণীভুক্ত হলেও অভিযান নেই ট্যানারির বিরুদ্ধে

প্রকাশ: June 29, 2015
tanary

পরিবেশ দূষণের জন্য দায়ী ট্যানারিগুলোর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না উল্লেখ করে ২৯ জুন ২০১৫ তারিখে বণিক বার্তায় প্রকাশিত এই প্রতিবেদনটি আমরা ঢাকার পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হল-

দূষণের জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী প্রতিষ্ঠানগুলোকে ‘লাল’ শ্রেণীভুক্ত করেছে পরিবেশ অধিদফতর। এ তালিকায় আছে চামড়া শিল্পের অনেক কারখানা। তা সত্ত্বেও পরিবেশ দূষণকারী এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কোনো অভিযান পরিচালিত হচ্ছে না। যদিও বর্জ্য শোধনের ব্যবস্থা ছাড়াই উৎপাদন অব্যাহত রেখে দূষণ ঘটিয়ে যাচ্ছে ট্যানারিগুলো।

জানা গেছে, সারা দেশে ছোট-বড় মোট ২২০টি ট্যানারি রয়েছে। পরিবেশ অধিদফতর প্রতিষ্ঠার পর ২০১০ থেকে ২০১৩ সালের জুলাই পর্যন্ত সাড়ে তিন বছরে মাত্র সাতটি ট্যানারিকে মোট ১৬২ কোটি ৮৭ লাখ ৫৫৬ টাকা জরিমানা করা হয়। সর্বশেষ ২০১৩ সালের ৭ জুলাই মোট ৯ হাজার ৯০০ ঘনমিটার দূষিত বর্জ্য ফেলার কারণে গাজীপুরের এপেক্স ট্যানারিকে ৪ কোটি ৯৫ লাখ টাকা জরিমানা করে পরিবেশ অধিদফতর। এর পর আর কোনো অভিযান চোখে পড়েনি।

পরিবেশ দূষণের জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযান কেন চালানো হচ্ছে না, জানতে চাইলে এ ব্যাপারে সরাসরি কোনো মন্তব্য করেননি পরিবেশ ও বনমন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু। তবে বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, পরিবেশ সম্পর্কে সচেতনতা বেড়েছে। এখন পরিবেশ দূষণের বিষয়ে ভয়ে থাকেন শিল্প মালিকরা। এটা সরকারের সাফল্যের অংশ। ট্যানারির সঙ্গে শিল্প মন্ত্রণালয় জড়িত। এগুলো সাভারে স্থানান্তরের কাজ চলছে শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন। সেখানে কেন্দ্রীয়ভাবে বর্জ্য শোধনাগার হচ্ছে। কারখানাগুলো স্থানান্তর হলে দূষণও বন্ধ হয়ে যাবে।

সবচেয়ে বেশি ট্যানারি রয়েছে ঢাকার হাজারীবাগে। সংখ্যায় তা ১৯৪। এছাড়া চট্টগ্রামসহ দেশের অন্যান্য অঞ্চলেও বেশকিছু ট্যানারি আছে। ধামরাই ও সাভারে তিনটি, চট্টগ্রামে ১৮ এবং জামালপুর, রংপুর, খুলনা, যশোর ও গাজীপুরে একটি করে ট্যানারি রয়েছে। এগুলোর বিরুদ্ধেও নেই কোনো অভিযান।

জানা গেছে, হাজারীবাগের ট্যানারিগুলো সাভারে স্থানান্তরের প্রকল্পটি একনেকে অনুমোদন পায় ২০০৩ সালের ১৬ আগস্ট। কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০০৫ সালে। এ শিল্প নগরে ২০৫টি প্লটে ১৫৫টি কারখানা স্থাপন করার কথা। বারবার সময় ও নির্মাণ ব্যয় বাড়িয়েও সেখানে আজ পর্যন্ত কোনো কারখানা স্থানান্তর করা যায়নি।

হাজারীবাগের ট্যানারি স্থানান্তরের নির্দেশ রয়েছে হাইকোর্টেরও। ২০০৯ সালের জুনে হাইকোর্ট সরকারকে ট্যানারিগুলো ঢাকার বাইরে সাভারে স্থানান্তর বা ২০১০ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে বন্ধের আদেশ দেন। এ আদেশ না মানায় সরকারের ঊর্ধ্বতন ডজন খানেক কর্মকর্তাকে তলবও করেন আদালত। পরে এসব কারখানা স্থানান্তরের সময় বাড়ানো হয়। তবে পরিবেশ অধিদফতরের এনফোর্সমেন্ট কার্যক্রম বন্ধ রাখার কোনো নির্দেশনা না থাকলেও অজ্ঞাত কারণেই বন্ধ রয়েছে দূষণবিরোধী অভিযান।

এ বিষয়ে শিল্প সচিব মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া বলেন, সাভারে চামড়া শিল্পপল্লীতে কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগারের কাজ শেষ পর্যায়ে। আগস্টেই এটি অপারেশনে আসতে পারবে। আশা করছি, কিছু কারখানা ওই সময়ের মধ্যে সাভারে স্থানান্তর হয়ে উৎপাদন শুরু করবে। পরিবেশ দূষণের বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে পরিবেশ অধিদফতরসহ কাউকেই কোনো ধরনের বিধিনিষেধ দেয়া হয়নি। চাইলেই নিজ নিজ আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে পারে যেকোনো কর্তৃপক্ষ।

এদিকে দফায় দফায় ট্যানারি স্থানান্তরে সময় বাড়িয়ে যাচ্ছে শিল্প মন্ত্রণালয়। ২০১৪ সালের ডিসেম্বর, চলতি বছর মার্চ, তার পর জুন; এভাবে দফায় দফায় সময় ১০ বারেরও বেশি সময় বাড়ানো হয়। তবে শিল্প মন্ত্রণালয়ের কোনো সময়সীমাই মানেননি ট্যানারি মালিকরা। সর্বশেষ তথ্যমতে, সাভারে ৭৮টি ট্যানারি তাদের কারখানা নির্মাণের মূল কাজ শুরু করেছে। ২৫টি কারখানার সীমানা দেয়াল ও নিরাপত্তা ছাউনি (গার্ড শেড) তৈরি হয়েছে। শুধু সীমানা দেয়াল তুলেছে ৩২টি ট্যানারি। আর ১২টি ট্যানারি শুধু নিরাপত্তা ছাউনি তুলেছে। কেন্দ্রীয় বর্জ্য শেধনাগার নির্মাণ শেষ পর্যায়ে রয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, হাজারীবাগে অবস্থিত ১৯৪টি ট্যানারি কারখানা থেকে প্রতিদিন ১৫০ টন কঠিন ও ২১ হাজার ৬০০ ঘনমিটার দূষিত তরল বর্জ্য বুড়িগঙ্গায় গিয়ে মেশে। লবণ, ক্রোমিয়াম, সিসা, অ্যামোনিয়াম, সালফারসহ বিভিন্ন ক্ষতিকর রসায়নিক বর্জ্য পানি, মাটি ও পরিবেশের সঙ্গে মিশে তা মানবস্বাস্থ্যের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সূত্র: বণিক বার্তা

You must be logged in to post a comment Login

মন্তব্য করুন