স্কুলের সুবিধাও নেই বিশ্ববিদ্যালয়ে!

প্রকাশ: June 24, 2015
02_237171

ভিক্টোরিয়া ইউনিভার্সিটি ও অতীশ দীপঙ্কর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় পরিদর্শন করে শিক্ষাসচিব নজরুল ইসলাম খান মন্তব্য করেছেন এগুলোতে স্কুলের সুবিধাও নেই। এই নিয়ে ২৪ জুন ২০১৫ তারিখের কালের কন্ঠে প্রকাশিত প্রতিবেদনটি আমরা ঢাকার পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হল-

শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৫০০, শিক্ষক পাঁচজন। এর মধ্যে আবার ৩০ শতাংশ শিক্ষক সব সময়ই অনুপস্থিত থাকেন। বাকি শিক্ষকরা বিভিন্ন বর্ষে মার্কেটিংয়ের মতো একটি আধুনিক বিষয়ে সপ্তাহে প্রায় ৪০টি ক্লাস নেন। অবাস্তব মনে হলেও এর পুরোটাই সত্য। এ অবস্থা চলছে রাজধানীর ভিক্টোরিয়া ইউনিভার্সিটিতে। শুধু ভিক্টোরিয়া নয়, পাশের ভবনে অতীশ দীপঙ্কর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ও কম যায় না। রাজধানীর পান্থপথের এ দুটি বিশ্ববিদ্যালয় যেন পাল্লা দিয়ে অনিয়ম করছে। এমনকি একটি ভালো মানের স্কুলে যে শিক্ষা উপকরণ, অবকাঠামো, ল্যাবরেটরি থাকা প্রয়োজন তা-ও নেই এ দুই বিশ্ববিদ্যালয়ে।

একেকটা শ্রেণিকক্ষ খুপরি ঘরের মতো। আলো-বাতাস ঢোকার কোনো জায়গা নেই। শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করতে নেওয়া হয় নানা প্রতারণার আশ্রয়। কম্পিউটার ল্যাবে থরে থরে সাজানো মনিটর। কিন্তু কোনো মনিটরের সঙ্গে সিপিইউ (সেন্ট্রাল প্রসেসিং ইউনিট) নাই! ওয়াই-ফাই বা অন্যান্য প্রযুক্তিগত সুবিধা তো নেই-ই। পরীক্ষার সময় নকল লিখে দেয়ালের সব জায়গা ভরে ফেলা হয়েছে।

গতকাল মঙ্গলবার আকস্মিকভাবে এ দুটি বিশ্ববিদ্যালয় পরিদর্শনে যান শিক্ষাসচিব নজরুল ইসলাম খান। সঙ্গে ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) উপপরিচালক জেসমিন পারভীন। তাঁদের কাছে পেয়ে শিক্ষার্থীরা জানালেন, ‘আমরা সব সময় ভয়ে থাকি। কখন বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হয়ে যায়। এত অনিয়ম তো সরকার মেনে নিতে পারে না।’

সচিব প্রথমে ঢোকেন ভিক্টোরিয়া ইউনিভার্সিটিতে। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বিভাগের চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নানের কাছে নিজের পরিচয় দেন তিনি। তারপর ঘুরে দেখেন বিভিন্ন শ্রেণিকক্ষ।

ব্যাচেলর অব ট্যুরিজম বিভাগের ক্লাসে একজনই ছাত্র ছিলেন। তিনি জানালেন, সপ্তাহে দুই দিন ক্লাস হয়। সচিব সেখান থেকে কম্পিউটার ল্যাবে ঢুকেই দেখেন সুদৃশ্যভাবে সব মনিটর সাজানো। কিন্তু কোনোটির সঙ্গেই সিপিইউ নেই। একটি রুমের সামনে ঝুলছিল ড. দুর্গাদাস ভট্টাচার্যের নামফলক। ফলকে আরো লেখা ছিল ‘অ্যাডভাইজার টু প্রেসিডেন্ট’। মার্কেটিং বিভাগে বসেছিলেন তরুণ শিক্ষক সানি সাহা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করে ভিক্টোরিয়া ইউনিভার্সিটিতে যোগ দিয়েছেন। তিনি জানালেন, তাঁর বিভাগে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৫০০ জন। অথচ শিক্ষক মাত্র পাঁচজন। সব শিক্ষকের বয়সই কি আপনার মতো? জানতে চান সচিব। সানির জবাব- ‘অলমোস্ট সবাই তরুণ’। শুনে অসন্তোষ ঝরে শিক্ষাসচিবের কণ্ঠে, ‘সব শিক্ষক তরুণ হতে পারে না, শিক্ষকরা অভিজ্ঞ না হলে পড়াবেন কী? বিভিন্ন বয়সের থাকতে পারেন। কিন্তু সবাই তরুণ হবেন কেন? শিক্ষকতা একটি জটিল পেশা। তার মানে হচ্ছে কোনো শিক্ষক এখানে স্থায়ী হয় না। নামকাওয়াস্তের চাকরিতে যোগ দেন। পড়ে ভালো চাকরি নিয়ে সড়ে পড়েন।’

ভিক্টোরিয়া ইউনিভার্সিটি হওয়ার কথা ছিল কুমিল্লায়। তবে উপাচার্য এম আর খান জানান, পান্থপথেই তাঁদের ইউনিভার্সিটির দুটি ক্যাম্পাস। ভাড়া করা বাড়িতে বিশ্ববিদ্যালয় চালাচ্ছেন।

ভিক্টোরিয়ার পাশের ভবনেই অতীশ দীপঙ্কর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। সেটির অবস্থা আরো করুণ। রিসেপশন থেকে পরিদর্শক দলকে বলা হলো ওপরে ক্লাস চলছে। কিন্তু সচিব গিয়ে দেখলেন ঘুপচি শ্রেণিকক্ষগুলো ফাঁকা। ধুলো পড়ে আছে। অর্থাৎ দীর্ঘদিন কক্ষগুলোয় কারো পা-ই পড়েনি।

একটি শ্রেণিকক্ষে ঢুকে দেখা গেল কয়েকজন শিক্ষার্থী জটলা করছে। শিক্ষক নেই। শিক্ষার্থীরা জানালেন, সপ্তাহে তিনটি ক্লাস হয়। এতে সিলেবাস কাভার হয় কি না জানতে চাইলেন ইউজিসির উপপরিচালক জেসমীন পারভীন। পরে তিনিই হিসাব করে বুঝিয়ে দিলেন এভাবে কোনোমতেই বিবিএর সিলেবাস শেষ হবে না। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সপ্তাহে ছয় দিন ক্লাস করে সিলেবাস কোনোমতে শেষ করে।

কৌশলে শিক্ষাসচিব নজরুল ইসলাম খান শিক্ষার্থীদের কাছে জানতে চাইলেন এমন কেউ উপস্থিত আছেন যিনি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্কলারশিপ পেয়েছেন? জবাব এলো ‘না’। অথচ ছয় শতাংশ শিক্ষার্থীকে বিনা বেতনে পড়ানোর শর্তেই বিশ্ববিদ্যালয়কে সরকার লাইসেন্স দিয়েছে। দেয়ালে নকল কেন? জানতে চাইলেন শিক্ষাসচিব। প্রথমে গাঁইগুঁই করলেও চেপে ধরলে শিক্ষার্থীরা লাজুক হেসে জবাব দেন, বড় ভাইয়ারা করেছে। আমরা উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছি। এক হাজার শিক্ষার্থীর জন্য লাইব্রেরিতে চেয়ার রয়েছে ১৩টা। দোতলা থেকে বলা হয়, ওপরের তলায়ও ক্লাসরুম রয়েছে। অথচ ওপরে গিয়ে দেখা যায় ওখানে টোকাই করপোরেশনের অফিস। পাশে রুমের সামনে কয়েক জোড়া স্যান্ডেল ও জুতো দেখে বোঝা গেল ওটা পারিবারিক বাসা।

একজন শিক্ষার্থী এসে জানালেন তাঁরা হতাশায় ভুগছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো ভবিষ্যৎ দেখতে পাচ্ছেন না। আর বিশ্ববিদ্যালয়েরই যদি কোনো ভবিষ্যৎ না থাকে তাহলে ছাত্রদের ভবিষ্যৎ কী? শুনে সচিব অভয় দিলেন, ‘আমরা বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করতে আসিনি। মান বাড়ানোর জন্য কী করা যায় তা খুঁজে বের করতে এসেছি।’ কয়েকজন এসে সচিবকে নিচু স্বরে জানালেন, অভিযোগ করায় তাঁদের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের করে দিতে পারে। এমন হলে শিক্ষাসচিব তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন।

এ সময় শহীদুল নামে উপস্থিত এক ব্যক্তি জানান, এ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যা টাকা আসে তা মালিকরা ভাগবাটোয়ারা করে নিয়ে যান। বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান আনোয়ারা বেগম প্রতি মাসে চার লাখ টাকা নেন। সিনিয়র দুজন ট্রাস্টি মাসে আড়াই লাখ টাকা করে এবং অন্য সদস্যরা মাসে এক লাখ টাকা করে সম্মানী নেন। এ কারণে শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের যথাসময়ে বেতন দেওয়া যায় না। বনানীর মূল ক্যাম্পাসেও নামমাত্র টেক্সটাইল ও ফার্মেসি ল্যাব রয়েছে। শহীদুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি বোর্ডের নানা অনিয়মের বিভিন্ন চিত্র তুলে ধরে সচিবের কাছে একটি লিখিত অভিযোগ দাখিল করেন। শিক্ষাসচিব জানান, পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ব্যবস্থা নেবেন। ইউজিসির উপপরিচালক জেসমিন পারভীন বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্যদের আর্থিক সুবিধা নেওয়ার সুযোগ নেই। এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ আছে।

পরিদর্শন শেষে উপস্থিত সাংবাদিকদের শিক্ষাসচিব বলেন, একটি ভালো মানের স্কুলে যে শিক্ষা উপকরণ, অবকাঠামো, ল্যাবরেটরি থাকা প্রয়োজন তা-ও নেই রাজধানীর ভিক্টোরিয়া ইউনিভার্সিটি ও অতীশ দীপঙ্কর বিশ্ববিদ্যালয়ে। ফলে শিক্ষার্থীরা কী শিখছে তা সহজেই অনুমেয়। আমরা এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে উপকরণ, অবকাঠামো, ল্যাবরেটরির দ্রুত উন্নতি চাই। নইলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আমি জানি এসব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের পেছনে অনেক প্রভাবশালী রাজনীতিকরা থাকেন। তার পরও শিক্ষার মান নিয়ে আপস করা হবে না। বিশ্ববিদ্যালয় দুটি ২০০৩-০৪ সালে প্রতিষ্ঠা হলেও আজো কোনো সমাবর্তন করেনি। পদে পদে এসব বিশ্ববিদ্যালয় অনিয়ম করছে। এবার পরিদর্শন করেছি বিনা নোটিশে। পরের বার নোটিশ দিয়ে আসব। পরিস্থিতির উন্নতি না দেখলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পর্যায়ক্রমে সব বিশ্ববিদ্যালয় পরিদর্শন করা হবে।

সূত্র: কালের কন্ঠ

You must be logged in to post a comment Login

মন্তব্য করুন